১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সকল জাপানি ইলেকট্রনিক্সের পন্যের আমদানির উপর ১০০% শুল্ক আরোপ করে এবং টোকিওকে একটি একতরফা বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে যার ফলে জাপানি সেমিকন্ডাক্টরের উপর আমেরিকান একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।জাপানি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত উত্থাপনের ফলে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীরা হুমকির মুখে পড়লে তারা এই ব্যাবস্থা নিতে বাধ্য হয়।সেটা না হলে জাপান সহজেই সিলিকন ভ্যালিকে অতিক্রম করে বিশ্বের ইলেকট্রনিক্স এবং যোগাযোগ রাজধানীতে পরিণত হতে পারত।একই বানিজ্য চুক্তির মাধ্যমে জাপানকে মার্কিন কৃষি পন্যের বাজারে পরিনত করা হয় যার ফলে দীর্ঘ ৩০ বছর জাপানি অর্থনীতি মন্দা মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
ঠিক একই পলিসি প্রয়োগ করা হচ্ছে চীনের বেলায়।এবং সেটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়,রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও।কারন জাপান অর্থনৈতিক দিক থেকে উদীয়মান শক্তি হলেও সামরিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে তার কোন শক্তি ছিল না।
২০১৯ সালে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধের পর ট্রাম্প ক্ষমতা ত্যাগ করার আগে আরো কিছু চীনা কোম্পানির উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপ করে যায়।যেটা বাইডেন প্রশাসনও চালু রখবেন।নতুন নিষেদাজ্ঞার আওতাধীন কোম্পানি গুলু হল বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Comac, জ্বালানী কোম্পানি CNOOOC,চিপ নির্মাতা SMIC, কনজিউমার ইলেক্ট্রিনিক্স নির্মাতা Xiaomi।
এসব কোম্পানি গুলুর বিরুদ্ধে নিষেদাজ্ঞা আরোপের অজুহাত ছিল চীনে সরকারের সাথে এদের গোপন যোগাযোগ।অথচ মার্কিন সব টেকনোলজি কোম্পানি এটা করে আসছে অনেক আগে থেকেই।নভেম্বর,২০১৯ সালের চুক্তি মতে,Google,IBM, Oracle,Microsoft, Amzon Web Service আগামি ১৫ বছর সিআইএ সহ আরো ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থাকে ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল সেবা এবং তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে। Eric Schmidt এবং গুগল এক্সিকিউটিভ Jared Coheন এর মতে বিংশ শতকে মার্কিন শক্তি যদি হয় অস্র নির্মাতা লকহিড মার্টিন তাহলে একবিংশ শতকে সেটা হল টেকনোলজি এবং সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি।
দুনিয়াজুড়ে যখন চীনের কথা আলোচনায় আসে তখন সবাই হিংসাত্মক হয়ে উঠে।বিশেষ করে লিবারেল দুনিয়া।কারন চীন হল লিবারেল দুনিয়ার জন্য দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী।ট্রাম্প প্রশাসন যখন চীনের বিরুদ্ধে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করে তখন তাদের উদ্ধেশ্য ছিল চীনকে ডিকাপলিং করা।বাইডেন নির্বাচনী প্রচারের সময় চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও চীনের সাথে ট্র্যাম্পের সব ফ্রন্টের যুদ্ধের তিনি দ্বিমত প্রকাশ করেন।কিন্তু তার পররাষ্ট্র সেক্রেটারি আন্তোনি ব্লিনকেন সিনেটের শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেছেন যে,ট্র্যাম্পের চীন নীতি তিনি সমর্থন করেন।এতে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় চীনের নীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন হবে না।
