একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি।
আমি যখন বুয়েট-মেডিকেল বুঝতে শিখি তার আগে কিংবা কিছু কাল পরে আমি একটি কৌতুক শুনেছিলাম। সেটি ছিল অনেকটা এই রকমঃ
এক মহিলা পাশের বাসায় বেড়াতে গেছে। মহিলা সেখানে গিয়ে সেই বাসার মহিলাকে প্রশ্ন করছে, আপা আপনার ছেলেটা কোথায় ভর্তি হল ?
মহিলা গর্বের সাথে জবাব দিল, আপা আমার ছেলেতো এমআইটি তে চাঞ্জ পেয়েছে।
অতিথি মহিলা বলল, এমআইটি ভাল, তো বুয়েট, মেডিকেলে চাঞ্জ পায় নাই ?
ছেলের মা কিছু সময়ের জন্য নির্বাক ছিল।
আমি কি হবো আমার বাবা মা আমার জন্মের আগেই ঠিক করে রেখেছে। যে করেই হোক তাদের ইচ্ছা পূরণ হতেই হবে। এতে আমার কি হবে তা নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে।
এই রকম ঘটনা শুধু বাংলার একটি ঘরেই ঘটে না, বরং বাংলার শতকরা আশি ভাগ পরিবারের চিন্তা চেতনা এই রকম। এখানে প্রতিনিয়ত চলে জোর করে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার বানানোর খেলা। সে খেলায় হয়ত আশাবাদী জনগোষ্ঠী তাদের আশা পূরণ করতে পেরে পুলকিত হয়, কিন্তু যে প্রাণীটিকে আশার হাতে বলিদান করা হয় সে বেচারা যে সারা জীবন তার অপছন্দ নিয়ে বাস করবে তা কেউ ভেবে দেখে না।
আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না হলে না খেয়ে মরতে হবে এমন অবস্থা। অনেক অল্প বয়স থেকে আমাদের এসবই শেখানো ও বোঝানো হয়। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ ছাড়া আর কাউকে পেলাম না যারা তাদের সন্তানদের নিজের ইচ্ছা মতো কিছু হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
ক্লান্ত শ্রমিককে গান শুনিয়ে কে আনন্দ দেবে, স্কুলে বাচ্চাদের কে নজরুলের কবিতা পড়াবে, কিভাবে একজন দার্শনিক তার তত্ত্ব নিয়ে সবার সামনে আত্মপ্রকাশ করবে, নতুন প্রজন্মকে কারা অনুপ্রেরণা যোগাবে আমারা তা তো ভেবে দেখিই না বরং কারও মনে যদি একটু অন্যরকম হওয়ার বাসনা জাগ্রত হয়, কিছু অতি আবেগি তাদের আবেগ দিয়ে সেই মহৎহৃদয়কে ভেজানোর চেষ্টা করে।
অথৈ পানির মধ্যে পরে শেষ পর্যন্ত হয়ত কেউ পরিবারের কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু তাতে নিজের মনের কাছে সারা জীবন ছোট হয়ে থাকতে হয়। আমি সারা জীবন যে কাজটা করব তা অন্য কারও ঠিক করে দেওয়া। তপুর সেই গানটির কথা প্রায়ই মনে পড়ে, “মনে যার রং-তুলি পাঞ্জাবী, বাইরে সে স্যুট পরা কর্মচারী”। এভাবে আর কতদিন চলবে? বেশিদিন তো চলতে দেওয়া ঠিক না। এভাবে বেশিদিন চললে আমরা শারীরিক দিক দিয়ে সুস্থ থাকলেও দিনদিন মানসিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যাবো, যে পঙ্গুত্ব বাইরে থেকে বোঝা যাবে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেই নিজেকে খোঁচাবে।
এতক্ষণ আমার এই লেখা কোন অভিভাবক যদি পরে থাকেন তাহলে আমি কৃতজ্ঞ। তবে আরও বেশি কৃতজ্ঞ থাকবো যদি আপনারা নিচের অংশ না পড়েন। কারণ, নিচে আমি তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু বলতে চাই, যে কথাগুলো অনেক সময় বড়দের কাছে মনে হয় “ছোট মুখে বড় কথা”।
যাদের মনে হয় যে, তাদের স্বপ্নগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের বলি আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সেই পূরণ না হওয়া স্বপ্নটা আবার দেখ। তবে সতর্ক থাকবে স্বপ্ন দেখা শেষ হওয়ার আগে যেন ঘুমিয়ে না পর। আর কখনই ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে না, কারণ ঘুমের মধ্যে দেখা সেটা স্বপ্ন নয়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখা স্বপ্নটা তো পূরণ করতে হবে। তাই বলি তুমি কতক্ষণ ঘুমাবে টা আমি জানি না, কিন্তু সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাইলে তোমাকে কিন্তু সূর্যের মতোই জ্বলতে হবে। সুতরাং ভয় পেলে চলবে না। সব সময় মনে রাখবে বাঘের জায়গা হল বনে, মনে নয়। সেই মনের বাঘটাকেই পরাজিত করতে হবে।
যতদিন না তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না পার ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীটাকে মনে করবে একটি যুদ্ধ ক্ষেত্র, যেখানে তোমার একমাত্র লক্ষ্য জয়, একমাত্র কাজ সংগ্রাম একমাত্র হাতিয়ার নিজের তারুণ্য, সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ এবং প্রিয়জনের ভালবাসা। এসব কিছুর কথা মনে রেখে তোমাকে তোমার মতো করে লড়তে হবে। যদি তুমি তা করতে পারো, তবে দিনশেষে তুমিই বিজয়ী।
তোমার জন্য শেষ কথা, তোমার মন যে কাজটা করতে চায় তোমার সেই কাজটিই করা উচিৎ যদি তা সৎ হয়, কিন্তু অসৎ কাজ সবসময় পরিহার করতে হবে। নিজের মনের বিরুদ্ধে কোন কাজ করবে না, যদি চেষ্টা করো কাজটা হয়ত হবে, কিন্তু তার ফল হবে সাময়িক, যা একমাত্র স্বার্থপর ছাড়া আর কারও কাম্য নয়।
সর্বোপরি তুমি নিজেকে তৈরি করবে তোমার নিজের মনের মতো করে, যেন নিজেকে, নিজের কাজকে এক মুহূর্তের জন্য ও ঘৃণা করতে না হয়। অন্যকে দিয়ে নিজেকে বিচার করবে না, নিজের বুদ্ধি আর কর্ম দ্বারাই নিজেকে বিচার করবে।
সব কাজ সম্পন্ন করার পর নিজের দিকে একবার তাকাও, তুমি একজন সফল মানুষ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১৬ রাত ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


