somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুই হাজার বছরের এক খেলা কীভাবে জমিদারি হয়ে উঠল

০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১৮৮৩ সালের ৩১ মার্চ, লন্ডনের কেনিংটন ওভাল। এফএ কাপের ফাইনাল।

এক দলের নাম ওল্ড এটোনিয়ানস। ইটন কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের দল। ওইদিন মাঠে নামা এগারোজনের ভেতর ছিলেন একজন ব্যারনেট, একজন ল্যাটিন ভাষার অধ্যাপক, আর ব্রিটেনের সবচেয়ে নামী বাণিজ্যিক আইনজীবীদের একজন। অধিনায়ক আলফ্রেড কিনেয়ার্ড ম্যাচ জিতলে প্যাভিলিয়নের সামনে হ্যান্ডস্ট্যান্ড দিতেন, তার ট্রেডমার্ক উদযাপন। তিনি খেলতেন লম্বা প্যান্ট পরে।

অন্য দলের নাম ব্ল্যাকবার্ন অলিম্পিক। ল্যাঙ্কাশায়ারের তুলার কল থেকে উঠে আসা কিছু ছেলে। তাঁতি, ঢালাইকর্মী, নদীর ঘাটে মাল খালাস করা মজুর, এক দাঁতের ডাক্তারের সহকারী। তাদের মাঠের নাম ছিল হোল-ই-থ-ওয়াল, পাশের পাব থেকে ধার করা নাম।

তখনকার নিয়মে খেলোয়াড়দের টাকা দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ফুটবল ভদ্রলোকের খেলা, আর ভদ্রলোক টাকার জন্য খেলে না। শুনতে মহৎ। বাস্তবে এই নিয়ম কী দাঁড়ায়? ইটনের ছেলের সময় আছে, টাকা আছে, ট্রেন ভাড়া আছে। ব্ল্যাকবার্নের তাঁতি অনুশীলনে যেতে হলে কারখানায় একদিন গরহাজির থাকতে হয়, মানে পাঁচ কি ছয় শিলিং মজুরি জলে। অ্যামেচারিজম কোনো নৈতিক আদর্শ ছিল না। ধনীর ছেলে আর গরিবের ছেলেকে আলাদা রাখতেই এই নিয়ম বানানো হয়েছিল।

খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। জেমস কস্টলির গোলে ব্ল্যাকবার্ন অলিম্পিক জিতল ২-১। ইতিহাসে প্রথমবার এফএ কাপ গেল শ্রমিকদের ঘরে।

কিনেয়ার্ড ওইদিন হ্যান্ডস্ট্যান্ড দেননি। ট্রফি হস্তান্তরের সময় গ্যালারি থেকে ভেসে এসেছিল তিনবার নিচু গলার জয়ধ্বনি আর, রিপোর্ট বলছে, অনিচ্ছুক করতালি। ব্ল্যাকবার্নে ফিরে অলিম্পিকের অধিনায়ক অ্যালবার্ট ওয়ারবার্টন সংবর্ধনায় বললেন, কাপ ল্যাঙ্কাশায়ারে ভালো ঘর পেয়েছে, কাপ আর কোনোদিন লন্ডনে ফিরবে না।

দুই বছর পর, ১৮৮৫ সালের জুলাইয়ে, চাপে পড়ে এফএ পেশাদারিত্ব বৈধ ঘোষণা করল। ফুটবলার এবার আইনত টাকা নিতে পারবে। ১৮৮৮ সালে জন্ম নিল ফুটবল লিগ।

আর ব্ল্যাকবার্ন অলিম্পিক?

উঠে গেল ১৮৮৯ সালে। পেশাদার যুগে টিকতে যে টাকা লাগে, ওই টাকা তাদের ছিল না। ছয় বছর। যে দরজা তারা খুলেছিল, ওই দরজা দিয়ে টাকা ঢুকল, আর টাকা সবার আগে গিলে ফেললো তাদেরকেই।

একশো চল্লিশ বছরে এই ঘটনা বারবার ঘটেছে। প্রতিবার প্রায় একইভাবে।

যে খেলার কোনো উদ্ভাবক নেই
বেসবল কে বানিয়েছে, তা নিয়ে আমেরিকানরা এখনো ঝগড়া করে। বাস্কেটবলের উদ্ভাবক জেমস নেইস্মিথ, তারিখসহ লেখা আছে। রাগবির জন্ম নিয়ে ইংল্যান্ডে একটা স্কুলের নাম আছে।

ফুটবলের কোনো উদ্ভাবক নেই।

কারণ ফুটবল কেউ বানায়নি। মানুষ গোল কিছু পেলে লাথি মারে। এটুকুই। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চীনের হান রাজবংশের সৈন্যরা খেলত ছুজু, চামড়ার বলে পালক ভরে সেলাই করা, পা দিয়ে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে হতো। ফিফা নিজেই ছুজুকে ফুটবলের প্রাচীনতম রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রিকরা খেলত এপিস্কাইরোস, রোমানরা হারপাস্টাম, সৈন্যদের শরীর গরম রাখার ব্যায়াম।

আর মধ্য আমেরিকায় খেলা হতো মায়া আর আজটেকদের বল খেলা।

রাবারের ভারী বল, শুধু কোমর আর নিতম্ব দিয়ে মারা যেত, হাত-পা নিষিদ্ধ। পাথরের কোর্ট, দুই পাশে ঢালু দেয়াল, উঁচুতে বসানো পাথরের রিং। মেক্সিকো আর গুয়াতেমালাজুড়ে এরকম দেড় হাজারের বেশি কোর্টের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

মায়াদের সৃষ্টিতত্ত্বের বই পোপোল ভুহ-তে আছে দুই যমজ ভাইয়ের গল্প, হুনাহপু আর শবালানকে। তারা পাতালের রাজ্য শিবালবার দেবতাদের সঙ্গে বল খেলতে নামে, বাজি নিজেদের প্রাণ। এখানে খেলা বিনোদন নয়। খেলা মৃত্যুর সঙ্গে দরকষাকষি। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খেলা শেষে সত্যিকারের বলি হতো, এবং কিছু ভাস্কর্য ইঙ্গিত দেয় যে বলি হতো বিজয়ী দলের অধিনায়ক, পরাজিত নয়। কারণ দেবতাকে সেরাটাই দিতে হয়।

মানে খেলার দাম দিতে হতো জীবন দিয়ে। মূল্য আর দাম, এই দুইয়ের পার্থক্য এখানেই শুরু। যার মূল্য অসীম, তার দাম হয় না। দাম নির্ধারণ করা মানেই তাকে বিনিময়যোগ্য করে ফেলা।

তিন হাজার বছর পর জুরিখে বসে কেউ বিশ্বকাপের একটা দাম লিখবে। বিশ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সেই গল্প পরে।

রাজারা ফুটবল নিষিদ্ধ করতেন কেন
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে যা খেলা হতো, তাকে বলা হয় মব ফুটবল। শ্রোভটাইডের দিন গোটা গ্রাম বেরিয়ে পড়ত, এক গ্রামের বিরুদ্ধে আরেক গ্রাম, বল নিয়ে যেতে হবে প্রতিপক্ষের গির্জার দরজা পর্যন্ত। মাঠের সীমানা নেই, খেলোয়াড় সংখ্যা নেই, নিয়ম বলতে প্রায় কিছুই নেই। খেলা চলত সারাদিন। হাড় ভাঙত, মাঝেমধ্যে মানুষ মরত।

১৩১৪ সালে দ্বিতীয় এডওয়ার্ড লন্ডনে ফুটবল নিষিদ্ধ করলেন। ১৩৬৩ সালে তৃতীয় এডওয়ার্ড আবার। যুক্তি ছিল, ফুটবল খেলে ছেলেরা তীরন্দাজির অনুশীলন করছে না, যুদ্ধে ক্ষতি হবে। স্কটল্যান্ডে ১৪২৪ সালে প্রথম জেমস আইন করলেন, কোনো লোক ফুটবল খেলবে না।

