
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। এই লেখকেরাই একদিকে গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনাকে ইসলামপন্থীদের হিন্দুবিদ্বেষের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে যুক্তি দিচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু নন!
ভেবে দেখুন, ইসলামপন্থি উগ্রবাদীদের আপত্তির মূল ভিত্তিই হলো রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়। এই সাম্প্রদায়িকতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে "রবীন্দ্রনাথ হিন্দু হলে সমস্যা কোথায়?" এই সহজ কথাটি বলার বদলে আমাদের উদ্ভট প্রগতিশীলেরা বলছেন, "আরে না, রবীন্দ্রনাথ তো হিন্দু নন, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম!"
এই ধরনের প্রগতিশীলেরা কি আদৌ ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন? আমাদের চিন্তা ও মননের স্বাধীন জায়গাটুকু কি তাঁরা টিকিয়ে রাখতে পারবেন? আমার মনে হয় না!
এই প্রগতিশীল অধ্যাপক বা সাংবাদিকদের কেউ রবীন্দ্রনাথের লেখা ভালো করে পড়ে দেখেছেন বলেও মনে হয় না। পড়লে অন্তত জানতেন যে, এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের হিন্দু পরিচয়ের কথা স্পষ্টভাবে লিখেছেন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর "আত্মপরিচয়" প্রবন্ধে লিখেছেন: "আমি হিন্দু এ কথা বলিলে যদি নিতান্তই কোনো লজ্জার কারণ থাকে তবে সে লজ্জা আমাকে নিঃশব্দে হজম করিতেই হইবে। কারণ, বিধাতার বিরুদ্ধে নালিশ করিতে হইলে সেই আপিলআদালতের জজ পাইব কোথায়?"
এই কথাটির ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে আগেই দিয়েছেন। মানুষের পরিচয়ের এমন কিছু দিক আছে, যা সে নিজের ইচ্ছায় বেছে নেয় না বা পরিবর্তন করতে পারে না। যেমন ধর্মীয়, দৈহিক ও পারিবারিক পরিচয়। জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়ের এই অংশের বিপরীতে রয়েছে আরেকটি অংশ, যা মানুষ নিজের শিক্ষা, কাজ, বিশ্বাস ও জীবনচর্চার মধ্য দিয়ে অর্জন করে এবং পরিবর্তন করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝাতে লিখেছেন, "আমাদের পরিচয়ের একটা ভাগ আছে, যাহা একেবারে পাকা - আমার ইচ্ছা অনুসারে যাহার কোনো নড়চড় হইবার জো নাই। তাহার আর একটা ভাগ আছে যাহা আমার স্বোপার্জিত - আমার বিদ্যা ব্যবহার ব্যবসায় বিশ্বাস অনুসারে যাহা আমি বিশেষ করিয়া লাভ করি এবং যাহার পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব নহে।"
তিনি লিখেছেন, "মানুষের প্রকৃতির মধ্যে সবই যদি চিরন্তন হয়, কিছুই যদি তাহার নিজে গড়িয়া লইবার না থাকে, আপনার মধ্যে কোথাও যদি সে আপনার ইচ্ছা খাটাইবার জায়গা না পায় তবে তো সে মাটির ঢেলা। আবার যদি তাহার অতীতকালের কোনো একটা চিরন্তন ধারা না থাকে....নিজের ইচ্ছা অনুসারেই আগাগোড়া আপনাকে যদি তাহার রচনা করিতে হয় তবে সে একটা পাগলামি, একটা আকাশকুসুম।"
তিনি আরো লিখেছেন: "আমি যে আমারই পরিবারের মানুষ সে আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমার পরিবারের কেহ বা মাতাল, কেহ বা বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে আসিয়া ঠেকিয়া গেল এবং লোকসমাজেও উচ্চশ্রেণীতে গণ্য হইল না। এই কারণেই আমি আমার পারিবারিক পরিচয়টাকে একেবারে চাপিয়া যাইতে পারি কিন্তু তাহা হইলে সত্যকে চাপা দেওয়া হইবে।"
এই প্রবন্ধেই ব্রাহ্ম পরিচয়ের প্রসঙ্গ টেনে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "এ তর্কটা রামমোহন রায়ের মনের মধ্যে একেবারেই ছিল না দেখিতে পাই। এদিকে তিনি সমাজপ্রচলিত বিশ্বাস ও পূজার্চনা ছাড়িয়াছেন, কোরান পড়িতেছেন, বাইবেল হইতে সত্যধর্মের সারসংগ্রহ করিতেছেন; ...সমাজে নিন্দায় কান পাতিবার জো নাই, তাঁহাকে সকলেই বিধর্মী বলিয়া গালি দিতেছে, এমন কি যদি কোনো নিরাপদ সুযোগ মিলিত তবে তাঁহাকে মারিয়া ফেলিতে পারে এমন লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু কী বলিয়া আপনার পরিচয় দিব সে বিষয়ে তাঁহার মনে কোনো দিন লেশমাত্র সংশয় ওঠে নাই। কারণ হাজার হাজার লোকে তাঁহাকে অহিন্দু বলিলেও তিনি হিন্দু এ সত্য যখন লোপ পাইবার নয় তখন এ সম্বন্ধে চিন্তা করিয়া সময় নষ্ট করিবার কোনো দরকার ছিল না।"
