somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

বিদ্রহীসূত
পাঠকের মুগ্ধতাই আমার লেখার প্রেরণা, সত্য প্রচার আমার লেখার উদ্দেশ্য আর মিথ্যাকে বিনাশ করে দিকেদিগন্তে সত্যের আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণই আমার লেখার চূড়ান্ত লক্ষ্য।

আমি একজন আমলা নাকি একটি জানোয়ার?

১১ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৪:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি এখন অনেক বড়। সরকারি আমলা। অনেক বড় বড় ডিগ্রি আমার ঝোলাতে। বাড়ি, গাড়ি গণ্ডায় গণ্ডায়। বিদেশি ব্যাংকে বেহিসাবী ডলার। এক সিগনেচারেই ঘটাতে পারি তুলকালাম কাণ্ড। সরকার আমার হাতের পুতুল, আমি যে বাসুদ করি (বাসুদ= বাংলাদেশ সুবিধাবাদী দল, যখন যে দলই ক্ষমতায় আসুক আমি সে দল করি)। মিডিয়া আমাদের ব্যাপারে নির্বাক, তাকে সযতেœ পকেটে রেখেছি। আমার অনেক ক্ষমতা। আন্তর্জাতিক লবি করে চলি যে। আমার ব্যাপারে একটি উদাহরণ অনেকেই বলে, “গোবরেও পদ্মফুল ফোটে।” কারণ আমার বাবা অত্যন্ত দরিদ্র। আমার সামনে অবশ্য কেউ এই উদাহরণ বলতে পারে না, আমি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে যাব কিনা তাই। দীন অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করা আমার একদম ভালো লাগে না। নিন্দুকেরা বলে আমার এই অর্থকাড়ি সব অবৈধ। আমি ঘুষ খাই, দেশের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশি ব্যাংকে জমা করি। দেশের মানুষের কথা না ভেবে নিজ স্বার্থেই শুধু কাজ করি, নিজ স্বার্থে দেশকে বিক্রি করে দিতেও প্রস্তুত আছি। আমার বাবার অভিযোগ- আমি নাকি শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়ঘেঁষা, অথচ বাবা-মা-ভাই-বোনদের দিকে দৃষ্টি কম। আরে বাবা, আমার এই উন্নতির পেছনে তাদের তো বিরাট অবদান, এখনও তারা অনেক ধনী, ক্ষমতাবান। আমার বাবা তো আমার দেওয়া অর্থ স্পর্শও করে না। ঐযে- তার একটা ছেলে আছে, আমার ছোট ভাই, কী-না কি করে, তার উপার্জনেই নাকি চলে যায়। উচ্চাকাক্সক্ষা নেই, দরিদ্র মানসিকতা এখনো যায় নি তাদের।
আমি কারো অভিযোগে কান দিই না। এক’শ কোটি টাকার কাজ যদি ক্ষমতাবলে আমি কাউকে পাইয়ে দিই তবে কি দু’-এক কোটি টাকা আমার পাওনা হয় না? আমি তো তাদের কাছে চাচ্ছি না, তারা এমনিতেই উপঢৌকন হিসাবে দিচ্ছে। কেউ টাকা দিচ্ছে, কেউ ফ্ল্যাট দিচ্ছে, কেউ গাড়ি দিচ্ছে- এই আর কি। তাছাড়া আমি চলবই বা কিভাবে বলুন? দেশের যে হাল-হকিকত, এখানে কি আর লেখা-পড়া হবে? এজন্য আমার স্ত্রী-সন্তানকে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়েছি, সেখানকার জীবন-যাপন, বাচ্চাদের ভালো স্কুলে পড়া, তাদেরকে মাসে মাসে দেখতে যাওয়া- কত খরচ! তাছাড়া সারাজীবন কি আর এখানে থাকব, রিটায়ারমেন্টের পরে তো পার্মানেন্টলি সেট্ল করব ওখানেই, সেখানেই তাই বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স করছি। শুধু আমিই তো করছি না, আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, নিুপদস্থরা সকলেই সে চেষ্টাই করে, তাহলে আমি নই কেন?
গত কয়েকদিন আগে বাবা আমাকে আবেগময় একটি চিঠি দিয়েছে। হয়তো ভেবেছে আমি আবেগে গলে যাব। তার আবেগ আমায় কিছুটা স্পর্শ করেছিল বটে, তবে তা ক্ষণিকের জন্য। এ সমস্ত আবেগ-টাবেগের আমার কাছে কোনো মূল্য নেই। বাবা লিখেছে-
বাবা, ভালোবাসা নিও। দাদুভাই ও বউমাকেও স্নেহ দিও। ওদের তো আর গ্রামে আনলে না কখনো, খুব দেখতে ইচ্ছে হয়। তুমিও তো আসতে পার মাঝে-মধ্যে বুড়ো বাবা-মাকে দেখতে। ভাই-বোন, বাল্যবন্ধু, গ্রামবাসী, গ্রাম, দেশ, নদী, গ্রামের রাস্তা, মাঠ-ঘাট, পুরোনো স্মৃতির জায়গাগুলি তোমাকে আকর্ষণ করে না, এগুলিতে তোমার কোনো অনুভূতি নেই জানি কিন্তু বাবা-মাকেও কি ভুলে গেলে? তোমার মা খুব অসুস্থ হয়েছিল, অপারেশন করিয়েছি। এখন সুস্থ। তুমি যখন স্কুলে পড়তে তখন তোমার মা প্রায় দিনই নিজের ঔষধ কেনার টাকা তোমার টিফিন কিনতে দিয়ে দিত। সে ভাবতো- ছেলে যখন অনেক বড় হবে তখন সেই সুখে অসুখ এমনিই ভালো হয়ে যাবে। যাইহোক, সেই পুরোনো রোগটিই খুব বেড়েছিল। অসুস্থ অবস্থায় তোমার মা তোমাকে খুব দেখতে চেয়েছিল। ফোন করে তোমাকে জানানোর চেষ্টাও করেছিলাম, তুমি হয়ত সে খবর পাও নি।
