somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

ব্লগার শ্যাইয়ান ভাইয়ের সাথে সিলেট ভ্রমন

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক দেড় বছর আগে আমি আর শ্যাইয়ান ভাই গেলাম সিলেট।
মূলত শ্যাইয়ান ভাই সিলেট যাচ্ছিলেন তার গ্রামের বাড়ি কম্বল বিতরন করতে। আমি তার সাথে চলে গেলাম। আমার যাওয়ার কথা ছিলো না। শ্যাইয়ান ভাই কম্বল আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উনি ট্রেনে করে যাছিলেন। আমি যাবো শুনে উনি অনলাইনে একটা বাড়তি টিকেট কেটে নেন। আসলে শ্যাইয়ান ভাই স্লিপিংবাথ নিয়েছিলেন তার জন্য। আরাম করে শুয়ে বসে যাবেন। কিন্তু আমার জন্য উনি আরাম করে শুয়ে বসে যেতে পারলেন না। শেষমেষ দুটা চেয়ারকোচ আসনের ব্যবস্থা হয়। স্লিপিংবাথটা শূন্য গেলো। অবশ্য শ্যাইয়ান ভাই চেয়েছিলেন স্লিপিংবাথ এর টিকিট টা কাউকে দিয়ে দিবেন। যাইহোক, কমলাপুর থেকে আমি আর শ্যাইয়ান ভাই সিলেটের ট্রেনে উঠে পড়লাম। এর আগেও আমি সিলেটে বেশ কয়েকবার গিয়েছি।

শীতের রাত। আমার পকেটে কোনো টাকা নেই।
একটা এটিএম কার্ড আছে। কার্ডে টাকা আছে কিনা আমি জানি না। অবশ্য টাকা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমার সাথে আছেন শ্যাইয়ান ভাই। একজন মানবিক ও হৃদয়বান মানুষ। তার জীবনযাপন সহজ সরল সুন্দর। কোনো অহংকার নেই। তার মতো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। এর অনেকদিন আগে একবার শ্যাইয়ান ভাইয়ের সাথে ধানমন্ডির এক কপি শপে অনেক গল্প হয়েছিলো। যাইহোক, ট্রেন চলছে শাঁ শাঁ করে। আমি আর শ্যাইয়ান ভাই টুকটাক গল্প করছি। আমি শ্যাইয়ান ভাইকে বলেছিলাম, আপনি স্লিপিংবাথে চলে যান। আরাম করে ঘুমান। এখানে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। শ্যাইয়ান ভাই আমাকে একা ফেলে রেখে যাননি। বড় অদ্ভুত রকমের একজন ভালো মানুষ শ্যাইয়ান ভাই। আমাদের সামু ব্লগের অনেক ব্লগারকে শ্যাইয়ান ভাই 'কর্যে হাসনা'তে ঋণ দিয়েছেন। সেসব ঋণ ব্লগারগন পরিশোধ করেছেন কিনা আমার জানা নেই।

বড় বড় স্টেশনে ট্রেন থামছে পাচ দশ মিনিটের জন্য।
আমি স্টেশনে নেমে লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছি। শ্যাইয়ান ভাই সিগারেট খান না। যাইহোক, শ্যাইয়ান ভাই ট্রেনের ক্যান্টিন থেকে কিছু খাবার কিনলেন। ট্রেনের খাবার কখনও ভালো হয় না। মধ্যরাতে আমরা ট্রেন থেকে নামলাম। তারপর সিএনজি করে হোটেলে গেলাম। হোটেল শ্যাইয়ান ভাই আগেই বুকিং করে রেখেছিলেন। হোটেলের রুমটা সুন্দর। পাশাপাশি দুটা খাট। ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম, শ্যাইয়ান ভাইকে 'গুড নাইট' বলে। সুন্দর ঘুম হলো। ঘুম থেকে উঠে দেখি শ্যাইয়ান ভাই রেডি হয়ে বসে আছেন। আমিও চটপট রেডি হয়ে গেলাম। অত্র অঞ্চলের নামকরা এক রেস্টুরেন্টে নাস্তা করলাম। পরোটা গরুর মাংস। শেষে চা। খাবারটা ভালো ছিলো। তারপর চললাম, শ্যাইয়ান ভাইদের গ্রামের বাড়ি। সুন্দর গ্রাম। অনেক গাছপালা আছে। গ্রামের বাড়িটাও সুন্দর। শ্যাইয়ান ভাই তার চাচা চাচীদের কদমবুসি করলেন। শ্যাইয়ান ভাই মানুষকে ভালোবাসতে জানেন।

