এই রকম সিনেমাগুলাকে কি বলে আমি জানিনা, বোদ্ধারা হয়তো বলতে পার বেন।সিন্ড্রেলাম্যানে যেমন আমেরিকার গ্রেট ডীপ্রেশনের ঘটনা একটা পরিবারের মধ্যদিয়ে ফুটে ওঠে, তেমনি আজ দেখলাম চাইনিজ ছবি “জ্যং ইমু” , ইংরেজিতে “টু লিভ” নামের মুভি।১৯৯৪ সালের এই সিনেমাটিতে চীনা সমাজের আর্থ-সামাজিক আর রাজনৈতিক প্রক্ষাপট (১৯৪০ দশক থেকে ৮০ পর্যন্ত), একটা পরিবারের বেচে থাকার সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে।পরিবারটি ফুগুয়ে নামক এক লোকের। মা, বাবা, স্ত্রী আর ২ সন্তান সহ তার পরিবার।
ফুগুয়ে অসম্ভব জুয়াড়ী, সিনেমার প্রথমে দেখানো হয় জুয়া খেলে তার নিঃস্ব হবার ঘটনা । জুয়া (গ্যম্বেল) খেলে বাপের ভিটা -বাড়ী সবই খোয়ায় সে, এমন কি পিতাকেও। তার পিতা বাড়ী হারানোর কষ্ট সহ্য করতে পারেনা, বাড়ি হস্তান্তরের দিন মারা যায়। ফুগুয়ের স্ট্যাটাস তখন ল্যন্ডলর্ড (বাড়িওয়ালা) থেকে আর্ডিনারী টাউন্স পিপল (সাধারন শহরের বাসিন্দা) শ্রেনীতে পরিনত হয়।এতে এক দিক দিয়ে তার লাভ হয়, কারন পরবর্তীতে যার কাছে সে বাড়ি খোয়ায় (লঙ্গার ), সে ক্যপিটালিস্ট সভাবের কারনে পাবলিক ট্রায়ালে পড়ে,জনসম্মুখে ৫ টা গুলি খেয়ে মারা যায়।( কারন তখন চাইনিজ সমাজে সোসালিস্টদের জয় জয়কার ),বড়লোকদের (ক্যপিটালিস্ট ঘরানার) চরম দুঃসময়।
লঙ্গারের মৃত্যুর আগে, একবার, ফুগুয়ে তার কাছে টাকা ধার করতে গেলে, সে তাকে একটা বাক্স দেয় , পাপেট শোর। পুতুল সহ বাক্সটি দিয়ে সে বলে , তুমি নিজে কামাই করে খাউ। তখন এইটা নিয়ে ফুগুয়ে বিভিন্ন যায়গায় শো করতে থাকে। ১৯৪৯ এ, হঠাত সিভিল ওয়ার শুরু হয়।পাপেট শো দেখানোর সময় যুদ্ধে সে আর তার সাথি (চান্সেন) সৈন্যদের হাতে আটক পড়ে। যাদের কাছে আটক পড়ে তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়। ফুগুয়ে আর তার বন্ধুই শুধু জীবিত থাকে । পর্বতীতে পালাবার সময় রেড আর্মিরা আটক করে তাদের, কিন্তু পাপেট শো দেখিয়ে তারা রেড আর্মির মন জয় করে আর তাদের অংশ হয়ে যায়। পরর্বতীতে ফুগুয়ে যোদ্ধার সনদ সহ ফিরে বাড়ি ফিরে আসে, আর চান্সেন রেড আর্মির ড্রাইভারের চাকরি পেয়ে থেকে যায় তাদের সাথে। ( দেশ তখন তাদের হাতে )।
অনেকদিন পর বাড়ি ফিরে ফুগুয়ে জানতে পারে তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তার মা মারা গেছে আর যে মেয়ে শেষ বার বিদায়ে বাবা ডাকতে পারত, সে এবার কিছুই বলতে পারেনা। জরের করনে মেয়ে কালা ও বোবা হয়ে গেছে। ফুগুয়ে সংসার গুছাতে থাকে। চীনে তখন রিভোলিউশন চলছে। তারা সবাই জাতি হিসাবে উপরে উঠতে থাকার কাজে ব্যাস্ত। ঠিক ১৯৫৬ সালের কথা, সবাই মিলে কাজ করে, কার্মস্থলেই ঘুমিয়ে পড়ে আর কমুনাল রান্নাঘরে তাদের খাবার দেয়া হয়। চীনারা এই বলে মনবল বাড়াই যে, ১৫ বছর এমন কাজ করলে তারা আমেরিকাকেও টপকে যাবে।