somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহানায়কের চোখ দিয়ে অভিনয়

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পরপর সাতটা সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়ার পর ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে ফ্লপ মাস্টার জেনারেল নামে ডাকা শুরু করলো। অথচ তিনিই হয়ে গেলেন মহানায়ক। সেই যে মহানায়ক উত্তম কুমার ডাকা হলো, তারপর ওই শব্দ আর কারও জন্য ব্যবহার করা যায়নি।

কথাটা কতদূর সত্যি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ রেখে গেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে সারা জীবন উত্তম কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সৌমিত্র বলেছিলেন, উত্তম কুমার যদি চোখের সামনে একটা অপরাধ করে তারপর ওই হাসিটা দিতেন, তিনি বিশ্বাস করে নিতেন লোকটা নির্দোষ।

মহানায়ক নামটা তাঁকে প্রথম দিয়েছিল উল্টোরথ পত্রিকা, ১৯৫৯ সালে, চাওয়া পাওয়া মুক্তি পাওয়ার পর। ততদিনে তাঁর বয়স তেত্রিশ।

১৯৪৭ সালে মায়াডোর নামের একটা হিন্দি সিনেমায় এক্সট্রা হিসেবে পাঁচ দিন কাজ করেছিলেন, ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওতে। সিনেমাটা মুক্তিই পায়নি।

এরপর যা হলো, সেটা বাংলা সিনেমার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলোর একটা। ১৯৪৯ সালের কামনা-তে তিনি প্রথমবার নায়ক, নাম দিলেন উত্তম চ্যাটার্জি, সিনেমা চললো না। ১৯৫০ সালের মর্যাদা-তে নাম বদলে হলেন অরূপ কুমার, ওখানেই জীবনে প্রথম গানে ঠোঁট মেলালেন, এবারও সিনেমা চললো না। ১৯৫১ সালে সহযাত্রী-তে পাহাড়ি সান্যালের পরামর্শে তিনি প্রথমবার নিজের নাম লিখলেন উত্তম কুমার। ওই সিনেমার সেটেই তাঁর পরিচয় হলো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সিনেমা এবারও চললো না। ওরে যাত্রী ডুবলো, নষ্টনীড় ডুবলো, সঞ্জীবনী ডুবলো। ছাব্বিশ বছর বয়সে পৌঁছে তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন অভিনয় ছেড়ে দেবেন।

তখন তাঁকে দেখতে পেলেন নির্মল দে। ১৯৫২ সালের বসু পরিবার-এ তিনি সুখেন চরিত্রে নিলেন ওই ফ্লপ মাস্টার জেনারেলকে। ঐ বছরের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমাগুলোর একটা হলো, আর উত্তম কুমার পোর্ট কমিশনার্সের চাকরি ছেড়ে দিলেন।

পরের বছর নির্মল দে তাঁকে আবার নিলেন সাড়ে চুয়াত্তর-এ, এবং প্রথমবার তাঁর বিপরীতে দাঁড় করালেন সুচিত্রা সেনকে। সেই সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে চললো একটানা এক বছরের বেশি সময় ধরে। প্যারাডাইস সিনেমা হল সারা বছর হিন্দি সিনেমা দেখাতো, সাড়ে চুয়াত্তর ঐ হলের প্রথম বাংলা সিনেমা।

১৯৫৪ সালের অগ্নিপরীক্ষা মুক্তি পেল তাঁর সাতাশতম জন্মদিনে। প্রচারের জন্য প্রযোজকেরা পোস্টারে ছাপালেন উত্তম আর সুচিত্রার নিজের হাতের সই, সঙ্গে ক্যাপশন, আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসার সাক্ষী।

