somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

২১ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



“মানুষ কি চায় — উন্নতি, না আনন্দ? উন্নতি করিয়া কি হইবে যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে? আমি এমন কত লোকের কথা জানি, যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে বটে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ভোঁতা— এখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ পায় না, জীবন তাহাদের নিকট একঘেয়ে, একরঙা, অর্থহীন। মন শান-বাঁধানো— রস ঢুকিতে পায় না।”
-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, (আরণ্যক)।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর জন্ম ১২ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ সালে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত এবং কবিরাজ। মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ ছিলেন সবচেয়ে বড়। তিনি একজন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। ১৯৫১ সালে ইছামতী উপন্যাসের জন্য বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন। তার বেশ কিছু গল্প ও উপন্যাস থেকে সিনেমা হয়েছে। সিনেমা গুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

পিতার কাছে বিভূতিভূষণের পড়ালেখার পাঠ শুরু হয়।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার পিতা মারা যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স এবং ১৯১৬ সালে কলকাতা'র রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ) থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৮ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষায়ও ডিস্টিংশনসহ পাশ করেন।
১৯১৯ সালে হুগলী জেলার জাঙ্গীপাড়ায় দ্বারকানাথ হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ানোর সময় বসিরহাটের মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পরই গৌরী দেবী মারা যান যক্ষায়। স্ত্রীর শোকে তিনি কিছুদিন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন। পরে ৩ ডিসেম্বর, ১৯৪০ তারিখে ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রমা দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের সাত বছর পর একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (ডাকনাম বাবলু) জন্মগ্রহণ করেন। যদিও বিয়ে করার তার কোনো ইচ্ছা ছিলো না। আত্মীয় স্বজনের চাপে পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হোন।

শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন বিভূতিভূষণ।
এই কথাসাহিত্যিক ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর তারিখে বিহারের (বর্তমানে ঝাড়খন্ড) ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন স্ট্রোকে। তিনি তার বাড়িটির নাম স্ত্রীর নামে 'গৌরীকুঞ্জ' রেখেছিলেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দ) প্রবাসী পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় 'উপেক্ষিতা' নামক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। তার লেখা 'চাঁদের পাহাড়' একটি অনবদ্য এ‍্যাডভেঞ্চার কাহিনী, যার পটভূমি আফ্রিকা। চাঁদের পাহাড় অদ্ভুত একটা উপন্যাস। একবার পড়তে শুরু করলে সমস্ত চিন্তা ভাবনা হারিয়ে যায়। প্রতিটা বাঙ্গালীই এই বইটা পড়েছেন আশা করি। যারা পড়েন নি অবশ্যই পড়বেন।

মানুষ যে প্রকৃতিরই সন্তান এ সত্য তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। প্রকৃতির লতাপাতা, ঘাস, পোকামাকড় সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে স্বস্বভাবে তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে। প্রকৃতি আর মানুষকে ভালবাসতেন লেখক। প্রচুর সাহিত্য পড়তেন। পড়তেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিদ্যা। শেষ জীবনে পরলোকতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন বিভূতিভূষণ। পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন সারাক্ষণ। তাই সারা বাড়িতে বইপত্র ছড়ানো থাকত। আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না। প্রতিটা লেখকেরই হয়তো কিছুটা দুর্বলতা থাকে। বিভূতিভূষনেরও ছিলো। তার লেখাতে গ্রামের নিখুঁত বর্ণনা থাকতো। বৃষ্টি থাকতো, দারিদ্রতা থাকতো, কাশফুল থাকতো, পাওয়া না পাওয়া থাকতো, থাকতো মানুষের মনের গোপন ইচ্ছা গুলো। তাঁর সাহিত্যের একটা বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে অবহেলিত, নির্যাতিত মানুষের জীবনভাষ্য; তিনি চেয়েছিলেন যেসব জীবন অখ্যাতির আড়ালে আত্মগোপন করে আছে, তাদের সুখ-দুঃখকে সাহিত্যে রূপায়ণ করতে।

