somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তমসাচ্ছন্ন বর্ণচ্ছটার নিউ ইয়ার

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তমসাচ্ছন্ন বর্ণচ্ছটার নিউ ইয়ার
------------------------- রমিত আজাদ

: তোমার অংকটি সঠিক হয়নি।

মোটামুটি কঠিন স্বরে কথাটি বললেন ইলেক্ট্রনিক্সের শিক্ষক এফিমচিক। এফিমচিক স্যারের আসল নাম নয়, আমাদের দেয়া নাম। প্রথম ক্লাসে স্যার আমাদের প্রথম যেই বইটির রেফারেন্স দিয়েছিলেন তার লেখকের নাম ছিলো এফিমচিক। আমরা স্যারকে ঐ নামেই ডাকতে শুরু করলাম। প্রথম ক্লাসে স্যারকে মৃদু-মোলায়েম স্বরে কথা বলতে দেখে আমাদের ধারনা হয়েছিলো স্যার খুব নরম-সরম মানুষ, উনার পরীক্ষা পাহাড়ী ছড়ার মত ছলছল করে পেরিয়ে যাবো। কিন্তু আজ পরীক্ষা দিতে এসে আর এমনটি মনে হলো না। সকাল থেকেই তিনি কঠিন রূপ ধরে বসে আছেন। রিটেন পরীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো পেলাম তাও খুব জম্পেশ টাইপের। মনে হচ্ছে আমার মেধাবী দাদাও ঐ প্রশ্ন পেয়ে ভড়কে যেতেন! কোনরকমে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলাম, বাকীগুলোর উত্তর কি হবে তাই ভেবে কুল কিনারা পাওয়ার চেষ্টা করছি। আবার আবদুল আলীমের একটা গান মনে পড়লো - 'সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে সুধাই, বল আমারে তোর যে কি আর কুল কিনারা নাই?' পদ্মা নদীর মাঝেই বোধহয় স্যার আজ আমাদের ফেললেন।

এদেশের পরীক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী রিটেনের পরে ভাইভা। যা লিখেছে তা স্যারকে গিয়ে বোঝাও। আন্দিগুন্দি মুখস্থ করে লিখলে কোন কাজ হবে না, একেবারে লবডঙ্কা! তার উপর স্যারের উপরি প্রশ্নের বোঝা তো আছেই! আমি একা নই, যা বুঝলাম ক্লাসের সবারই জবুথবু অবস্থা। শেয়ার বাজারের ক্লায়েন্টের মত একটু অপেক্ষা করলাম, দেখি কি হয়। আগে ডাকা-বুকা স্টুডেন্টরা ভাইভা ফেস করুক তারপর সুযোগ বুঝে আমি যাবো। এগিয়ে গেলো দিমা, ভালো ছাত্র হিসাবে নাম আছে তার। স্যার বললেন, "দিমা, তুমি তো এক্সিলেন্ট গ্রেড পাওয়ার স্টুডেন্ট, কিন্তু পরীক্ষা তো সেরকম হয়নি। এই অংকটা পুরোপুরি সঠিক নয়। সময় দিলাম অংকটা ঠিক করো, পারলে এক্সিলেন্ট গ্রেড দেবো।" দিমা কিছুক্ষণ কেরামতি করার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়ে স্যারকে বললো, "স্যার হচ্ছেনা।" স্যার বললেন, "হচ্ছেনা বললে শুনবো না। তোমাকে চেষ্টা করতে হবে, আমি মনে করি তুমি সাহস হারিয়ে ব্যার্থ হচ্ছো। সাহস করে আগাও, আশা করি সলভ করতে পারবে।" দুর্দান্ত কথা, স্যার যেন আমাদের মনের ভিতরে প্রবেশ করে, মনের বই খুলে, মনের সব লেখা পড়ে নিচ্ছেন। আসলেই তো, আমরা অনেক সময় সাহস হারিয়ে চেষ্টা থেকে বিরত থাকি। আমি আমার প্রশ্নটি নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম। আরও কিছুক্ষণ কলম দিয়ে খাতায় গুতাগাতি করে দিমা স্যারকে গিয়ে বললো, "স্যার আমার এক্সিলেন্ট গ্রেড লাগবে না, যা খুশি দেন। আমি বাড়ী যাই।" স্যার আরো কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন, তারপর শীতল কন্ঠে বললেন, "আমি বুঝি, আজ থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বর, তোমরা নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের চিন্তায় বিভোর। এখন দুপুর বারোটা, রাত বারোটা হতে আরো বারো ঘন্টা বাকী। নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের চিন্তাটা আপাততঃ শিকেয় তুলে রাখো। এই মুহুর্তে তোমার কর্তব্য ভালোভাবে পরীক্ষা দেয়া, এখনকার কর্তব্য পালন করো।" মনে হলো নীতিবান কোন সেইন্ট তার শিষ্যকে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে শোনাচ্ছেন। স্যারের এই আচরণে আমরা আর পুরো সেমিস্টারের, সেই নরম-সরম, হাসি-খুশি মানুষটাকে খুঁজে পেলাম না। দায়িত্ববোধ মানুষকে এতটা বদলে দেয়!