১৯৫৭ সাল। কলকাতার চৌরঙ্গীতে মেট্রো সিনেমা তখন শহরের সবচেয়ে অভিজাত হল। এমজিএম-এর সঙ্গে যুক্ত ওই আর্ট ডেকো প্রেক্ষাগৃহে শুধু ইংরেজি সিনেমা চলতো, সাহেব-মেম আর শহরের উঁচুতলার দর্শকের জন্য। বাংলা সিনেমার ওখানে ঢোকার অনুমতি ছিল না। সেই বছরের নভেম্বরে হল কর্তৃপক্ষ নিজেদের নিয়ম ভেঙে প্রথমবার একটা ভারতীয় সিনেমা চালালো। নাম চন্দ্রনাথ, নায়ক উত্তম কুমার, নায়িকা সুচিত্রা সেন।

মেট্রোর প্রধান প্রজেকশনিস্ট ছিলেন সৎকড়ি চট্টোপাধ্যায়। রোগা, লম্বা, গম্ভীর মানুষ। বছরের পর বছর ধরে ওই পর্দায় আলো ফেলার কাজ তিনিই করে এসেছেন, আর সেই নভেম্বরে প্রজেকশন রুমের ছোট জানালা দিয়ে তিনি পর্দায় দেখলেন নিজের ছেলেকে।

কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়ার শেষ কাজ চোখ আঁকা। শিল্পী আগে খড় বাঁধেন, মাটি চাপান, রং দেন, আর সবার শেষে সরু তুলি দিয়ে চোখ আঁকেন। ওই আচারের নাম চক্ষুদান। চোখ আঁকার আগে অবধি ওটা মাটির মূর্তি, চোখ আঁকার পর ওটা দেবী।

উত্তম কুমারকে আজও মনে রাখা হয় রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে, অথচ তালিকাটা একবার সাজালে দেখা যায় নায়ক হিসেবে তাঁকে যতটা মনে রাখা হয়, অভিনেতা হিসেবে তাঁর কাজ তার চেয়ে অনেক বড়।

১৯৫৫ সালের হ্রদ-এ তিনি স্মৃতিভ্রংশ রোগী, আর ওই অভিনয়ের জন্যই জীবনের প্রথম বিএফজেএ পুরস্কার। ১৯৫৬ সালের সাহেব বিবি গোলাম-এ তিনি ভাঙতে থাকা জমিদারির ভেতরের মানুষ, আর ওই সিনেমা দেখে গুরু দত্ত আর আবরার আলভি হিন্দিতে বানালেন সাহেব বিবি অউর গুলাম। ১৯৫৭ সালের হারানো সুর-এ আবার স্মৃতি হারানো লোক, এবং সিনেমাটা তিনি নিজেই প্রযোজনা করলেন অজয় করের সঙ্গে আলোছায়া প্রোডাকশন খুলে। ১৯৫৯ সালের বিচারক-এ তিনি নিজের অতীতে তাড়া খাওয়া এক জজ। ১৯৬০ সালের খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন-এ, রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে বানানো, তিনি একজন অনুগত ভৃত্য। একই বছর কুহক-এ প্রথমবার নেতিবাচক চরিত্রে নামলেন, সিনেমাটা চার্লস লটনের দ্য নাইট অফ দ্য হান্টার থেকে অনুপ্রাণিত।

১৯৬১ সালে তপন সিংহের ঝিন্দের বন্দী-তে তিনি ট্রিপল রোলে, দ্য প্রিজনার অফ জেন্ডা থেকে নেওয়া গল্পে। ওখানেই প্রথমবার একই ফ্রেমে এলেন উত্তম কুমার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, একজন নায়ক আর একজন খলনায়ক হিসেবে। ওই তলোয়ারের লড়াইয়ের দৃশ্য আজও আলোচনায় আসে।, কারণ ওখানে দুইটা আলাদা অভিনয়পদ্ধতি মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। সৌমিত্র এসেছিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর ঘরানা থেকে, আবৃত্তি আর উচ্চারণের নিখুঁত তালিম নিয়ে। উত্তম কুমার অনেক সময় মুখের সামান্য নড়াচড়া আর চোখের পাতার ওঠানামা দিয়েই অনেক কথা বলে দিতেন।

