somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

মেয়েটির নাম ছিল রুপা

৩০ শে জুন, ২০১৭ রাত ১১:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




ছোটবেলায় আমি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তাম। আমার থেকে কয়েক ক্লাশ উপরে পড়তো রুপা নামের একটি মেয়ে। খুব রুপবতী মেয়ে। খুব সুন্দর করে কথা বলতো। মেয়েটিকে আমার খুব ভালও লাগতো। বয়সে আমার চেয়ে বড় হলেও আমি তাকে রুপা বলেই ডাকতাম। আমার যুক্তি হচ্ছে পছন্দের মানূষদের তুমি করেই বলতে হয়। আমি আমার মা বাবাকেও তুমি বলি। যাই হোক, আমি সুযোগ পেলেই রুপা'র পাশে ঘুরঘুর করতাম। আমার এখনও মনে আছে- রুপা আমাকে খুব আদর করতো। টিফিন টাইমে আমরা দু'জন একসাথে খেতাম। স্কুলের পোশাকে কি যে সুন্দর লাগতো রুপাকে! বছর শেষে রুপা অন্য কোথাও চলে গেল। আমিও অন্য স্কুলে ভরতি হলাম। তারপর রুপার সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই।

এরপর দুই যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেল। আমি রুপার কথা একেবারেই ভুলে গেলাম। লেখা পড়া শেষ করলাম। চাকরি করা শুরু করলাম। বিয়ে করলাম। আমাদের বাড়িটা ছয় তলা। আমি ছয় তলায় থাকি। মা নিচ তলায় থাকে। আমার অন্য ভাইরা কেউ দোতলায়, কেউ পাঁচ তলায় থাকে। আমাদের বাসায় দু'টা ফ্লাট ভাড়া দেওয়া। এই দুই ভাড়াটিয়ার সাথে আমার কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। তবে মাঝে মাঝে আমি এক ক্ষুনক্ষুনে বুড়িকে সিড়ি দিয়ে নামতে-উঠতে দেখেছি। মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম বুড়ি তার এক মেয়েকে নিয়ে চার তলায় থাকে। মেয়েটা পাগল। বুড়ির অন্যসব ছেলে মেয়েরা খুব ধনী। তাদের গাড়ি বাড়ি সব কিছুই আছে। কিন্তু ছোট বোনটা পাগল বলে কোনো ভাই বোন'রা মা আর ছোট বোনটাকে নিজেদের কাছে রাখতে রাজি নয়। তবে তারা মা আর বোনের সব খরচ দেয়।

আমরা চার ভাই। কোনো বোন নেই। বাড়ির সব কাজ মানে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল ইত্যাদি সব কাজ মা দেখাশোনা করেন। আমি সকালে বাসা থেকে বের হই রাতে ফিরি। (আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি কেন ব্যাক্তিগত কথা আপনাদের বলছি, লেখাটা শেষ করলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।) একদিন রাতে খেতে বসেছি তখন সুরভি বলল জানো আমাদের চার তলায় এক বুড়ি থাকে। বুড়িটাকে দেখলে কি যে মায়া হয়! আমি আজ গিয়ে ছিলাম তাদের ঘরে। বুড়ির মেয়েটা প্রতিবন্ধী। মাথার বেশির ভাগ চুল'ই সাদা। মেয়েটাকে দেখলে মায়া লাগে। কেমন নিঃশ্বপাপ চোখ মুখ। আমি চুপ করে ভাত খেয়ে খাচ্ছি। সুরভি চার তলার ভাড়াটেকে নিয়ে নানান কথা বলে যাচ্ছে। খাওয়া শেষে সুরভি আমাকে পায়েস দিল। পায়েসটা খেতে খুব ভালও হয়েছে। সুরভি জানাল বুড়ি দিয়েছে।

এক মঙ্গলবার অসুস্থতার কারনে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলাম। তখন সময় দুপুর দুইটা। সুরভি বাসায় নেই। সে গিয়েছে তার বাবার বাড়ি, ফিরবে সন্ধ্যার পর। আমি যখনই বাসায় ফিরি নিচ তলায় মার সাথে দেখা করে যাই। মা বলল সুরভি বাসায় নেই, দেশী মাছ রান্না করেছি ভাত খেয়ে যা বাবা। মা ভাত বেড়ে দিল, প্রথম নলা ভাত মুখে দিতেই- শুনি চারপাশে অনেক চিল্লাচিল্লি। দৌড়ে দরজার কাছে গেলাম। দুনিয়ার লোকজন জমা হয়েছে। তারা বলছে আমাদের চার তলায় আগুন লেগেছে। মা বলল চার তলায় বুড়ি থাকে। বাবা তুই তাড়াতাড়ি যা। আমি দৌড়ে চার তলায় গেলাম। গিয়ে দেখি দরজায় তালা মারা। দরজার ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমি তালা ভাঙলাম।