আরো কিছুক্ষণ চেষ্টার পর দিমা হয়তো কিছু পারলো। স্যার ওকে একটি গ্রেড দিলেন। ভালো-মন্দ কিছু বুঝলাম না। দিমা এম্নিতেই কম আবেগ প্রকাশের লোক। শেয়ার মার্কেটের ক্লায়েন্টের মতো পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহনমুলক মনোভাব নিয়ে আমি তখনো বসে আছি। ক্লাসে অনেক ছাত্র-ছাত্রী বসা। বেশীরভাগই সুন্দর পোষাক-আষাক পরে এসেছে। বিশেষত মেয়েরা বেশ সাজগোজ করেছে। আজ থার্টিফার্স্ট নাইট কাল পয়েলা জানুয়ারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে নিউ ইয়ারের প্রাক্কালে দেখা, একে অপরকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাবে তাই। সারা বিশ্ববিদ্যালয়েই একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ। এই উৎসবমুখর পরিবেশে স্যার আমাদের ভালো মুসিবতে ফেলেছেন! আরো কয়েকজন স্যারের ভাইভা ফেস করলো, সবারই জবুথবু অবস্থা। বুঝলাম এই মার্কেটের আপ-ডাউন নাই। স্যার একই গতিতে চলবেন। তাহলে আর কি? বিপদের সময় সকলেই যা করে, আমিও তাই করলাম, সৃষ্টিকর্তার করুনা ভিক্ষা করে স্যারের দিকে অগ্রসর হলাম। স্যার তখন ঐ কঠিন কথাটি বললেন, " তোমার অংকটি সঠিক হয়নি।"

আমি: জ্বী তাই মনে হচ্ছে।
স্যার: তাই মনে হলে চলবে না। অংকটি কারেকশন করতে হবে।
আমি: জ্বী, আমি বোধহয় পারবো না।
স্যার: সমস্যাটা ঠিক ওখানেই। সাহসের অভাব।
(আমি বুঝে গেলাম স্যার কি বলতে চাইছেন। তাড়াতাড়ি বললাম )
আমি: ওকে ওকে। আমি চেষ্টা করছি।
তারপর নিজের সিটে গিয়ে বসলাম। দেখি কতদূর আগাতে পারি। অনেকক্ষন বসে বসে চেষ্টা করলাম। ইলেকট্রনিক্সের বিশাল অংকটির সমাধান করতে। বড় জম্পেশ অংক! ভয় না করে মস্তিষ্ক ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কত সময় পার হয়েছে বুঝলাম না। কিছুটা এগুতে পেরেছি মনে হলো। আশে পাশে তাকিয়ে দেখলাম অনেকেই নেই, মানে পরীক্ষা দিয়ে চলে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম দুঘন্টা পেরিয়ে গেছে! ওরেব্বাস! স্যারের দিকে এগুলোম।

স্যার: পেরেছো?
আমি: জ্বী, কিছুদূর গিয়েছি।
স্যার: দেখি কতদূর গেলে?
কাগজটা হাতে নিয়ে মনযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টি শীতল না উষ্ণ বুঝলাম না। মনে মনে ভয় হতে লাগলো।

স্যার: কিছুদূর এগিয়েছ, কিন্তু কমপ্লিট হয়নি। আবার বসো। আরো চেষ্টা করো। অংকটি করতেই হবে।

কি আর করা। গুরুর আদেশ শিরোধার্য্য। আবার কাগজ-কলম নিয়ে মগজের খেলা খেলতে বসলাম। কখনো অংকে ডুবে যাই, আবার কখনো জাগরনে ফিরে আসি। যতবার ফিরে আসি, ততবার আমার চতুর্দিকে জনসংখ্যা কমতে দেখি। আজকে থার্টি ফার্স্ট নাইট। বাংলাদেশে দিনটা সাদামাটাভাবে কাটিয়েছিলাম, কিন্তু এদেশে তো এটা ঈদের দিন! এই দিনে আমাকে মাটি চষার মত কলম চষতে হচ্ছে! আকসানা অপেক্ষা করবে। ও ডরমিটরিতে থাকেনা, থাকে শহরে। কিন্তু এবার ও নিউ ইয়ার ডরমিটরিতে সেলিব্রেট করবে জানিয়েছে। আমাকে ওর জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে। এই প্রথম কোন মেয়ে আমার কাছে এমন ইচ্ছা প্রকাশ করলো। আমার মন অবশ্যই খুশিতে নেচে উঠেছে। গত পরশু দিন ও এই সিদ্ধান্ত আমাকে জানায়। তখন থেকেই নানা জল্পনা-কল্পনা আমার মাথায়। কি করে ওকে হ্যাপী করা যায় বারবার শুধু সেটাই ভেবেছি। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতে হবে। জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে সেই মেন্যু ঠিক করেছি গতকাল। যা যা করবো তার মধ্যে রেখেছি কাবাব, পুডিং, অলিভিয়া সালাদ; এগুলো ওর পছন্দ হবে বিশ্চয়ই। সেই অনুযায়ী কেনাকাটাও করেছি কাল। কিন্তু রান্না তো এখনো হয়নি! পরিকল্পনা ছিলো পরীক্ষা শেষে গিয়ে রান্না শুরু করবো। রাত বারোটার আগেই রান্না কমপ্লিট হয়ে যাবে। এখন তো দেখছি মহা মুসিবতে পড়েছি!

