গুজরাটী শব্দ “হরতাল” কে বিরোধী দল যেভাবে ব্যবহার করছে তা বোধ হয় বিশ্বের কোন দেশই করা হয় না। আর হরতালের আভিধানিক অর্থ যাই থাকুক না কেন বর্তমান বিরোধী দলের প্রেক্ষাপটে হরতালের সংজ্ঞা হচ্ছে- এদেশ আমার বাপ-দাদার, চাইলেই বন্ধ করে দেব সবকিছু।
বাংলাদেশের মানুষেরও আত্মার সাথে মিশে গেছে হরতাল। হরতাল আমাদের সংস্কৃতির ও একটা অংশ। হরতালের তারিখ নির্ধারণ মানেই হচ্ছে- আজকে আমার দোকানটা বন্ধ থাকবে, না হয় লুট হবে। আজকে আমার কষ্টার্জিত উপার্জনে কেনা শখের গাড়িটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হবে। হরতাল মানেই হচ্ছে আজকে আমার কাজে যাওয়া হবে না। বড় কর্তার বকুনি। নয়তো ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। হরতালের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হয়। রপ্তানি পণ্য নিয়ে বন্দরে কনটেইনার ঢুকতে পারে না। একইভাবে আমদানি পণ্যও বন্দর থেকে বাইরে আনা যায় না।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউস দিয়ে সম্পন্ন হয়। এ কারণে হরতালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। কলকারখানায় উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়সূচি ভেঙে পড়ায় এক দিনের হরতালে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির জের টানতে হয় কয়েক দিন ধরে। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও হরতালের কারণে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
টাকার অঙ্কে হরতালের ক্ষয়ক্ষতি বের করা কঠিন। একেক সময়ের হরতালে একেক রকম ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে হরতালে ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে হরতালের বিকল্প কর্মসূচি ভাবা উচিত।
পোশাকশিল্প খাত: যেসব কারখানায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য প্রস্তুত করতে হয় সেসব কারখানা পণ্য রপ্তানির জন্য অন্তত ১২টি ধাপে কাজ করতে হয়।
হরতালের কারণে এ ১২টি ধাপের কাজ ব্যাহত হয়। ধাপগুলোর মধ্যে আছে—ঋণপত্র খোলা, কাঁচামাল উৎপাদন, পণ্য জাহাজীকরণ, কাঁচামাল পরিবহন, বন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া, উৎপাদন, তৈরি পণ্য বন্দর দিয়ে ক্রেতার কাছে সরবরাহ ইত্যাদি।
তৈরি পোশাকশিল্পে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ১২ ধাপে কাজ করতে হয়। হরতালের কারণে যেসব কারখানার কাঁচামাল বন্দর থেকে কারখানায় পৌঁছাতে পারে না সেসব কারখানা সঠিক সময়ে উৎপাদনে যেতে পারে না। আবার হরতালের দিন সব কারখানায় কম-বেশি উৎপাদন ব্যাহত হয়।
হরতালে অন্তত ৬৫ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার সময়সূচি অনুযায়ী পণ্য রপ্তানি করতে না পারায় বিমানে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বের করা কঠিন। চট্টগ্রামের ৭৫০টি পোশাক কারখানা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। পোশাকশিল্পের মতো কলকারখানায়ও হরতালের প্রভাব পড়ে। উৎপাদন ব্যাহত হয়।
জাহাজ ব্যবসা: হরতালের কারণে বন্দরে স্বাভাবিক পণ্য ওঠানামা ব্যাহত হয়। একইভাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দালিলিক কাজ শেষ করতে না পারায় বন্দরে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে বাড়তি সময় অবস্থান করতে হয়। বন্দরে অবস্থানরত কনটেইনার ও বাল্ক জাহাজের গড়ে প্রতিদিন ক্ষতিপূরণ অন্তত ১২ হাজার মার্কিন ডলার। এ হিসেবে গড়ে অর্ধশত জাহাজের ক্ষতিপূরণ গুনতে হয় অন্তত চার কোটি টাকা। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়াকেই সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে করা উচিৎ।
হরতালে পণ্য ওঠানামা ও পরিবহন বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে যায়। পণ্যের ক্রয়মূল্যের সঙ্গে এই ক্ষতি যোগ করায় শেষ ধাপে ভোক্তাকেই বাড়তি টাকা গুনতে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


