somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আনত যীশুর শহরে ২

২০ শে ডিসেম্বর, ২০২১ ভোর ৪:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আনত যীশুর শহরে ১

নানান ব্যস্ততায় সেলেকা মেয়েটাকে ভুলে গেলাম খুব সহজেই।

তারপর এক বিকেল। কাজের পাট চুকিয়ে বাড়ির পথ ধরেছি। বৃষ্টিভেজা দিন। কাদাপানিতে রাস্তা সয়লাব। গামবুট ঠুকে দ্রুত হাঁটছি। ছাতা নেই সাথে। ট্রেন স্টেশনটা আমাদের হাসপাতাল ক্যাম্পাসের সাথেই লাগোয়া। তবুও ভিজে ভূত হওয়া ঠেকানো যাবে না আজকে। কি জ্বালা।

হঠাৎ ছপ্ ছপ্ শব্দে পাশে তাকাতে হল। এই আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টির ভেতর খালি পায়ে আওয়াজ তুলে হাঁটছে কেউ। মহিলার বয়স পঁয়তাল্লিশের ধারে কাছে। নম্বর লেখা হাতের প্লাস্টিক আর্মব্যান্ডটা বলে দেয় সে এই রেখস্ট ডের ইজার হাসপাতালেরই রোগী হবে। আপাদমস্তক পলক বুলিয়ে আরো আঁতকে উঠতে হল। তার বাম চোখটা ফুলে ছোটখাট টেনিস বল। তীব্র আঘাতে গাঢ় বেগুনি রং নিয়েছে। পাতা বুজে গেছে। বেঢপভাবে ফুলে ওঠা চোখটা এই বুঝি কোটর ঠেলে বেরিয়ে ঠকাশ্ কারো মাথা ফাটিয়ে শোধ নেবে এক চোট।

মুহূর্তের জন্যে ভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম। পাশ কাটিয়ে চলে যাবো নাকি থেমে গিয়ে জানতে চাইবো সাহায্য লাগবে কি না -এই দোলাচলে দুলছি যখন, তখন মহিলা নিজেই এসে পথ আগলে দাঁড়ালো। ঝুম বৃষ্টি তার চুল চুঁইয়ে আধবোজা চোখ গড়িয়ে নামছে। পড়নের জামাটাও ভিজে সপ্ সপে। কালো ফুটকি দেয়া হাসপাতাল গাউন হাঁটু আঁকড়ে আছে। যেন সাধ্য থাকলে এই পালিয়ে যাওয়া রোগীকে সে রুখে দিত।

‘ওডিয়নপ্লাতজ যাবো কিভাবে বলতে পারো?’। এই জার্মান দেশে অচেনা লোককে ‘আপনি’ বলাই ধর্ম। অবশ্য ধর্ম বজায় রাখার মত অবস্থা নেই তার। মাথার ভেতর হিসাব কষছি। ওডিয়নসপ্লাৎজ তো আমিও যাচ্ছি। সেখান থেকে ট্রেন বদল। কিন্তু পথের হদিস বলা কি ঠিক হবে? নাকি ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাবো। মনের তরফ থেকে হ্যাঁ-না কোনো সদুত্তরই মিলছে না। যান্ত্রিক জীবনে বিবেকের দরজায় কড়া নাড়বার ফুরসৎ মেলে না। তাই খুব প্রয়োজনেও সে ঘুমিয়ে বেহুঁশ।

‘এই চোখ নিয়ে যাবেন কি করে? চলুন আপনাকে ইমার্জেন্সিতে পৌঁছে দিচ্ছি‘। দু’কদম দূরে লাল হরফে ‘নোটফাল যেন্ট্রুম’ মানে ‘জরুরী বিভাগ’ লেখা ব্যানারটা দেখিয়ে প্রস্তাব দিলাম।

প্রস্তাব টশকে উড়িয়ে মহিলা টলোমলো পায়ে তাল সামলাতে সামলাতে বললো, ‘আমার সাথে ওডিয়নসপ্লাৎজ যেতে পারবে? কিছু দেখতে পাচ্ছি না ভাল করে’।
-‘ট্রিটমেন্ট না করালে পরে কিন্তু আরো খারাপ হবে‘।
-‘ধুর্, বললাম তো নোটফাল থেকেই আসছি!’।
-‘ইনফেকশন হয়ে গেলে কিন্তু চিরকালের মত চোখ হারাবেন’।
-‘বলছি না, আমাকে যেতে হবে। এত কথা ভাল্লাগছে না, যত্তসব...’। গাউনের পকেট থেকে কাঁপা হাতে এক গোছ চাবি বের করে কথাগুলো বললো সে।

বুঝলাম বোঝাতে যাওয়া বাতুলতা। ঠিকানায় পৌঁছানো তার কাছে জরুরী বিভাগে ফিরে যাবার থেকেও জরুরী। বেশি কথা বলতে গেলে যদি হাতের চাবিটা বেগতিক ছুড়ে মারে। কথা আর না বাড়িয়ে, বৃষ্টি-কাদায় মাখামাখি হয়ে চললাম তার সাথে। উদ্দেশ্য, ঠিক ট্রেনে তুলে দেয়া। কিন্তু তুলে দেয়া পর্যন্তই। যাত্রা সঙ্গী হবার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।