একদিন ফুগুয়ে ছেলেকে কাজে দিয়ে আসে, সন্ধায় সবাদ আসে যে তার ছেলে মারা গেছে,তার ছেলের কর্মস্থলের দেয়ালের চাপা পড়ে। দেয়ালটি একটা গাড়ির ধাক্কায় তার ছেলের উপর পড়ে, পরে জানা গেল গড়ির মালিক ডীস্ট্রিক মেয়র, যেকিনা সেই ফুগুয়ের বন্ধু, চান্সেন। যাকে সাথে করে সে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে (সিভিল যুদ্ধের দিনগুলো) নিজ পরিবারকে ফিরে পেয়েছে। সমাধিস্থলে, ফুগুয়ের স্ত্রী যখন চান্সেনকে বলে “তোমার কাছে আমরা একটা জীবন পাই” (উই ও ইউ আ লাইফ) , সে অনেক আনুশোচনায় পড়ে যায়। পরবর্তিতে এক পর্যায়ে সে তার সমস্ত সম্পত্তি ফুগুয়ের নামে দিতে আসে, প্রয়শ্চিত্য হিসাবে।
দেখতে দেখতে ১৯৬৬ সাল চলে আসে। প্রয় ১০ বছরের প্রলেতারিয়াত রিভোলিউশন চলে চীনাতে।যে রিভোলিউশনের ছোয়া থেকে তখনকার একটা পরিবারও মুক্তি পাইনি। চেয়ারমেন মাউ তখন জাতিয় হিরো। ফুগুয়ের মেয়ে বড় হয়েছে, তার বিয়ের কথাবার্তা হতে থাকে। ছেলে এক ওয়ারকার্স পার্টির কমরেড নেতা।যেহেতু মেয়ে ডিসেবল, তাই ডিসেবল পাত্রের খোজ আনা হয়। ছেলের পা খোড়া, ফ্যাক্টেরির কাজ করতে গিয়ে তার পা ভেঙ্গে গিয়েছিল (তবে সে প্রতি মাসে জরিমানা পায়),বিয়ের আগে ছেলে আসে মেয়ে দেখতে, কিন্তু কোন উত্তর না দিয়ে সে বেরিয়ে যায়। পরর্বতীতে একদিন দেখা যায়, সে এসে শশুর বাড়ীতে মাও সে তুং এর ছবি একছে আর ফুগুয়ের মেয়ে সাহায্য করছে। ছেলের ওয়ার্কার্স পার্টির লোকজন ছাদের টালি মেরামত করে দিয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব সেদিনই দিয়ে দেয় সে। আর পাকাপোক্ত হবার দিন ছেলে শশুর বাড়িতে চেয়ারমেন মাও এর ছবি আর আনেক বই উপহার হিসাবে পাঠায়। তারা বিয়েকরার পর মাও এর ছবির সামনে শপথ নেয়, মাথা নোয়ায়। অসাধারন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, যা মাওকে চীনারা দিয়েছিল, আর মাও পেয়েছিল তখনকার লোকেদের থেকে, তা ফুটে ওঠে।
সময় পেরিয়ে যায়, ফুগুয়ের মেয়ে এখন গর্ভবতী, তাকে হাসপাতালে আনা হয়ছে। ফুগুয়ের স্ত্রী তার মেয়েকে বিভিন্ন টেকনিক শিখিয়ে দেয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় হাসপাতালে অভিজ্ঞ ডাক্তারের অভাব।করন বয়স্ক ডাক্তার রা সরকার বিরোধী আন্দলোন করছিল (রিএক্সোনিস্ট), ফলে সরকার তাদের ছাটায় করে, জুনিয়রদের দায়িত্ব দিয়েছে। ফুগুয়ে আর তার স্ত্রীর অনুরোধে, তাদের জামাই এক বয়স্ক প্রফেসর ডাক্তার ধরে আনে। কিন্তু ৩ দিন যাবত খেতে না পারায় , সে মিটিয়ে গিয়েছে । দ্রুত ফুগুয়ে দোকান থেকে ৭ টা বান রুটি কিনে আনে। ক্ষুদার্থ ডাক্তার এক সাথে ৭ টাই খেয়ে ফেলে।পানি ছাড়া রুটি গিলে ফেলায়, সে প্রয় বেহুশ হয়ে যায়। দ্রুত পানি খাইয়িয়ে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করে ফুগুয়ে আর বাকিরা সবাই।