১৯৬৩ সালের ভ্রান্তিবিলাস শেক্সপিয়রের কমেডি অফ এররস থেকে, যেখানে উত্তম কুমার আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় দুইজনেই ডাবল রোলে, মালিক আর ভৃত্যের দুই জোড়া যমজ হিসেবে। একই বছরের দেয়া-নেয়া ছিল অভিনেতা হিসেবে তাঁর একশোতম সিনেমা। ১৯৬৫ সালের থানা থেকে আসছি-তে তিনি পুলিশ। ১৯৬৮ সালের চৌরঙ্গী শঙ্করের উপন্যাস থেকে। ১৯৬৯ সালের অপরিচিত দস্তইয়েভস্কির দ্য ইডিয়ট থেকে। ১৯৭২ সালের স্ত্রী-তে তিনি নীতিভ্রষ্ট এক জমিদার, আর ওই চরিত্রের জন্য পেলেন ষষ্ঠ বিএফজেএ।

১৯৭৫ সালের সন্ন্যাসী রাজা তৈরি হলো ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা থেকে, যেখানে তিনি সেই রহস্যময় সাধু, যে রাজবাড়িতে ফিরে এসে দাবি করে সে-ই মৃত বলে ধরে নেওয়া রাজা। একই বছরের বাঘ বন্দী খেলা-তে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, আর অগ্নীশ্বর-এ একরোখা, আপসহীন এক ডাক্তার।

তাঁর জীবনের শেষ প্রধান চরিত্র মুক্তি পেয়েছিল মৃত্যুর পর, ১৯৮১ সালের প্লট নাম্বার ফাইভ-এ। ওখানে তিনি হুইলচেয়ারে বসা এক সিরিয়াল কিলার।

১৯৬১ সালের সপ্তপদী-তে কৃষ্ণেন্দু আর রিনা ব্রাউন কলেজের অনুষ্ঠানে ওথেলো অভিনয় করে। ওই অংশটুকু আলাদা করে পরিচালনা করেছিলেন উৎপল দত্ত। পর্দায় ওথেলোর মুখে যে ইংরেজি সংলাপ শোনা যায়, ওটা উত্তম কুমারের গলা নয়, উৎপল দত্তের। ডেসডিমোনার গলা সুচিত্রা সেনের নয়, জেনিফার কেন্ডালের। উত্তম কুমার শুধু ঠোঁট মিলিয়েছেন, এবং এতটাই নিখুঁতভাবে মিলিয়েছেন যে দৃশ্যটা বাংলা সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটা হয়ে টিকে আছে।

গানের হিসাবও একই। সহযাত্রী-র সেটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রায় দুই দশক ধরে পর্দায় উত্তম কুমার গানে বাঙালি যে গলা শুনেছে, ওটা হেমন্তের। ১৯৫৫ সালের শাপমোচন-এর পর ওই জুটি বাংলা সিনেমার একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ালো। মানুষ বলতো উত্তমের গান।

গান তিনি নিজেও গেয়েছেন। ১৯৫৬ সালের নবজন্ম-তে দেবকী বসুর পরিচালনায় তিনি ছয়টা বৈষ্ণব পদাবলী গেয়েছিলেন, সুর করেছিলেন নচিকেতা ঘোষ। ১৯৬৬ সালের কাল তুমি আলেয়া-তে তিনি নিজেই সঙ্গীত পরিচালক, আর ওই সিনেমায় হেমন্তের গাওয়া জয় চলে যায় গানটার সুর তাঁর নিজের করা।

সত্যজিৎ রায় নায়ক-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন দার্জিলিঙে বসে, শুটিংয়ের বাইরের সময়ে। লেখার সময় মাথায় ছিলেন উত্তম কুমার, তবে অভিনেতা হিসেবে নয়। রায়ের ভাষায়, একটা ফেনোমেনন হিসেবে। লেখা শেষ করে তিনি চিত্রনাট্য পড়ে শোনালেন তপন সিংহকে আর বললেন, এই চরিত্রে তিনি উত্তমকেই নেবেন। তপন সিংহ জবাব দিলেন, উত্তম ছাড়া এই চরিত্র আর কেউ করতে পারবে না।

