বস্তিতে বড় হইছি, এখনও বস্তিতেই আছি। বাপ-দাদারা চাষা ছিলেন। আমার শরীরেও চাষার গন্ধ লেপ্টে আছে। শিক্ষা-দীক্ষা পাই নাই, অশিক্ষা পাইছি। সংস্কার শিখি নাই, কুসংস্কার শিখছি। উদারতা বুঝিনা, সংকীর্ণতা ঠিকই বুঝি। আর সম্ভবতো এ কারণেই এ পোস্টটার উৎপত্তি।
শুরুতেই ছোট্ট একটা ছোট গল্প বলি। কোন সময়ে শুনেছিলাম প্যারিস শহরে নাকি 'কুত্তা' পেটানো নিষেধ। 'কুত্তা' শব্দটার সাথে আমাদের ব্লগের সুশীল সমাজের সদস্যগণ পরিচিত নাও থাকতে পারেন। শব্দটা আমাদের গ্রামদেশে ও বস্তিতে বহুল প্রচলিত এবং আমাদের সংস্কৃতিতে শব্দটা মোটেই অশ্লীল নয়। হ্যা, আপনারা যাকে কুকুর বলেন আমরাই তাকে কুত্তা বলি। যাহোক, কুত্তা পেটানো নিষেধ থাকলেও একদিন প্রকাশিত হল যে খোদ শহরের মেয়র মহোদয় 'কুত্তা' নয় নিজের বউকেই পেটান। বিষয়টি নিয়ে নাগরিক সমাজে সমালোচনার ঝড় বয়ে যেতে লাগল। অবস্থার অবনতির আশংকায় মেয়র মহোদয় নাগরিকদের ডেকে এর কারণ ব্যাখ্যা করলেন। তিনি নাগরিকদের বললেন, বউকে পেটানো যায় কারণ বউ ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কিন্তু 'কুত্তা' (তার ভাষায় কুকুর) পেটানো যাবেনা। কারণ 'কুত্তা' ঈশ্বরের সম্পত্তি। নাগরিকরা ভেবে দেখল আসলেইতো মেয়র মহোদয়ের যুক্তিতো ঠিক। তারা মেয়র সাহেবের ব্ক্তব্যে শুধু সন্তষ্টই হলনা বরং তার জ্ঞানের ভূয়সী প্রশংসা করে খুশি মনে বাড়ি ফিরে গেল।
উপরের গল্পটা হয়ত স্রেফ বানানো। তবে আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এর একটা গুরত্ব অবশ্যই আছে বলে মনে করি। আমাদের দেশে অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান মানবতার পক্ষে অনেক শ্লোগান দেন, কাজ করেন। কিন্তু কিছুটা হলেও নিজের চোখে দেখেছি নিজের বাসার কাজের লোক কিংবা গরীব আত্বীয় স্বজনের সাথে তারা কেমন ব্যবহার করেন। বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিও খুলে সরকার এবং দাতা সংস্থার কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান নিয়ে গরীবের নয় নিজের অবস্থার উন্নতি করেন। অথচ নিজের বাসার কাজের লোকটিকে কোন উৎসবেও একটি ভাল পোশাক উপহার দেন না। গরীব আত্বীয়রা বাসায় আসলে বসতেও বলেন না। অনেক নীতি-নির্ধারকরে দেখেছি বাসার কাজের লোক, নিজের ড্রাইভার, বাসার দারোয়ানের সাথে কতো জঘন্য রকমের ব্যবহার করতে। অথচ এরাই সভা, সেমিনারে বড় বড় কথা বলেন। মানবতার জয়গান গান।
ব্লগেও অনেক শ্রদ্ধেয় ব্লগারকে দেখি মানবতার শ্লোগান দিয়ে পোস্ট দিতে। বিবেকের তাড়না থেকেই সম্ভবতো কর্তৃপক্ষ এগুলোকে স্টিকিও করেন। তাদের উদ্দেশ্য দেখে ও বক্তব্য পড়ে আমার মতো সংকীর্ণ হৃদয়ের মানুষের মনও বিগলিত হয়। শ্রদ্ধায় মাথাটা নুয়ে পড়ে। নিজেও এ কাজের একজন অংশীদার হওয়ার একটা তাগিদ অনুভব করি। এ তাগিদ থেকেই তাদের উদ্দেশ্য কিছু একটা বলার সাহস পাচ্ছি। ইংরেজিতে একটা কথা আছে যার বাংলা অনুবাদ করলে দাড়ায়, 'দান নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হয়'। তেমনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অথবা আলোচিত অথবা জটিল কোন 'মানবতা লংঘন' বিষয়ক ঘটনায় নিজেকে না জড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে নজর দেন। আপনার কাজের মানুষটির দিকে নজর দেন। আপনার গরীব আত্বীয় স্বজনের দিকে নজর দেন। এর পরে সম্ভব হলে পাশের বস্তিটির দিকে অর্থাৎ আমাদের দিকে নজর দেন। এভাবে সবাই যদি নিজের ঘরে সম্ভব হলে নিজের আশেপাশে মানবতা প্রতিষ্ঠিত করেন তাহলে দেখা যাবে যে এক সময়ে সারাদেশেই মানবতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। জাতীয় জীবনে মানবতারও লংঘন হবে না।
আমি মানবতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টাকে স্রেফ এভাবেই দেখি। আমার এই অনুদারতা ও সংকীর্ণতার জন্য দয়া করে ক্ষমা করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৮:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


