
আপনি একজন মুসলমান, হৃদয়ের মধ্যে দৃঢ়ভাবে লালন করছেন ধর্মের প্রতি বিশ্বাস। আপনাকে মারলে, নির্যাতন করলে, কপালে অস্ত্র ধরে মৃত্যুর ভয় দেখালে আপনি কি আপনার ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করবেন? আপনার সামনে বহু মুসলিমকে যদি এভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয় তবে কি আপনি ভয়ে ভীত হয়ে ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করবেন? বেশিরভাগ মানুষই তা করবে না। একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে সে ধর্ম ত্যাগে বাধ্য হলেও নতুন ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা ও বিশ্বাস কোনোটাই থাকবে না বরং বিশ্বাসগতভাবে সে পূর্বের ধর্ম ইসলামের প্রতিই আকৃষ্ট থাকবে। কিন্তু আপনারই কোনো পূর্বপুরুষ অন্য একটি ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাকে নির্যাতন করতে হয়নি, ভয় দেখাতে হয়নি বরং ইসলামের সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাকে বোঝানো হয়েছিল তার অনুসৃত ধর্ম তথা আদর্শটি সঠিক নয়, তার ধর্ম বা আদর্শ তাকে মুক্তি দিতে পারবে না অপর পক্ষে ইসলাম হলো সঠিক ধর্ম বা আদর্শ, এতেই রয়েছে মুক্তি। তিনি ইসলামকে উত্তম আদর্শ হিসাবে শ্রদ্ধাভরে আলিঙ্গন করেছিলেন। এভাবেই যুগে যুগে মানুষ তাদের আদর্শ পরিবর্তন করেছে স্বেচ্ছায়, কেবল নতুন সেই আদর্শের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আদর্শ নির্মূলের পন্থা কথানোই পূর্ণরূপে সফল হয়নি, হওয়া সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও গোঁড়াপন্থীরা ইসলামের বিধি-বিধানকে জোর করে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়- এটা মোটেও সঠিক পন্থা নয়। কিন্তু একইভাবে যারা এই আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে তাদেরকেও শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগ করে ফেরানোর চেষ্টা একটি ভুল পদ্ধতি।
জঙ্গিবাদ একটি ভ্রান্ত, বিকৃত আদর্শ। শক্তি প্রয়োগ করে এই আদর্শকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। একজন মুসলমান, একজন হিন্দু (সনাতন ধর্মী), একজন খ্রিষ্টান, একজন বৌদ্ধ বা একজন ইহুদিকে শক্তি প্রয়োগ করে, নির্যাতন করে ধর্ম ত্যাগ করানো যতটা কঠিন ঠিক একজন জঙ্গিকেও তার আদর্শ থেকে ফেরানো ততটাই কঠিন। তাদেরকে এই রাস্তা থেকে ফেরাতে হলে প্রয়োজন তাদের আদর্শ যে ভুল, তারা যে ঐ পথে মুক্তি পাবে না, জান্নাতের বদলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে সেটা বুঝিয়ে দেওয়া একই সাথে তখন প্রশ্ন আসবে তাহলে কোন পথে মুক্তি? তখন মুক্তির সঠিক রাস্তাটাও তাকে দেখাতে হবে। এটা না করা গেলে তাদেরকে ফেরানো যাবে না।
এখন পুলিশ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যতই সফলতার জয়োগান গাক, সরকার যতই বলুক- “জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আমরা সফল”, চিন্তাশীল মহলে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে আদতে তারা জঙ্গিবাদের রাস্তায় কতটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পেরেছে! এর চেয়ে অনেক বেশি সফলতা যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিধর দেশগুলোর ঝুলিতে আছে কিন্তু তাতে কি বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো গেছে? মোটেও না, বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে, বেড়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জঙ্গি হামলা সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখা যাবে কিন্তু জঙ্গিবাদকে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তাছাড়া যারা জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত হয়েছে, জঙ্গিহামলা চালাচ্ছে বা চালানোর পরিকল্পনা করছে তাদেরকে আইনের আওতায় নেওয়া সম্ভব কিন্তু যারা ভবিষ্যতে জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়াবে তাদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? এখানেই আমার কথা- শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি অবশ্যই আদর্শিক লড়াই লাগবে।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, চিন্তাশীল, নিরাপত্তা বিশ্লেষক সকলেই এখন একমত যে জঙ্গিবাদ নির্মূলে আদর্শ লাগবে। এই আদর্শিক লড়াইয়ে ভাড়া করা হচ্ছে তথাকথিত মাদ্রাসা শিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের। যারা হাদিয়ার বিনিময়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়ে, নানা ওয়াজ করে জঙ্গিবাদের ভ্রান্ততা প্রমাণের চেষ্টা করছে কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কি দেখাতে পারছে? জঙ্গিবাদ নামক ভ্রান্ত আদর্শ ত্যাগ করে তারা কোন পথে গেলে সত্যিকার মুক্তি পাবে সেটা কি তারা বাতলে দিতে পারছে? তারা নিজেদের মধ্যেই এই পথ নিয়ে নানা বিতর্কে লিপ্ত। তা ছাড়া ঐ জঙ্গিরা এ সমস্ত তথাকথিত আলেমদের পথ বহুদিন ধরে দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়েই তো জঙ্গিতে পরিণত হয়েছে।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই করতে হলে অবশ্যই শক্তিশালী আদর্শ লাগবে, কারণ জঙ্গিবাদ ভ্রান্ত ও বিকৃত আদর্শ হলেও তা শক্তিশালী। কোনো একটি আদর্শ কতটা শক্তিশালী তা বোঝা যায় সেই আদর্শের অনুসারীদের ত্যাগ, কোরবানি দেখে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সেই আদর্শকে যদি মানুষ আকড়ে ধরে থাকে তবে বুঝতে হবে আদর্শটির শক্তি আছে। আর যে আদর্শে ত্যাগ নেই, কেবল ভোগ আছে বুঝতে হবে তার কোনো শক্তিও নেই। জঙ্গিবাদের আদর্শ ধারণ করে মানুষ তার সর্বস্ব উৎসর্গ করতে পারে, জীবন দিতে পারে, জীবন নিতে পারে- বুঝতে হবে তার একটি সাংঘাতিক শক্তি আছে অপরপক্ষে ধর্মব্যবসায়ীদের নিকট যে আদর্শটি আছে তা মোটেও ত্যাগ করতে শেখায় না, কেবল ধর্মের কাজ করে বিনিময় নিতে শেখায়। কাজেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এই মোল্লাদের ওয়াজ কখনোই জঙ্গিবাদের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না।
জঙ্গিবাদ ভাইরাসের মতো সংক্রমিত হচ্ছে মানুষের মাঝে। এখন প্রতিশেধক টিকার ব্যবস্থা না করা গেলে কোটি কোটি মানুষ সংক্রমণের আশংকায় থাকবে। তাহলে এখন সেই সঠিক আদর্শ কোথায় পাওয়া যাবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