গত পরশু দিন ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে নিউ ইয়ার উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠান ছিলো। আকসানা আমাকে ওখানে নিয়ে যায়। অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে ও একসময় আলতো করে আমার কাধে এলিয়ে দেয় ওর মাথাটি। এই প্রথম কোন মেয়ে আমার আমার কাধে মাথা এলিয়েছে। আমি কি ওর জন্য অনেক ভালো একটি নিউ ইয়ারের এ্যারেঞ্জমেন্ট করবো না?

স্যার তখনো স্টুডেন্টদের ভাইভা নিচ্ছেন আর গ্রেড যে অত সহজে পাওয়া যায়না তাই বুঝিয়ে দিচ্ছেন। হঠাৎ একটা বিষয় আমি লক্ষ্য করলাম - প্যালেস্টাইনের ইমাদ-কে দেখছি না! কি হলো ছেলেটার? বেশ কিছুদিন যাবৎ ও যেন কেমন হয়ে গিয়েছে! ক্লাস করে না, পরীক্ষায়ও আসেনা। শুধু করিডোরে ঘুরে বেড়ায়। বিষয়টি নিয়ে জোরেসোরে ওকে কোন প্রশ্ন করতে চাইনি। অন্যদের কাছ থেকে যা জানার জেনেছি। বিশেষ করে সিরিয়ার রাফাত আমাকে বলেছে, "প্যালেস্টাইনের অবস্থা খুব খারাপ রে ভাই। আমি নিজেও তো প্যালেস্টাইনি, নিজ ভূম থেকে বিতাড়িত হয়েছি। আমার বাবা পুরো পরিবার নিয়ে সিরিয়ায় চলে আসেন। সেই থেকে সিরিয়ায় আছি। তাই কোনরকম ভালো আছি। আর যারা আসতে পারেনি তারা ওখানে খুবই কষ্ট করে। স্বাধীন দেশ না থাকলে যা হয় আরকি!" একবার খুব মৃদুভাবে ইমাদকে প্রশ্ন করেছিলাম, "ইমাদ তোমার সম্ভবত এখানে ভালো লাগছে না, তুমি কি দেশে ফিরে যেতে চাও?" উত্তরে ইমাদ হতাশ সুরে বলেছিলো, "কি হবে ফিরে গিয়ে? একই তো কথা।" খুব বিধেছিলো ওর এই কয়েকটি শব্দ। একজন গৃহহীন মানুষের কাছে পরের ঘর আর পথ একই। নিজেদের কথা মনে হলো, এই সেদিনওতো আমরা নিজ দেশে পরবাসী ছিলাম। আমার মাটিতে মাথা উঁচু করে চলতো ইংরেজ সাহেব-মেমরা, আর চাবকাতো সেই আমাদেরকেই। খাদ্যশস্যের ভান্ডারভূমিতে পাশবিক শক্তির বলে নীল চাষ করিয়ে একের পর এক দুর্ভিক্ষের অনুক্রম তৈরী করেছিলো তারা। মনে মনে হাজারটা ধন্যবাদ দিয়েছিলাম আমাদের বাপ-দাদাকে। বুকের পাটা ছিলো উনাদের, একবার ইংরেজ আরেকবার পাকিস্তানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন বলেই তো আজ আমরা মুক্ত নিশ্বাস নিতে পারছি। একটি পরিচয়, একটি পাসপোর্ট বহন করতে পারছি। হতে পারে আমার দেশটি দরিদ্র, তারপরেও তো আমাদের একটি দেশ আছে। ঐ যে একটা কবিতা আছে, 'পাঁকা হোক তবু ভাই পরেরই বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।' আর প্যালেস্টাইনিরা কেউ ভীন দেশে প্রবাসী হয়ে আছে, আর কেউ নিজ দেশে পরবাসী হয়ে আছে!

