দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে জানতে ভিজিট করুন : http://prothomnews.com/
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৪১ বছরের ইতিহাসে আজ এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় কারও বিরুদ্ধে আজই প্রথম ঘোষণা করা হবে রায়।
যে রায়ে জামায়াতের সাবেক রুকন মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে। বিচারপতি এম ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২-এ রায় ঘোষণা করবে। ট্রাইব্যুনালে অন্য দু’সদস্য হলেন বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও মো. শাহিনুর ইসলাম। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ গতকাল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। আবুল কালাম আযাদ এ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরুর সময় থেকেই পলাতক। শুনানিকালে প্রসিকিউশন তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছিল।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন থেকেই আন্দোলন চলে আসছে। একাত্তরের ঘৃণ্য অপরাধীদের আদালতের কাঠগড়ায় তোলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। শুরুর দিকে এ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নিজামুল হক। পরে বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। গত মাসে স্কাইপ সংলাপ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের প্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. নিজামুল হক পদত্যাগ করেন। এরপর সরকার ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল ১-এর চেয়ারম্যান হন বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর।
অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনাল ২-এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি এম ওবায়দুল হাসানকে। জামায়াতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মামলারও বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। তার মামলায় যে কোন দিন রায় ঘোষণা করা হবে। দলটির নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার কার্যক্রম একবার শেষ হলেও এখন নতুন করে মামলাটির যুক্তিতর্ক আবার শোনা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলিমের।
যেভাবে এগিয়েছে আযাদের মামলা
আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ১০ই এপ্রিল। গত বছরের ২৫শে মার্চ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপন করে প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আবুল কালাম আযাদকে গ্রেপ্তারেরও নির্দেশনা চাওয়া হয়। ৩রা এপ্রিল আযাদকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু উত্তরখানে তার বাসায় গিয়ে পুলিশ তাকে পায়নি। এর আগেই সে পালিয়ে যায়। ২৫শে সেপ্টেম্বর দু’টি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আযাদকে ৭ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু সে হাজির না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে পলাতক ঘোষণা করে তার অনুপস্থিতিতে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয়।
৭ই অক্টোবর পলাতক আযাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে মো. আবদুস শুকুর খানকে নিয়োগ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ৪ঠা নভেম্বর আযাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ৮টি অভিযোগ গঠন করা হয়। ২৬শে নভেম্বর থেকে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য নেয়া শুরু হয়। ২০শে ডিসেম্বর শেষ হয় সাক্ষ্য। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নূর হোসেনসহ রাষ্ট্রপক্ষের ২২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হয়। তবে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবদুস শুকুর খান কোন সাক্ষী হাজির করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল যুক্তি উপস্থাপনের জন্য ২৩শে ডিসেম্বর দিন ধার্য করে। দু’পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে গত বছরের ২৬শে ডিসেম্বর মামলার কার্যক্রম শেষ হয়। ট্রাইব্যুনাল শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। ট্রাইব্যুুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসিউদ্দিন মাহমুদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল আগে মামলাটি রায়ের জন্য সিএভি রেখেছিল। এখন রায়ের জন্য দিন ঠিক করেছেন। কাল (আজ) বিষয়টি কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, গভীর প্রত্যাশা নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম এ রায়ের জন্য। সাক্ষ্য-প্রমাণ যা দিয়েছি, সেগুলোই রায়ে প্রতিফলন হবে বলে আমরা আশা করছি। প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে আজ। এ রায় ঘোষণা হবে তার বিরুদ্ধে আনা ৮টি অভিযোগের ভিত্তিতে। এসব অভিযোগ আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি।
অভিযোগ : আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) ধারায় ৮টি অভিযোগে আনা হয়েছে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে। প্রথম, দ্বিতীয় ও অষ্টম অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে অপহরণ, আটক রাখা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এগুলো হলো: একাত্তরের জুনে রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে অপহরণ করে আটকে রেখে নির্যাতন, ২৬শে জুলাই আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আটকে রেখে নির্যাতন এবং ১৮ই মে এক নারীকে আটকে রেখে নির্যাতন।
আযাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ অভিযোগে। যাদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন- কলারন গ্রামের জমিদার সুধাংশু মোহন রায়, পুরুরা নমপাড়া গ্রামের মাধবচন্দ্র বিশ্বাস ও ফুলবাড়িয়া গ্রামের চিত্তরঞ্জন দাস। পঞ্চম অভিযোগে তার বিরুদ্ধে নতিবদিয়া গ্রামের দুই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। আযাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগটি আনা হয়েছে ৭ নম্বর অভিযোগে। এ অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৭ই মে তিনি ৩০-৩৫ জন সশস্ত্র রাজাকারকে নিয়ে ফরিদপুুরের বোয়ালমারী থানার হাসামদিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় হামলা চালান। সেখানে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শরৎচন্দ্র পোদ্দার, সুরেশ পোদ্দার, শ্যামাপদ পোদ্দার, যতীন্দ্র মোহন সাহা, নীল রতন সমাদ্দার, সুবল কয়াল ও মল্লিক চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।