
প্রিয় ব্লগারগন আপনারা কি লক্ষ্য করেছেন- গত ৪/৫ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে এক শ্রেণীর তথাকথিত কবি সাহিত্যিকেরা। এইসব নামধারী কবি সাহিত্যিকদের এক বিশাল সিন্ডিকেট আছে। সব জাগায় তাদের লোকজন আছে। (জঙ্গীরা যেমন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, এদেরও সব জায়গায় লোকজন আছে, এইসব সিন্ডিকেটওয়ালাদের মনোভাবটা এরকম- কুদ্দুস আমার কবিতা ছাপাতে সাহায্য করেছে অমুক পত্রিকায়, তাই আমি অমুককে বলে তার একটা গল্প ছাপানোর ব্যবস্থা করে দিলাম- অমুক পত্রিকায়।)। এরমধ্যে কিছু আছে প্রবাসী। সবাইই এক রকম। সব রসুনের এক মাথা। একজনকে কিছু বলবেন ওমনি সবাই আপনাকে ঝেঁকে ধরবে। মূরগীর পশম ছিলার মতো আপনাকে ছিলে ফেলবে। তাদের দল এতটাই শক্তিশালী। তারা একে অন্যের উপর ভর দিয়ে উপরে উঠতে চেষ্টা করতেছে।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো- তারা কবিতা বা সাহিত্যের কিছুই বুঝে না, নূন্যতম সাহিত্য জ্ঞান নেই। তাদের লেখা পড়াও খুব বেশি না। হুট করে তারা কোথা থেকে এসে সাহিত্যকে ব্যবহার করে কিছু একটা হয়ে উঠতে চাচ্ছে। তারা সাধারন মানূষকে বুঝাচ্ছে কবিতা কি? সাহিত্য কি বা কেমন হওয়া উচিত! লোকজন ধরে-ধরে চাটুকারিতা করে, দালালি করে তথাকথিত পুরস্কার বাগিয়ে নিচ্ছে। চায়ের আড্ডায় আর ফেসবুকে কবিতা আর সাহিত্য নিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কত কথা! মূলত তারা নিজেদের নোংরা অতীত ডাকতে সাহিত্যকে বেছে নিয়েছে। এদের একজন (মহিলা) আজ স্ট্যাটাস দিয়েছে- ''আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি একজন লেখক। তাই মন খারাপ ভাবটা দূর করার জন্য কলম হাতে দুলে নিলাম।'' এই মহিলা একটা পেজ খুলেছে- আবোল-তাবোল যা মন চায় লিখছে। কিছু আবাল আবার এইসব লেখায় লাইক, কমেন্ট দেয়ার জন্য হাবলে পড়ছে!
ু
হুমায়ূন আজাদ আগেই বলে দিয়েছেন- ''আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।'' এখন দেখছি তাই তো হচ্ছে। এই শ্রেনীর লোকজন বেশ কিছু বিখ্যাত লেখকের নাম-ধাম জেনে নেয়। নেট থেকে জনপ্রিয় বই গুলোর রিভিউ পড়ে নেয়। এবং মনে করে সাহিত্যের সব জানা হয়ে গেছে। এখন জাতে উঠার জন্য নেট ঘেটে বই লিখে ফেলে। লেখার মাঝে দুই একটা ইংরেজীতে কোটেশন তো থাকবেই। নিজের বই বিক্রি বাড়ানোর জন্য আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধন পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে ধরে। কারন এই লেখক বা কবি বই প্রকাশ করার আগে প্রকাশক সাহেবকে বলেছেন- দুই শ' বই বিক্রি হবেই। যদি না হয় তাহলে আমি নগদ টাকায় কিনে নিব। বই বের করার ক্ষেত্রে প্রবাসীরা এগিয়ে- কারন তাদের টাকার সমস্যা নেই। এ শ্রেনীর প্রকাশকরা এদের দিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে। এরা আবার দিল দরিয়া। বই এর খরচ ২০ হাজার টাকা হলেও দিয়ে চল্লিশ হাজার। এইসব লেখকদের বই বের করার জন্য এবং প্রকাশকরা ব্যবসা করার জন্য ফেব্রুয়ারী মাসের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সবচেয়ে জঘন্য লাগে তখন- যখন নিজেরা নিজেরাই একজন আরেকজনকে কবি বলে সম্বোধন করছে, গল্পকার বলছে, কথাসাহিত্যিক বলছেন। তারা দায়িত্ব মনে করে- হুমায়ূন আহমেদকে ছিন্নভিন্ন করছেন। 'হুমায়ূন সাহিত্য কোনো সাহিত্য হলো- এই কথা বলতেও আপনাদের জিব কাঁপে না।' বোধহয় তাদের ধারনা হুমায়ূন আহমেদের সমালোচনা না করলে লেখক হওয়া যায় না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার পাবার জন্য তাদের নানান তদবির করতে দেখা যায়। এইসব তথাকথিত লেখকরা ঠিকমত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না। এরা মানূষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য, ভানবাসি মানূষদের জন্য টাকা সংগ্রহ করে। (কিন্তু নিজেরা দশ টাকাও দেয় না)। সংগ্রহ করা টাকা স্বচ্ছতার সাথে বিলিয়ে দেয়। সব কিছু তারা ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। একটু পর-পর কে কি করছে, কে কত টাকা দিল এবং সমস্ত টাকা কিভাবে খরচ হলো সব ফেসবুকে আপডেট করছে। এইসবই হলো লোক দেখানো। এর আড়ালের যা আছে, উদ্দ্যেশ্য-কারণ এবং নিজেদের উপকারিতা, ইত্যাদি ব্যাপার স্যাপার সাধারন মানূষ বুঝতে পারে না।