আবার আমি আমাতে ফিরে এলাম। অংকটা শেষ করতে হবে। প্রিয়তমা আকসানাকে একটি সুন্দর নিউ ইয়ার উপহার দিতে হবে। আরো কিছুদূর কাজ করে মনে মনে হলো অংকটা গুছিয়ে এনেছি। কনফিডেন্স বেড়ে গেলো। আরো কিছু কাজ করে মনে হলো, এবার স্যারের কাছে যাওয়া যায়।

আমি: স্যার অংকটা মনে হয়।
স্যার: দেখি। (ভালোভাবে দেখে বললেন) না, কমপ্লিট হয়নি। এই দেখো, এই জায়গাটা খেয়াল করোনি। সিটে আর যেতে হবে না। আমার সামনে বসেই বাকিটুকু সলভ করো।
আমি গুরুগৃহের সুবোধ বালকের বসে বাকি কাজটি করতে থাকলাম। এদিকে আরো কয়েকজন পরীক্ষা দিয়ে চলে গেলো। একসময় আমি অংকটি কমপ্লিট করলাম। আমার আত্মবিশ্বাস অনেকখানি বেড়ে গেলো।
আমি: স্যার, এবার কমপ্লিট।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, আর কেউ রুমে নেই। শুধু আমি আর স্যার। স্যার কাগজটি হাতে নিলেন। এবার আর অত খুটিয়ে দেখলেন না। একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে, একটা মিষ্টি হাসি হাসলেন। ওমা এইতো আমার পরিচিত স্যার! সেই কোমল মানুষ, সেই সরল-মিষ্টি হাসি! এবার আমিও মিষ্টি হাসলাম।

স্যার: কি বুঝলে? সাহসের অভাব। সাহসের অভাবে এগুতে ভয় পাও। দেখোতো নিজেই কেমন কঠিন অংকটি সমাধান করে ফেললে। যাও তোমাকে ভালো একটি গ্রেড দিলাম।

বুঝলাম, একেই বলে প্রকৃত শিক্ষক। এক জায়গায় পড়েছিলাম, ' ভালো শিক্ষক তিনিই যিনি ছাত্রকে শেখাতে পারেন হাউ টু লার্ন।' এই পরীক্ষার ঘটনা আমার জীবনে একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।

প্রাচীন প্রাসাদের চাইতেও বিশাল বিশতলা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনটি থেকে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম, তখন আর দিনের আলো নেই। সন্ধ্যা নেমেছে ইউক্রেনের এই প্রাচীন শহরটিতে। মেঘে ঢাকা চন্দ্রহীন কালো আকাশের পটভূমিতে অঝোরে বরফ ঝরছে বেশ। কৃত্রিম বিজলির আলোয় চিকচিক করছে সেই তুষারদানাগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডরমিটিরি পাঁচ কিলোমিটারের পথ। শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো আছে তবে এই লাইনে মেট্রো নেই, কাজ চলছে। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে বলা যায়না, অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার পর সব কাজই খুব স্লো হয়ে গিয়েছে। এম্নিতে বাসে চেপেই যাই। বুঝলাম থার্টি ফার্স্ট নাইটের ব্যস্ততায় এখন বাসে সিট পাওয়া যাবেনা। আমি হাটা পথে ডরমিটরির দিকে রওয়ানা হলাম।

এখানে এই রাতটি খুব ঘটনাবহুল হয়। অনেকের জীবনেই স্মরণীয় ঘটনা আছে এই রাত্রিতে। কেউ পেয়েছে নতুন বন্ধু, কারো কারো গাঢ় বন্ধুত্ব হয়েছে কারো সাথে। কেউ পেয়েছে নতুন ব্যবসার পার্টনার। কারো হয়তো প্রেমিকার সাথে এই রাতেই হয়েছে প্রথম অভিসার অথবা প্রথম ফিজিকাল ইন্টিমেসি। আরো কত কি! এই থার্টি ফার্স্ট নাইট নিয়ে সিনেমাও হয়েছে ভুরি ভুরি। এই রাতটিকে দুঃখ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে ইউরোপীয়রা। সবাই মিলে প্রানান্ত রাতটি যেন হয় সুখের ঢেউয়ে দোলা।

আবার ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে এটা একটা উন্মত্ততার রাত্রী। গ্রীক পৌরাণিক পৌত্তলিক যুগের দেব-দেবীদের মত হাস্যরস, মদ্যপান ও ব্যভিচারে মত্ত হয়ে ওঠে প্রায় সবাই। মহাজ্ঞানী সক্রেটিস প্যান্থিয়নে বিশ্বাসী ছিলেন না, আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি একেশ্বরবাদের কথা বলেছিলেন। আর তার শিষ্য প্লেটো এইসব মত্ত দেব-দেবীদের ধারণা পাল্টে গম্ভীর মঙ্গলময় এক ইশ্বরের ধারনা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় খ্রীষ্টধর্মের প্রভাবে মত্ততার অনেকটাই বিলোপ হয়েছিলো, কিন্তু আঠারো শতকের পর তা আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে। এখন তো ব্যাক্তি স্বাধীনতার নামে চলছে অবাধ যৌনাচার, আরও কত কি!

