প্রায়ই একটা ঘটনা ঘটত, বিকাল কি সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠলে বুঝতাম না, সকাল নাকি বিকাল। কতক্ষণ মাথাটা ভোম হয়ে থাকত। এমনই এক বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি আকাশে কি মেঘ! কি মেঘ! কি মেঘ!! গহন দেয়া একেবারে, ভোর কি সন্ধ্যা বোঝার উপায় নাই।এমন আচ্ছন্ন চারিধার। আমাদের ঘরখানা ছিল দোতলার টানা বারান্দার শেষ মাথায়, ঘর থেকে বের হয়ে বামে গেলেই বারান্দা শেষ, দু-তিন ধাপ সিঁড়ি নামলেই গাড়ীবারান্দা, গোল থাম বেয়ে একদিকে উঠে এসেছে বাগান বিলাশের বিশাল ঝাড়, ফুল ছিল কিনা আজ মনে নেই কিন্তু মেঘ ছিল আকাশে অমন মন কেমন করা মেঘ আর দেখেছি কিনা জানিনা, দিনটির কথা কেনই বা মনে পরে জানি না, তবে এখনো অমন মেঘ জমলেই সেই বিকাল কি সন্ধ্যা আমার মনে আসবেই। মানব জীবনের এই ত এক আক্ষেপ কোন কিছুর বিনিময়েও পাওয়া যাবে না এক দন্ড, কি এক পল, কি মুহূর্ত!
আকাশটা কি বিশাল ছিল, সবসময় ভাবতাম, যদি রাস্তার শেষ মাথাটায় একদিন পৌছাই নিশ্চয়ই আকাশটাকে ধরতে পারব। কাব্যি করলে বলতে পারি সে আকাশটা আজো অধরাই থেকে গেল। আকাশ অধরা থাকলেই কি বহু পথের শেষ দেখেছি। বহু কানা গলি, গলি ঘুপছি ঘুরে, সেই বায়ান্ন গলি, তেপান্ন বাজার এর ঢাকা আজ মেগা সিটি, এতে আপ্লূত হবার বিশেষ কিছু নেই, এ শুধুই জনমিতির খেল, ভানুমতির খেল। বড় ঈমাম্বারা, চামেরি হাউস, রোজ গার্ডেন, বড় কাটরা, ছোট কাটরা এগুলই শুধু ঢাকা নয়, সবচেয়ে বড় যা ছিল তা ঢাকার প্রান, বুড়িগঙ্গা। অনেক শহর দেখেছি, দেশে কিংবা বাইরে শহর গুলো কমবেশি কোন না কোন নদীর ধারে, যে গুলো খুব সতস্ফূর্ত শহর, আপন মনে বেরে গেছে, ম্যানহাটন এর মত গ্রীড আয়রন প্যাটার্ন নয়,( আড়াআড়ি আর দীঘলে চৌখুপি রাস্তাই হচ্ছে গ্রীড আয়রন প্যাটার্ন) কেতাবি ভাষায় স্পন্টেনেওয়াস গ্রউথ যাদের, নদীর ধার ঘেঁষে ঘেঁষে শহর চলেছে নদীও চলেছে শহর বেড়েছে, নদী তো বাড়েনি কিন্তু বেড়েছে নদীর নাব্যতা, নদীর রূপ, নদীর উচ্ছল যৌবন কে ধরে রেখেছে, কোটি কোটি মুদ্রার বিনিময়ে হলেও কারন এ নদীই যে শহরের প্রাণ। প্যারিসের “ ল্য সিন”, বারলিনের “ দ্য স্প্রী” ম্যানহাটন এর “হাডসন রিভার”, অ্যাস্টারডেমের “অ্যামস্টেল”, মস্কোর “ভ্লগা”, আগ্রার “যমুনা”, কত্ত শত নাম আসছে মনে কিন্তু হায় এমন করুণ হতশ্রী, হতযৌবন, নদ কোথাও কেউ দেখেনি, এমন নিকষ কাল জল, এত পঙ্কিল, এত অবহেলিত নদী দ্বিতীয়টি বুঝি এই পৃথিবীতে আর নেই। কিসের