
একটি সুখবর দিয়ে লেখাটি শুরু করছি বন্ধুগন- সুরভি'র বাচ্চা হবে।
কয়েকদিন আগের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে- অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে সুরভি জানালো আমি 'বাবা' হবো। হঠাত করে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। মনে মনে বললাম, হায় হায়... কি কয়? আমি এখন কি করবো? বাংলা সিনেমাতে দেখেছি এই সময়ে নায়ক স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে, কোলে তুলে নেয়, চুমু খায়। আমি এইসব কিছুই করলাম না। সুরভি'র মুখের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে আমি সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে চিন্তা করলাম- এখন থেকেই অনেক বাড়তি খরচ হবে, এত টাকা কোথায় পাবো? যাই হোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি- সব কিছু অন্যরকম লাগছে। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে গেছি, অন্য রকম লাগেনি। আজ সব কিছু অন্যরকম লাগছে। মনের মধ্যে কেমন একটা অন্যরকম ভাব হচ্ছে!
আমার ভাই বোন আত্মীয় স্বজন সব আছে। কিন্তু সব থেকেও যেন কেউ নেই। সুরভি খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলছে- একমাস সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে। তাহলে ঘরে রান্না করবে কে? বুয়াও ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছে এখনও আশে নাই। কবে আসবে কে জানে! ফোন দিলে ধরে না। সুরভিকে নিয়ে এই পর্যন্ত চার বার ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়েছে। অনেক রকম টেস্ট করা হয়েছে। পানির মতো টাকা খরচ হচ্ছে। আমি দরিদ্র মানুষ। প্রতিটা মুহূর্তে প্রচুর বেগ পেতে হচ্ছে। সুরভিকে আমি কিছুই বুঝতে দেই না। সামনের দিন গুলোতে খরচের মাত্রা আরও বাড়বে। কিভাবে সামলাবো আমি জানি না। অবশ্য আমি হাসি মুখ করে সুরভির সামনে বসে থাকি। তাকে আশস্ত করি। এটা কোনো ব্যাপারই না। বাংলাদেশের সেরা হাসপাতালে আমাদের বেবি হবে। তুমি চিনো আমাকে? দেখো আমি কি করি? কিন্তু আমি তো জানি আমার পকেটের অবস্থা।
ভরসা দেওয়ার, সাহস দেওয়ার আশে পাশে কাউকে দেখছি না। আমার এক ভাই তার বউ বাচ্চা নিয়ে গেছে মালোশিয়া ঈদের ছুটি কাটাতে। আরেকভাই নতুন গাড়ি কিনেছে, সে তার গাড়ি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এক সময় যারা বলেছে, বিয়ে করেছ, তিন বছর হয়ে গেছে এখনও বাচ্চা নিচ্ছো না কেন? দূর মিয়া বাচ্চা নাও। বাচ্চা ছাড়া সংসার, সংসার না। আমরা আছি তোমাদের সাথে। যত রকম সহযোগিতা লাগে করবো। কোনো ভয় নেই। এই সমস্ত লোক গুলোকে আজ খুঁজে পাচ্ছি না। সেদিন আমি অফিসে ব্যস্ত, এদিকে সুরভি ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, একজন কাউকে পাচ্ছি না সুরভিকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে। কিন্তু তার আলট্রাস্নোগ্রাফি করা খুব প্রয়োজন। এই সময় গুলোতে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। কিন্তু এই আমি রাজীব- নিজে খোঁজ খবর নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছি বন্ধুর জন্য। সব রকম খোঁজ খবর করেছি। যতটুকু পেরেছি সাহায্য সহযোগিতা করেছি। সারাদিন অফিস করে তাদের বাজার সদাইও করে দিয়েছি। এযুগে মানুষের কথা বিশ্বাস করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। প্রয়োজনের সময় কাউকেই কাছে পাওয়া যাবে না। যা করার তোমাকে একাই করতে হবে। তাই শুধু নিজের উপর বিশ্বাস আর আস্থা রাখাই সবচেয়ে ভাল কাজ।
সুরভি কুঁজো হয়ে বসে ঘরের কোনো কাজ করতে পারে না। ডাক্তারও নিষেধ করে দিয়েছেন। এখন আমি নিজে তরি-তরকারী কেটে দেই, পেঁয়াজ মরিচ কেটে দেই। হাড়ি-পাতিলও পরিস্কার করি। এই সমস্ত কাজ আমি আগে কোনো কালেও করি নাই। যতটা পারি করে যাচ্ছি। আমি একা হয়ে পড়েছি। কথায় বলে 'যে একা সেই'ই সামান্য'। আমি খুব ভালও করেই জানি, এই সমস্ত সমস্যা গুলো আমি কাটিয়ে উঠতে পারবো। আমি পরিশ্রম করতে জানি। আর আমার হাত দু'টাও ঠিক আছে। যাই হোক, ঘরের সব কাজ শেষ করে যখন বিকেলে ছাদে যাই- সুরভি বলে, কি চাও ছেলে না মেয়ে? এই প্রশ্নটা আমার কাছে খুব হাস্যকর লাগে। ছেলে হলেও আমার, মেয়ে হলেও আমার। আর আমি মেয়েটাকে যটুকু আদর করবো, ছেলে হলে- ছেলেটাকেও একই রকম ভালোবাসা আর আদর যত্ন করবো। কাজেই আমি ছেলে হলেও খুশি হবো, মেয়ে হলেও বেজার হবো না। আমি চাই সুস্থ সবল একটা শিশু। পরম ভালোবাসা আর মমতায় বড় করবো। তাকে শিখাবো মঙ্গলময় সব সত্য।
তবে এই সমাজ এবং সমাজের বেশির ভাগ মানুষ গুলো ভাল না। বেশির ভাগ'ই দুষ্টলোক। এই দুষ্টলোকদের ভয়ে একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনতে চাইছিলাম না। আমি যুদ্ধ করে যাচ্ছি, আমার সন্তান কি দুষ্টলোকদের সাথে যুদ্ধ করে পারবে! ঘরে বাইরে, অফিসে আলাদলে সব জায়গায় দুষ্টলোকে ভরা। কারো মনে মায়া দয়া নেই, দয়া নেই। মানুষ কি ভংকর, মানুষ কি নিষ্ঠুর, মানুষ কি মিথ্যাবাদী।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