আমি ডরমিটরিতে ঢুকেই রান্নার তোড়জোড় শুরু করলাম। টেবিলে যেন কোন ত্রুটি না থাকে। আজ যে আকসানা আসবে! গতকাল ও আমাকে দেখিয়েছে ওর নতুন জামা যেটা পড়ে ও নিউ ইয়ার সেলিব্রেট করবে। সংক্ষিপ্ত ঢংয়ের জামাটি আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা ওকে বলিনি। বললে ও মন খারাপ করবে যে! যেটা করেছি সেটা হলো মাসখানেক আগে আমার বাড়ী থেকে পাঠানো টাকার একটা অংশ থেকে ওর জন্য একটা চমৎকার জামা কিনেছি। ঠিক যখন বারোটার ঘন্টা বেজে নতুন বছর শুরু হবে, ওর হাতে তুলে দেবো আমার উপহার। আমি দেখতে চাই, ওর মন কেমন খুশীতে দুলে ওঠে।

রাত এগারোটা বাজে। আমার টেবিল রেডী। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি মজার মজার খাবার দিয়ে ভরে সুন্দর টেবিল সাজাতে। একপাশে ফুলদানীতে কিছু ফুল রেখেছি। একবার মা বলেছিলেন, মেয়েরা ফুল খুব পছন্দ করে। আমার কর্মজীবি মা তার উপার্জন থেকে প্রায়ই আমাকে টাকা পাঠান। পুলিশে চাকুরী করেন মা। আমি ছোটবেলায় বিস্মিত হয়ে দেখতাম ইউনিফর্ম পরিহিতা নারীর হাতে হাতিয়ার। মনে মনে গর্ব অনুভব করতাম আমার সাহসী মাতার জন্য। পুলিশের মন কঠোর হওয়ার কথা, অথচ আমার মা আমার সাথে কেমন কোমল! হতেই হবে, মায়ের মন যে! মা চিঠিতে লেখেন, "বাবা কষ্ট করবি না কিন্তু, তুই মন খুলে খরচ কর।" আমার নীতিবান বাবা মার টাকার একটু অংশও নেন না। বলেন, "ধর্মে আছে সংসার চালানোর পুরো দায়িত্ব স্বামীর। তাই তোমার টাকা তোমার কাছেই থাক, তুমি সেটা নিজ মনে খরচ করো।" বাবার পাঠানো টাকা আর মার পাঠানো টাকা আমি আলাদা করে রাখি। মার পাঠানো সেই টাকা থেকেই ফুল কিনেছি। জীবনের প্রথম বান্ধবীকে বরণ করবো ফুল লাগবে না! এমনও তো হতে পারে, আজ রাতে সে আমার প্রেমিকা হয়ে যাবে! ধুর ছাই আমি কত আকাশ-কুসুম ভাবছি, এদিকে রাত এগারোটা বেজে গেলো, আকসানার খবর নাই। মেজাজ খিচড়ে গেলো। ইচ্ছা হচ্ছে লাথি মেরে টেবিলটা ফেলে দেই। হঠাৎ ইউরি নিচায়েভ এলো। "কি ভাই এতো সব আয়োজন, কার জন্য?" ইউরির অবস্থা আমার মতই, কোন প্রেমিকা নাই। বললাম, "না মানে নিউ ইয়ার না? তাই একটু আয়োজন।"

ইউরি : তা ভাই নিচে তো বেশ ধুম-ধারাক্কা হবে মনে হয়।
আমি: কোথায়?
ইউরি: নিচে। হলে। ড্যান্স হবেনা!
আমি: ও।
ইউরি: তোমার মন খারাপ?
আমি: নাহ!
ইউরি: চলো করিডোরে দাড়াই।
আমি: করিডোরে দাড়িয়ে কি করবো?
ইউরি: বারে, অপরূপ সাজে সেঁজেছে মেয়েরা। ওদের দেখবো না?
আমার মেজাজ আরো সপ্তমে উঠলো। এর আগের নিউ ইয়ারগুলোতে তাই করেছিলাম, করিডোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের রূপ-সৌন্দর্য চোখের দেখায় উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু আজ আমার আকসানার আসার কথা। আর আমি করিডোরে দাঁড়িয়ে অন্য মেয়েদের দেখবো? যাহোক ইউরিকে এটা বুঝতে দিলাম না। এদেশে ছ্যাঁক খাওয়ার কনসেপ্ট খুব একটা নেই। তারপরেও লোকে জানতে পারলে গপ্পো হয়ে যাবে। তাই ওর সাথে রূমের বাইরে এসে করিডোরে দাঁড়ালাম।