হেরিটেজ! কিসের ডিজিটাল!! কোন ভায়াগ্রাও কাজে দিবেনা আর! এ যৌবন গেছে চলে! কোন সঞ্জীবনী সুধাই বুঝি কাজ করবে না আর। এ ক্যামন ধারা মানুষ আমরা বুঝি না! শহর শুধু উত্তরেই যাচ্ছে, যেতে যেতে সেই ঠেকল কোথায় তুরাগে, নদী বাঁচলেই শহর বাঁচবে! এ সহজ উপপাদ্য। নদী বাঁচবে কিনা জানিনা, স্বপ্ন বেঁচে থাকবে কিনা জানিনা, স্মৃতিরা বেঁচে থাকবে, সেই মেঘ মেদুর বিকেলটির মত। কত জল জমা হয়ে ছিল, এ শহর টিকে নিয়ে, আজ কাজের ফাঁকে ফাঁকে এক খাড়ির দেখা পেয়ে তোরে ফুরে বেরিয়ে আসছে সব জল। এ শহরের আমি কেউ নই তবু এ শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু! আমার হার জিত, আমার লড়াই, ফুট নোটে লিখা শেষ না হওয়া কবিতা, কান্না হাসির ফোঁড়ন, সব সব সব-কিছু, পালাতে চাই যত সে আসে আমার পিছু পিছু।
পায়ে পায়ে চলতে চলতে কখন যে এ শহর পৌঁছে গেছে খাদের কিনারে , কেউ বুঝেই উঠতে পারলাম না। নব্বই পর্যন্ত বেশ একটা শ্বাস প্রশ্বাস নেবার মত সচল ছিল। রিক্সা করে অনায়াসেই যে কোন কোথাও যাওয়া যেত, বেশ ফুর ফুরে মেজাজে। মানুষ ও ছিল ম্যানেজেব্ল নাম্বারে। তারপর কি যে হল, কেউ কিছু বুজবার আগেই একেবারে তলানিতে এসে ঠেক্লাম।কি অদ্ভুত!
টিয়া পাখি গুলো এখন কোন আকাশে ওড়ে!
সেই মেঘময় আকাশ দেখে কোন বালক-মন কি আর অবাক হয়!!
আকাশটা কোথায় গেলে আগের মত অতটা খোলা পাব যেখানে পথের সাথে মিশে গেছে!!!
দুর্বিনীত দালান সারির ফাঁক ফোঁকরে, কিংবা টেলিগ্রাফের তারে লটকে থাকে আদখানা আকাশ, মেঘ দল অলখেই চলে যায়। বালকের জানালায় মেঘ বুড়োরা আর ফেলেনা কোন ছায়া, রবীন্দ্র নাথ কি সান্টাক্লজ কাউকে খুঁজে দেখার মত জানালাই আর নেই এ পোড়া শহরে। আমদের ঘনটার পর ঘনটা কেটে যেত আকাশ দেখতে দেখতে, যেদিন স্কুল থাকতো না তাও ভোরে উঠে যেতাম, সেই গাড়ী বারান্দাটার সিঁড়িতে বসে আকাশ দেখতাম, হাতের টুথব্রাসের পানি শুকিয়ে জেত,কি যে ভাবতাম অত! আবার একটা তাড়া খেলে পরে ঢুকতাম টয়লেটে। চারখনা মরডান ব্রেড চ্যাপটা প্লেটে দুধ ঢেলে চিনি ছড়িয়ে দিতাম আর ডিম পোচ কি ডিম সিদ্ধ এই ছিল নাস্তা মা নেই বাবুর্চি মালেক ভাই কি খায়ের ভাই তাদের কাছেই হেঁশেলের ভার, এটা খাব ওটা খাব না, কোন সুযোগই নেই। তখনও বিমাতা ভয়ঙ্করী উপস্থিত নেই দৃশে, বাবা ব্যস্ত, পলিটিক্স বলে কথা! বড় ভাই, সূর্য সেন হল -বাসা যাওয়া আসা করেন, বড় দু বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, মেজ ভাই যা একটু শাসন বারন করতেন, আর আমরা