কয়েকশো বছরে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে ফুটবল নিষিদ্ধ হয়েছে ত্রিশবারের বেশি।

তীরন্দাজি একটা অজুহাত। আসল কারণ সহজ। ফুটবল মানে হাজার মানুষ এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে, নিজেরাই নিয়ম বানাচ্ছে, নিজেরাই বিচার করছে, আর রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। রাজার ভয় বল নিয়ে নয়। রাজার ভয় ভিড় নিয়ে। যে ভিড়ের নিজস্ব কিছু আছে, সেই ভিড়কে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

ফুটবল নিয়ে যারা লেখেন, তারা এই কথা প্রায় কখনো বলেন না।

ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে পাশ হয় এনক্লোজার অ্যাক্ট নামে একগুচ্ছ আইন। যে মাঠে গ্রামের সবাই গরু চরাত, যেখান থেকে সবাই কাঠ কুড়াত আর ঘাস কাটত, সেই সাধারণ জমিতে বেড়া উঠল, বসল ব্যক্তিমালিকানা। শত শত বছরের প্রথাগত অধিকার এক কলমের খোঁচায় মুছে গেল। জমিহীন গ্রামবাসী শহরে এল, ঢুকল ম্যানচেস্টার আর ব্ল্যাকবার্নের কারখানায়।

আর কারখানায় ঢুকে, সপ্তাহে ছয়দিন কাজের পর শনিবার বিকেলের অবসরে, তারা যে খেলা গড়ে তুলল, সেটাই আধুনিক ফুটবল।

মানে আধুনিক ফুটবলের জন্মই হয়েছে একটা কমন্স কেড়ে নেওয়ার পর, তার বদলি হিসেবে। মাঠ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, মানুষ বানিয়ে নিল নতুন মাঠ। যা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, যা সবার।

দেড়শো বছর পর, ঠিক একই যুক্তি, ঠিক একই ভাষায়, ফিরে এসেছে। বেড়া দাও। মালিকানা বসাও। যা সবার, তাতে শতাংশ লেখো।

ফুটবল মানুষের শেষ কমন্স। এবং এখন সেটাতেও এনক্লোজারের কাজ শুরু হয়েছে।

ফুটবল বিশ্বজনীন হয়েছিল ফিফা জন্মানোর আগেই
ফিফা যখন নিজের কথা বলে, তখন বলে একটা মিশনের গল্প। আমরা ফুটবলকে পৃথিবীর কোণায় কোণায় পৌঁছে দিচ্ছি। ফুটবল সত্যিকারের বৈশ্বিক খেলা বানানোই আমাদের লক্ষ্য।

তারিখগুলো মিলিয়ে দেখলে গল্পটা উল্টে যায়।

১৮৭২ সালে কলকাতায় ক্যালকাটা এফসি প্রতিষ্ঠিত। ১৮৮৯ সালে মোহনবাগান। ১৮৮২ সালে আর্জেন্টিনায় স্কটিশ শিক্ষক আলেকজান্ডার ওয়াটসন হাটন ছেলেদের ফুটবল শেখাতে শুরু করেন, ১৮৯৩ সালে তার হাতে আর্জেন্টাইন অ্যাসোসিয়েশন। ১৮৯৪ সালে চার্লস মিলার সাও পাওলোতে দুটো বল নিয়ে জাহাজ থেকে নামেন। উরুগুয়েতে ১৮৯১ সালে রেলওয়ে শ্রমিকদের ক্লাব, যা পরে হবে পেনিয়ারোল। ১৯০০ সালে ইতালিতে, ১৮৯৯ সালে বার্সেলোনা, ১৯০০ সালে বায়ার্ন মিউনিখ।

ফিফার জন্ম ১৯০৪ সালের ২১ মে, প্যারিসে।

মানে ফিফা যখন জন্মাল, ফুটবল ততদিনে চারটা মহাদেশে পৌঁছে গেছে। বন্দরে বন্দরে, রেললাইনের ধারে, মিশনারি স্কুলের মাঠে। ব্রিটিশ নাবিক, রেলের ইঞ্জিনিয়ার, কলের ম্যানেজার আর মিলের মিস্ত্রিরা যেখানে গেছে, সঙ্গে বল নিয়ে গেছে। ফিফার কোনো ভূমিকা এতে ছিল না। ফিফা তখনও অস্তিত্বেই ছিল না।

ফুটবল বিশ্বজনীন হয়েছে সাম্রাজ্যের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে, ফিফার কর্মসূচি হিসেবে নয়। ফিফা এসেছে পরে, এবং এসে কৃতিত্বটা নিজের নামে লিখে নিয়েছে।

এটা নিছক ইতিহাসের খুঁটিনাটি নয়। এটাই ফিফার সবচেয়ে বড়ো দাবির ভিত্তি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে যখন বলা হবে, বিশ্বকাপের অংশ বিক্রি করলে ফুটবল সারা পৃথিবীতে ছড়াবে, তখন প্রশ্নটা এই ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে করতে হবে। ফুটবল ছড়াতে আপনাদের কখনো লাগেনি। আপনারা এসেছিলেন খেলা ছড়িয়ে যাওয়ার পর, হিসাবরক্ষক হিসেবে।

১৯০৪ থেকে ১৯৭৪: সাতটা দেশ, একটা ডাকঘর, শূন্য ক্ষমতা
প্যারিসে ১৯০৪ সালে যে সাতটা দেশ কাগজে সই করল, তারা হলো ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন আর সুইজারল্যান্ড। ইংল্যান্ড যোগ দিতে অস্বীকার করল। যে দেশ খেলার নিয়ম লিখেছে, তারা কেন মহাদেশীয় কেরানিদের কথা শুনবে?

প্রথম বিশ্বকাপ ১৯৩০ সালে, উরুগুয়েতে। জুল রিমের স্বপ্ন। ইউরোপের প্রায় সব দেশ যেতে রাজি হলো না। জাহাজে করে আটলান্টিক পাড়ি দিতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কে যাবে? শেষ পর্যন্ত গেল মাত্র চারটা ইউরোপীয় দল। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া। ইংল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, কেউ না।

ভাবুন। বিশ্বকাপ, এবং ইউরোপ আসতে চায় না।

এরপর প্রায় সত্তর বছর ফিফা ছিল একটা গরিব সংগঠন। জুরিখে ছোটো অফিস। ১৯৭৪ সালে যখন হুয়াও আভেলাঞ্জ দায়িত্ব নেন, ফিফার কর্মী সংখ্যা এক ডজনের মতো। আয় বলতে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর চাঁদা। সংগঠনের হাতে বলার মতো নগদ ছিল না।

স্ট্যানলি রাউস তখন সভাপতি, ইংরেজ, পুরোনো ধাঁচের প্রশাসক। তার পৃথিবীর কেন্দ্র ইউরোপ, এবং সেটা নিয়ে তার কোনো সংকোচ ছিল না।

তারপর ১৯৭৪ সালের ১১ জুন এল, এবং ফুটবলের হিসাব চিরতরে বদলে গেল।

যে অঙ্ক আভেলাঞ্জ আবিষ্কার করেছিলেন
ফ্রাঙ্কফুর্টে ফিফা কংগ্রেসে ভোট হলো। আভেলাঞ্জ ৬২, রাউস ৫২।

ব্রাজিলিয়ান আইনজীবী ও ব্যবসায়ী আভেলাঞ্জ ওই ভোটের জন্য ছিয়াশিটা দেশে গিয়েছিলেন। বহু সফরে সঙ্গে ছিলেন পেলে। সাংবাদিক কেয়ার র‍্যাডনেজ পরে লিখেছেন, আভেলাঞ্জের কোনো বাছবিচার ছিল না, রাজা হোক বা খুনি, যে ভোট দিতে পারবে তার সঙ্গেই তিনি বসতেন।