আসলেই পরীর মত সাঁজে সব মেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নব্বই পারসেন্ট মেয়ের গায়েই স্বল্প পোষাক। এখানে এটাই রীতি, অনুষ্ঠান-উৎসব মানে মেয়েদের স্বল্প বসন। কোন রকমে নিতম্ব ঢাকা আটসাঁট মিনি স্কার্ট, ঊর্ধাঙ্গে লো-কাট টপস যাতে উরোজের উর্ধাংশের অনেকটাই অনাবৃত থাকে, তা নইলে সেমি-ট্রান্সপারেন্ট জামা যাতে কাঁচুলি দৃশ্যমান হয়। তারা মনে করে এভাবেই সৌন্দর্য্য বহিঃপ্রকাশিত হয়। সেই অর্ধ অনাবৃত গাত্রে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির বাণ যেন এক নীরব রূপ-স্তুতি! ডরমিটরি সাজানো হয়েছে রঙিন কাগজ, জরি আর বেলুনে, কোন কোন রুমে মিউজিক বাজছে, মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নপূরী। আমি গভীর দৃষ্টি নিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছি কখন আকসানা আসবে। পাশাপাশি বুক ধুকপুক করছে যদি ও না আসে। সিঁড়িতে মেয়েলী জুতার হিলের আওয়াজ যখনই পাই, মনে হয় এই বুঝি আকসানা এলো। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। এক একটা মিনিট মনে হয় যেন এক একটা মাস। অপেক্ষার সময় এত ধীরে বয় কেন? হঠাৎ এসে আমাকে সাৎ করে চুমু খেলো নাতাশা। আমি অনেকটাই চমকে গেলাম। মেয়েটি আমার দু বছরের জুনিয়র, এই হোস্টেলেই থাকে। একটু ফাজিল টাইপের। তবে এই ফাজলামোটা বেশি মনে হলো। বললাম, "কি ব্যাপার?" ও ভীষণ অবাক হয়ে বললো, "বারে, একটা তরুণী চুমু খেলো, আর তুমি খুশি না হয়ে বিরক্ত হলে? এটা নিউ ইয়ার না? তুমি তো ভীষণ বেরসিক" আমি তো আর তাকে বলতে পারিনা যে, আমি তার নয়, অন্য কারো চুম্বনের অপেক্ষা করছি। মনে মনে ও বিদায় হোক তাই চাইছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি এগারোটা পয়ত্রিশ বাজে, হঠাৎ গতকালের দেখানো সেই জামাটি পড়ে সিঁড়ি থেকে করিডোরে পা রাখলো আকসানা। আমি ছুটে গেলাম, ঠিক করিডোরের মাঝখানেই ও আমার গালে উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিয়ে বললো, "এস নাস্তুপাইউশিম (আসছে নিউ ইয়ারের শুভেচ্ছা)। সেই মুহুর্তে মনে হলো এতো খুশী কোনদিন হয়নি। বললাম চলো চলো রূমে চলো। ব্যাপার-স্যাপার দেখে সরে গেলো ইউরি ও নাতাশা। আমরা দুজন আমার রূমে প্রবেশ করলাম।

টেবিল দেখে আকসানা ভীষণ অবাক। "এতো কিছু তুমি করেছো আমার জন্য!" আমি বললাম, "আর কার জন্য করবো বলো?"
এবার ও গভীর দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। বললাম আরো সারপ্রাইজ আছে। "কি সারপ্রাইজ?" ও জানতে চাইলো। "সেটা বারোটার ঘন্টা বাজলে বলবো।" টেলিভীষণে তখন নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের প্রস্ততি দেখাচ্ছে। একটু পরে রাষ্ট্রপতি বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। সবাইকে নিউ ইয়ারের শুভেচ্ছা জানালেন। তার পরপরই বেজে উঠলো বারোটার ঘন্টা। প্রচন্ড চিৎকার হৈচৈ-এ মুখরিত হয়ে উঠলো চতুর্দিক। ঠাস ঠাস করে আতশবাজী ফুটছে সেই সাথে চলছে গান 'হ্যাপী নিউ ইয়ার! হ্যাপী নিউ ইয়ার! বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে ফায়ারওয়ার্ক দেখলাম ধুম ধুম করে বড় বড় বাজী ফুটে বর্নিল আলোচ্ছটায় সমগ্র আকাশটিকে ঝলমল করে তুলছে। জ্বলে জ্বলে উঠছে পড়ন্ত তুষারের কণাগুলো। আমি আকসানার হাতে তুলে দিলাম নিউ ইয়ারের উপহার। গিফট হাতে নিয়ে ও আবেগ আপ্লুত হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে অধরে অধর রেখে গভীর চুম্বন করলো। সেই মুহুর্তে মনে হলো এই পৃথিবীতে আমার চাইতে সুখী আর কেউ নেই।