এর আগেও একবার রায় তাঁকে ডেকেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ঘরে বাইরে নিয়ে রায়ের একটা পরিকল্পনা ছিল, সেখানে সন্দীপের চরিত্রে উত্তম কুমারকে ভাবা হয়েছিল। তিনি রাজি হননি, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল চরিত্রটা কোনো প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার করা উচিত।

নায়ক-এর ক্যামেরায় ছিলেন সুব্রত মিত্র, রায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কাজ। সিনেমার বেশিরভাগ অংশ শুট হয়েছে একটা চলন্ত ট্রেনের কামরার সেটে। ষোড়শ বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নায়ক ইউনিক্রিট পুরস্কার পেল, আর ফোর্বস পরে ভারতীয় সিনেমার সেরা পঁচিশটা অভিনয়ের তালিকায় ওই কাজটা রাখলো। ইন্দিরা সিনেমায় প্রিমিয়ারের দিন ভিড়ের চাপে তাঁর গায়ের জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল।

পরের বছর, ১৯৬৭ সালে, রায়ের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় কাজ চিড়িয়াখানা, যেখানে তিনি ব্যোমকেশ বক্সী। একই বছর মুক্তি পেল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, পর্তুগিজ-বাঙালি কবিয়াল হেনসম্যান অ্যান্টনির জীবন নিয়ে বানানো সিনেমা। ওই দুই কাজের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান পেলেন। ভারত সরকার সেবারই এই বিভাগটা চালু করে, ফলে সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কারের প্রথম প্রাপক উত্তম কুমার।

চরিত্রের ভেতরে তিনি কতদূর ঢুকতেন, তার একটা উদাহরণ তাঁর ভাই তরুণকুমার নিজের বইয়ে লিখে গেছেন। ১৯৫৯ সালের মরুতীর্থ হিংলাজ-এ একটা স্বপ্নদৃশ্য ছিল, যেখানে উত্তম কুমারের চরিত্র রাগের মাথায় সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রের গলা টিপে ধরে। শুটিংয়ের সময় তিনি এতটাই ঢুকে গিয়েছিলেন যে সত্যি সত্যি গলা চেপে ধরেন। পরে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন সারাদিন শুটিংয়ের পরেও তিনি মাঝরাতে উঠে একা একা রিহার্সাল দিতেন।

১৯৭৫ সাল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বছর। ওই বছর তাঁর ছয়টা সিনেমা মুক্তি পায়, মৌচাক, সন্ন্যাসী রাজা, অগ্নীশ্বর, নগর দর্পণে, বাঘ বন্দী খেলা আর আমি সে ও সখা। ছয়টাই সফল, এবং ওই বছরের সবচেয়ে বেশি আয় করা বাংলা সিনেমাগুলো পরপর তাঁরই।

কাজ শুধু ক্যামেরার সামনে ছিল না। ১৯৬৬ সালের শুধু একটি বছর দিয়ে তিনি পরিচালনায় নামেন। ১৯৭৩ সালের বন পলাশীর পদাবলী তাঁর নিজের বলা স্বপ্নের প্রকল্প, রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস থেকে, যেখানে তিনি একইসঙ্গে পরিচালক, সংলাপ লেখক, প্রযোজক আর আবহসঙ্গীতের কারিগর। ওই সিনেমা ১৯৭৩ সালের সবচেয়ে বেশি আয় করা বাংলা সিনেমা হলো, আর তাঁর অনুরোধে বড় শিল্পীরা কেউ ওখানে পারিশ্রমিক নেননি।

১৯৭৯ সালে বন্যার্তদের জন্য তিনি একটা চ্যারিটি ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করেছিলেন, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বনাম বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বাংলার ক্যাপ্টেন তিনি, বোম্বের ক্যাপ্টেন দিলীপ কুমার।