আর তিনি যা আবিষ্কার করেছিলেন, সেটাই ফিফার আসল গঠনতান্ত্রিক রহস্য।

ফিফা কংগ্রেসে প্রতিটা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের একটা করে ভোট। কুক আইল্যান্ডস, জনসংখ্যা পনেরো হাজার, তার একটা ভোট। জার্মানি, জনসংখ্যা আট কোটি, তারও একটা ভোট। বাংলাদেশ, ব্রাজিল, মন্টসেরাট, সবার একটা করে।

কাগজে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো আছে, ফিফায় নেই। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩, ফিফার ২১১।

বাস্তবে এটা সবচেয়ে সহজে কেনা যায় এমন ব্যবস্থা।

কারণ ভোটার যখন গরিব আর কোষাগার যখন ক্ষমতাসীনের হাতে, তখন গণতন্ত্র আর গণতন্ত্র থাকে না, বেতনভুক হয়ে যায়। আপনি ইউরোপের বড়ো ফেডারেশনকে কিনতে পারবেন না, তাদের নিজস্ব টাকা আছে। কিন্তু যে ফেডারেশনের মোট বার্ষিক বাজেটের সিংহভাগ আসে জুরিখ থেকে পাঠানো চেকে, সেই ফেডারেশনের সভাপতি কংগ্রেসে হাত তোলার আগে দুবার ভাববেন।

আভেলাঞ্জ এই অঙ্ক বুঝেছিলেন ১৯৭৪ সালে। তিনি আফ্রিকা আর এশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন উন্নয়নের, বিশ্বকাপ বড়ো করার, যুব বিশ্বকাপ চালুর যা ছোটো দেশগুলোও আয়োজন করতে পারবে। প্রতিশ্রুতিগুলো ভালো। কিন্তু প্রতিশ্রুতির টাকা আর ভোটের টাকা একই পাইপ দিয়ে যায়।

এই পাইপ আজও একই আছে। দিনে দিনে আরও চওড়া হয়েছে।

ফাউস্টের চুক্তি: হর্স্ট ড্যাসলার
আভেলাঞ্জ জিতলেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখার টাকা কোথায়?

যিনি শেষ পর্যন্ত টাকা এনে দিলেন, তিনি নির্বাচনে আভেলাঞ্জের বিপক্ষে কাজ করেছিলেন। হর্স্ট ড্যাসলার, অ্যাডিডাসের প্রতিষ্ঠাতা আডি ড্যাসলারের ছেলে, তখন ইউরোপের বেশিরভাগ ফেডারেশনের ওপর প্রভাব রাখতেন এবং রাউসের হয়ে খেটেছিলেন। আভেলাঞ্জ মুগ্ধ হলেন লোকটার নেটওয়ার্ক দেখে।

ড্যাসলার তার হিসাব করে ফেলেছিলেন আগেই। মার্কেটিং ব্যক্তিত্ব প্যাট্রিক ন্যালি পরে যেভাবে বলেছেন, ড্যাসলারের হাতে অ্যাডিডাসের মার্কেটিং বাজেট ছিল না, বাজেট ছিল পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। তাই তাকে অন্য পথে টাকা জোগাড় করতে হবে। আর তিনি যদি আভেলাঞ্জকে টাকা এনে দিতে পারেন, তাহলে আভেলাঞ্জকেও তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

এই বাক্যই হয়ে উঠলো আধুনিক ফুটবলের জন্মসনদ।

ন্যালি এলেন ১৯৭৪ বিশ্বকাপের দুই মাস পর। ক্লায়েন্ট কোকা-কোলা। এল প্রথম গ্লোবাল স্পনসরশিপ প্যাকেজ। ন্যালির নিজের বর্ণনায়, কোকের টাকা ফেডারেশনের চেহারাই বদলে দিচ্ছিল, আভেলাঞ্জ জুরিখে নতুন সদর দপ্তর তুলছেন, পূর্ণকালীন পেশাদার কর্মী নিচ্ছেন, পিআর আর অর্থ বিভাগ বসাচ্ছেন। অন্য ফেডারেশনগুলো তাকিয়ে দেখছিল, আর একে একে একই পথে নামছিল।

১৯৮২ সালে লুসার্নে ড্যাসলার প্রতিষ্ঠা করলেন ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্ট অ্যান্ড লেজার, সংক্ষেপে আইএসএল। প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই আইএসএল ফিফার মার্চেন্ডাইজিং আর স্টেডিয়াম বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব পেয়ে গেল। খোলা দরপত্র নয়, সরাসরি আলোচনা। ১৯৮৩ সাল নাগাদ ফিফার মূল বাণিজ্যিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আইএসএলের হাতে।

গল্পের শেষটা কেমন?

আইএসএল দেউলিয়া হয় ২০০১ সালে। ২০১২ সালে সুইস প্রসিকিউটরের একটা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওখানে বলা হয়, ফিফার নির্বাহী কমিটিতে থাকাকালে আভেলাঞ্জ ও তার জামাতা রিকার্দো তেইশেইরা বিশ্বকাপের মার্কেটিং স্বত্ব বণ্টনের বিনিময়ে চার কোটি দশ লাখ ডলারের বেশি ঘুষ নিয়েছেন।

ফাউস্ট জার্মান কিংবদন্তির এক পণ্ডিত, যিনি অসীম জ্ঞান আর ক্ষমতার বিনিময়ে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেন। চুক্তির শর্ত শুনতে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্দান্ত। দাম আদায় করা হয় পরে, এবং তখন ফেরত নেওয়ার কোনো পথ থাকে না।

ফিফা ১৯৭৪ সালে গরিব ছিল। ২০২৩ থেকে ২০২৬, এই চার বছরে ফিফা আয় ধরেছে তেরো বিলিয়ন ডলার। মাঝখানে যা হারিয়েছে, তার হিসাব টাকায় হয় না।

২০১৫ সালের ২৭ মে, ভোর ছয়টা
জুরিখের বাউর অ্যু লাক হোটেল। আল্পসের দিকে মুখ করা জানালা, ফিফা কর্মকর্তাদের বহু বছরের প্রিয় ঠিকানা। ওই সপ্তাহে কংগ্রেস, দুদিন পর সভাপতি নির্বাচন।

ভোরে সুইস পুলিশ ঢুকল। মার্কিন বিচার বিভাগের অনুরোধে সাতজন ফিফা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। হোটেলকর্মীরা সাদা চাদর ধরে আড়াল বানিয়ে তাদের বের করে আনল, যাতে ক্যামেরায় মুখ না পড়ে।

মার্কিন অভিযোগপত্রে মোট চোদ্দোজন। অভিযোগ, র‍্যাকেটিয়ারিং, ওয়্যার ফ্রড, মানি লন্ডারিং। ঘুষের অঙ্ক পনেরো কোটি ডলারের বেশি, সময়সীমা দুই দশকেরও বেশি। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল লরেটা লিঞ্চ বললেন, এই দুর্নীতি ব্যাপক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং গভীরে প্রোথিত, আর এতে জড়িয়ে আছে ফুটবল কর্মকর্তাদের অন্তত দুই প্রজন্ম।

ঘুষ কীসের বিনিময়ে? মূলত লাতিন আমেরিকার টুর্নামেন্টগুলোর মিডিয়া ও মার্কেটিং স্বত্ব।

কোপা আমেরিকার সম্প্রচার স্বত্ব। কনকাকাফ গোল্ড কাপ। মহাদেশীয় ক্লাব প্রতিযোগিতা। মানে যে অঞ্চল টাকার অভাবে নিজের খেলোয়াড় ধরে রাখতে পারছিল না, সেই অঞ্চলের সম্প্রচার থেকে আসা টাকাও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হিসাবে ঢুকছিল। দক্ষিণ আমেরিকা দুই দিক থেকে কাটা পড়ছিল, ইউরোপ টানছিল তার খেলোয়াড়, আর নিজের ঘরের লোক টানছিল তার সম্প্রচারের টাকা।

সবচেয়ে সিনেমাটিক চরিত্র চাক ব্লেজার। কনকাকাফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, নিউ ইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে থাকতেন, এবং নিজের বিড়ালদের জন্য আলাদা একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। কর ফাঁকি ধরা পড়ার পর তিনি এফবিআইয়ের হয়ে কাজ করতে রাজি হন এবং গোপন রেকর্ডার নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে বসতেন।

সেপ ব্ল্যাটার গ্রেপ্তার হননি। ২৯ মে তিনি পঞ্চমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হলেন।

চারদিন পর, ২ জুন, পদত্যাগ করলেন।

এরপর ফিফা সংস্কারের ঘোষণা দিল। স্বাধীন নীতি কমিটি, বেতন প্রকাশ, মেয়াদের সীমা, স্বচ্ছতার ভাষা। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সভাপতি হলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। প্রচারণার মূল শব্দ ছিল, সংস্কার।

তারপর?

ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচি চালু হলো ২০১৬ সালে। এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনপ্রতি বরাদ্দ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ফিফার নিজের হিসাবেই, ২০১৬ সালে প্রতিটা অ্যাসোসিয়েশন যা পেত, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালে তার সাত গুণ পেয়েছে।

মানে দুর্নীতির কেলেঙ্কারির উত্তর হিসেবে যা এল, তা হলো ফেডারেশনগুলোর কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পাঠানো।

আগে টাকা যেত টেবিলের নিচ দিয়ে, ব্যক্তিগত হিসাবে, গোপনে, ঘুষ হিসেবে। এখন টাকা যায় টেবিলের উপর দিয়ে, চুক্তিতে সই করে, উন্নয়নের নামে, ফেডারেশনের অ্যাকাউন্টে। বৈধ। নিরীক্ষিত। প্রেস রিলিজসহ।

গন্তব্য একই। প্রাপক একই। ভোটও একই।

শুধু কাগজপত্র ঠিক করে নেওয়া হয়েছে।

সংস্কার বলতে ফুটবল আসলে যা পেল, তা হলো ঘুষের বাজেটায়ন।

বসমান, ১৯৯৫: যেদিন পাম্প চালু হলো
এবার বিশ বছর পিছিয়ে যেতে হবে, কারণ জুরিখে এসব ঘটার অনেক আগেই ইউরোপের আদালত ফুটবলের মানচিত্র নতুন করে এঁকে ফেলেছিল।

লাতিন আমেরিকার রক্তক্ষরণ নিয়ে যারা রাগ করেন, তারা সাধারণত ফিফাকে গালি দেন। কিন্তু ছুরিটা ফিফার হাতে ছিল না।

১৯৯০ সালে জঁ-মার্ক বসমান নামের এক বেলজিয়ান দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবলারের চুক্তি শেষ হয়। তিনি ফ্রান্সের এক ক্লাবে যেতে চান। তার ক্লাব ট্রান্সফার ফি চায়, ফরাসি ক্লাব দিতে পারে না, বসমান আটকে যান। পাঁচ বছর মামলা চলে। ১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউরোপীয় আদালত রায় দেয়।

রায়ের দুটো অংশ। এক, চুক্তি শেষ হলে খেলোয়াড় বিনা ফিতে যেখানে খুশি যেতে পারবেন। দুই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতর কোনো ক্লাব অন্য ইইউ দেশের খেলোয়াড়ের ওপর কোটা বসাতে পারবে না।

এক রায়ে ইউরোপীয় ফুটবল একটা একক শ্রমবাজারে পরিণত হলো। আর একক শ্রমবাজার মানে, যার হাতে সবচেয়ে বেশি টাকা, সে-ই সেরাদের নিয়ে যাবে।

পাম্প চালু হয়ে গেল।

সিআইইএস ফুটবল অবজারভেটরির হিসাব বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিজের দেশের বাইরে পেশাদার ফুটবল খেলা ব্রাজিলিয়ানের সংখ্যা ৩,০২০। আর্জেন্টিনার ২,১৭১। আর একটা আগের হিসাব আরও পরিষ্কার করে বলে দেয় গন্তব্য কোথায়: বিশ্বজুড়ে প্রবাসী পেশাদার ফুটবলারদের মধ্যে সাড়ে নয় হাজারের বেশি খেলেন উয়েফাভুক্ত দেশে।

সংখ্যাটার চেয়েও ভয়ংকর হলো বয়স। গবেষকরা যাকে বলছেন অভিবাসনের কিশোরায়ন। আগে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় দেশের লিগে নাম করে, জাতীয় দলে খেলে, তারপর ইউরোপে যেত। এখন যায় ষোলো-সতেরো বছর বয়সে। মানে দেশের দর্শক তাকে কখনো পরিণত অবস্থায় দেখেই না।

সাও পাওলোর একটা ছেলে যদি সত্যিই ভালো হয়, ব্রাজিলের কোনো মাঠে আপনি তার সেরা খেলা দেখবেন না। দেখতে হলে যেতে হবে মাদ্রিদে।

এরিসিক্থনের ক্ষুধা
টাকার পার্থক্যটা দেখুন, তাহলে বাকিটা বুঝতে সুবিধা হবে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপপর্বে একটা জয়ের জন্য ক্লাব পায় তিরিশ লাখ ডলারের বেশি। কোপা লিবার্তাদোরেসের গ্রুপপর্বে একটা জয়ের জন্য পায় তিন লাখ। চ্যাম্পিয়নস লিগে একটা ড্র থেকে যে টাকা আসে, লিবার্তাদোরেসে একটা জয় থেকেও তার তিন ভাগের এক ভাগ আসে না।

২০২৫ সালে কোপা লিবার্তাদোরেস জিতে চ্যাম্পিয়ন ক্লাব পেয়েছে সব রাউন্ড মিলিয়ে দুই কোটি তিরিশ লাখ ডলার। ম্যানচেস্টার সিটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে পেয়েছিল চোদ্দো কোটি বিশ লাখের বেশি।

দক্ষিণ আমেরিকার ভেতরেও ফাটল ধরেছে একই কারণে। ব্রাজিলে জাতীয় কাপ জিতলে ক্লাব পায় প্রায় এক কোটি আশি লাখ ডলার। আর্জেন্টিনায় লিগ চ্যাম্পিয়নের প্রাইজমানি পাঁচ লাখের কাছাকাছি। ২০১৯ সালের পর থেকে লিবার্তাদোরেস জিতেছে শুধু ব্রাজিলিয়ান ক্লাবই। যে টুর্নামেন্ট একসময় বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের ঘরের সম্পত্তি ছিল।

এই অবস্থায় ক্লাবগুলো বাঁচে কীভাবে?

খেলোয়াড় বেচে। এবং নব্বইয়ের দশক থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় চালু হয় থার্ড পার্টি ওনারশিপ, সংক্ষেপে টিপিও। সিস্টেমটা এরকম: ক্লাবের টাকা নেই, তাই বাইরের কোনো বিনিয়োগ তহবিল ক্লাবকে নগদ দেয়, বিনিময়ে ওই তহবিল কিনে নেয় একজন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ ট্রান্সফার মূল্যের একটা অংশ। খেলোয়াড় বিক্রি হলে টাকা ভাগ হয়।

মানে একজন জীবন্ত মানুষের ভবিষ্যতে শেয়ার। কেনাবেচা হয় স্টকের মতো।

২০০৬ সালে ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড কিনল কার্লোস তেভেজ আর হাভিয়ের মাসচেরানোকে। দুই আর্জেন্টাইন, দুজনেরই বয়স বাইশ, দুজনেই বিশ্বের যেকোনো বড়ো ক্লাবে যেতে পারতেন। তারা গেলেন মাঝারি মানের ওয়েস্ট হ্যামে। কারণ তাদের অর্থনৈতিক স্বত্ব ছিল অফশোর তহবিলের হাতে, এবং তহবিল ঠিক করত কে কোথায় যাবে। তেভেজ করিন্থিয়ান্স থেকে ওয়েস্ট হ্যামে গেলেন, আর করিন্থিয়ান্স ওই ট্রান্সফার থেকে কিছুই পেল না।

উয়েফার তৎকালীন সভাপতি মিশেল প্লাতিনি টিপিওকে দাসপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

ফিফা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে টিপিও নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, কার্যকর হয় ২০১৫ সালের ১ মে।

শুনতে মনে হচ্ছে ন্যায়বিচার, কিন্তু ভাবছেন কি এই সিদ্ধান্তে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো?