বানিজ্য যুদ্ধ শুরুর পাশাপাশি পেন্টাগন দক্ষিন চীন সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরে বিমানবাহী রনতরিসহ বিপদজনক সব যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করেছিল যেখান থেকে বাইডেন প্রশাসন সরে আসবে না। পেন্টাগনের মতে "অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে চীন ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী’’। অন্য কথায় চীনের উন্নতির সাথে সাথে আমেরিকার পতন সমানুপাতিক।মুলত চীনের উত্থানের শুরুটা ২০০১ সাল থেকে এবং ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দার সময় সেটা পুরুপুরি দৃশ্যমান হয়।২০০৮-‘৯ সালের বিশ্ব মন্দার পর ২০১০ সালের আগস্টে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানকে হটিয়ে চীন সেই জায়গা দখলে নেয়। ২০১২ সালে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্যে ৬০ বছরের আমেরিকান আধিপত্য খর্ব করে চীন দুনিয়ার এক নাম্বার আমদানি রপ্তানিকারন দেশে পরিনত হয়।উল্লেখ্য ২০১২ সালে আমেরিকার আমদানি রপ্তানি বানিজ্যের পরিমান ছিল ৩.৮২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং চীনের আমদানি রপ্তানি বানিজ্যের পরিমান ছিল ৩.৮৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৪ সালের শেষ দিকে এসে পিপিপি অনুযায়ী চীনের জিডিপি ছিল ১৭.৬ ট্রিলিয়ন ডলার,অন্যদিকে আমেরিকার ছিল ১৭.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে এসে মার্কিন জিডিপি ছিল ২০.৬ ট্রিলিয়ন ডলার(পিপিপি) আর চীনের জিডিপি ছিল ২৪.১৬ ট্রিলিয়ন ডলার(পিপিপি).১৮৭২ সাল থেকে শুরু করে বিগত ১৪৮ বছরে আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার কোন শক্তি দুনিয়াতে ছিল না।যেটা এই শতকের শুরুর দ্বিতীয় দশক থেকে চীন করেছে।
২০১৫ সালের মে মাসে চীনা সরকার বৈদ্যুতিক গাড়ি, পরবর্তী প্রজন্মের তথ্য প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, উন্নত রোবটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহ ১০টি উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে ’’মেড ইন চায়না ২০২৫’’ পরিকল্পনা প্রকাশ করে। পরিকল্পনার আওতাভুক্ত অন্যান্য প্রধান খাতের মধ্যে ছিল কৃষি প্রযুক্তি, এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, নতুন কৃত্রিম উপাদানের উন্নয়ন, বায়োমেডিসিনের উদীয়মান ক্ষেত্র, এবং উচ্চ গতির রেল অবকাঠামো। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল উচ্চ-প্রযুক্তি শিল্পে ৭০% স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে বিশ্ব বাজারে একটি প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করা, যেটা হবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার শতাব্দী উদযাপন।
সেমিকন্ডাক্টর হল সকল ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ২০১৪ সালে সরকারের জাতীয় সমন্বিত সার্কিট শিল্প উন্নয়ন প্রকল্প লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যে, চীন ২০৩০ সালে নাগাদ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বৈশ্বিক নেতা হতে যাচ্ছে।২০১৮ সালেচীনের স্থানীয় চিপ উৎপাদন শিল্প মৌলিক সিলিকন প্যাকিং এবং পরীক্ষা থেকে উচ্চ হাই ভ্যালু চিপ ডিজাইন এবং উৎপাদনে মনোনিবেশ করে।২০১৯ সালে মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করে যে, যখন আমেরিকা বিশ্ব বাজার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অর্ধকে উৎপাদন এবং যোগানের নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কারণে চীন তার অবস্থানের জন্য প্রধান হুমকি হয়ে উঠেছে।
ততদিনে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত গবেষণায় চীনের থেকে পিছিয়ে পড়েছে। নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের Qingnan Xie এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Richard Freeman গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চীনের পিজিক্যাল সাইন্স, প্রকৌশল এবং গণিতে বৈশ্বিক প্রকাশনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চারগুণ বেড়ে গেছে।