বুড়ি ঘরের বাইরে গেলেই দরজা তালা লাগিয়ে যায়, কারন তার ছোট মেয়েটা মানসিক প্রতিবন্ধী। দরজা খোলা থাকলেই মেয়েটা ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সব সময়ের মতো সেদিনও বুড়ি দরজায় তালা লাগিয়ে গেছে। কিন্তু ভুলে রান্না ঘরের চুলাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল। চুলার উপরে দড়িতে ভেজা কাপড় শুকাতে দিয়েছিল, সেই চুলা থেকেই সারা ঘরে আগুন লেগে যায়। আগুন নিভাতে আমাকে সারা মহল্লার মানুষ সাহায্য করেছে। এত আগুন আমার একার পক্ষে নেভানো সম্ভব ছিল না।

আমি তালা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বুড়ির মধ্য বয়সী ছোট মেয়েটা ভয়ে দরজার পেছনে লুকিয়ে আছে। কাঁদছে। খুব কাঁদছে। মেয়েটাকে দেখেই আমার বুকে ধাক্কা লাগলো। এই মেয়েকে আমি চিনি। মেয়েটির নাম রুপা। আমরা এক স্কুলে পড়েছি। রুপা আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। সে ভয়ে কাঁপছে। আমি বললাম কোনো ভয় নেই। আমি আছি। তারপর গ্যাসের মেইন লাইন বন্ধ করলাম। তাতেই আগুন অনেকখানি কমে গেল। বাকি আগুন মহল্লাবাসীর সহযোগিতায় বালতি ভরতি পানি দিয়ে-দিয়ে নিভালাম।

পরের দিন আমি রুপা আপার সাথে দেখা করতে গেলাম। সে আমাকে চিনতে পারছে না। কিছুতেই তাকে আমি পুরোনো দিনের কথা মনে করাতে পারলাম না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই হাসে। কি সুন্দর পবিত্র হাসি! মুখটা কি মায়া-মায়া। রুপা আপাকে দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর কোনো পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। রুপা আপার মার সাথে অনেকক্ষন কথা বললাম, তিনি জানালেন রুপার মাথার চুল তিনি ইচ্ছা করে ছেলেদের মতো কেটে দিয়েছেন। যেন খারাপ লোকের নজর না পড়ে। যখন রুপা আপার ১৮ বছর বয়স তখন গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল এবং কি দেখে যেন ভয় পায়। সে রাতেই জ্বর আসে। তারপর সে সব কিছু ভুলে যায়। কাউকেই চিনে না। অতীতের কোনো কথাই ভুলে গেছে। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। রুপার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। বুড়ি প্রতিমাসে সরকারের কাছ থেকে সরকারি ভাতা পান। তাছাড়া রুপার বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তিনি মারা যাওয়ার পর বুড়ি প্রতিমাসে পেনশনের টাকা তোলেন।

(বি: দ্রঃ ছবিটা প্রতীকী। তবে রুপা আপা দেখতে এই মেয়েটার মতোন ছিলেন।)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০১৭ রাত ১১:৩৯
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে----- ড্রাকুলা হাসিনা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৭



ড্রাকুলার হাসিনা তো আর এমনি এমনি বলেনি যে, আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা মূলত ভারতকে একতরফা সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি অমর দিশারী

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:১২


তুমি সূর্য কিনারায় উঁকি দিয়েছ বলে-
মা.. তুমি সূর্য আলো!
তোমার জন্মদিনে চাঁদ পৃথিবী হাসছে
আমরা যে গর্বিত গর্বিত-
মা.. তুমি সূর্য আলো;

তোমার অনুশাসন
আমাদের প্রেরণার উড়ন্ত পায়রা
শান্তির জ্বলন্ত মশাল
তোমার জন্ম সাতশত মহীয়ান-
আমরা শুধু গর্বিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয়! বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে!!! :-ls B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯



অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, অতুলনীয়,অবিস্মরণীয় যে বিশেষণই ব্যবহার করি না কেন বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ব বুঝাতে কোন শব্দ ভান্ডারই যেন যথেষ্ট নয়। আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি বাংলাদেশের এমন পারফর্মেন্স দেখে!! বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth-রূপের বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৩

প্রশ্ন ও প্রারম্ভিক জিজ্ঞাসাঃ
আমাদের মনে কি এমন প্রশ্নের উদয় হয় না যে,"আমরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অবয়ব, গায়ের রঙ, চুল কিংবা পুরুষদের মুখের দাড়ি-গোঁফের দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×