
অফিসে এক রুমে আমরা পাঁচজন বসি। আমি ছাড়া বাকি চারজন নিয়মিত নামাজ পড়েন। আযান দিলেই তিনজন অজু করে নামাজ পড়তে দোতলায় চলে যান। রুমে আমি তখন একা চুপচাপ বসে থাকি। ব্যবপারটা দেখতে দৃষ্টিকটু লাগে হয়তো। দিনের পর দিন একই ঘটনা। নামাজ না পড়ার কারনে অফিসের কেউ কেউ আমার দিকে কঠিন চোখে তাকায়। একদিন এমডি স্যার বলেই ফেললেন, আপনার রুমের সবাই নামাজ পড়ে, আপনি নামাজে যান না কেন? এটা ঠিক না। অবশ্যই নামাজ পড়বেন। ইত্যাদি আরও অনেক জ্ঞান দিলেন। মনে মনে ভাবি আমাকে নামাজ পড়তে হবে। নামাজ ছাড়া বেহশতে যাওয়ার অন্য কোনো উপায় নেই। অবশ্য আমি বেহশতে যেতে চাইও না। ৭০ টা হুর পরী আমার দরকার নাই।
প্রথম প্রথম আমার রুমের চারজন আমাকে খুব নামাজের কথা বলতেন। আমি শুধু বলি- জুম্মার নামাজ পড়ি তো ভাই। আচ্ছা পড়বো, পড়বো। নিয়মিত নামাজ পড়বো। আমার পাশের টেবিলে যে বসে তার নাম কামাল। নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কালো স্থায়ী দাগ বসিয়ে ফেলেছেন। কাজের ফাকে ফাঁকে ল্যাপটপে কোরআন হাদীস পড়েন-শুনেন। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ভালো লাগে। মাঝে মাঝে নামাজ পড়তে দেরী হয়ে গেলে, কামাল ভাই প্রায়ই বলেন সময় মতো নামাজ পড়তে না পারলে ভালো লাগে না। কাজা নামাজ পড়া আমার জন্য খুব কষ্টের। নিজে ধর্ম-কর্ম না করলেও অন্য কেউ ধর্ম-কর্ম পালন করলে ভালো লাগে আমার। তাকে আমি সমীহ করি। কারন আমার ধারনা যারা নামাজ রোজা করেন তারা অন্য মানূষের তুলনায় একটু বেশি ভালো হয়।
একদিনের ঘটনা- কামাল সাহেব ছাড়া আমাদের রুমে সবাই বাইরে। আমিও বাইরে ছিলাম। বিকেলে ফেরার কথা ছিল। দ্রুত কাজ শেষ হওয়ার কারনে আমি দুপুরে এসে অফিসে উপস্থিত হই। এসে দেখি কামাল সাহেব ওয়াশরুমে। তার ল্যাপটপ খোলা। সেখানে থ্রি এক্স চলছে। খুব আস্তে সাউন্ড দেয়া। দেখে আমি তো প্রচন্ড অবাক! আমার হাত পা কাঁপছে। আমি দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। কেউ যে অফিসে বসে থ্রি এক্স ভিডিও দেখে আমার ধারনার বাইরে ছিল। তাও আবার কালাম সাহেবের মতো লোক, যে কিনা নামাজ পড়তে পড়তে কপালে দাগ বসিয়ে ফেলেছেন। আমার মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। যাই হোক, পরের দিন আমি কামাল সাহেবের ল্যাপটপ ঘাটাঘাটি করে আবিস্কার করলাম, দেখলাম সেখানে কয়েক শ' থ্রি এক্স ভিডিও। তারপর আমার সন্দেহ আরও বাড়লো। তার মোবাইলে চেক করে দেখলাম একই অবস্থা। এরপর থেকে কামাল সাহেবের পাশে বসতেও আমার খারাপ লাগে। আমি জিএম সাহেবকে বলে অন্য রুমে চলে যাই।
অন্য রুমে যাওয়ার আগে, আমি আমার রুমের বাকি তিনজনের উপরও আমার সন্দেহ হলো। যেহেতু তারাও নিয়মিত নামাজ পড়েন। গোপনে আমি তাদের মোবাইল আর কম্পিউটার সার্চ করলাম। এর মধ্যে সুমন নামের একজনের মোবাইলে বেশ কিছু নোংরা ভিডিও পেলাম। আর কম্পিউটারে কোনো ভিডিও নেই কিন্তু History তে গিয়ে দেখি তিনি নানান রকম পর্ণ সাইট নিয়মিত ভিজিট করেন। এই সুমন ভাই আমাকে কথায় কথায় কত বার যে কোরআন আর হাদীসের ব্যাখ্যা শুনিয়েছেন। নিজের চোখে দেখছি- নামাজের পর তিনি টানা ত্রিশ মিনিট তজবি হাতে নিয়ে জিকির করেন। তার গ্রামের বাড়িতে বউ আছে একটা ছোট বাচ্চা আছে। এখন আমি অনায়াসে বলতেই পারি- দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বদমাইশরা হলো- এইসব তথাকথিত ধার্মিকেরা, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। আসলে নামাজ পড়লেই আর কথায় কথায় কোরআন হাদিসের কথা বললেই তাকে ভালো মানূষ বলা ঠিক হবে না। এক গ্রামের মসজিদের ইমাম আমাকে বলেছিল- তোমার হবি কি? আমি বলেছিলাম আমার শুধু বই পড়তে ভালো লাগে। আর ইমাম সাহেব শয়তানের মতো হাসি দিয়ে বলেছিলেন- নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে সহবাস করাই আমার হবি।
