
নীলা প্রতিমাসের এক তারিখে শাহেদের হাতে বাজারের লিস্ট তুলে দেয়।
প্রতিমাসে লিস্ট বড় হতে থাকে। শাহেদের নেই চাকরি। বাজারে গেলে তার মাথা ঘুরতে থাকে। সংসারের সমস্ত সদাইপাতি শুধু এই লিস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। আরও আছে কিছু অলিখিত ও মৌখিক সদাইপাতি। শাহেদ চুপ করে লিস্টের সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে আসে। লিস্ট ছাড়াও আরও অলিখিত সদাইপাতি। যেমন- পাঁচ রকমের মাছ, মাংস, মূরগী। আর মৌখিক হচ্ছে- কয়েক রকমের ফল, খেজুর সহ, মধু, তেঁতুল, মাখন, জেলি ইত্যাদি। পুরো মাসের বাজার করতে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগে। এরপর আরও আছে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানি, বুয়া, ডিশ, ইন্টারনেট, ওষুধ পত্র, দাওয়াত, মেয়ের স্কুলের বেতন, শিশু একাডেমি'র বেতন, আরবী পড়ায় হুজুরের টাকা, মেহেমানদারি ইত্যাদি ইত্যাদি। শাহেদের সীমাহীন কষ্ট হয়। অথচ সে তার পরিবারকে কিছুই বুঝতে দেয় না। এদিকে তার জমানো টাকা প্রায় শেষ হতে চললো।
শাহেদ বিয়ের আগে কোনো দিনও বাজার করেনি।
এখন সে গত পাঁচ বছর ধরে সে নিয়মিত বাজারে করে। বাজারের সমস্ত জিনিসপত্রের দাম তার জানা। বাজারে প্রতিমাসে কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়েই। বেড়েই চলেছে। তার ছোট্র সংসার তারপরও কত কিছু যে লাগে তার ইয়ত্তা নেই। বাজার টাজার করার পরও দেখা যায়- কোনো কোনো মাসে, লাইট ফিউজ হয়ে গেছে, কোনো না কোনো সুইচ নষ্ট হয়ে গেছে, বেসিনের কল নষ্ট হয়ে গেছে অথবা গ্যাসের চুলা নষ্ট হয়ে গেছে। একটা সংসারে যে কত কিছু লাগে! যতদিন যাচ্ছে জীবনযাত্রা তত কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক টাকা থাকলে কোনো চিন্তা নাই। টাকা না থাকলেই রাজ্যের যত চিন্তা আছে সব ভর করে মাথায়। সিন্দাবাদের ভূতের মতো গলা টিপে ধরে। শাহেদ তার স্ত্রী আর কন্যাকে কিছুই টের পেতে দেয় না। বরং নীলা এক কেজি আপেলের কথা বললে, শাহেদ দুই কেজি নিয়ে আসে।
সংসারের বাজার শেষ করার পর নিজের মা আর ছোট ভাইকেও তো প্রতিমাসে হাত খরচ হিসেবে কিছু টাকা দিতে হয়।
সামনে আসছে রোজা। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়বে। ঈদের একটা আলাদা খরচ আছে। শ্বশুর বাড়িতেও কিছু কেনাকাটা করে দিতে হবে। এসব ভাবতেই শাহেদের দম বন্ধ হয়ে আসে। টাকার দরকার, অনেক টাকার দরকার। টাকা ছাড়া তো কিচ্ছু হয় না। এই জন্যই তো মানুষ এত টাকা টাকা করে। শাহেদ ভেবে পায় না- এই দেশের মানুষ খেয়ে-পড়ে বেঁচে আছে কিভাবে? জিনিসপত্রের যা দাম! শাহেদ খুব বুঝতে পারে আসলে এই সমাজের কেউ'ই ভালো নেই। নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারে দেশের সাধারন মানুষ কত কষ্টে আছে। অন্যদিকে কিছু মানুষের হাতে সীমাহীন টাকা। তারা কত ফালতু খরচ করে। মুহুর্তের মধ্যে হাজার-লক্ষ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে। গায়েই লাগে না যেন। আর শাহেদের বিশ টাকা অপ্রয়োজনে খরচ হলে বুকে এসে লাগে।
জীবন যুদ্ধ কি জিনিস তা শাহেদ হারে হারে টের পাচ্ছে।
আসলে শুধু শাহেদ না, প্রতিটা বিবাহিত পুরুষই বুঝে। এই সমাজে লক্ষ লক্ষ শাহেদ আছে। হতাশা বা মানসিক অসুস্থতা ক্রমে গ্রাস করছে শাহেদকে। এখন সে হাসে না। শেষ কবে সে হো হো করে হেসেছে সে জানে না। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এই সুন্দর পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বেশী সুন্দর মানুষ। মানুষ শুধু সুন্দরই না- এরা পৃথিবীর সেরা জীবও বটে। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে তাহলে কেন শাহেদদের উন্নতি হচ্ছে না? অল্প কিছু দিন মানুষের আয়ু। শাহেদ চায় এই স্বাধীন দেশে সবাই খেয়ে পড়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকুক। আদিম সমাজে মানুষ সারাদিন মাইলের পর মাইল চষে বেড়িয়েছে খাবারের সন্ধানে, সারা জীবন'ই থেকেছে আধপেটা খেয়ে। এটা তো আদিম যুগ নয়। পৃথিবীর সব মানুষ ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক। আনন্দে থাকুক।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৯ রাত ৮:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