ইউরোপের বড়ো ক্লাবগুলোর টিপিও লাগে না, তাদের নিজের টাকা আছে। টিপিওর ওপর বেঁচে ছিল দক্ষিণ আমেরিকা আর দক্ষিণ ইউরোপের গরিব ক্লাবগুলো। ব্রাজিলে প্রতিক্রিয়া ছিল আতঙ্কের, কারণ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছিলেন বাইরের বিনিয়োগ ছাড়া ব্রাজিলিয়ান লিগ ভেঙে পড়বে। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ লিগ ইউরোপীয় কমিশনে অভিযোগ করেছিল।

ফিফা রোগের লক্ষণ কেটে দিল, রোগ রেখে দিল। শোষণের যন্ত্র নিষিদ্ধ হলো, কিন্তু যে দারিদ্র্যের কারণে ক্লাবকে ওই যন্ত্রের কাছে যেতে হয়েছিল, তার জন্য কিছুই হলো না।

এরিসিক্থন থেসালির রাজা, যিনি দেবী ডিমিটারের পবিত্র বন কেটে ফেলেছিলেন। শাস্তি হিসেবে দেবী তার ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন এমন ক্ষুধা যা কোনোদিন মেটে না। রাজা আগে খেলেন নিজের সব সম্পত্তি, তারপর নিজের মেয়েকে বারবার বিক্রি করলেন খাবার কেনার জন্য, শেষে নিজের শরীর খেতে শুরু করলেন।

দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব ফুটবল এখন এরিসিক্থন। প্রতি মৌসুমে নিজের সন্তান বেচে টিকে থাকে, আর যত বেচে তত দুর্বল হয়, আর যত দুর্বল হয় তত বেশি বেচতে হয়।

কেন্দ্র মানে প্রতিভা নয়, কেন্দ্র মানে ক্যালেন্ডার
ইউরোপ ফুটবলের কেন্দ্র হয়ে উঠল কেন? প্রচলিত উত্তর, ইউরোপে টাকা বেশি।

অসম্পূর্ণ উত্তর। কেন্দ্র মানে টাকা নয়। কেন্দ্র মানে ক্যালেন্ডার, স্বীকৃতি আর আর্কাইভ, তিনটাই ইউরোপের হাতে।

প্রথমত, ক্যালেন্ডার। আন্তর্জাতিক ম্যাচের উইন্ডো কবে খুলবে, ট্রান্সফার উইন্ডো কবে, বিশ্বকাপ কোন মাসে, সব ঠিক হয় ইউরোপীয় লিগের মৌসুম মাথায় রেখে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ গরমের কারণে নভেম্বর-ডিসেম্বরে সরাতে হয়েছিল, আর তাতে ইউরোপীয় ক্লাব ও লিগগুলোর যে চিৎকার উঠেছিল, তা থেকে বোঝা যায় কারা নিজেদের ফুটবল খেলার সময়ের মালিক মনে করে। দক্ষিণ আমেরিকার ক্যালেন্ডার কখনো কারও মাথাব্যথা হয়নি। আফ্রিকান নেশনস কাপ প্রতিবার ইউরোপীয় ক্লাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকে।

দ্বিতীয়ত, স্বীকৃতি। ব্যালন ডি’অর একটা ফরাসি ম্যাগাজিনের পুরস্কার। কিন্তু ওই পুরস্কারই ঠিক করে দেয় কে শ্রেষ্ঠ। নিয়মে অবশ্য লেখা আছে, পৃথিবীর সব লিগ সমানভাবে বিবেচনায় আসবে। কাগজে কথাটা সুন্দর, আর লেখার জন্যই লেখা। বাস্তবে ওই পুরস্কার জিততে হলে ইউরোপে খেলতেই হবে। ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে ইতিহাসের সেরা মৌসুম কাটালেও আপনি বিবেচনায় আসবেন না। মেধা ইউরোপে জন্মায় না, কিন্তু মেধার সার্টিফিকেট ইউরোপ থেকেই ইস্যু হয়।

তৃতীয়ত, আর্কাইভ। ফুটবলের স্মৃতি কোথায় জমা থাকে? ইউটিউব খুলে “সেরা গোল” লিখলে যা আসে, তার নিরানব্বই ভাগ ইউরোপীয় মাঠে ইউরোপীয় ক্যামেরায় তোলা। রোনালদিনিয়োর জাদু আমরা দেখেছি বার্সেলোনায়। মারাদোনার শ্রেষ্ঠত্ব নাপোলিতে। নেইমারের উত্থানের ফুটেজ সান্তোসে আছে ঠিকই, কিন্তু ওই ফুটেজ নিছক প্রস্তাবনা, মূল বই লেখা হয় ইউরোপে।

সবচেয়ে নির্মম হলো লাতিন আমেরিকার গৌরবও এখন ইউরোপে গচ্ছিত। ব্রাজিলের প্রতিভা দেখতে হলে ব্রাজিল দেখতে হয় না, লা লিগা দেখতে হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আটটা দলের ছয়টাই ছিল উয়েফার। চ্যাম্পিয়ন স্পেন, রানার্সআপ আর্জেন্টিনা। এবং যে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল, তাদের প্রায় পুরো একাদশ খেলে ইউরোপে।

মানে লাতিন আমেরিকা এখনো খেলোয়াড় বানায়। শুধু ওই খেলোয়াড়দের আর তাদের রাখা যায় না।

এশিয়া: ফল আসে, ক্ষমতা আসে না
এশিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল কথা বলা হয়।

এশিয়া ফুটবলে কিছুই করেনি, এটা সত্য নয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলেছে। জাপান ২০২২ সালে এক গ্রুপে জার্মানি ও স্পেন, দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে গ্রুপ শীর্ষে থেকেছে। সৌদি আরব একই আসরে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে। জাপানের নারী দল ২০১১ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ফাইনালে আমেরিকাকে হারিয়ে।

ফল আছে। যা নেই তা হলো ক্ষমতা।

এএফসির সদস্য সাতচল্লিশটা দেশ, উয়েফার পঞ্চান্ন। সংখ্যায় প্রায় সমান। কিন্তু ক্যালেন্ডার এশিয়ার হাতে নেই, ট্রান্সফার বাজার এশিয়ার হাতে নেই, বিশ্ব ফুটবলের কোনো সিদ্ধান্ত টোকিও বা দোহায় নেওয়া হয় না।

এশিয়ার সাতচল্লিশটা ভোট ফিফার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। তবে ঠিক একটা কারণেই মূল্যবান। ভোট হিসেবে।

ফুটবল সংস্কৃতি ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার আছে, এশিয়ার নেই, এটা মেনে নিলাম। কিন্তু ১৯০৪ সাল থেকে যে সংগঠন নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক বলে দাবি করে, তারা এই সংস্কৃতি বানাতে কী করেছে?