2019 সালে, 1978 সালে পেটেন্ট জন্য পরিসংখ্যান সংকলিত হওয়ার পর প্রথমবারের মত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৃহত্তম সংখ্যার জন্য ফাইল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের মতে, চীন ৫৮,৯৯০টি পেটেন্ট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭,৮৪০টি পেটেন্টের জন্য আবেদন পত্র দাখিল করেছে। উপরন্তু, পরপর তৃতীয় বছরের জন্য, চীনা উচ্চ-প্রযুক্তি কর্পোরেশন Huawei টেকনোলজিস কোম্পানি, 4,144 পেটেন্ট সঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোয়ালকম (2,127) থেকে বেশ এগিয়ে ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় 470 প্রকাশিত আবেদন সঙ্গে তার শীর্ষ স্থান বজায় রাখে, কিন্তু সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় 265 সঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তিনটি ছিল চীনা। World Intellectual Property Organization এর তথ্য মতে প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রেও চীন আমেরিকাকে পিছনে ফেলছে।২০১৯ সালে চীন ৫৮,৯৯০টি প্যাটেন্ট আবেদন জমা দেয় পক্ষান্তরে আমেরিকা জমা দেয় ৫৭,৮৪০টি। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনা কোম্পানি হুয়াই প্যাটেন্ট আবেদন জমা দেয় ৪১৪৪টি পক্ষান্তরে মার্কিন কোম্পানি কোয়াল্কম জমা দেয় ২১৭২টি।
কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সে ঘাড় এবং ঘাড় দৌড়
২০১৯ সালে মার্কিন কনজিউমার টেকনোলজির নেতৃত্বে ছিল গুগল, অ্যাপল, আমাজন, এবং মাইক্রোসফট অন্য দিকে চীনে নেতৃত্বে ছিল আলিবাবা, টেনসেন্ট (চীনা ভাষায় টেংক্সুন), শিয়াওমি এবং বাইডু। সব প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি হয় প্রাইভেট সেক্টর থেকে। মার্কিন কোম্পানিগুলির মধ্যে, মাইক্রোসফট ১৯৭৫ সালে, ১৯৭৬ সালে অ্যাপল, ১৯৯৪ সালে আমাজন, এবং সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে গুগল প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট, গুগলের দুই মাস পরে প্রতিষ্ঠিত হয় এর পর ১৯৯৯ সালে আলিবাবা, ২০০০ সালে বাইডু, এবং ২০১০ সালে একটি হার্ডওয়্যার কোম্পানি হিসেবে জন্ম হয় শাওমির। ১৯৯৪ সালে যখন চীন প্রথম সাইবার জগতে প্রবেশ করে, তখন থেকে সরকার জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সেন্সরশীপের মাধ্যমে তথ্য নিয়ন্ত্রণের নীতি অক্ষত রাখে।
১৯৯৬ সালে, দেশ শেনঝেনের পার্ল নদীর তিরে একটি উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প উন্নয়ন অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়।যেটা ছিল চীনে প্রথম।২০০২ সাল থেকে করমুক্ত ব্যবস্থা এবং কম মজুরী এবং কম দক্ষ শ্রমিকদের সুযোগ নিতে আগ্রহী পশ্চিমা বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো বিশাল অংকের বিনিয়োগ করে।২০০৮ সালে এসে চীনের হাই টেক প্রযুক্তির রপ্তানির ৮৫% আসে এসব বিদেশী কোম্পানির হাত ধরেই।
২০০৫ সালের একটি সরকারী প্রতিবেদনে দেশটির উদ্ভাবন ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটি খুঁজে পায়।একই বছর সরকার ন্যানোটেকনোলজি, হাই-এন্ড জেনেরিক মাইক্রোচিপ, এয়ারক্রাফট, বায়োটেকনোলজি এবং নতুন ওষুধের ২০টি মেগা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে পলিসি পেপার প্রকাশ করে। এরপর এসব উদ্ভাবনের দিকে মনোনিবেশ করে। যার মধ্যে রয়েছে ছোট স্টার্ট-আপ,ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং শিল্প এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা, এই কৌশলের ইতিবাচক ফলাফল পেতে তাদের খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি।
চীন-মার্কিন সম্পর্ক: বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে শুরু করে গরম যুদ্ধ?
