বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে, নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাঝারী আকারের একটি ঝাউ গাছ। নদী থেকে ভেসে আসা হালকা মিষ্টি বাতাস যখন ঝাউয়ের শাখায় ঢেউ তুলে যায় তখন সমস্ত সত্ত্বা কি এক অদৃশ্য ভালোলাগার আবেশে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত ভালোলাগা-ভালোবাসা এখানে এসে একই মোহনায় মিশেছে। জীবনের সব বেদনা যেন আনন্দের ফেরীতে করে মন সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়।
ঝাউ গাছটাকে কেন জানি খুব আপন মনে হয় সুন্দরের কাছে। যখন কোন কাজ থাকেনা তখনই সে ঝাউতলায় এসে বসে থাকে। ঝাউতলার শ্যামল ছায়ায় বসে তাঁকিয়ে থাকে স্রোতসিনী নদীর পানে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় এ পাশটায় যদি তার একটা ঘর থাকতো তবে বেশ হতো, সারাদিন এখানে বসে তরঙ্গিনী কুশিয়ারার ছল ছল জলধারায় হারিয়ে যেত।
কুশিয়ারার স্বচ্ছ জলে প্রতিনিয়ত ভেসে চলে শত শত নৌকা। এদের অধিকাংশই জেলে নৌকা, মাঝে মাঝে দু-একটা যাত্রীবাহী নৌকার দেখা মেলে। মাঝিরা মনের সুখে গেয়ে চলে ভাটিয়ালী গান। ঝাউয়ের শন শন, কুশিয়ারার ছলাৎ ছলাৎ আর মাঝির ভাটিয়ালী গান মিলেমিশে এক মধুর ছন্দের সৃষ্টি করে।
আকাশ বার্তায় মান্না দে’র গান শুনতে শুনতে সুন্দর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো বুঝতেই পারেনি। ঘুম যখন ভাঙ্গল তখন দিনের সূর্য্য ধীরে ধীরে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ছে। মনে হচ্ছে লাল সূর্য্যটা কুশিয়ারার বুকে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। সে নীল রংয়ের শার্টটা গায়ে ছাপিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।
কয়েক কদম এগুতেই পিছন থেকে কার যেন ডাক পাওয়া যায়। পিছনে থাকাতেই সুন্দরের চোখে পড়ে করিম মাঝি ঘাটে নৌকা ভিড়িয়েছে। করিম মাঝি হাত দিয়ে ঈশারা করে হাঁক দিয়ে ডাকে, ও ডাক্তারের পোলা, এইদিকে আহো। সুন্দর গুটিপায়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। দেখতে পায় বেশ ভদ্র চেহারার কয়েকজন মানুষ নৌকার পাঠাতনে বসে আছে। করিম মাঝি বলে, বাবা সুন্দর, এনারা এই গ্রামে পরথ্ম আসচেন, রাস্তাঘাট কিসচু চেনেন না। তুমি এনাদের একটু নিজাম ব্যাপারীর বাড়ি পর্যন্ত পৌছাইয়া দাও। সুন্দর হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।
সবার আগে নৌকা থেকে নামলেন একজন বয়স্ক লোক। তারপর নামলেন মাঝবয়সী একজন মহিলা। সুন্দর আন্দাজ করে ইনি ওই বয়স্ক লোকের স্ত্রী। লোকটি মনে হয় বেশ বয়স করে বিয়ে করেছেন। তারপর বছর দশেকের একটি ছোট্ট ছেলে পাঠাতন থেকে নামে।
সবার শেষে নৌকার পাঠাতন থেকে নামলো একটি মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে সুন্দরের চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেলো। এমন নজড়কাড়া মেয়ে এর আগে এ গ্রামে একটিও দেখা যায় নি। ডাগর ডাগর চোখের এ মায়াবিনী যেন কোন স্বপ্নপূরীর বাসিন্দা। সদ্য কৈশোর পেরুনো এ রুপসীকে স্রষ্টা যেন নিজ হাতে কারুকার্যমন্ডিত করেছেন। নবযৌবনা এই উর্বশীকে দেখে জীবনে প্রথমবারের মতো হৃদয়ে এক অন্যরকম আলোড়ন হয়। প্রিয় ঝাউগাছ আর সদা চঞ্চলা স্রোতসিনী কুশিয়ারাকেও ম্লান মনে হয় স্রষ্টার এই অপূর্ব সৃষ্টির কাছে।
চলবে…..

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