ফিফা ফরওয়ার্ড ৩.০ কর্মসূচিতে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জন্য বরাদ্দ ছিল ২.২৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিটা সদস্য অ্যাসোসিয়েশন আবেদন করে পেতে পারত আশি লাখ ডলার পর্যন্ত।

টাকা তাহলে যায়। প্রশ্ন হলো, টাকা কোথায় গিয়ে হারায়।

জাপান যা করেছিল, আর জুরিখ যা করেনি
জাপানের গল্প ফিফার সবচেয়ে বড়ো অজুহাত ভেঙে দেয়।

আশির দশকের শেষে জাপান ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে চল্লিশের নিচে। ঘরোয়া লিগ অপেশাদার, গ্যালারি ফাঁকা, মাঠ বাজে। বেসবল আর সুমো দেশের খেলা, ফুটবল কেউ চেনে না।

১৯৯২ সালে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন একটা পরিকল্পনা ঘোষণা করল। নাম, জে-লিগ হান্ড্রেড ইয়ার ভিশন। শতবর্ষী পরিকল্পনা।

লক্ষ্য কী? ২০৯২ সাল নাগাদ জাপানে একশোটা পেশাদার ক্লাব থাকবে।

দুই হাজার বিরানব্বই সাল। যে পরিকল্পনা যারা বানিয়েছিলেন, তাদের কেউ ফল দেখে যেতে পারবেন না। কাওয়াবুচি সাবুরো, লিগের প্রথম চেয়ারম্যান, নিজেই জানতেন লক্ষ্যটা তার জীবনকালের বাইরে।

মডেলটা ছিল কমিউনিটিভিত্তিক। ক্লাবের নাম হবে কোম্পানির নয়, শহরের। ক্লাব শুধু ফুটবল নয়, এলাকার অন্যান্য খেলা আর স্বাস্থ্যকর্মসূচিও চালাবে। স্পনসর আনবে স্থানীয়ভাবে, যাতে জাতীয় করপোরেশনের ওপর নির্ভরতা না থাকে। লক্ষ্য ছিল ক্লাব যেন শহরের সম্পত্তি হয়, বিনিয়োগকারীর নয়।

১৯৯৩ সালের ১৫ মে জে-লিগের প্রথম ম্যাচ। এরপর ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় বিভাগ, ২০১৪ সালে তৃতীয়। ২০০৯ সালে এএফসি জে-লিগকে মহাদেশের শীর্ষ লিগের স্বীকৃতি দেয়।

আজ জাপানের তিনটা পেশাদার বিভাগ, প্রতিটায় বিশটা করে ক্লাব। ২০২৬ মৌসুমে জে১-এর মোট দর্শক ছত্রিশ লাখ, ম্যাচপ্রতি গড় একুশ হাজারের বেশি।

এই পুরো কাঠামো বানাতে ফিফার ভূমিকা কী ছিল?

কিছুই না।

জাপান নিজের টাকায়, নিজের পরিকল্পনায়, নিজের একশো বছরের ধৈর্যে এটা বানিয়েছে। জুরিখ থেকে কোনো ব্লুপ্রিন্ট আসেনি।

আর ঠিক এই কারণেই জাপানের উদাহরণ ফিফার জন্য বিব্রতকর। কারণ জাপান প্রমাণ করেছে যে ফুটবল সংস্কৃতি বানানো সম্ভব। শূন্য থেকে সম্ভব। বেসবলের দেশে সম্ভব। শুধু দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় মালিকানা আর সৎ প্রশাসন।

তাহলে ফিফা ১২১ বছরে বাকি এশিয়ায় এটা করল না কেন?

যেখানে টাকা যায় আর যেখানে যায় না
অস্বস্তিকর উত্তর, আর সেই উত্তর আমাদের নিজেদের ঘরেও আঙুল তোলে।

২০২৩ সালের এপ্রিলে ফিফার নীতি কমিটির বিচারিক শাখা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দুই বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে, সঙ্গে দশ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা। অভিযোগ, ফিফা ফরওয়ার্ড তহবিলের অপব্যবহার এবং ওই খরচ বৈধ দেখানোর জন্য জাল বা মিথ্যা কাগজপত্রের ব্যবহার।

ফিফা রায়ের একান্ন পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছিল। বিতর্কিত কেনাকাটার তালিকায় ছিল খেলার সরঞ্জাম, ফুটবল, জাতীয় দলের বিমান টিকিট এবং লনমোয়ার। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বিডিও-র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নগদে এত বেশি লেনদেন হয়েছে যে পরে সেগুলোর হিসাব মেলানোই কঠিন।

আর এই সিদ্ধান্ত এসেছিল ওই সপ্তাহেই, যে সপ্তাহে বাফুফে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণ দেখিয়ে নারী দলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠায়নি।

টাকা এসেছিল। টাকা মাঠে পৌঁছায়নি।

এখন যে প্রশ্ন সবাই এড়িয়ে যায়, সেটা করি।

ফিফা এই ব্যবস্থা কেন সহ্য করে?

কারণ ফিফার কাঠামো ঠিক এই ফেডারেশনগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২১১টা সদস্য, ২১১টা ভোট। জুরিখে যিনি সভাপতি হতে চান, তার দরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর যে ফেডারেশনের নিজস্ব আয় নেই, যাদের বাজেটের প্রধান অংশ আসে ফিফার চেক থেকে, সেই ফেডারেশন সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটার।

একটা দেশের ফুটবল ফেডারেশন যদি সত্যিই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, নিজের লিগ থেকে আয় করতে শেখে, স্পনসর জোগাড় করে, স্বাবলম্বী হয়, তাহলে তারা জুরিখের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। তখন তারা স্বাধীনভাবে ভোট দেয়।

মানে সফল উন্নয়ন কর্মসূচির ফল হলো একজন ভোটার হারানো।

আমি বলছি না ফিফায় কেউ বসে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ছক কষে। বলার দরকারও নেই। সিস্টেমটা এমনভাবে বানানো যে ফলাফল একই থাকে। যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত, দুর্বল, নির্ভরশীল ফেডারেশন টিকে থাকে সেখানে ক্ষমতাসীন সভাপতির আসনও টেকে। উন্নয়ন এখানে লক্ষ্য নয়, উন্নয়ন এখানে ভাষা।

১৯১১ সালে মোহনবাগান খালি পায়ে খেলে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতেছিল, আর সেই জয় গোটা উপনিবেশে রাজনৈতিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল। ঢাকার মাঠে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের দিন শহর থেমে যেত, এটা আশি-নব্বইয়ের দশকের কথা, ইতিহাস নয়।

সংস্কৃতি ছিল। সংস্কৃতি নষ্ট হয়েছে। এবং যাদের ওই সংস্কৃতি রক্ষা করার কথা, তাদের একজনকে ফিফা লনমোয়ারের রসিদ জাল করার দায়ে নিষিদ্ধ করেছে।

টিকিটের দাম, বা ভালোবাসাকে ভেরিয়েবল বানানোর কৌশল
২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবার ডায়নামিক প্রাইসিং চালু করল।

ডায়নামিক প্রাইসিং মানে কী? বিমানের টিকিট বা হোটেলের ঘরের মতো, চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, চাহিদা কমলে দাম কমে। অ্যালগরিদম প্রতি মুহূর্তে দাম ঠিক করে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যখন আয়োজনের জন্য দরপত্র জমা দিয়েছিল, সেই নথিতে গ্রুপপর্বের টিকিটের প্রস্তাবিত দাম ছিল একুশ থেকে তিনশো তেইশ ডলার।

বাস্তবে কী হলো? সর্বনিম্ন দাম শুরু হলো ষাট ডলারে, উপরের সীমা ছয় হাজার। ফাইনালের সবচেয়ে সস্তা টিকিট চার হাজারের বেশি। রিসেল বাজারে ফাইনালের আসন উঠল অবিশ্বাস্য উচ্চতায়, কোনো কোনো রিপোর্টে তেত্রিশ হাজার ডলার পর্যন্ত।

ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ আর ভোক্তা সংগঠন ইউরোকনজিউমার্স মিলে ইউরোপীয় কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করল, বক্তব্য, ফিফা টিকিট বিক্রির একচেটিয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন শর্ত চাপিয়েছে যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কখনো গ্রহণযোগ্য হতো না। নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেলরা সমন পাঠালেন।

২০২২ বিশ্বকাপে সাতটা ম্যাচ দেখতে সবচেয়ে সস্তা স্তরে খরচ হতো প্রায় চোদ্দোশো পাউন্ড। ২০২৬-এ আটটা ম্যাচ দেখতে একই স্তরে লাগে পাঁচ হাজারের বেশি।