জানুয়ারী ২০০০ সালে সর্বসাকুল্যে চীনে ২% এর কম মানুষ ইন্টারনেট ব্যাবহার করত। এই বাজার পূরণের জন্য রবিন লি এবং এরিক জু বেইজিং এ চীনা সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে বাইডু প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৯ সালে গুগল চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় বাইডু গুগলের দিগুন বাজারের দখল নেয়।সেই চীনে ইন্টারনেট ব্যাবহারকারির পরিমান দাঁড়ায় ২৯%।২০০৮-২০০৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা প্রকৌশলী এবং উদ্যোক্তা সিলিকন ভ্যালি থেকে ফিরে এসে বিশাল চীনা বাজারে উচ্চ-প্রযুক্তি ফার্ম মাশরুমিং এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।২০১৩ সালের মার্চ মাসে শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরই তার সরকার রাষ্ট্র সমর্থিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবহার করে "গণ উদ্যোক্তা এবং গণ উদ্ভাবন" প্রকল্প শুরু করে। তখনই টেনসেন্ট তার সুপার অ্যাপ উইচ্যাট নিয়ে আসে।
আলিবাবা ২০১৪ সালেস সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে জনসমক্ষে আসে।একই বছর নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে প্রাথমিক শেয়ার ছেড়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে।দশকের শেষ দিকে বাইডু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যাবসার শুরু দিয়ে ইন্টারনেট সেবাকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছিল। চীনা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯০% পছন্দের সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে কোম্পানিটি সাইবার জগতে পঞ্চম সর্বাধিক পরিদর্শিত ওয়েবসাইট হয়ে ওঠে এবং এর মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১.১ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।
শাওমি কর্পোরেশন ২০১১ সালের আগস্ট মাসে তাদের প্রথম স্মার্টফোন বাজারে নিয়ে আসে। ২০১৪ সাল নাগাদ এটি অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল এবং তারা তাদের নিজস্ব মোবাইল ফোন চিপ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।২০১৯ সালে এটি ১২৫ মিলিয়ন মোবাইল ফোন বিক্রি করেছে.২০২০ সালে এসে এটি মোবাইল বিক্রির বাজারে দুই নাম্বারে উঠে এসেছে।
মোবাইল পেমেন্টে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন।২০১৯ সালে, চীনে মোবাইলে লেনদেনের পরিমান ছিল $৮০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে এসে সেটা দাঁড়ায় ১১১.১ ট্রিলিয়ন ডলারে।আমেরিকার অবস্থান এক্ষেত্রে ষষ্ঠ(১৩০ বিলিয়ন ডলার,যেটা চীনের লেনদেনের কাছে পেনির মত)।২০১২ সালের আগস্ট মাসে বেইজিং ভিত্তিক বাইটড্যান্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ২৯ বছর বয়সী ঝাং ইয়িং তার ব্যবহারকারীদের জন্য একটি নতুন সংবাদের ভিত্তি গড়ে দেন। তার পণ্য, টুটিয়াও (আজকের শিরোনাম) হাজার হাজার সাইট জুড়ে ব্যবহারকারীদের আচরণ ট্র্যাক করে একটি ব্যাবহারারিদের মতামত নিয়ে নেন যে,কিসে তাদের আগ্রহ বেশি এবং সে অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করেন।২০১৬ সালে এসে এর ব্যাবহারকারির সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৮ মিলিয়ন।যার মধ্যে ৯০% এর বয়স হল ৩০ বছরের নিচে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাইটড্যান্স চীনে ডুইন নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও অ্যাপ চালু করে যা এক বছরের মধ্যে যার সাবস্ক্রাইবার হয় ১০০ মিলিয়ন।এরপরেই TikTok হিসাবে এটি এশিয়ার কয়েকটি বাজারে প্রবেশ করবে। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বাইটড্যান্স, ভিডিও তৈরি, ম্যাসেজিং এবং সরাসরি সম্প্রচারের জন্য সাংহাই ভিত্তিক চীনা সামাজিক নেটওয়ার্ক অ্যাপ Musical.ly ক্রয় করে এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় অফিস স্থাপন করে।মার্কিন বাজারের প্রবেশ করার এটি ঝাং এর সাথে মার্জ করে এবং প্রচারের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার খরচ করে।ফলশ্রুতিতে আমেরিকাতে TikTok ব্যাবহারকারির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৫ মিলিয়নে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাবহারকারির সংখ্যা দাঁড়ায় ২ বিলিয়ন।আর এতেই মার্কিন টেক কোম্পানির হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।যার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এটার উপর নিষেদাজ্ঞা দেয় এমনকি যে কোন মার্কিন নাগরিকের জন্য TikTok এবং Wechat এর ব্যাবহার নিষিদ্ধ করেন।