দুপুরে শ্যাইয়ান ভাইদের বাড়িতে গেলাম।
তার চাচা এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি। বিকেলে দরিদ্র ও অসহায় লোকদের মাঝে কম্বল বিতরন করা হলো। কোনো ঝামেলা হয়নি। সাজানো গোছানো অনুষ্ঠান। আমি ঘুরে ঘুরে চারপাশ সব দেখছি। খেয়াল করে শুনলাম, মাইকে আমার নামও বলল। ঢাকা থেকে আগত শ্যাইয়ানের বন্ধু রাজীব। রাজীব মস্ত বড় লেখক। যাইহোক, রাতের দিকে শ্যাইয়ান আমাকে নিয়ে গেলেন চাঁদের আলো দেখাতে। জোছনা রাত সবারই ভালো লাগে। রিকশা করে গেলাম অনেকখানি দূরে। নিরব রাস্তা, রাস্তার দুইদিকে অসংখ্য টিলা। রাবার বাগান। চারপাশে অন্ধকার। মাঝে মাঝে মেঘ সরে চারিদিক জোছনায় ভেসে যাচ্ছে। শ্যাইয়ান ভাই মুগ্ধ হয়ে চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। এত মুগ্ধ হয়ে কেউ কি চাঁদ দেখে? আমি শ্যাইয়ান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। বড় অদ্ভুত একজন মানুষ। চাঁদের আলোর জন্য পাগল ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এখন দেখছি শ্যাইয়ানও কম যান না।

রাতে খাওয়া দাওয়া করে, আমরা আবার চলে এলাম হোটেলে।
সকালে আমরা যাবো এক রিসোর্টে। শহর থেকে কিছুটা দূরে। রিসোর্ট টা একটা বিশাল টিলার উপরে। সম্পূর্ন কাঠের বাড়ি। বিশাল এলাকা জুড়ে এই রিসোর্ট। রিসোর্টের মালিক আবার শ্যাইয়ান ভাইয়ের বন্ধু। শ্যাইয়ান ভাই একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে নিলেন। যদিও বাস বা সিএনজি করেও যাওয়া যেতো। খরচ করতে শ্যাইয়ান ভাইয়ের জুড়ি নাই। যেখানে দশ টাকায় কাজ হয়, শ্যাইয়ান ভাই সেখানে এক হাজার টাকা খরচ করেন। যাইহোক, রিসোর্ট দেখে আমি মুগ্ধ। খুব সুন্দর রিসোর্ট। চারিদিকে অংখ্য গাছপালা আর পাখির ডাকাডাকি। রিসোর্টের ওয়াশরুম টা জাস্ট ফাইফ স্টার হোটেলের মতোন। জঙ্গলের মধ্যে এরকম ওয়াশরুম! জাস্ট ওয়াও। রিসোর্টের দায়িত্ব থাকা লোকটা আমাদের ভীষন রকমের খাতির যত্ন করেছেন। রিসোর্ট থেকে বাজার অনেক দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না। মাটির রাস্তা। তবু চা, গরম পরোটা ইত্যাদি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

শ্যাইয়ান ভাই আর আমি বিশাল এক ব্যলকনিতে বসে চা খেলাম।
সময় তখন মধ্যদুপুর। শীতকাল বলে রোদের তাপ নেই। চারিদিকে সুন্দর পরিবেশ। পাখির কিচিরমিচির অতি মনোরম লাগছিলো। দুপুরে শ্যাইয়ান ভাই ঘুম দিলেন। সুন্দর ঘুম। একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমালেন। আমি তাকে ডাক দেই নাই। আমার মা বলেছেন, কেউ আরাম করে ঘুমালে তাকে ডাক দিবি না। আমি একাএকা গাছপালা দেখলাম। পাখির গান শুনলাম। কাঠ বিড়ালি এদিক ওদিক ছোটাছুটি দেখলাম। রাতে রিসোর্টের কেয়ারটেকার আমাদের জন্য সেই রকম খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। একটা আস্তো মূরগী মশলাপাতি মাখিয়ে ফয়েল পেপারের দিয়ে মুড়ে দিয়ে কয়লার তাপ সিদ্ধ করতে থাকলেন। মূরগী খাওয়ার জন্য তৈরি হতে দুই ঘন্টা সময় লাগবে। আমি আর শ্যাইয়ান ভাই পুরো রিসোর্ট ঘুরে বেড়ালাম। শ্যাইয়ান ভাই অনেক গল্প করলেন। বিজ্ঞান, রাজনীতি, ধর্ম প্রায় সব বিষয়েই গল্প হলো। আসলে এক বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে অবধারিতভাবে অন্য অনেক বিষয় এসে যায়। এভাবে গল্পের মুল টপিক হারিয়ে যায় বা গুরুত্ব হারায়। আমাদের শ্যাইয়ান ভাই একবার সারারাত কবরস্থানে ছিলেন।