ডায়নামিক প্রাইসিং শুধু দাম বাড়ায় না। ডায়নামিক প্রাইসিং আপনার ভালোবাসাকেই দামের হিসাবে ঢুকিয়ে দেয়।

আপনি আর্জেন্টিনার সমর্থক। আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছে। আপনার আকুলতা এখন সর্বোচ্চ। অ্যালগরিদম ঠিক এই আকুলতাটা পড়তে পারে, এবং পড়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। মানে আপনি যত বেশি ভালোবাসেন, আপনার কাছে দাম তত বেশি।

পুরোনো ব্যবস্থায় ভালোবাসা ছিল অগ্রাধিকারের ভিত্তি। ক্লাবের সিজন টিকিটধারী, বহু বছরের সদস্য, তারা আগে সুযোগ পেত। নতুন ব্যবস্থায় ভালোবাসা হলো নিষ্কাশনের সূচক। যত গভীর, তত বেশি টানা যাবে।

সমর্থক এখানেই গ্রাহক হয়ে যায়। সমর্থক এমন একজন যে হারলেও আসে। গ্রাহক এমন একজন যার কাছ থেকে যতটা আদায় করা সম্ভব, ততটাই আদায় করা উচিত।

২৮ জুলাই, ২০২৬
তারপর গত মঙ্গলবার এল।

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে ১৯ জুলাই, নিউ জার্সিতে, স্পেন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। রিপোর্ট বলছে এই আসর থেকে রেকর্ড পনেরো বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ফাইনালের আগের সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কে ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সামনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বললেন, ফিফার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দিতে হবে।

নয় দিন পর, ২৮ জুলাই, প্রস্তাব এল।

নাম, ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ। সংক্ষেপে এফএফই। ফিফার বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট পরিচালনার পুরো ব্যবসা, মানে সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিটিং, লাইসেন্সিং, সব একটা আলাদা কোম্পানিতে ঢুকবে। ওই কোম্পানির প্রাথমিক মূল্যায়ন বিশ বিলিয়ন ডলার। বাইরের বিনিয়োগকারীরা কিনতে পারবেন বিশ শতাংশ পর্যন্ত সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব। উঠবে ৪.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। ফিফার ভাষ্যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ফিফারই থাকবে।

বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকবে বলে যে প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, সেটা প্রতিষ্ঠা করেছেন জশুয়া কুশনার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।

আর প্রস্তাবের বিনিময়ে সদস্যদের কী দেওয়া হচ্ছে?

ফিফা ফরওয়ার্ডের বরাদ্দ প্রতি অ্যাসোসিয়েশনে আশি লাখ ডলার থেকে বেড়ে হবে দুই কোটি, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের জন্য। ২০৩১ থেকে ২০৩৪ সালে দুই কোটি বিশ লাখ, তার পরের চার বছরে দুই কোটি চল্লিশ লাখ। এর ওপর ফিফা ফাস্ট ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম নামে ঐচ্ছিক আরেকটা তহবিল, যেখান থেকে প্রতিটা অ্যাসোসিয়েশন তাৎক্ষণিকভাবে পেতে পারে আরও দুই কোটি ডলার।

আর সিদ্ধান্তের সময়সীমা? ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।

ইনফান্তিনো সদস্যদের যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতে লেখা আছে, শর্ত পূরণ না হলে ফিফা পুরোনো ফরওয়ার্ড ৪.০ কর্মসূচিতেই চলবে, মানে প্রতি অ্যাসোসিয়েশনে প্রায় এক কোটি ডলার।

উয়েফা সঙ্গে সঙ্গে বিবৃতি দিয়েছে। বলেছে, ফিফা সমিতিগুলোকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, সমর্থন করো নয়তো এককালীন টাকা তুলে নেওয়া হবে। উয়েফার ভাষায়, এইটুকু জানলেই এই পরিকল্পনা সম্পর্কে আর কিছু জানার বাকি থাকে না।

তাদের মূল বিবৃতিতে ছিল আরও ধারালো কথা। ফুটবলের আত্মা আর প্রশাসন বেচাকেনার সম্পদ নয়। আমরা কেউ ফুটবলের মালিক নই। এটা ফিফার নিজের নয় যে বেচবে।

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রকাশ্যে বলেছেন, ফুটবল বিনিয়োগকারীদের নয়।

কনকাকাফ প্রশ্ন তুলেছে অন্য দিক থেকে। তারা তাদের ফিফা কাউন্সিল সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে জানতে চাইতে, ফিফার হাতে যে বিপুল রিজার্ভ জমা আছে, উন্নয়নের টাকা সেখান থেকে বাড়ানো যায় না কেন।

মোক্ষম প্রশ্ন। ২০২৪ সালের শেষে ফিফার হাতে রিজার্ভ ও নগদ মিলিয়ে ছিল প্রায় ৪.৭৬ বিলিয়ন ডলার। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে শেষ হওয়া বিশ্বকাপ এনেছে রেকর্ড আয়।

তাহলে বেচতে হচ্ছে কেন?

এক বাটি ডাল
বাইবেলের জেনেসিসে এষৌ ছিলেন ইসহাকের বড়ো ছেলে, জন্মসূত্রে পিতৃসম্পত্তির উত্তরাধিকারী। একদিন শিকার থেকে ফিরে ক্ষুধায় কাতর এষৌ দেখলেন ছোটো ভাই ইয়াকুব ডাল রান্না করছেন। ইয়াকুব বললেন, ডাল পাবে, বিনিময়ে জন্মাধিকার দিতে হবে। এষৌ রাজি হলেন।

ডাল ফুরিয়েছিল ওই বিকেলেই। উত্তরাধিকার আর কোনোদিন ফেরত আসেনি।

২১১টা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সামনে এখন যা রাখা হয়েছে, তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনা বলা যায় না। ভোট কেনা হচ্ছে, এইটুকুই।

ফিফার সংবিধান সংশোধন করতে হলে দরকার পঁচাত্তর শতাংশ সমর্থন। উয়েফার সদস্য পঞ্চান্ন, মোট সদস্য ২১১। মানে ইউরোপ একা আটকাতে পারে যদি বাকিরা তাদের পাশে থাকে, আর ইউরোপ একা হেরে যায় যদি বাকিরা না থাকে।

বাকিরা কারা? আফ্রিকার চুয়ান্ন, এশিয়ার সাতচল্লিশ, কনকাকাফের একচল্লিশ, ওশেনিয়ার এগারো, দক্ষিণ আমেরিকার দশ।

এদের বেশিরভাগের কাছে দুই কোটি ডলার বিশাল অঙ্ক। কারও কারও কাছে গোটা বছরের বাজেটের চেয়ে বড়ো।

১৯৭৪ সালে আভেলাঞ্জ ঠিক এই অঙ্ক কষে ৬২-৫২ ভোটে জিতেছিলেন। বাহান্ন বছর পর একই অঙ্ক আবার কষা হচ্ছে, শুধু চেকের সংখ্যাগুলো বড়ো হয়েছে।

ওই দুই কোটি ডলার যেসব ফেডারেশনের হাতে যাবে, তাদের অনেকের হিসাব ব্যবস্থার অবস্থা আমরা জানি। ফিফার নিজের নীতি কমিটি তা লিখিতভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একান্ন পৃষ্ঠায়।

মানে বিশ্বকাপের মালিকানা বিক্রি করে যে টাকা আসবে, তার একটা বড়ো অংশ এমন হাতে যাবে যেখান থেকে সেই টাকা মাঠ পর্যন্ত পৌঁছাবে না। আর ওই টাকার বিনিময়ে যে ভোট পাওয়া যাবে, সেই ভোট স্থায়ী।

লেনদেন তাই এরকম দাঁড়ায়: যা সবার, তার একটা অংশ চিরতরে বিক্রি হবে, আর বিক্রির অনুমোদন কেনা হবে এমন টাকা দিয়ে যা কোনোদিন খেলোয়াড়ের পায়ে পৌঁছাবে না।

থিসিউসের জাহাজ
ফিফার পক্ষ থেকে যুক্তি এসেছে, বিশ শতাংশ তো সামান্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ফিফারই থাকছে। খেলার নিয়ম, ক্যালেন্ডার, প্রতিযোগিতা, সব ফিফার হাতেই।

গ্রিকদের একটা পুরোনো ধাঁধা আছে। থিসিউসের জাহাজ যাদুঘরে রাখা ছিল। একটা করে পচা তক্তা বদলানো হতো। শেষ তক্তা বদলানোর পর সেটা কি আর সেই জাহাজ থাকে?