তোমার ছোটভাই কঠোর পরিশ্রমী হয়েছে। আমার সাথে মাঠে কাজ করে। সে অনেক পরিশ্রম করে এক খণ্ড জমিও কিনেছিল। সেই জমি বিক্রি করেই তোমার মায়ের অপারেশন হয়েছে। মায়ের জন্য এটুকু করতে পেরে তোমার ভাই যে কী খুশি হয়েছে তা প্রকাশ করবার মতো ভাষাজ্ঞান যে আমার নেই।
ছোটবেলায় তোমার বোনের একজোড়া রূপোর নুপুরের খুব শখ ছিল। সেজন্য অনেক কষ্টে সে মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়েছিল, পরে নিজের শখটুকু মাটিচাপা দিয়ে সেই টাকায় তোমার জন্য কলেজব্যাগ কিনে দিল। তোমার বন্ধুরা, পাড়া-প্রতিবেশীসহ গ্রামের সবাই তোমার জন্য অনেক করেছে। যারা কিছু করতে পারে নি তারা অন্তত তোমার জন্য দোয়া করেছে। গ্রামের মানুষগুলি তোমার কাছে নিজ স্বার্থে কিছু চায় না, তারা শুধু চায় তুমি গ্রামের জন্য কিছু কর, দেশের জন্য কিছু কর। তারা অবশ্য এখন সেটিও বোধহয় চায় না। তারা তোমাকে বুঝে গেছে। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণাই করে। তোমার মা, বোন, ভাই, গ্রামবাসী, হয়ত গ্রামীন পথ-ঘাট-নদী, গ্রামের মাটি সবাই তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। এই ঘৃণা আমাকে কষ্ট দেয়।
আমি তোমাকে ধর্মজ্ঞান দিয়েছি, দেশপ্রেম শিখিয়েছি, মানুষের কল্যাণ করা শিখিয়েছি, প্রতিবেশীর প্রতি আচরণ, পরিবারের প্রতি কর্তব্য, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব সব শিখিয়েছি। নিজের রক্ত পানি করা অর্থে তোমাকে শিক্ষিত করেছি। কোন উচ্চতর শিক্ষা পেয়ে তুমি আমার শিক্ষাগুলো ভুলেই গেলে? ভেবেছিলাম তুমি অনেক বড় মানুষ হবে। বড় ঠিকই হলে কিন্তু মানুষ হলে না।
একসময় খুব বড় আফসোস ছিল- তোমার ছোট ভাই-বোনের লেখাপড়া শেখাতে পারলাম না। তোমার লেখাপড়ার পেছনেই আমার উপার্জনের প্রায় সবটুকু খরচ হয়ে যেত। এখন মনে হয় খুব ভালো হয়েছে, এই উচ্চশিক্ষা ওদেরকেও অমানুষ করে তুলত। ওদের কাছে অন্তত আমার শিক্ষাটুকু আছে।
তোমার অর্থের প্রতি বিন্দু পরিমাণ আশাও আমাদের নেই। তোমার বিত্ত-বৈভবের মোহ কখনো আমাকে স্পর্শও করেনি। শুধু তোমার মায়ের একটি প্রার্থনা ছিল তোমার প্রতি- তাই চিঠিটি লিখতে বসেছিলাম। তোমার মা বলেছে- “দেশ মাতা অনেক উদার, অনেক বড়। তাই যারা দেশকে কুরে কুরে খায়, দেশকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায় সেই অকৃতজ্ঞ সন্তানদেরকেও দেশ মাতা নিজের বুকে আগলে রাখে। কিন্তু আমি এত উদার হতে পারলাম না। তাই তোমার ছেলেকে বলে দিও- জীবদ্দশায় যে মাকে দেখল না, মৃত্যুর পরে তাকে দেখতে আসার বিশেষ প্রয়োজন নেই।”
ভালো থেকো।
তোমার বাবা।
আবার চোখে জল চলে আসলো। আবেগ আমায় ছুঁয়ে দিল। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমি সত্যিই সরকারি আমলা হয়ে গেছি, আমি একটি জানোয়ার হয়ে গেছি।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৪:১৩
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামু একটি ছোট নৌকা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫



একটা ছোট নৌকা, পাল তুলে, পাড়ি দিচ্ছে -
অন্তহীন তারার রাস্তা পেরিয়ে।
পেরোচ্ছে গ্রহ, ধূমকেতু, ছুটন্ত আগুনের টুকরো,
দূরে কোথাও ধাক্কা লাগে, তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায়।
ধীরে, খুব ধীরে এগোয় নৌকা;
তবু এগোয়।

নৌকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×