![]()
আগামী জুনের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নাজিমুদ্দিন রোড থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় থাকা একই কম্পাউন্ডে তিনটি কারাগারের মধ্যে একটির নির্মাণকাজ শেষ হলে তা 'ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ' হিসেবে চালু হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেই কারাগারটির নির্মাণ প্রক্রিয়াও পুরোপুরি শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। সরেজমিন দেখা গেছে, বড়-ছোট ভবনগুলোর কোনোটিই এখনও পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী হয়নি। এশিয়ার বৃহত্তম কারাগার হচ্ছে কেরানীগঞ্জে
নির্মাণাধীন বড় ভবনগুলোর মধ্যে অন্তত দুটির কাজ কোনোভাবেই এই সময়সীমার মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়। চারটি ভবনের নির্মাণ যথাসময়ে শেষ করতে হলে বিশেষ ব্যবস্থায় বাড়তি লোক নিয়োগের প্রয়োজন হবে। অবশ্য প্রকল্পের দায়িত্বশীলরা দাবি করেছেন, জুনের আগেই তারা কাজ শেষ করতে পারবেন। বলা হচ্ছে, নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি হবে এশিয়ার বৃহত্তম কারাগার। সম্প্রতি গাজীপুরে কারা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, জুনের মধ্যেই কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
কারাসূত্র জানায়, নির্মাণকাজে ধীরগতি, দফায় দফায় ব্যয় ও সময়সীমা বাড়ানোর কারণে এর আগে বেশ কয়েকবার কারাগার স্থানান্তরের টার্গেট পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ চলতি ডিসেম্বরে স্থানান্তরের কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। সূত্রমতে, সাত বছর ধরে চলমান নির্মাণ প্রক্রিয়ার এ পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৬৮ ভাগ। সর্বশেষ অক্টোবরে একনেকের সভায় প্রকল্পের সময়সীমা ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত অনুমোদন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন সমকালকে বলেন, জুনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে কারাগার স্থানান্তর সম্ভব হবে বলে আশা করছি। গণপূর্ত অধিদপ্তর এর আগেই নির্মাণকাজ শেষ করতে পারবে বলে জানিয়েছে। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের বর্তমান কারাগারের স্থানে একটি পার্ক নির্মাণ ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘর উন্মুক্ত করে দেওয়ার তথ্যও জানান এই কারা কর্মকর্তা।
কারা সূত্র জানায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয় ৩৪ বছর আগে। নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কাউন্সিলের সভায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়।
নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারটি জনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায় হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্টরা। নানা ঘাট পেরিয়ে অবশেষে ২০০৩ সালে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। পরের বছর প্রকল্পের সারপত্র তৈরি করে ২০০৫ সালের জুলাইয়ে প্রকল্প জমা দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একনেকে এ প্রকল্প অনুমোদনের সময় বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয় ৩১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। ২০০৭ সালে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় ১৯৪ দশমিক ৪১ একর জমিতে মাটি ভরাটের মধ্য দিয়ে কারাগারের নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ভবন নির্মাণের কাজ।
২০১০ সালের জুন মাসে কারাগারের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হয়। পাশাপাশি বেড়ে যায় নির্মাণ ব্যয়। তখন ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩৭ কোটি ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এই দফায়ও নির্ধারিত সময় ও বাজেটে কাজ শেষ না হওয়ায় ফের চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত অক্টোবরের একনেক সভায় আবারও ব্যয় বাড়িয়ে ৪০৬ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, নির্মাণাধীন একই নকশার আটটি কারাভবনের চারটির কাজ শেষের পথে। এর মধ্যে দুটির টুকিটাকি কাজ বাকি রয়েছে। অন্য দুটির কাজ সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ এক মাস লাগবে। বাকি চার ভবনের মধ্যে তিনটির কাঠামোসহ আনুষঙ্গিক কিছু নির্মাণ হয়েছে। এগুলোর কাজ শেষ হতে আট থেকে ১০ মাস লাগবে বলে জানান নির্মাণসংশ্লিষ্টরা। অন্য ভবনটির ছয়তলার মধ্যে চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। এটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা রফিক কনস্ট্রাকশনের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মালেক সমকালকে জানান, কাজ শেষ হতে প্রায় দুই বছর লাগবে। ফাঁসির মঞ্চও তারাই তৈরি করবেন। ডেঞ্জার সেলের তিন নম্বর ভবনের সীমানার ভেতরেই এটি নির্মাণ করা হবে। এতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। এ ছাড়া দুর্ধর্ষ জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের রাখার জন্য
চারটি চারতলা কারাভবন (ডেঞ্জার সেল) হচ্ছে। এর মধ্যে একটির নির্মাণকাজ শেষ এবং একটি শেষের পথে। বাকি দুটির মধ্যে একটির কাজ শেষ হতে অন্তত চার মাস ও দোতলা পর্যন্ত নির্মাণ হওয়া অন্য ভবনটির জন্য এক বছর লাগবে। এরই মধ্যে হাসপাতাল, লন্ড্রি, সেলুন, গুদাম ও গম থেকে আটা তৈরির কারখানা ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জে নির্মাণাধীন সুপরিসর এ কারাগারকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি অংশে পুরুষ বন্দি ও একটি অংশে নারী বন্দিদের রাখা হবে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় ৩২ একর জমিতে 'পুরুষ কারাগার-১'-এর নির্মাণ চলছে। আরও একটি পুরুষ ও একটি নারী কারাগার পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে এ কারাগারে আট হাজার পুরুষ ও ২০০ নারী বন্দির ধারণ ক্ষমতা থাকছে। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে নয় একর জায়গায় নির্মিত বর্তমান কারাগারটির ধারণ ক্ষমতা দুই হাজার ৭০০। তবে সেখানে ১০ হাজারের বেশি বন্দিকে গাদাগাদি করে রাখতে বাধ্য হয় কারা কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছয়তলা বিশিষ্ট আটটি ভবনের প্রত্যেকটিতে ৫০০ জন বন্দিকে রাখা হবে। এ ছাড়া ডেঞ্জার সেলের প্রতি তলায় ১০০ জন মৃত্যুদ প্রাপ্ত আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গিসহ দুর্ধর্ষ আসামিদের রাখা যাবে। ৬০ জন ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দির জন্য থাকবে ৬০টি বিশেষ কক্ষ। ১০০ কিশোর বন্দি ও ৩০ জন মানসিক ভারসাম্যহীন বন্দিকে রাখার উপযোগী আলাদা সেলও থাকবে এই কারাগারে। কারাগারের বাইরের অংশে বন্দিদের চিকিৎসার জন্য নির্মাণ হবে ২০০ শয্যার হাসপাতাল। কারা কর্মকর্তাদের ৫০টি পরিবারের জন্য আলাদা ইউনিট ও কর্মচারীদের ৩৫০টি পরিবারের জন্য আলাদা ভবন, অফিসার্স ক্লাব, স্টাফ ক্লাব, স্কুল, মসজিদ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সভার জন্য মিলনায়তন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া কারাগার চত্বরে এক হাজার কারারক্ষীর থাকার উপযোগী ব্যারাক নির্মাণ করা হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের পর নাজিমুদ্দিন রোডের বর্তমান কারাগারটি হবে দর্শনীয় স্থান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতিবাহী কারা সেলে চালু করা জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। নির্মাণ করা হবে একটি পার্ক। এ ছাড়া থাকবে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কারাকল্যাণ ভবন। এসব কাজের জন্য দুই মাসের বেশি সময় লাগবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুত্র ঃ সমকাল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


