খ্রিষ্টিয় নতুন বছরের প্রথম দিনেই দেশের প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চার কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২ কপি নতুন বই। এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩২ লাখ শিক্ষার্থী পাচ্ছে তিন কোটি ২৮ লাখ আট হাজার ৫৩টি বই ও অনুশীলন খাতা। ‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে ফুলের মতো ফুটব, বর্ণমালার গরব নিয়ে আকাশ জুড়ে উঠব’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আজ শুক্রবার সারা দেশে শুরু হয়েছে পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস। রাজধানীর ধানমন্ডির গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল মাঠে সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন শিক্ষাক্ষেত্রে গত সাত বছরে যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে। বিশেষ করে সংখ্যাগত দিক থেকে সাফল্য যুগান্তকারী। বেশ চমৎকার কথা। কিন্তু নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কী শিখে বড় হচ্ছে? সেই খবর কী মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আছে? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ২০১০ সালে যখন বিনামূল্যে এই বই দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় তখন শিক্ষার্থী ছিল আড়াই কোটির মতো। আর এখন শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে চার কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার। বইয়ের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২ কপি।
শিক্ষামন্ত্রী'র কথিত সাফল্য সংখ্যার বিচারে যুগান্তকারী বটে। কিন্তু শিক্ষার মান, শিক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার খাতা দেখার ধরন, পরীক্ষার খাতা দেখায় শিক্ষকদের প্রদেয় শর্তাবলী, লোক দেখানো পাসের হার, এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে শিক্ষামন্ত্রী গোটা জাতিকে একটি ভুল শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে পঙ্গু করা হচ্ছে কিনা সেটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সময় এখনই।
নতুন বই হাতে আনন্দিত শিক্ষার্থীদের আনন্দের কথা মাথায় রেখে শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আজ লিখব না। বরং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী'র উক্তি থেকে শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা কত হতে পারে, তার একটি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করানো যাক। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ০ থেকে ১৪ বছর বয়সি জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৪.৬৩ ভাগ। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০.৬২ ভাগ। এবং ৬৫ বা তদোর্ধ্ব বয়সি জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪.৭৫ ভাগ। আমরা হিসাবের জটিলতা এড়াতে ০ থেকে ১৫ বছর বয়সিদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৫ ভাগ, ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সিদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০ ভাগ এবং ৬৫ ঊর্ধ্ব বয়সিদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ হিসাবে ধরে এখন বিশ্লেষণ করব।
১. যদি প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা চার কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন হয় এবং প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থী ৩২ লাখ হয়, তাহলে প্রাক প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী চার কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন।
২. ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি পরিচালিত ২০১০ সালের একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে শতকরা ৫৩ জন ছেলে এবং শতকরা ৫৭ জন মেয়ে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ে। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশে শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ার গড় হার শতকরা ৫৫ ভাগ (২০১০ সালে)। চরম দারিদ্র্য, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, পরিবারের ধরন, সচেতনতার অভাব, অসুস্থতা, শিশুশ্রম, মাইগ্রেশান, শিক্ষার প্রতি অনিহা ইত্যাদি কারণে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে। সেসব ফ্যাক্টরগুলোর কিছুটা উন্নতিকে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে দেশে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার হার শতকরা ৪৪ থেকে ৪৮ ভাগ। