মানুষের জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে তার কোন ব্যাখ্যা থাকেনা। এই আমার কথাই ধরুন। ছোটবেলা থেকে স্কুল জীবনের প্রায় পুরোটাই যথেষ্ট সচ্ছল পরিবারের ছেলে ছিলাম। মা আর বড় মামার কঠোর শাসনের মধ্য দিয়ে পড়ালেখা ছাড়া আর অন্য কিছুর গতন্তর ছিলোনা আমার। খেলতে চাইলে বাসার সামনে আয়োজন করা হতো খেলার। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে চাইলে মামা তাও আয়োজন করতেন বাসায়। পারিবারিক ভাবে প্রতিযোগিতা হতো। এর মধ্য দিয়েই পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনীতে বৃত্তি পেলাম। এসএসসিতে ভালো রেজালটও হলো।
মনে পড়ে সেই ছোটবেলায় মামার অফিসের পিকনিক হলে আমার উপস্থিতি ছিলো অত্যাবশ্যকীয়। সকালে উৎসাহ ভরে যেতাম আর ফেরার সময় ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম আমি বাসায়। কিন্তু মামাকে না দেখে কান্নাকাটি শুরু করতাম। বার বারই মনে হতো মামাকে মনে হয় আমিই ফেলে রেখে এসেছি। সবাই বুঝাতো মামাই আমাকে বাসায় রেখে গেছে।
যাই হোক পারিবারিক এক বিপর্যয়ে সবার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেললাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে। দীর্ঘদিন কারো সাথে কোন যোগাযোগ পর্যন্ত করিনি। বাড়ি থেকে বোন চিঠি লিখতো। আম্মা নানা ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করতো। কিন্তু আমার আর ততদিনে পরিবারের কারো প্রতি আস্থা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপর জীবন সংগ্রাম শুরু করি। জুটিয়ে নেই চাকুরী। হঠাৎ করে শুনলাম মামা অসুস্থ। ঢাকায় আনা হয়েছে ও টিবি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কিন্তু অভিমান আমার মধ্যে এতোই প্রকট যে কাছে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করলামনা। অসুস্থ হয়েও বার বার নিজের ছেলেদের বলেছেন আমার কথা। তার ছেলেদের অনুরোধে গেলাম দেখতে। দেখে এলাম। শক্ত সবল দেহের মামা ততদিনে শীর্ণকায়। ধুমপান জনিত ক্যানসারে আক্রান্ত মামার সময় প্রায় শেষ দিকে। আশাহত ডাক্তাররা বাড়ি ফিরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিলেন।
তার ছেলেরা তাকে বাড়ি নিয়ে গেলো। কিছুদিন পর অন্য একটি কাজে আমি বাড়ি গেলাম। দেখতে গেলাম মামাকে। মামা তখন হাড্ডিসার। আমাকে দেখেই যেনো শক্তি পেলেন চোখ আর হাতের ইশারায় সবাইকে দেখাচ্ছিলেন আমাকে। আমি শুধু বলেছিলাম-- 'আমার এমন হওয়ার কথা ছিলোনা।'
সেটাই ছিলো শেষ দেখা। এরপর যেদিন সেই অমোঘ সত্যটি শুনলাম..কেবলই মনে হচ্ছিলো আমার পায়ের নীচ থেকে এক টুকরো মাটি যেনো সরে গেলো। এই মামাই ছিলেন আমার সব। পড়াশোনা থেকে শুরু করে জামা কাপড় কেনা সবই করতেন তিনি। কিন্তু তার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। অবশ্য আমার সামর্থ্যও ছিলোনা। যাই হোক আল্লাহ নিশ্চয়ই মামাকে জা ন্নাতবাসী করবেন। শুধু মাঝে মাঝে ভাবি- জীবন কেন এমন হয়? আমার জীবন তো এমন হওয়ার কথা ছিলোনা।
বি:দ্র: আমার ব্যক্তিগত বলে কারো জন্য বিরক্তিকর মনে হয় তবে আমি আন্তরিক ভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

