সিলেবাসে নেই কারিগরি বিদ্যার কোন বিষয়, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি শিক্ষার ছিটেফোঁটাও নেই। সিলেবাসের কোথাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি কারিগরি বিদ্যার কোন বিষয়। প্রযুক্তি শিক্ষা ছাড়াই কোর্স শেষে দেয়া হচ্ছে ‘হেলথ টেকনোলজি’র সনদ। অথচ কোর্সের শিরোনাম রাখা হয়েছে বিএসসি ইন হেলথ টেকনোলজি (ডেন্টাল)। কিন্তু কারিকুলাম প্রণয়নে কোর্সের কোথাও শিরোনামের সঙ্গে সংশ্লি¬ষ্টতা রাখা হয়নি। পাঠ্যসূচির সর্বত্রই চিকিৎসা শাস্ত্রের আদ্যোপান্ত। হাতে-কলমে শেখানো হয় চিকিৎসা পদ্ধতি। ডেন্টাল চিকিৎসকরা যা শিখছেন, তাদেরও তাই শিখানো হচ্ছে। সিলেবাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোথাও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ক কিছুই নেই। ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জন-বিডিএসের ডেন্টিস্টরা যেমন ৪ বছর কোর্স সম্পন্ন করে ইন্টার্নশিপ করেন, তেমনি ‘হেলথ টেকনোলজি’র শিক্ষার্থীদেরও চার বছর কোর্স সম্পন্ন করে এক বছর ইন্টার্নশিপ করতে হয়। তবুও তারা পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেদের ডেন্টিস্ট বলতে পারেন না। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল-বিএমডিসি অনুমোদন দেয় না বলে প্র্যাক্টিসও করতে পারেন না। এমনকি কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে জব ডেসক্রিপশনে বলা হয়েছে, তারা ডেন্টিস্টদের সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন, ডেন্টাল চেয়ারের পরিচ্ছন্নতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ, এক্সরে মেশিন দেখভাল করার কথা। এছাড়া কোর্সের সাথে সিলেবাসের কোন মিল না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে বিএমডিসি’র অনুমোদন না থাকায় প্রাক্টিসের সুযোগ না মেলায় কোর্স শেষ করেও তারা বেকার জীবনযাপন করছেন।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৪ বছর মেয়াদে ডেন্টাল চিকিৎসার ৫৩টি বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন করেও পুরোপুরি বেকার থাকছেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশে ডেন্টালের কারিগরি খাতে কাজের কোন সুযোগ না থাকায় কোর্সের শিক্ষার্থীরা শুধু সনদপত্রই অর্জন করছেন। আবার কোর্সের শিরোনামে ‘হেলথ টেকনোলজি’ থাকায় তারা স্বীকৃতি পাচ্ছেন না চিকিৎসক হিসেবে। বরং ‘জব ডেসক্রিপশন’-এর নামে প্রায় সমান শিক্ষা অর্জন করেও তাদের কাজ ডেন্টিস্টদের সহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছেÑ জানিয়েছেন কোর্সের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, এভাবে ত্রিমুখী খামখেয়ালিপনার জন্য বলি হচ্ছেন ডেন্টালের শিক্ষার্থীরা। এদিকে কোর্স ও হাতে-কলমে শিক্ষার সঙ্গে কোন মিল না থাকায় বিদেশেও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। এটাকে তারা ‘অন্যায়’ ও ‘শিক্ষাবান্ধব নয়’ উল্লে¬খ করে দীর্ঘদিন ধরে কোর্সের শিরোনাম পরিবর্তনসহ ডেন্টিস্টদের মতো প্র্যাক্টিসের সুযোগ দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
সূত্র মতে, ডেন্টাল চিকিৎসার পরিধি বাড়াতে ২০০৪-২০০৫ সালে বিএসসি ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) নামে ৪ বছরের কোর্স চালু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টির অধীনে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। পরবর্তীকালে ২০০৬-২০০৭ সেশন থেকে কোর্সের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বিএসসি ইন হেলথ টেকনোলজি। ২০১১-১২ সেশনে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির আওতায় এনে কোর্সকে সরকারিকরণ করা হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, সাইক ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্স এবং মার্কস ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজিÑ এই ৫ প্রতিষ্ঠানে কোর্স পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষা শেষ করে বর্তমানে ইন কোর্স ট্রেনিং-এ থাকা ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মো. সারোয়ার হোসেন ভূঁইয়া জানান, আমরা যে সিলেবাসে পড়ছি সেটি সম্পূর্ণই বায়োলজিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল। এখানে কারিগরি বা স্বাস্থ্য প্রযুক্তি শিক্ষার কিছুই নেই। বিশ্বের কোথাও এই নামে কোন কোর্সও পড়ানোর নজির নেই। কিন্তু হাস্যকরভাবে বাংলাদেশেই কোর্সটির নামকরণ করা হয়েছে হেলথ টেকনোলজি। তিনি জানান, ইতোমধ্যে যারা কোর্স সম্পন্ন করেছেন তারা বেকারত্ব বরণ করছেন এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন। কর্তৃপক্ষের অসতর্কতার কারণেই এটি হয়েছে।