ব্যাপারটা আমি মানতে পারি না। বিয়ে করেছেন, বাচ্চা কাচ্চা আছে, বয়স ৩২ এর বেশি। নিয়মিত নামাজ কালাম পড়েন তারা কেন থ্রি এক্স দেখবেন। ধর্মে কি এই নিয়ম আছে? নোংরা ভিডিও দেখো আবার নামাজ কালামও পড়ো। থ্রি এক্স দেখে চ্যাংড়া পুলাপান, দুষ্টপুলাপান, আর কিছু দুষ্ট অবিবাহিতরা। কোনো রুচিশীল এবং সৃষ্টিশীল মানূষ এইসব নোঙরা ভিডিও দেখে না। নো নেভার। আমার নিজের কাছেই এই জিনিস দেখতে রুচি হয় না। বিয়ের পর নরনারীর মিলন একান্ত দুইজনের- আনন্দের ব্যাপার, ব্যাক্তিগত ব্যাপার। কথায় বলে- পাপকে ঘৃনা করা পাপীকে নয়। যতক্ষণ পাপী তার পাপকে উপলব্ধি না করতে পারে, ক্ষমা না চায় বা একই পাপ বার বার করে, ততক্ষণ ঘৃনা করার ব্যাপারে আমি পাপ আর পাপীকে আলাদা করার কোন কারণ দেখি না। সভ্য মানুষের ধর্ম হচ্ছে বাক্যে চিন্তায় কর্মে যুক্তির অনুশাসন মেনে চলা।
এই শ্রেনীর মানুষ ইসলামী মুখোশ পড়েই সর্বদা ভণ্ডামী করে থাকে। সমাজে এদের সংখ্যাই বেশি। হুমায়ূন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' বইটার কথা খুব মনে পড়ে যায়। উপন্যাসটি প্রথম বেরোয় দৈনিক ইত্তেফাক -এর ঈদ সংখ্যা ২০০৩-এ। অনেকের কাছেই হুমায়ুন আজাদ পছন্দের কোন লেখক না। কিন্তু আমার কাছে অন্যতম একজন। ধর্ম মানুষকে অন্ধ হতে শেখায় না- তবে যারা আমাদের এই জ্ঞান দান করেন তারাই আমাদের অন্ধ করে রাখেন । “পাক সার জমিন সাদ বাদ” উপন্যাসের কিছু অংশ নিচে দিয়ে দিলাম-
''দেশ মুরতাদ ও ইহুদিতে ভ’রে গেছে, দেশ নাপাক হয়ে গেছে, একে আবার পাক করে তুলতে হবে। পাক পবিত্র স্তানকে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্থান নেই ব’লে আমাদের দিলে শান্তি নেই; আমরা সব সময় স্তানের স্বপ্ন দেখি; স্তান থেকে খেজুর, বাশমতি চাউল এনে খাই, তাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলি, আমাদের লকলকে যুবতীগুলো তাদের দাড়িঅলা দাড়িছাড়া খেলোয়াড়দের চুমো খাওয়ার, দেহ দেয়ার জন্যে পাগল হয়, তাদের হোটলে গিয়ে চিৎ হয়। তাদের দুই চারটি মেজর-লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসে মাসে ছফরে না এলে আমরা দিলে সুখ পাই না। এভাবে আমরা একটু পাকের পরশ পাই। নাপাক ওয়াতানে বাস করা শুয়োরের গোস্ত খাওয়ার থেকেও হারাম। নাউজুবিল্লা।
আমরা একলা নই; আমাদের ভাইয়েরা আছে দুনিয়া জুড়ে, তাদের কাজ ক’রে চলেছে; কোথাও যদি কোন দালানের ওপর এরোপ্লেন ঝাঁপিয়ে পরে। যদি কোন গাড়ি হাসপাতালে হোটেলে ঢুকে সব কিছু চুরমাচুর ক’রে দেয়, যদি কোন প্রমোদকেন্দ্রে বোমায় ৩০০ জন মরে, তখন বুঝি সেটা আমাদের ভাইদের কাজ। এক অর্থে আমাদেরই কাজ। এটা জিহাদ। আমরা আমাদের কাজ ক’রে চলেছি; দেশ এক রকম দখলই করে ফেলেছি, পুরোপুরি করতে বাকি নেই। আমরা মেইন পার্টির সঙ্গে আছি, মেইন পার্টিতে আমাদের লোক আছে, মেইন পার্টিতে এখন আমাদের লোকই বেশী; তারা কাজ ক’রে যাচ্ছে; বেশী দিন নেই আমরা দেশটিকে আমাদের নিশানের নিচে, আমাদের পায়ের নিচে নিয়ে আসবো। আমাদের জিহাদ চলছে চলবে।''
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