ধাঁধা শতাংশ নিয়ে নয়। ধাঁধা প্রথম তক্তা নিয়ে।

আজ পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছে, এই খেলার মালিক কেউ নয়। ফিফা নিজেকে কখনো মালিক বলেনি, বলেছে অভিভাবক, ট্রাস্টি। ট্রাস্টি সম্পত্তি দেখাশোনা করেন, বিক্রি করেন না।

এফএফই ঠিক এখানে হাত দিচ্ছে। এরপর থেকে সবাই জানবে, বিশ্বকাপের একটা দাম আছে, আর ওই দাম দিয়ে অংশ কেনা যায়।

দাম একবার লেখা হয়ে গেলে শতাংশ শুধুই আলোচনার বিষয়। আজ বিশ। চার বছর পর পঁচিশ, কারণ তখন উন্নয়নের জন্য আরও টাকা লাগবে। তারপর?

২০২১ সালে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আটচল্লিশ ঘণ্টায় ভেঙে পড়েছিল। কেন ভেঙেছিল? বোর্ডরুমে নয়, আদালতে নয়। ভেঙেছিল কারণ লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনালের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে গিয়েছিল। খেলোয়াড়রা মুখ খুলেছিল। ক্লাব একে একে সরে গিয়েছিল সমর্থকদের চাপে।

এটাই একমাত্র শক্তি যা এখনও পুরোপুরি কেনা যায়নি।

উয়েফা এখন যে ভাষায় কথা বলছে, খুব মহৎ শোনাচ্ছে। আমরা কেউ ফুটবলের মালিক নই। সত্য কথা। কিন্তু যারা বলছে, তারা নিজেরাই চ্যাম্পিয়নস লিগের টাকার পাহাড় বানিয়ে লিবার্তাদোরেসকে ভিক্ষুক বানিয়েছে, বসমান-পরবর্তী শ্রমবাজারের সুবিধা পুরোটা নিয়েছে, আর আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ষোলো বছরের ছেলে তুলে এনেছে দশকের পর দশক।

উয়েফা এই লড়াইয়ে ফুটবলের আত্মার পক্ষে দাঁড়ায়নি। উয়েফা দাঁড়িয়েছে নিজের একচেটিয়া অবস্থানের পক্ষে। দুটো একসঙ্গে ঘটছে বলে দ্বিতীয়টাকে খুব বেশি ক্ষতিকর মনে হচ্ছে না।

যা ফেরত আসে না
ফিরে যাই ব্ল্যাকবার্নে।

১৮৮৩ সালের ওই দলের কথা ভাবুন। তাঁতি, ঢালাইকর্মী, ঘাটের মজুর। লন্ডনে গিয়ে ব্যারনেট আর ল্যাটিনের অধ্যাপকদের হারিয়ে ট্রফি নিয়ে ফিরেছিল, ব্রাসব্যান্ড বাজিয়ে গোটা শহর তাদের নিতে এসেছিল স্টেশনে।

ছয় বছরের মাথায় ক্লাবটা আর ছিল না।

তারা হেরেছিল কারণ তারা জিতেছিল। তাদের জয় প্রমাণ করেছিল শ্রমিকের দল ভদ্রলোকের দলকে হারাতে পারে, আর ওই প্রমাণের পর টাকা ঢুকল, আর টাকা প্রথমেই খেয়ে ফেলল যারা দরজাটা খুলেছিল তাদের।

এরপরও একই ঘটনা বারবার ঘটেছে। প্রতিবার ফুটবলের সাধারণ মালিকদের বলা হয়েছে, তোমরা আরও পাবে। প্রতিবার তারা কম নিয়ে ঘরে ফিরেছে।

পেশাদারিত্ব এসেছিল খেলোয়াড়ের অধিকারের নামে। এসে বানিয়েছে ট্রান্সফার বাজার। বসমান রায় হয়েছিল একজন খেলোয়াড়ের স্বাধীনতার জন্য। রায়ের ফল, তিন হাজার ব্রাজিলিয়ান দেশছাড়া। টিপিও নিষিদ্ধ হয়েছিল খেলোয়াড়দের বাঁচাতে। ফল, দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাবের অক্সিজেন বন্ধ। বিশ্বকাপ আটচল্লিশ দলে বাড়ানো হয়েছিল বেশি দেশকে সুযোগ দিতে। ফল, ইতিহাসের সবচেয়ে দামি টিকিট আর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আয়।

এখন বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপের বিশ শতাংশ বিক্রি করলে ফুটবলের উন্নয়ন হবে।

আপনার সন্দেহ করার অধিকার আছে। শুধু অধিকার নয়, একশো চল্লিশ বছরের প্রমাণ আছে।

ফুটবল টিকে আছে কারণ ফুটবল খেলতে টাকা লাগে না। একটা বল, দুটো ইট, আর যত ইচ্ছা মানুষ। শাহবাগের মোড়ে, সাভারের ধুলোমাখা মাঠে, রোজারিওর গলিতে, লাগোসের বস্তিতে, কোথাও কারও অনুমতি লাগে না। এই একটা কারণেই ক্রিকেট, বাস্কেটবল, টেনিস, কেউ ফুটবলের ধারেকাছে আসতে পারেনি। বাকি সব খেলার জন্য কিছু না কিছু কিনতে হয়।

যা কিনতে হয় না, তার মালিক কেউ নয়। আর যার মালিক কেউ নয়, সেটাই সবার।

জুরিখ এখন এই বাক্যের ওপর কলম চালাচ্ছে।

ছোট্ট শহরের যে ছেলেটা আজ বিকেলে মাঠে নামবে, তার এসবের কিছুই জানার কথা না। সে জানে না তার খেলার একটা দাম লেখা হয়েছে বিশ বিলিয়ন ডলার। জানার দরকারও নেই।

শুধু ভয় এই যে, যেদিন সে জানবে, সেদিন হয়তো তাকে জিজ্ঞেস করার মতো কেউ আর থাকবে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

I Have a plan / মুচলেকা দিয়ে যাওয়া এবং মুচলেকা দিয়ে ফেরত আসা সরকারের রাষ্ট্র ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৫:৪৬





ওয়াশিংটন – যদিও তিনি এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন যার বৈধতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে, এবং শক্তিশালী মহলের প্ররোচনায় যাদের হস্তক্ষেপ কখনোই সন্দেহের বাইরে ছিল না, তারেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১১




আমরা প্রায়ই বলি, অমুক এভারেস্ট জয় করেছেন, তমুক কে-টু জয় করেছেন, অমুক অন্নপূর্ণা জয় করেছেন। শব্দটি এতটাই প্রচলিত যে আমরা আর ভাবিই না—আসলে কি পাহাড়কে জয় করা যায়?

আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবার ও শরীরে ঢুকছে?

লিখেছেন কাবিল, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৪


মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastic) হলো খুব ছোট প্লাস্টিকের কণা। সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর থেকেও অনেক ক্ষুদ্র কণা আছে—সেগুলোকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এনসিপিকে মারছে কেন? (অথবা) এনসিপি মার খাচ্ছে কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০


(ইহা নাকি এনসিপিকে পিষিয়ে মারবে!)

এনসিপিকে মারছে কেন (?) অথবা এনসিপি মার খাচ্ছে কেন? প্রশ্ন দুটো হলেও আদতে প্রশ্ন একটাই উত্তরও একটাই। বিগত ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ খুনি হাসিনার আমলে যাহারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×