somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্মের ভাষা যখন রাজনীতির ভাষা: বাংলাদেশের অতি পুরাতন নতুন বিপদ!

০৩ রা জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি ধারণা ছিল যে, ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, কিন্তু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভাষা ধর্মীয় হবে না। মানুষ ধার্মিক হতে পারে, কিন্তু আইন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় ধর্মীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এই ধারণাটি ধর্মবিরোধী নয়, বরং যে সমাজে নানা ধর্মের মানুষের বসবাস, তাদের সহাবস্থানের জন্য এটি ন্যূনতম শর্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারণাটি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিভিন্ন দেশে ধর্ম আবার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। আত্মিক উন্নতি বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আলোচনার জন্য নয়, বরং পরিচয়, বিভাজন এবং ক্ষমতা দখলের কৌশল হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, ইউরোপের নানা দেশে সাংস্কৃতিক খ্রিস্টান পরিচয়, প্রায় সব ক্ষেত্রে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিকত্বের মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। আর ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে জুলাই '২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান রাজনীতির ভাষা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। এটা জামাতের মতো দলের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা শুধু নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয়কে আবার রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রধান ভাষা বানানোর চেষ্টা। যে কাজে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে। জামাতের রাজনীতি সরাসরি খেলাফত বা শরিয়া আইনের দাবি তোলে না। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতি, ইসলামী মূল্যবোধ, পশ্চিমা প্রভাব - এই জাতীয় কতগুলি শব্দ ব্যবহার করে মানুষের মনে এমন একটি ষড়যন্ত্রের আবহ তৈরি করে, যেখানে বোঝানো হয়, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের সংগঠিত করা ছাড়া গতি নেই।

এই কৌশল নতুন নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের চোখের সামনেই আছে। সেখানে শুরু থেকেই ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তি বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফল হয়েছে ভয়াবহ। সংখ্যালঘুরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, ভিন্নমত ধর্মদ্রোহে পরিণত হয়েছে, আর রাজনীতি মানেই হয়ে উঠেছে ইমানের পরীক্ষা। পাকিস্তানে কেউ রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সমালোচনা করলে, আগে বিচার হয় তার ধর্মীয় অবস্থান। একই চিত্র দেখা যায় ইরান বা আফগানিস্তানের মতো দেশে, যেখানে ধর্মীয় নৈতিকতার নামে রাষ্ট্র ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করেছে।

ভারতের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সেখানে ধর্ম ভিন্ন হলেও রাজনৈতিক কৌশল একই। হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের মধ্য দিয়ে নাগরিকত্বকে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, আসল ভারতীয় কে, এই প্রশ্নটাই রাজনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে গেছে। তাই, বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম বিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় নীতির মানদণ্ড বানানোর চেষ্টা আশঙ্কাজনক।

বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় ভাষা রাজনীতির প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ রাষ্ট্র তখন আর নিরপেক্ষ থাকবে না। ভিন্নমত রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা হারিয়ে ব্লাসফেমি বা ধর্মীয় অপরাধে পরিণত হবে। আইন যুক্তির বদলে ইমান দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করবে। তখন যদি ভোট থাকেও, মানুষের অধিকার থাকবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত খতমে নবুওয়াত সম্মেলনটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। এটি দক্ষিণ এশীয় ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি আঞ্চলিক সম্মেলন, যেখানে বাংলাদেশ নতুন এক পরীক্ষাগার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। কৌতূহলের বিষয়, বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা এই জনসভায় গিয়ে বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে তারা কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনা করবে। দেখা যাচ্ছে, মধ্যপন্থী দল হয়েও বিএনপি ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতি করছে।

সমস্যাটি ধর্মের নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ধর্মকে এমনভাবে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয় যে, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষদের আর সমান নাগরিক হিসেবে দেখা হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা ছিল, তা ধর্মহীনতা ছিল না। এর অর্থ ছিল, রাষ্ট্র কারও বিশ্বাস যাচাই করবে না, এবং বিশ্বাস চাপিয়ে দেবে না। এই নীতিকে যদি আমরা অপ্রাসঙ্গিক বলে সরিয়ে দিই, তাহলে সামনে যে পথ খুলে যায়, তার পরিণতি আমরা পাকিস্তান, ইরান বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে জানি।

আজ ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থানকে তাই শুধু দলীয় রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ভাষায় ফিরিয়ে আনার এক সুদূরপ্রসারী প্রকল্প। এই পথ একবার তৈরি হয়ে গেলে, তা থেকে ফিরে আসা সহজ নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৯
১০টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইরানকে হারানো পসিবল না

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০

সবাই বলতাছে
-ইরানের কাছে কত মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আছে??
-ইরান কত দিন যুদ্ধ চালাতে পরাবে??
- কে আগে টায়ার্ড হবে???
ট্যাকা কম, অর্থনীতি ভাঙ্গা, মিত্র দেশ নাই, চিকিৎসা নাই...
but..

মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ইন্টারসেপ্টর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:০৬



ইরানের মাটি পানি ও আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ। বাংলাদেশের তুলনায় ইরানের সমতল ভূমি কম তারপরও ইরানে গম উচ্চ ফলন হয়। ভোজ্য তৈল জাত শষ্য উচ্চ ফলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধোলাই-৭১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



মধ্যপ্রাচ্যে আছি। দেশে ফেরার টিকেট কাটা ছিল ২ তারিখে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধের দামামা।আমি আরবি বুঝিনা। এয়ারপোর্টে কাউকে ইংরেজিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে ''খালাস খালাস'' মাফি মাফি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিলে কাজ হবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৩


সম্প্রতি শিয়া ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ কামাল আল-হাইদারির পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে 'জিহাদের' ডাক দেওয়া হয়েছে। ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে এই আহ্বান জানানো হলেও,... ...বাকিটুকু পড়ুন

হা হা রিয়্যাক্ট না করে কেউ যাবেন না

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



এই লোকটা বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে আমেরিকা ও ইসরাইলের ধ্বংস চেয়ে আসছে, তাদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যা করার মত ভয়ঙ্কর হুমকি দিয়ে আসছে; অথচ যুদ্ধ শুরুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×