এই সমস্ত তথাকথিত সাহিত্যিকেরা মনে করে লেখক হওয়ার প্রথম সর্ত হলো মদ খাওয়া। বেশির ভাগ সময়ই এদের পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকে না। তখন একজন পয়সাওয়ালা লোক খুঁজে নিয়ে বারে গিয়ে বসেন। তখন ছবি তুলেন, সেই ছবি ফেসবুকে দেন। কেউ কেউ আবার ফেসবুকে সরাসরি লাইভ দিয়ে দেন। তারা বুঝাতে চেষ্টা করেন- তারা সাহিত্য নিয়ে সাধনা করছেন। তা যেন দেশবাসী দেখতে পায়। অথবা তারা প্রমানে বিশ্বাসী। এই তথাকথিত কবি সাহিত্যিকদের ভিড়ে ভালো লেখকেরা হারিয়ে যাচ্ছে। ভালো কিছু লেখার মানসিকতা নষ্ট হয়ে আচ্ছে। শিক্ষার মান যেমন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে তেমনি এইভাবে এইসব নামধারী কবি-সাহিত্যিকেরা সাহিত্যের মানও অনেক নিচে নামিয়ে ফেলেছে। কারো কিছু করার নেই। তারাই বাংলা একাডেমিও চালাচ্ছে। সাধারন মানুষ সব দেখছে, সব বুঝতে পারছে কিন্তু কারো কিছু করার নেই। তবে আশার কথা হচ্ছে- দুষ্টলোকের পতন অনিবার্য। বেশ কিছু সস্তা প্রকাশককে আমার ইছা করে কানটা টেনে ছিড়ে ফেলি।
এই কবি সাহিত্যিকেরা অনেকে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে স্ট্যাটাস দেয়- 'প্রিয় পাঠক আমি অমুক জায়গায় আছি। আপনাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছি।' প্রিয় পাঠক কোলকাতাতে আমার বই অমুক দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।' চিটাগাং এর বন্ধুরা কই? আমি চিটাগাং আসছি। শিল্পকলা একাডেমিতে আমি আসতেছি।' কথা হবে আড্ডা হবে। চিটাগাং থেকে ঢাকা এসে আবার স্ট্যাটাস- চিটাগাং এর মানূষ গুলো এত ভালো ক্যান? চিটাগাং না গিয়ে যদি নোয়াখালি থেকেও ঘুরে আসে তখনও স্ট্যাটাস দিবে- নোয়াখালি মানূষের তুলনা হয়। তারা যে পরিমান ভালোবাসা দেখিয়েছে- কোনোদিন ভুলব না। 'প্রিয় পাঠক আমার অমুক বই শেষ। নতুন এডিশন আসার জন্য আপনাদের আরও তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে।' ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিন্তু শুধু পুরুষ লেখকের কথা বলছি না, কিছু নির্লজ্জ মহিলাও আছে। আর কিছু আবাল পোলাপান সব সময় এদের ঘিরে থাকে। একটা নিম্ম মানের স্ট্যাটাস দিলে- 'অসাধারন দাদা', 'আপনার তুলনা হয় না', 'এত সুন্দর করে লিখেন কিভাবে?' তথাকথিত কবি সাহিত্যিকদের সাথে কোনো কোনো আবাল ছবি তুলে ফেসবুকে দিবে আর ক্যাপশন লিখবে- 'প্রিয় কবির সাথে' অথবা 'প্রিয় কথাসাহিত্যিকের সাথে।' এইসব ছাগল গুলো সাহিত্যকে সস্তা বানিয়ে ফেলল।
এইসব কবি সাহিত্যিকদের কর্মকান্ড যে কতটা হাস্যকর- তা কি তারা বুঝেন না? ভালো কিছু করলে লোকে আপনাকে খুঁজে নিবে। দ্বারে দ্বারে ঘোরার দরকার হবে না। দিনের মধ্যে একশ' বার নিজেই নিজেকে বারবার লেখক লেখক, কবি-কবি বলে চিৎকার দেন। ফ্যান পেজ খুলে নিজেকে কবি- লেখক হিসেবে জাহির করতে চেষ্টা করেন। খুব ভারিক্কি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে দেখাতে চান। এই সমস্ত কবি আর লেখকদের বই খুব কষ্ট করে দশ পাতা পড়ার পর, ইচ্ছে করে বইটা ছুড়ে ফেলি ডাস্টবিনে। বইতে না আছে ভাষার মাধুর্য, না আছে গভীরতা, না আছে সুন্দর শব্দ চয়ন, না আছে সুন্দর কোনো গল্প। তাদের বই ভাবায় না, স্বপ্ন দেখায় না রবং বিরক্ত উৎপাদন করে। আমার এক প্রিয় শিক্ষক আমাকে শান্ত্বনা দিয়ে বললেন- এত আফসোস করো না, এত মন খারাপ করো না, শুধু মনে রেখো যারা যোগ্য তারাই টিকে থাকবে।
বাংলা সাহিত্যকে এই তথাকথিত নব্য কবি আর সাহিত্যিকদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। যারা বাংলাসাহিত্যের বারটা বাজাচ্ছে তাদের আমি ছাড়বো না। আসুন সবাই ঐক্যবোধ্য হই। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।
বিঃ দ্রঃ খুব অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমি অকবি আর অসাহিত্যিকদের একটা তালিকা তৈরি করবো।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