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য এক বক্তৃতায় স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার হার শতকরা ২১ দাবি করেছেন। যার কোনো ভিত্তি বা প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা নেই। যদি উন্নয়ন সূচক এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বর্তমানে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার হার শতকরা ৩০ ভাগের কম হবে না। তাহলে এবার ড্রপআউট বা স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বের করা যাক। আজকে যদি প্রাক প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা চার কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন হয়, তাহলে ড্রপআউট বা স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থী সংখ্যাটি এই সংখ্যার অন্তত শতকরা ৩০ ভাগ বা তারও বেশি। যদি শতকরা ৩০ ভাগও হয়, তাহলে ড্রপআউট বা স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া সংখ্যাটি হবে এক কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ১৮ জন।
৩. বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যেসকল শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে, সেই সংখ্যাটি সরকারিভাবে কোথাও নেই। এলিট শ্রেণি'র ছেলেমেয়েরা সাধারণত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশুনা করে। তাই তাদের ড্রপআউট বা স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া যদি শূন্য বিবেচনা করি, তাহলে সেই সংখ্যাটি কত? তিন লাখ? দুই লাখ? নাকি এক লাখ? নাকি আরো বেশি? আমরা যদি এই সংখ্যাটি দেড় লাখও বিবেচনা করি, তাহলে দেশে প্রাক প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত (অর্থ্যাৎ ৪ থেকে ১৫ বছর বয়সি পর্যন্ত) মোট শিশুর সংখ্যা কত? এক কথায় এটি হবে (৪,৭৬,১৬,৭২৮ + ১,৪২,৮৫,০১৮+১,৫০,০০০) বা ৬ কোটি ২০ লাখ ৫১ হাজার ৭৪৬ জন।
৪. ২০১১ সালের আদম শুমারিতে ০ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা দেখা যায় এক কোটি ৫০ লাখ ৬১ হাজার ৯৭০ জন। ২০১১ তে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.০৪ ভাগ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে ০ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা এখন কত হবে? তার সঙ্গে শিশু মৃত্যু হার বাদ যাবে। আমরা সরাসরি যদি এই সংখ্যাটি হিসাবের সুবিধার জন্য এক কোটি ৪০ লাখও ধরি (কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নমুখী বিবেচনায়) তাহলে ০ থেকে ১৫ বছর বয়সিদের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় (৬,২০,৫১,৭৪৬ + ১,৪০,০০,০০০) বা ৭ কোটি ৬০ লাখ ৫১ হাজার ৭৪৬ জন। আমরা হিসাবে সুবিধার জন্য এই সংখ্যাটি ৭ কোটি ৬০ লাখ বিবেচনা করব।
৫. তার মানে ০ থেকে ১৫ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭ কোটি ৬০ লাখ মানে হলো, এটি দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা ৩৫
ভাগ। তাহলে মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২১ কোটি ৭১ লাখ ৪২ হাজার ৮৫৭ জন।
৬. ২০১১ সালে মৃত্যু হার ছিল ৪.৮ ভাগ। এটি এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যদি মৃত্যু হার ৪.৫ ভাগ হিসাবে বিবেচনা করি, তাহলে ২১ কোটি ৭১ লাখ ৪২ হাজার ৮৫৭ জনে মারা গেছে অন্তত ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৪২৮ জন।
৭. তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২১ কোটি ৭১ লাখ ৪২ হাজার ৮৫৭ জন বিয়োগ ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৪২৮ জন বা ২০ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪২৯ জন। যদি কিছু সংখ্যা আমরা এরপরেও ফেলে দেই, তাহলে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৫০ লাখের কম হবে না।
এখন কী আপনি সরকারি হিসাবে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমিয়ে, ড্রপআউট বাড়িয়ে, জন্মহার কমিয়ে, মৃত্যু হার বাড়িয়ে, এক্সিডেন্ট বাড়িয়ে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় মৃত্যু বাড়িয়ে বা অন্যান্য আরো জনমিতিক ব্যাপার স্যাপার এদিক করে করে চার কোটি জনসংখ্যা এদিক সেদিক করতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে বাস্তব সত্য সত্য হলো, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ২০১৫ সালেই ছাড়িয়েছে। যদি এর কোনো বিপরীত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আপনার কাছে থাকে, তাহলে তথ্য প্রমাণ সহ হাজির হন। আন্তাজে কোনো কথা এলাউ করা হবে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০১৫ সালেই ২০ কোটি ছাড়িয়েছে, এটাই হলো বাস্তবতা। আর যদি ০ থেকে ১৫ বছর বয়সি জনসংখ্যা এদিক সেদিক করে কমিয়ে দেখান, তা কতটা কমাতে পারবেন? চেষ্টা করে দেখান। মাননীয় শিক্ষমন্ত্রী নিশ্চয়ই শিক্ষার্থী সংখ্যা কমাবেন না। সুতরাং জনসংখ্যা যে ২০ কোটি ছাড়িয়েছে সেই খেয়াল কী আছে বাংলাদেশের?
...........................
১ জানুয়ারি ২০১৬

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




