
প্রিয় কন্যা আমার-
তোমাকে নিয়ে আমি মুগ্ধ! দুনিয়াতে তুমি এসে আমাকে মহৎ করে তুলেছো। তুমি আমার প্রতিটা দিন আনন্দময় করে তুলেছো। গতকাল থেকে তুমি নাচতে শুরু করেছো। আমার হাত ধরে তুমি দাড়াতে চেষ্টা করো। দাঁড়াও। এবং তারপর অদ্ভুত ভাবে পা বাঁকা করে নাচতে শুরু করো। তোমার নাচ দেখে বাসার সবাই মুগ্ধ! দুনিয়ার কেউ বিশ্বাস করবে সাত মাসের বাচ্চা নাচে! আমার মা বলে, আমার মরতে ইচ্ছা করে না। মরে গেলে মা তোমাকে দেখতে পাবে না। তোমার নাচ দেখতে পাবে না। তোমার জন্য মা অনেকদিন বেঁচে থাকতে চাচ্ছে। তুমি ছোট মানুষ হয়েও পুরো বাসার সবাইকে মাতিয়ে রেখেছো। তোমাকে পেয়েছি। আমি আর জীবনে কিছুই চাই না প্রভুর কাছে। আমার পয়ত্রিশ বছরের জীবনে নিশ্চয়ই কোনো ভালো কোনো কাজ করেছি, তাই ঈশ্বর খুশি হয়ে তোমাকে দিয়েছেন।
প্রিয় ফারাজা,
তোমার বড় বোন পরী। সে তোমাকে খুবই আদর করে। পরীকে নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। কিভাবে-কিভাবে যেন সে বুঝে গেছে লেখাপড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কোনো গতি নাই। পরীকে পড়ালেখার কথা বলতে হয় না। সে নিজীর আগ্রহে পড়তে বসে। প্রতিদিন সে অনলাইনে ক্লাশ করছে। একাএকা হোমওয়ার্ক করে নিজেই টিচারের কাছে সাবমিট করছে। শিশু একাডেমিতে রোজা ড্রয়িং শিখতো। করোনার জন্য শিশু একাডেমি বন্ধ। এখন সে অনলাইনে দিল্লির এক মেয়ের কাছে এনিমেশন শিখছে। আমাদের পাশের বাসায় পরীর বয়সী একমেয়ে আছে। তার বাপ মা তাকে ধর্মীয় বই কিনে দিয়েছে। আমি পরীকে কোনো ধর্মীয় বই কিনে দেই নি। সে অবসর সময়ে এনিমেশন শিখছে। কি হবে হযরত আলী, খাদিজা বা আমিনার বানোয়াট জীবনী পড়ে?
প্রিয় কন্যা ফারাজা,
আজ তোমার সেজো চাচার জন্মদিন। রাতে খানাদানার বিরাট ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অবশ্য আজ হবে সব চায়নিজ আইটেম। আমি যখনই ভাবি খাওয়া-দাওয়া একটু হিসেব করে করবো। তখনই বাসার মানুষজন এইসব ভারী খাবার রান্না শুরু করে। অথচ সুস্থ থাকার জন্য মানুষ কত রকম চেষ্টা করে। এমনিতেই আমার গ্যাস্ট্রিকের প্রচুর সমস্যা। আমার খাওয়া দরকার শুধু সবজি। তেলের খাবার থেকে দূরে থাকাই উত্তম। যাই হোক, এখন চারিদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ খুব বেড়েছে। আমাদের এলাকায় আট বছরের একটা মেয়ে ডেঙ্গু হয়ে মারা গেছে। তোমাকে নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি। যদিও তোমার মা আর আমি খুব সাবধান থাকি। মশার ওষুধ দিচ্ছি নিয়মিত ঘরে। দিনের বেলা তুমি ঘুমালে ছোট মশারী দিয়ে তোমাকে ঢেকে রাখি। একটা শিশুর অনেক যত্নের দরকার হয়। বাবা-মা একটু বেখেয়াল হলেই শিশু অসুস্থ হয়ে যায়। প্রতিটা মুহুর্ত তোমার দিকে চোখ রাখতে হচ্ছে।
প্রিয় কন্যা ফারাজা তাবাসসুম-
তোমার মায়ের কথা বলি- শোনো। তোমার মায়ের এক বান্ধবী আছে। বিয়ে করেছে দশ বছর হয়েছে। তাদের একটা ছয় বছরের বাচ্চা আছে। অথচ বাচ্চার বাপ তাদের ছেড়ে চলে গেছে এবং আরেকটা বিয়ে করেছে। এই ঘটনা দেখে তোমার মা আমাকে প্রশ্ন করে- আমি তার বান্ধবীর স্বামীর মতো করবো কিনা? দেখো, তোমার মা কি রকম বোকা! এত বছর ধরে আমরা একসাথে আছি- তবু আমাকে চিনলো না। বুঝলো না! এখনও তার মাঝে কত দ্বিধা!
আমি তো মন্দ লোক না। তোমাকে ছেড়ে, তোমার মাকে ছেড়ে কোথায় যাবো? এটা আমার পক্ষে কখনও সম্ভব না। তোমাদের আমি ভালোবাসি। একজন মানুষের পক্ষে যতটুকু ভালোবাসা সম্ভব আমি তার চেয়ে বেশি তোমাদের ভালোবাসি। তবে তোমার মাকে ভয় দেখিয়েছি- বললাম, হ্যাঁ আমি আরেকটা বিয়ে করবো। তোমার মা বলল- প্রতিদিন সন্ধ্যায় যে তুমি বের হও- সেই মেয়ের কাছে যাও। আমি বললাম হ্যাঁ সেই মেয়ের সাথে দেখা করতে যাই। ফারাজা, আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হই। কোনো একটা চায়ের দোকান থেকে চা খাই। কিছুক্ষন গল্পগুজব করি। এতটুকুই। যে কথা তোমার মাকে কোনোদিন বলি নি, আজ তোমাকে বলি- তোমার মায়ের সাথে পরিচয় হবার পর আমি আর কোনো নারীর দিকে তাকাই নি আজও। কোনোদিন তাকাবোও না।
প্রিয় কন্যা আমার-
সেদিন মিরপুর যাওয়ার পথে আমাদের গাড়ি বাংলামটর সিগনালে থেমেছিলো। তখন তোমার মা আর পরী বলল চিপস খাবে। আমি গাড়ি থেকে নেমে চিপস কিনলাম দুটা। আর এক বোতল পানি। বাইরে গেলেই সুরভি যা দেখবে তার খেতে ইচ্ছা করবে। ফুচকা থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি। আমড়া থেকে শুরু করে জাম ভর্তা। সে খাবেই। যাই হোক, এই করোনার মধ্যেও, লকোডাউনের মধ্যে লম্বা সিগনাল পড়েছে। আমি তোমাকে কোলে নিয়ে সামনে বসে আছি। তখন একজন হকার এলো। শিশুদের বই নিয়ে। সুরভি বলল, ফাইহার জন্য বই কিনো। যদিও বই পড়ার বয়স তোমার হয় নাই। আমি তোমার জন্য বই কিনলাম- পাঁচটা। এটাই তোমার জন্য কেনা প্রথম বই। রঙ্গিন ছবিসহ ফলের বই। বই গুলো তোমার হাতে দিলেই- সেই বই তুমি পড়ার বদলে মুখে দিয়ে খেতে চেষ্টা করো।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৩:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