কথাটা সত্য না। উপায় আছে। আসলে ইচ্ছে নেই। ফেরারী রোগীর সঙ্গী হয়ে নিজের অবস্থা সঙ্গীন হবার আশংকা আছে। রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি-টাইপ ঝামেলায় পড়তে পারি। কিংবা, সন্ধ্যার খবরের হেডলাইনও বনে যেতে পারি, ‘মিউনিখে জার্মান নারী সন্ত্রাসী হামলার শিকার। হামলাকারী প্রবাসী এবং মুসলিম। তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে...ইত্যাদি ইত্যাদি’।

তার চেয়েও বড় কথা। সেলেকার বয়সী একটা ছেলে আছে। তাকে সময়মতো কিন্ডারগার্টেন থেকে তুলতে হবে। বেগুনি চোখ ভদ্রমহিলার সাথে জড়িয়ে ভেজালে পড়লে তাকে নিতে আসার কেউ থাকবে না।

ট্রেন এসে গেছে প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে। ঘটাং মোচড়ে হাতল ঘুরিয়ে লোকজন নামছে।
-‘উঠে পড়ুন। দুই সামনের স্টেশনের পরেরটাই ওডিয়নসপ্লাৎজ। আর সাবধানে যাবেন প্লিজ‘।
-তুমি আসবে না সাথে? আমি একলা যাবো?’।

এমন সরল আকুতির বিপরীতে ভাষা খুঁজে পেলাম না। ঢোঁক গিলে স্বার্থপরের মত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম।

বেজায় ফোলা চোখটা নিয়ে খালি পায়ে ভেজা পোশাকে ট্রেন ধরলো অচেনা মানুষটা। তার চারপাশের লোকজনের চোখে তার অদ্ভূত উপস্থিতি এতটুকু ধরা পড়লো না। মুঠোফোনের থাবায় বন্দী তারা। সময় নেই ডান-বামের। দড়াম্ জোরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আহত দৃষ্টিতে কাঁচের ওপাশ থেকে তাকিয়ে থাকলো ভদ্রমহিলা।

ট্রেন চলে গেলে শূন্যচোখে স্টেশনের ঘড়িটার দিকে চাইলাম। আর দু’মিনিট পরেই আবার ওডিয়নসপ্লাৎজের ট্রেন। নাহ্, মহিলাকে এড়ানোও গেছে। আবার ফিরতেও পারবো সময়মতো। তবু সব কিছু ছাপিয়ে খালি মনে হতে লাগলো, কি ঘটনা ঘটেছিল তার সাথে। কেনই বা অমন তাড়াহুড়ো করে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে গেল সে? তাও আবার অমন ভীষন ফুলে ওঠা চোখ নিয়ে। চিকিৎসার পরোয়া না করেই।

কোনো জবাবই যে মেলার নয়। ফোঁশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরের ট্রেনে চাপলাম। সামনে আর কোন বিচিত্র লোকের সাথে দেখা হবে কে জানে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে হবে। একে একে ওরা সামনে এসে দাঁড়াবে। তারপর তাদের গল্পটা না বলেই চলে যাবে। আর মিছেমিছি ভাবিয়ে যাবে। (ক্রমশ)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ১২:৫৮
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সমাজের অসহায়-দরিদ্র মানুষদের জন্য আপনি কি করতে চান?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য মানুষের সেবা করা।
যে কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যখন কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যায়, অনেক সাহসী মানুষও অসহায় হয়ে পড়ে। তখন আমি অসহায় মানুষের হাতের লাঠি হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম কর্ম

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩



আপনার দিনের পর দিন ধর্মীয় লেখা পোস্ট করার কারণে -
হয়তো, আপনার কম্পিউটারটি স্বর্গে যেতে পারে।
কিন্তু, আপনার নিজে স্বর্গে যেতে হলে -
আপনার নিজের ধর্ম কর্ম করতে হবে।


ঠাকুরমাহমুদ
ঢাকা, বাংলাদেশ



...বাকিটুকু পড়ুন

মিমস যুদ্ধ: রাজনীতিতে হাসি-ঠাট্টার কৌশল”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১০ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৯

সাম্প্রতিক সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো বেশ মজার। ট্রল আর মিমসের দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে যা আমাদের বিনোদনের খোরাক জোগায়। ওপরের তালিকার সাথে আরও কিছু চলমান মিমস... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই মে, ২০২৬ রাত ১:৫১


মাইলস্টোন স্কুলের কথা কি এখনও মনে আছে? একটা ট্রেনিং জেট ক্রাশ করেছিল স্কুলের ওপর। ছোট ছোট বাচ্চারা ক্লাস করছিল, হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এল মৃত্যু। ঠিক যেমনটা আমরা সিনেমাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাওড়া স্টেশনের স্মৃতি

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ১১ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৫৮



মায়ের সাথে স্মৃতির শেষ নেই। আজ মা দিবস উপলক্ষে, মাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম সেই স্মৃতি নিয়ে কিছু কথা লিখছি।

হাওড়া স্টেশন। মা, সাহস, নিপু, আমি। প্রচণ্ড ভীড়ের ভিতর আমরা হাঁটছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×