আর সব তরুণীদের মত আকসানাও স্বল্প বসনাই ছিলো। ওর পরনে মিনি স্কার্ট না থাকলেও ছিলো আটসাট সিনথেটিক প্যান্ট যা ভেদ করে পুরো শরীরটাই ফুটে ওঠে। এতটাই টাইট প্যান্ট যে অন্তর্বাসের স্ট্রাইপ ফুটে উঠেছে। উর্ধাঙ্গে ঐদিনের দেখানো নীলাভ লো-কাট সেমি-ট্রান্সপারেন্ট জামাটি যা ভেদ করে দৃষ্টি অনায়াসেই আটকে যায় গোলাপী কাঁচুলির নকশায়। ওর গাঢ় আলিঙ্গনে আমার বুকে স্পষ্ট অনুভব করছিলাম ওর কোমল স্তনযুগলের প্রগাঢ় চাপ। ঘোর লেগে গেলো আমার। যৌনতা জেগে উঠছে কি? সেই মুহূর্তে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো যৌনতা ও প্রেমের মধ্যে সম্পর্ক কি? কোনটি আগে কোনটি পরে? যৌনতা থেকে প্রেম, নাকি প্রেম থেকে যৌনতা? আলাওল মধ্যযুগের কীর্তিমান বাঙালী কবি। উনার কাব্যে প্রেমের প্রাধান্য সেখানে তিনি দেহ ও মন দুটোরই গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রেম কি দেহাতীত হতে পারে? প্রাচ্য প্রেমে দেহের চাইতে মনের প্রাধান্য বেশী। আর পাশ্চাত্য প্রেমে মনের চাইতে দেহের প্রাধান্য বেশী। তাই হয়তো পাশ্চাত্যে বিচ্ছেদের আধিক্যও বেশী। দেহের চাহিদা ফুরিয়ে গেলে আর কোন আকর্ষণ থাকেনা। তাই বিচ্ছেদ হয়ে ওঠে অনিবার্য।

এই ক্ষণে আমি আর আকসানাকে নিয়ে দেহ-প্রেম প্রেম-দেহ ভাবনা আর ভাবতে চাইনা। ভাবতে চাই কেবল আমি-আকসানা আকসানা-আমি ভাবনা। আমরা খেতে বসলাম। কাবাব খেতে খেতে জানতে চাইলো আকসানা "আচ্ছা, তোমরা নিউ ইয়ার পালন করতো, তাই না?" "হ্যাঁ মানে না। মানে আমরা একটু ভিন্নভাবে আর কি।" আমতা আমতা করে বললাম আমি। "কি রকম?" আবার জানতে চাইলো আকসানা। বললাম, "বর্তমান বাংলাদেশে আমরা তিনটি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি - খ্রীষ্টাব্দ, হিজরী ও ফসলী সন, যার একটিও বাঙালীদের প্রবর্তিত নয়। খ্রীষ্টাব্দ-এর কথা তো তুমি জানোই। হিজরী সন ইসলামী চন্দ্র ক্যালেন্ডার। ফসলি সন নামে একটা ক্যালেন্ডারকে আমরা বাংলা সন বলে মেনে নিয়েছি, যদিও সেটার প্রচলন কোন বাঙালী করেনি। সেটার প্রশাসনিক প্রচলন করেছিলেন অবাঙালী সম্রাট আকবর ও তৈরী করেছিলেন অবাঙালী জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহউল্লাহ খান সিরাজী।"
"ও! তাহলে কোনটা সেলিব্রেট করো তোমরা?" আবারো জানতে চাইলো আকসানা। আমি বললাম, "অবাঙালী হলেও এই তিনটি ক্যালেন্ডারই এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। খ্রীষ্টাব্দ-এর সাথে আমাদের কর্মযোগ, হিজরী ক্যালেন্ডারর সাথে আমাদের আধ্যাত্মিকতার যোগ, আর ফসলি সন-এর সাথে আমাদের কৃষিকাজ ও হৃদয়ের যোগ। ফসলি সনটাকে আমরা বাংলা ক্যালেন্ডার মেনে নিয়ে ওটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে পালন করি।"

আকসানা: তোমাদের ডিশ বেশ মজার। আমি এই প্রথম ইন্ডিয়ান ডিশ ট্রাই করলাম।
আমি: এটা ইন্ডিয়ান না, বাঙালী ডিশ।
আকসানা: ইন্ডিয়ান বাঙালী আলাদা?
আমি: আলবৎ আলাদা।
আকসানা: আচ্ছা আজ থাক। আরেকদিন জানবো এ বিষয়ে।