এদিকে ফুগুয়ের স্ত্রীর চিন্তা হতে থাকে তার মেয়ের সম্ভাব্য সন্তান নিয়ে। সে তার মেয়ের মত বোবা, কালা অথবা জামাইয়ের মত খোড়া হবে নাতো?? কি নাম রাখাবে তার? এসব কথা ভাবতে থাকে।তখন ফুগুয়ে প্রস্তাব করে “ লিটীল বান” নাম রাখার। কারন তাদের নাতির জন্য যে ডাক্তার আনা হয় সে বান খেয়ে বেহুশ হয়ে গেছে সেটা স্বরন করে রাখা যাবে ( এটা চীনা সংস্কৃতির একটা অংশ), সিনেমার প্রথমে ফুগুয়ে যখন জুয়া (গেম্বলিং) খেলতো, তখন তার স্থীর গর্ভে তার ছেলে। এমন সময় তার স্ত্রী তাকে একদিন ছেড়ে চলে যায়। বাচ্চা হবার পর যখন ফুগুয়ের কাছে ফিরে আসে, তখন ছেলের নাম জিজ্ঞাসা করলে তার স্ত্রী বলে , তার নাম “নো গ্যাম্বেল”, কারন তার ছেলে বাবার মত জুয়া খেলবে না। ফুগুয়ে মোটামুটি বিশ্বাস ও করে ফেলে স্ত্রীর কথা। পরে জানতে পারে যে, তার স্ত্রী মজা করেছে। কিন্তু নাতির বেলায় এটা মজা না, আসলেই তার নাতি হয়। আর নাম রাখা হয় “ লিটিল বান”। ৭.৯ পাউন্ডের ছেলে হয় ফুগুয়ের মেয়ের। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ব্লিডিং বেড়ে যাওয়াতে তার মেয়েকে অনভিজ্ঞ ডাক্তার রা বাচাতে পারেনা।
সিনেমার একদম শেষে দেখানো হয়, ফুগুয়ে স্ত্রী, নাতি, আর জামাই মিলে তার মেয়ের কবরের কাছে যায়। সেখানে লিটিল বানের ফ্রেমে বাধানো একটা ছবি (৬ ষ্ট নাম্বার ছবি) রেখে আসে। কারন ফুগুয়ের স্ত্রী তার মেয় যখন গর্ভবতী, তখন বলেছিল যে, আমরা তো তোমার ছোটবেলায় ছবি তুলতে পারিনি, তুমি যেন এই ভুল করবে না। তোমার সন্তান হলে প্রতি বছর ছবি তুলবে। আজ ফুগুয়ের মেয়ে নেই, কিন্তু মেয়েকে দেয়া সেই কথা আজ ঠিকই তারা পুরন করছে…
ছবিতে মজার আর হাস্যকর কিছু যায়গা আছে, কিছু সংলাপও আছে। (চীনা ভাষা,আর ইংরেজী সাবটাইটেল দিয়ে হয়ত সব বোঝা মুশকিল), যেমন ঠিক শেষের দিকে যখন তারা কবরের কাছে বসা, তখন ফুগুয়ে স্ত্রীকে বলতে থাকে, “যদি ওই বয়স্ক প্রফেসর ডাক্তার কে বান রুটি না খেতে দিতাম, আমাদের মেয়েটা আজ আমাদের সাথে থাকত। একটা রুটি খেয়ে পানি খেলে , পেট ৭ টা রুটি খেলে যত ফোলে, তেমন ফুলে যায়। আর সে ডাক্তারতো ৭ টা রুটি খেয়ে পানি খেল, তার পেট নিশ্চয়ই ৪৯ টা রুটীর মত ফুলেছে তাই না?
(বিঃদ্র , ছবিটা দেখে ভাল লাগায় ছোট্ট একটা রিভিউ করলাম।রিভিউ আগে কোনদিন করিনি। রিভিউ করার জন্য ঘাটাঘাটি বা কোন গুগুল করা হয়নি, সে জন্য দুঃখিত। আর চাইনিজ ইতিহাস , রাজনীতি নিয়ে কোন ধারনা নেই বলে ব্যক্ষাও করতে পারিন, সে জন্যও দুঃখিত। তবে হ্যা, সিনেমাটা দেখে, চীনাদের নিয়ে জানার প্রবল ইচ্ছা যেগেছে। আপনিও পারলে দেখে নিয়েন সিনেমাটা, দেখলে আরো মাজা পাবেন। কারন রিভিউতে কত % ই বা আসে????)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