সিলেবাস পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের দাবির সত্যতা পাওয়া গেছে। সিলেবাসে রয়েছে হিউম্যান এনাটমি এবং ফিজিওলজি, জেনারেল প্যাথলজি, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি, হেমাটোলজি, মাইক্রো বায়োলজি, ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল এনাটমি, অর্থ ডেন্টিস্ট, ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল প্যাথলজি অ্যান্ড ওরাল মেডিসিন, জেনারেল অ্যান্ড ডেন্টাল ফার্মাকোলজি, চিল্ড্রেন, কমিউনিটি ডেন্টিস্ট্রি, ক্যামেস্ট্রি অব ডেন্টাল ম্যাটেরিয়ালস, কনজার্ভেটিভ এবং ডেন্টাল সার্জারি। কিন্তু কোথাও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি শিক্ষা বিষয়ক কিছু নেই। ফলে কোর্স সম্পন্ন হলেও শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি বিষয়ে কোন জ্ঞান অর্জন করছেন না। আবার কোর্স শেষে প্র্যাক্টিসেরও সুযোগ রাখা হয়নি। ডেন্টালে ৪ বছরের কোর্স শেষ করে শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে জব ডেসক্রিপশনে বলা হয়েছে, তারা ডেন্টাল চেয়ারের পরিচ্ছন্নতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ, এক্সরে মেশিন, দেখভাল করবেন। ২০০৯-১০ সেশনের সাইক ইনস্টিটিটের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী দীপঙ্কর রায় বলেন, প্রায় সমান শিখেও আমাদের জন্য পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ করার বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেয়া হয়েছে। এটা একেবারেই অসম্মানজনক। আন্তর্জাতিক মানের জব ডেসক্রিপশন না হওয়ায় অবহেলার শিকার হচ্ছি আমরা। এদিকে চার বছরের কোর্স শেষ করে বেকার রয়েছেন এমন শিক্ষার্থীরা জানান, সিলেবাসের সঙ্গে কোর্সের শিরোনামের মিল না থাকায় চাকরির ক্ষেত্রে মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। ২০০৪-০৫ সেশনে কোর্স সম্পন্ন করে বের হওয়া ইসরাত সুলতানা রুনা ও এখলাস উদ্দিন নামের দুই শিক্ষার্থী ২০১১ সালের মার্চে হেলথ টেকনোলজিস্ট হিসেবে চাকরির আবেদন করেছিলেন সউদী আরবের কিং ফায়সাল হাসপাতালে। রুনা জানান, এ সময় তাদের কাছে চাওয়া হয় সিলেবাস। তারা সেটি পাঠালে তাদের জানানো হয়, এটাতে স্বাস্থ্য প্রযুক্তির কিছু নেই। এটি একটি প্র্যাকটিশনার কোর্স। সুতরাং আবেদনের যোগ্য হিসেবে তারা বিবেচিত হবেন না। শিক্ষার্থীরা জানান, এভাবে দেশের কোথাও তাদের চাকরির সুযোগ নেই। এ পর্যন্ত তিনটি সেশনে প্রায় আড়াইশ’ শিক্ষার্থী এই কোর্স শেষ করে বেরিয়েছেন। চলতি বছর থেকে অন্তত ২০০ জন কোর্স শেষে বের হবেন। এরা তখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতে পা রাখবেন বলে মন্তব্য করেন তারা। বলেন, সংশ্লি¬ষ্টদের সব পর্যায়েই কোর্সের অসঙ্গতি ও সমস্যার বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকেও কোর্সের শিরোনাম ‘ব্যাচেলর অব ডেন্টিস্ট্রি’ অথবা বিএসসি ইন ডেন্টিস্ট্রি’ করার সুপারিশ পাঠানো হয়। কিন্তু তা আমলেই নেয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সমন্বয় না হওয়ায় বিষয়টি এভাবে চলছে বলে জানান তারা। এদিকে কোর্সের নাম ও সিলেবাস পরিবর্তনে শিক্ষার্থীরা আজ থেকে নতুন করে আন্দোলনে যাচ্ছেন। আজ রোববার দুপুর ১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। সম্মেলন থেকে শিক্ষার্থীরা ১৩, ১৫ এবং ১৮ নভেম্বর যথাক্রমে ডিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবেন। এই সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আগামী ২৪ নভেম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতীকী অনশন কর্মসূচি প্রদান করবে বলে জানা গেছে। এর আগে শিক্ষার্থীরা কোর্স শিরোনাম ও সিলেবাস পরিবর্তনসহ বিভিন্ন দাবিতে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়। গতকাল ছিল আল্টিমেটামের শেষ দিন। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন প্রফেসর ডা. মো. ইসমাইল খানের সাথে মোŸাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১২ রাত ১২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