"চলো ডিসকো-তে যাই। ড্যান্স করি।" আমাকে বললো আকসানা। আমিও বললাম, "চলো যাই।" রূম থেকে করিডোরে বেরিয়ে এলাম আমরা দুজন। ও আমার হাত ধরে আছে। এরকম আরো অনেক কাপল হাত ধরাধরি করে ডিসকোতে যাচ্ছে। অনেক ঝোড়া আবার খুবই ঘনিষ্ট অঙ্গে-অঙ্গ জড়িয়ে একেবারে মাখামাখি করে আছে। নিচের ড্যান্স হলে মিউজিকের শব্দ আরো চড়া হয়েছে, বাতাসে ঢেউ তুলেছে সুর আর ছন্দে। সেই ছন্দে দোলা লেগেছে তরুণ-তরুণীর বুকে। চারিদিকে প্রেম আর উচ্ছলতার বন্যা। আমি হঠাৎ লক্ষ্য করলাম করিডোরের শেষ মাথায় অাধো অন্ধকারে কে যেন একা দাঁড়িয়ে আছে। অবয়বটি আমার চেনা। আকসানাকে বললাম, "একটু অপেক্ষা করো।" তারপর এগিয়ে গেলাম সেইদিকে। কাছাকাছি এসে শুনলাম অবয়বটি একা একা কথা বলছে। আরো কাছে গিয়ে দেখলাম। প্যালেস্টাইনের ইমাদ দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে এখন সবাই খুশীর বন্যায় ভাসছে, সেখানে ওকে এমন একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেমন লাগলো। আমাকে দেখে ও ঘুরে দাঁড়ালো। আমি বললাম, "কি করছো, ইমাদ?" ও বললো, "না, কিছুনা। নিউ ইয়ার তো অদৃশ্যের সাথে কথা বলছিলাম।" আমি অবাক হলাম, " অদৃশ্যের সাথে কথা!" ইমাদ বললো, "মানে আমার বাবা-মা, ভাই-বোন ওদের সাথে। ওরা তো প্যালেস্টাইন নামক একটি পরাধীন দেশে আছে। সেখানে ওদের নিউ ইয়ার হয়না। আমিও তাই এখানে কিছু করিনা। একা একা ওদেরকে নিউ ইয়ারের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলাম।" বুকে এসে বিধলো কিছু অদৃশ্য তীর!

হাজারো আতশবাজীর অপূর্ব বর্ণচ্ছটার আকাশটির দিকে তাকিয়ে তখন আমার মনে হয়েছিলো, ঝলমলে ফায়ারওয়ার্কের পিছনের তমসাচ্ছন্ন ঐ কালো আকাশটির পটভূমিটিও সত্যি।

Dark Night of New Year
----- Dr. Ramit Azad


নিশ্চল বসন্ত এক গ্রাস করেছে বর্ণিল ভূবন,
চন্দ্রহীন নিশি ছেয়েছে তমসা স্বর্গলোকে,
নিশ্চুপ পর্বতরাজীর অবিরাম নিহারা নেত্রপাতে,
বিক্ষুদ্ধ ধরিত্রী বিস্মিত বিষাদে দেখে
শিশুর কাঁকুতি প্রেমহীন জনপদে,
খুঁজে ফেরে সদ্য নিহত পিতার অবয়বে,
কি জাগাবে সে? ঘৃণা না প্রেম?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৫:০৫
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিভ্রম

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪৪



ধর্মেশ্বর একজন চিকিৎসক। যথেষ্ট পরিমাণ পড়ালেখা করেছেন, দেশে ও প্রবাসে পড়ালেখা সহ ট্রেইনিং নিয়েছেন। তারপরও তিনি শহর ছেড়ে - জেলা শহর ছেড়ে অন্ধগ্রাম থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে আছেন। সম্ভব... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বে ঋণ খেলাপিতে বাংলাদেশ ১ নম্বর এবং দেশে ঋণ খেলাপিতে শীর্ষ ২০ জনের ১৯ জনই ওনাদের!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



শাস্ত্রীয় কথায় না গিয়ে সোজা কথায় কেউ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করলে তাকে ঋণ খেলাপি বলা হয়। আপনি জানলে অবাক হবেন যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির ১৯ জনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কি ডার্ক জাস্টিসকে ফলো করছেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১০



ছোটবেলায় দেখা একটি টিভি সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো। একজন বিচারক যিনি দিনের বেলায় কোর্ট রুমে অপরাধের বিচার করতেন, আর, রাতেরবেলা আইনের ফাঁক -ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

একদিন আমরা ক’জনা মিলে …….

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১২



ব্লগের একাধারে নম্র ও প্রাজ্ঞ এবং গবেষক সহ-ব্লগার শ্রদ্ধেয় ডঃ এম এ আলীর “ব্লগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত আবেদন”... ...বাকিটুকু পড়ুন

×