রবীন্দ্রনাথ যে নিজেকে হিন্দু হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, সেটা তাঁর নিজের লেখাতেই স্পষ্ট হয়েছে।
এবার আসি সেই বিষয়টিতে, যেটি আমাদের প্রগতিশীলেরা রবীন্দ্রবিদ্বেষের প্রসঙ্গে এড়িয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুবিদ্বেষের পিছনের যে কারনগুলো, তা গত দুই বছরে ইউনূসের আমলে জামাত ও ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের নাম বিকৃত করে "রঠা" এবং বঙ্গবন্ধুর নাম বিকৃত করে "বঙ্গবল্টু" বলা এর অংশ।
এই বিদ্বেষের সামাজিক উৎস বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের একটি অংশের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা। তবে এর উৎসের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উগ্র ইসলামপন্থীরা এই সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণাকে শক্তিশালী করে। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এখানে একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি উগ্র ইসলামপন্থী রাজনীতি বা পলিটিক্যাল ইসলামের অস্ত্র।
ধর্ম হিসেবে ইসলামকে মানুষ যখন হৃদয়ে ধারণ করে, তখন তার যে ব্যাখ্যা ও চর্চা আমরা দেখি, তা নম্রতা, বিনয় ও অহংকারহীনতার শিক্ষা দেয়। উদাহরণ হিসেবে, ছোটবেলায় ইসলাম সম্পর্কে যেসব গল্প শুনে আমরা বড় হয়েছি, তার মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু থেকে শোনা কাহিনিসহ আরও অনেক গল্প ছিল। এসব গল্পে কীভাবে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে ধৈর্য ধারণ করতে হয়, কীভাবে বিনয়ী হতে হয় এবং নিজের অহংকারকে সংযত করতে হয়, সেই শিক্ষা প্রধান ছিল। এই শিক্ষাগুলো ছিল অহংকার কমিয়ে সদাচারী ও বিনয়ী করে তোলার গল্প। এখানে ধর্মচর্চায় নিজের ধর্মকে সত্য বলে বিশ্বাস করার পাশাপাশি নিজের অহংকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা রয়েছে।
কিন্তু পলিটিক্যাল ইসলামের গল্পগুলো ঠিক এর উল্টো। সেখানে প্রাধান্য পায় মুসলিম শ্রেষ্ঠত্ব, যুদ্ধ, বিজয় এবং সেখান থেকে জন্ম নেওয়া বর্ণবাদী মনোভাব। পলিটিক্যাল ইসলাম অহংকে পরিশুদ্ধ করার পরিবর্তে অস্ত্রে পরিণত করে। অহংকে উসকে দিয়ে ঘৃণা উৎপাদন করে এবং অন্য ধর্মের অনুসারীদের ঘৃনা করার শিক্ষা দেয়। অন্যের প্রতি ঘৃণা ও ইসলামি শ্রেষ্ঠত্ববোধকে ক্রমাগত উসকে দিতে না পারলে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মুশকিল হলো, অহংকে পরিশুদ্ধ করার যে শিক্ষা ইসলাম ধর্ম দেয় - যে শিক্ষা ভিন্নধর্মের অনুসারীকে ঘৃণা করা দূরের কথা, তাকে পর বলে গণ্য করতেও নিষেধ করে - তার তুলনায় ধর্মের নামে ঘৃণা করার শিক্ষা আপেক্ষিক সুবিধা ভোগ করে। মানুষের মধ্যে ঘৃণা, ভয় ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ উসকে দেওয়া সহজ। অন্যদিকে, সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের সাধনা, যুক্তি ও পরিশ্রম। পাজি লোকদের প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ঘৃণা সহজেই সংক্রামিত হয় এবং অল্প সময়েই সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়। বিপরীতে, ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের কাজের গতি ধীর; তার ফল দৃশ্যমান হতে সময় লাগে।
বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের দুরবস্থা দেখে বিশেষ আশাবাদী হওয়ার কারণ খুঁজে পাই না। ঘৃণার রাজনীতি যখন সংগঠিত, আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক স্পষ্টতা ও নৈতিক সাহস প্রগতিশীলদের মধ্যে কতটা অবশিষ্ট আছে, সেই প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই লড়াইয়ে প্রগতিশীলরা যদি নিজেদের দ্বিধা কাটিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারেন, তবে শূন্যস্থানটি ঘৃণার রাজনীতিই দখল করবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