হিন্দু মন্দিরে দেবতাকে দেখতে যাওয়াকে বলা হয় দর্শন। কিন্তু দর্শন শুধু একদিকে তাকানো নয়। ভক্ত যেমন দেবতাকে দেখেন, বিশ্বাস অনুযায়ী দেবতাও তাঁকে দেখেন। এই জন্যই প্রতিমার চোখ আঁকার কাজ এত গুরুত্বপূর্ণ। মূর্তি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর, সবশেষে আঁকা হয় চোখ।

১৯৮০ সালের পর বাংলা সিনেমা অনেক নতুন নায়ক পেয়েছে। কেউ হয়তো সংলাপ আরও ভালো বলতেন, কারও গলা ছিল আরও জোরালো, কেউ অভিনয়ের জন্য শরীর নিয়েও অনেক বেশি পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু উত্তম কুমারের জায়গা কেউ নিতে পারেননি।

কারণ শুধু একজন ভালো অভিনেতা বা জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠার ব্যাপার এখানে ছিল না। তিন দশক ধরে বাঙালি তাঁকে পর্দায় দেখেছে। আর উত্তম কুমারও সেই পর্দা থেকে দর্শকের দিকে তাকিয়েছেন। এই সম্পর্ক তৈরি হতে অনেক বছর লেগেছিল।

কণ্ঠস্বরের বদলি হয়। চেহারারও বদলি আসে। কিন্তু একজন অভিনেতা আর দর্শকের মধ্যে এই যে চোখে চোখ রাখার সম্পর্ক, সেটা নতুন করে তৈরি করা যায় না।

আজ ‘পিঞ্জর’-এর সেই দৃশ্যটা আবার দেখলে অবাক হতে হয়। ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে উত্তম কুমার শুধু তাকিয়ে আছেন। কোনো সংলাপ নেই। সামনের লোকটাও চুপ করে আছে, কিন্তু বোঝা যায়, সে ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ছে। দৃশ্যে যেন তেমন কিছুই ঘটছে না। অথচ চোখ সরানো যায় না। ১৯৭২ সালে এই অভিনয়ের জন্য তিনি বিএফজেএ-র সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান, জীবনে পঞ্চমবার।

সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, বাংলা সিনেমার একটা আলো নিভে গেল, এমন নায়ক আর হয়নি, হবেও না। দিলীপ কুমার বলেছিলেন, আমাদের সবার মধ্যে উত্তমই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। রাজ কাপুর বলেছিলেন, ভারতের স্মার্ট, আধুনিক নায়ক। তপন সিংহ বলেছিলেন, প্রতিভা নিয়ে অনেকেই জন্মায় আর পরিশ্রমের অভাবে সেটা ঢাকা পড়ে যায়, উত্তম কুমারের দুইটাই ছিল।

১৯৫৭ সালের সেই নভেম্বরে মেট্রোর প্রজেকশন রুমে বসে সৎকড়ি চট্টোপাধ্যায় কী ভেবেছিলেন, আমরা জানি না। তিনি সারা জীবন অন্ধকার ঘরে বসে পর্দায় আলো পাঠিয়েছেন। তাঁর ছেলে সেই আলোর ভেতর দাঁড়িয়ে তিন দশক ধরে বাংলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আর বাংলা তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:২৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, ছেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২১

মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। কুমিল্লার এমনই একটি ঘটনার কথা বলেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা -

কুমিল্লা শহরের উত্তর দিকে রসুল আহমদ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের সীমা (জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা!)

লিখেছেন আবু সিদ, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০

“সুন্দর শব্দ মধুচক্রের মতো, আত্মার জন্য সুমিষ্ট এবং অস্থির জন্য আরোগ্য।” — প্রবচন ১৬:২৪, বাইবেল

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হলেই হাজারো শব্দ উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আমাদের কানে। দূর ও নিকট... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন কর্মী ও তার ন্যায্য পাওনা

লিখেছেন কিরকুট, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিনিয়োগ, মুনাফা, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্যোক্তার ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মীর শ্রম নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×