সিলেট থেকে আমরা ঢাকা ফিরলাম বিমানে করে।
মাত্র ২৫ মিনিট সময় লাগলো। বিমান বন্দরে শ্যাইয়ান ভাইয়ের পরিচিত লোক ছিলো। উনি আমাদের জন্য ভালো সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সব জাগাতেই শ্যাইয়ান ভাইয়ের পরিচিত লোক আছে। সিলেট থাকা অবস্থাতেই দেখেছি শ্যাইয়ান ভাই একটা টিলা কেনার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। সেই রাতেই বেশ কয়েক জাগায় ফোন করলেন। সিলেটে গিয়ে শ্যাইয়ান ভাইয়ের মুখে সিলেটি ভাষা শুনেছি। কি সুন্দর আঞ্চলিক ভাষা! যেমন, 'আপনে কিতা কইন আমি বুজিয়ার না' (আপনি কি বলেন আমি বুঝতে পারছি না)। 'আইওউবা আমরা ফাখাইয়া আই' যার অর্থ আসেন, আমরা বেড়িয়ে আসি। অথবা, 'চল, আমরা ঘুরে আসি'। ফাখাইয়া শব্দের অর্থ বেড়াতে যাওয়া কিংবা বেড়িয়ে আসা। সেটা কম সময়ের জন্য। এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায় যাওয়া।

বড় অদ্ভুত রকমের ভালো এবং সরল মানুষ শ্যাইয়ান ভাই।
রাস্তায় একটা পানির খালি বোতল পড়ে ছিলো। শ্যাইয়ান ভাইকে দেখলাম, সেই খালি বোতল তিনি কুড়িয়ে নিলেন। এবং যথাস্থানে ফেলে দিলেন। ট্রেনে এক অন্ধ গায়ক উঠেছেন। অন্ধ গায়ক গান গাইছেন। সিলেটের হাছন রাজার গান। 'মাটির পিঞ্জিরার মাঝে, বন্দি হইয়া রে, কান্দে হাসন রাজার মন-মুনিয়ায় রে'। চমৎকার গান। গান শুনে শ্যাইয়ান ভাই মুগ্ধ। অন্ধ গায়ক কে বকশিশ দিলেন। শ্যাইয়ান ভাই আমাকে বললেন, রাজীব ভাই আপনার প্রিয় গানের নাম বলুন। উনি গাইবেন। শ্যাইয়ান ভাইদের এলাকায় বেশ জনপ্রিয় একটা সিঙ্গাড়া পাওয়া যায়। সাতকরা সিঙ্গাড়া। সেই সিঙ্গারা খেলাম। ছোট ছোট সাইজ। সারা দিনই এই সিঙ্গারা বিক্রি হয়। দূর থেকে লোক এসে লোকজন এই সিঙ্গারা নিয়ে যায়। সব কিছু মিলিয়ে সিলেট ভ্রমনটা সুন্দর ছিলো। ধন্যবাদ শ্যাইয়ান ভাইকে। বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১:০২
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

লিখেছেন নতুন নকিব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:০৪

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

ইয়াতিমদের সাথে ইফতার অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, ছবি https://www.risingbd.com/ থেকে সংগৃহিত।

তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রীও তিনি। তাকেই তার বৈধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বছরশেষের ভাবনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৪৮


এসএসসি পাস করে তখন একাদশ শ্রেণিতে উঠেছি। সেই সময়ে, এখন গাজায় যেমন ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন বসনিয়া নামে ইউরোপের ছোট একটা দেশে এরকম এক গণহত্যা চলছিল। গাজার গণহত্যার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উৎসর্গ : জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৫:৩৮



খিচুড়ি

হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে—“বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে উপদেশ গ্রহণের জন্য আল্লাহ কোরআন সহজ করে দিলেও মুসলমান মতভেদে লিপ্ত হয় কোন কারণে?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:৫২



সূরাঃ ৫৪, কামার ১৭ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৭। কোরআন আমরা সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?

সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালেদা জিয়ার জানাজা

লিখেছেন অপু তানভীর, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৩৯

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার নানীর বোন মারা যান। নানীর বোন তখন নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। সেইবারই আমি প্রথম কোনো মৃতদেহ সরাসরি দেখেছিলাম। রাতের বেলা যখন লাশ নিয়ে গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×