পিভট পয়েন্ট-হুয়াওয়ে।
এত কিছুর ভীরে সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় শেনজেন ভিত্তিক কঞ্জিউমার ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা কোম্পানি হুয়াওয়ে।যেটা আবার চীনের প্রথম বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানি। এটি বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের একটি পিভট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। হুয়াওয়ে (চীনা ভাষায় "চমৎকার অর্জন") মোবাইল এবং রাউটার তৈরি করে যা বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের প্রযুক্তির সুবিধা প্রদান করে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির বর্তমান কর্মীর সংখ্যা ১৯৪,০০০ এবং ব্যাবসা পরিচালনা করে দুনিয়ার ১৭০টি দেশে। ২০১৯ সালে এর বার্ষিক টার্ন-ওভার দাঁড়ায় ১২৫ বিলিয়ন ডলারে। ২০১২ সালে এটি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সুইডেনের ১৩৬ বছর বয়সী এরিকসন কর্পোরেশনকে ছাড়িয়ে যায়, যা বিশ্বব্যাপী মার্কেট শেয়ারের ২৮% নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে এটি স্যামসাং পর অ্যাপলকে পিছনে দ্বিতীয় বৃহত্তম ফোন নির্মাতা হয়ে উঠে।বেশ কিছু বিষয় হুয়াওয়ের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উত্থানে অবদান রেখেছে: এর ব্যবসায়িক মডেল, এর প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই-এর ব্যক্তিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, উচ্চ-প্রযুক্তি শিল্পের রাষ্ট্রীয় নীতি, এবং এর কর্মীদের একচেটিয়া মালিকানা।
হুয়াওয়ের মালিকানা এবং পরিচালনা পদ্ধতি হল শেয়ার নির্ভর।হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান রেন ঝেংফেই মাত্র ১.১৪% শেয়ারের মালিক।বাকি শেয়ারের মালিক হল ৯৬.৭৬৮ জন কর্মচারী।কর্মচারী ছাড়া অন্য কেউ এই কোম্পানির শেয়ারের মালিক হতে পারে না।সব শেয়ার হোল্ডার মিলে প্রতিবছর ভোট দিয়ে এর পরিচালনা পরিষদ গঠন করে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের উন্নতির পাশাপাশি হুয়াওয়ের ভাগ্য বদলাতে থাকে।বছরের পর বছর ধরে এটি ৩জি এবং ৪জি প্রযুক্তির টেলি যোগাযোগ যন্ত্রপাতি এবং সেবা উৎপাদন এবং সরবরাহ করতে থাকে।২০১০ সালে টেলি যোগাযোগ প্রযুক্তির ডিজাইন এবং পরিচালনার জন্য এটি ভাড়া করে নিয়ে আসে IBM এবং Accenture PLC কে(মার্কিন কোম্পানি)।২০১১ সালে বিদেশী বিনিয়োগ এবং অধিগ্রহন দেখভালের জন্য ভাড়া করেন বোস্টন ভিত্তিক Boston Consulting Group কে। অনেক সফল মার্কিন উদোক্তার মত হুয়াওয়ে তার গ্রাহক সুবিধার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।যার জন্য মুনাফার দিকে না তাকিয়ে প্রতি বছর ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছেন শুধু গবেষণা এবং উন্নয়ন খাতে।যার ফলে ২০১৯ সালে এসে এটি দুনিয়ার প্রথম কোম্পানি হিসেবে পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়।২০১৯ সালে ৭ কোটি মোবাইল বিক্রির মাধ্যমে দুনিয়ার মোবাইল ফোন বাজারের ৩৭% দখলে নেয় এবং একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২৭০০ প্যাটেন্ট আবেদনের মাধ্যমে এটি শীর্ষে উঠে আসে।
হুয়াওয়ের এই ইর্ষনীয় সাফল্য ওয়াশিংটন-বেইজিংকে দ্বন্ধের কাছাকাছি নিয়ে আসে।যার ফলে ২০১৯ সালের মে মাসে ওয়াশিংটন হুয়াওয়ের উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপ করে এবং মার্কিন কোম্পানি কতৃক হুয়াওয়ের কাছে যে কোন পন্যের বিক্রির উপরও নিষেদাজ্ঞা আরোপ করে।এত কিছুর পরেও হুয়াওয়ের উত্থানকে থামানো যায়নি।২০২০ সালে হুয়াওয়ের আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪% বৃদ্ধি পেয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৩:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