চারজন বিশেষত ছোট তিনজন তো বেশ স্বাধীন ভাবেই বড় হয়েছি! অত তো বিগড়ে যাইনি। নিজের মত হেসে খেলে বেড়ে উঠছিলাম, এর মাঝে এক উটকো বিপদ এসে হাজির, এক প্রাইভেট টিউটর, জানিনা কেন স্যার এর নাম দিয়েছিলাম আমরা স্যারমুখী স্যার কেজানে কি এর মানে! আমাদের পড়ার ঘরটা ছিল দেড় তলায়, সিঁড়ির ল্যান্ডিঙ্গে লাগোয়া আট বাই দশ একটি ঘর!দেয়াল জোড়া আকা ছিল “দ্য রিটার্ন অফ দ্য সেইন্ট” এর টিং টিঙ্গে শরীরের ছবি। আমার কীর্তি! এ ঘর টাতে বড়রা কেউ ঢুকতেন না, আমরা সুশীল তিনজনা একে রেখেছি দেয়াল জুড়ে, যা খুসি তা। টিভি তখন অমোঘ নিয়তি! এখনকার মতই তবে সারাক্ষন তো চলত না আর হিন্দি ওয়ালাদেরও অত দাপট ছিল না! সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান দেখে দেখে কত্ত দুষ্টু ছেলেরা পা হাত যে ভাঙ্গল ইয়াত্তা নেই। দ্য রুটস, বাইওনিক অমেন, জেমেনি ম্যান, বিজে অ্যান্ড দ্য বেয়ার, ডবল ডেকার,অয়ান্ডার অমেন, লস্ট ইন স্পেইস, স্টার ট্র্যাক, হাওয়াই ফাইভ ও, মরক অ্যান্ড মিন্ডি, দ্য অয়াল্টন্স, লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরী, হাউ দ্য ওয়েস্ট ওয়জ ওউন, স্ট্রিট অফ সানফ্রানসিসকো কত্ত কি আর ছিল মুভি অফ দ্য উইক। লেট নাইটে হত ডালাস, বড়রা দেখত আমরা মাঝে সাঝে চুপ করে বসে থাকতাম, যেন প্যামেলার দুঃখ বুঝি কিংবা জে আর কি দারুন অভিনয় করছে, তাতেই মুগ্ধ? আর ছিল সলিড গোল্ড! অ্যান্ডি গিভ কি বী জিস গাইলে কথাই ছিল না! পাপেট শো! এখনো দেখতে রাজি! সেসাম স্ট্রিট!! আহা কি রঙ্গিন সময়টাই না ছিল! আমরা যারা মিড সেভেন্টিজ কি আরলি এইটটিজ আমার কেন যেন মনে হয় আমরা বুঝি সবই পেইয়েছির দলে! সেই ছোট্ট বেলার হিল্ম্যান রেডিওগ্রাম থেকে শুরু করে, এল পি, ক্যাসেট পেড়িয়ে টাচ জেনারেশন এ চলে এলাম, বাবার খটখটে টাইপ রাইটারে কত্ত ফিতা প্যাচিয়ে পি এ সাহেবের বকা খেয়ে এখন সারফেস প্রও তে মাউস পিষছি! ভাবলেই ক্যামন এক ব্যাথার মত সুখ জাগে, হারান লেত্তি হারানো লাট্টু,ফেলে আসা আলো ছায়া সময় , কোথায় যে যায়! ভাবি রাস্তাটার শেষটায় যেদিন পউছাব, যেখানে আকাশটা এসে আলগোছে নেমে গেছে, মিশে গেছে ধুলবালিদের সাথে, সেদিন বুঝি জানতে পারব, সময় কোথায় যায়! ছোট্ট যে গেছে সবার আগে বুঝিবা হাত বাড়িয়ে আছে হারানো সময়গুলি নিয়ে! সে আশায় দিন গুনি।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১৬ সকাল ১০:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