১৯৩৩ সালের ৫ এপ্রিল বিভূতিভূষণ প্রথম রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং ‘পথের পাঁচালী' রচনা সম্পর্কে কবির থেকে অভিনন্দন লাভ করেন। বিভূতিভূষনের আয়ু ছিল মাত্র ৫৬ বছর। লেখালেখি করেছেন ২৮ বছর। তাঁর রচনাসম্ভারের মধ্যে রয়েছে ১৫টি উপন্যাস, সাতখানা কিশোর উপন্যাস, দুইশ’র বেশি ছোটগল্প। পনেরোটি উপন্যাসের মধ্যে একটি ছিল অসমাপ্ত। শিশু-কিশোর উপন্যাসের মধ্যে তিনটি হলো বয়স্কপাঠ্য উপন্যাসের কিশোর সংস্করণ। এসবের বাইরে অন্যান্য বিষয়েও তিনি লিখে গেছেন। সেগুলোর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তার মধ্যে রয়েছে ভ্রমণকাহিনী, ডায়েরি, প্রবন্ধ, অনুবাদ। ব্যাকরণ বইও তিনি লিখেছেন। বিভূতিভূষণের ‘মেঘ মল্লার’, ‘মৌরীফুল’, ‘জন্ম ও মৃত্যু’ এবং ‘নবাগত’ গ্রন্থের গল্পগুলো আমার বিশেষ প্রিয়। তার সমকালে আর দুজন দাপুটে ঔপন্যাসিক ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

এক নজরেঃ

১। বিভূতিভূষণের বাবা মহানন্দ বন্দ্যাপাধ্যায় ছিলেন ভবঘুরে টাইপের মানুষ।
২। বিভূতিভূষণের স্কুলের নাম বনগ্রাম উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়।
৩। ইছামতী নদীতে স্নান করতে নেমে ডুবে মারা গিয়েছেন বিভূতিভূষণের বোন জাহ্নবী দেবী।
৪। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বিভূতিভূষণ চিরকালই খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন।
৫। বিভূতিভূষণের প্রিয় ফল ছিল আম আর কাঁঠাল। ভালবাসতেন চাঁপা, বকুল, শেফালি ফুল।
৬। নির্জন এলাকায় একাএকা বেড়াতেন বিভূতিভূষণ। এঁদেল বেড়ের জঙ্গল, সুবর্ণরেখা নদী, পাণ্ডবশীলা, কাছিমদহ রাত-মোহনা ছিল তাঁর প্রিয় ভ্রমণের জায়গা।
৭। শেষ দশ বছর, ব্যারাকপুরে থাকাকালীন লিখেছেন ‘অশনি সংকেত’ বা ‘ইছামতী’র মতো কালজয়ী উপন্যাস।
৮। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর দীর্ঘ ২২ বছর পরে আবার বিয়ে করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
৯। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মাঝে মাঝে চিঠি লিখতেন।
১০। বিভূতিভূষনের একমাত্র পুত্র তারাদাস বন্দ্যাপাধ্যায় ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
১১। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি- “সংসার যে কি ভয়ানক জায়গা, দুঃখে-কষ্টে না পড়লে বোঝা যায় না।”
১২। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যসাধনার কাল আটাশ বছর।
১৩। বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে" - 'পথের পাঁচালী' সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:৪৯
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দশ বছরের ব্লগিং—মিষ্টি মুখ হোক সবার

লিখেছেন কাওসার_সিদ্দিকী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৯

আজ আমার ব্লগিং যাত্রার দশ বছর দুই মাস পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে পাঠকদের ভালোবাসা, মন্তব্য আর সমর্থন আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে চাই আপনাদের সবার সাথে—তাই আজকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২


নতুন পে স্কেল নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বেতন কত বাড়বে এবং নতুন কাঠামো বাস্তবে কেমন হবে, এসব প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। নতুন বেতন কাঠামোয় ১ থেকে ১১... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২৮



বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি

বিশ্ব চিঠি দিবস উপলক্ষে এবার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের কয়েকজনকে নিজের হাতে চিঠি পাঠালাম। ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে একটি চিঠি যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ অদৃশ্য পাতায় লেখা ছিল যে

লিখেছেন সামিয়া, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২১



আমি একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতাম। তখন জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। সকালবেলা অফিস, সারাদিন কাজের চাপ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিয়ে নিয়ে তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট ও বিএনপি কি একে অপরের পরিপূরক?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৭


গ্যাস নাই ,বিদ্যুৎ নাই। নিত্যদিনের নানা সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। এভাবে মানুষ বিএনপিকে কতদিন সহ্য করবে? মানুষ সহ্য করতে করতে যখন ধর্যের বাধ সহ্যের বাধ ভেঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×