তিনি বলেন, ‘বিশেষ সংবাদদাতা অলিউল্লাহ নোমান বিচারপতির স্কাইপ সংলাপ নিয়ে প্রতিবেদন করেন। এরপর থেকে ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে নানা হুমকি দেয়া হয় তাকে।’ তিনি বলেন, ‘এই হুমকির পর থেকে আমাদের মধ্যে ভয় কাজ করে, তার যে কোনো ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে’। সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো চাপ ছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে হুমকি দেয়া হয়েছে, আমরা জানি না কারা হুমকি দিয়েছে।’
গত ৯ ডিসেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও বেলজিয়াম প্রবাসী ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ সংলাপ নিয়ে অলিউল্লাহ নোমানের লেখা ‘বিচারপতির স্কাইপ সংলাপ’ শিরোনামের একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপতে শুরু করে দৈনিক আমার দেশ। ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রতিবেদনটি ছাপে দৈনিকটি।
এই প্রতিবেদন প্রকাশকে কেন্দ্র করে গত ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, স্কাইপি প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনায় গত ১২ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক স্কাইপি সংলাপ প্রকাশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারিসহ দৈনিক আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেন।
তিনি একইসঙ্গে ওই সংলাপ প্রকাশের দায়ে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক অলিউল্লাহ নোমানকে গ্রেপ্তারে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তাও জানাতে বলেন।
লন্ডনে একমাস ধরে স্বেচ্ছা নির্বাসন কাটানোর পুরো সময়ে অলিউল্লাহ নোমান নীরবতা পালন করছিলেন। কিন্তু গত ১৪ জানুয়ারি ও বুধবার দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত ‘উচ্চআদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ও আমাদের গন্তব্য’ ও ‘আইনের শাসন বনাম ব্যক্তির ইচ্ছা’ শিরোনামের দুটি কলামে তিনি নিজের স্বেচ্ছা নির্বাসনের ব্যাপারে মুখ খোলেন।
১৪ জানুয়ারির অলিউল্লাহ নোমান জানান কিভাবে তিনি ১৭ ডিসেম্বর স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লেখেন, ‘আমি নির্বাসিত জীবনে রওনা দেয়ার এক সেকেন্ড আগেও জানতাম না তিনি (আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান) আমার বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
তিনি জানান, ‘আমাকে ডেকে নিয়ে শুধু জিজ্ঞাসা করলেন পাসপোর্টে কোনো দেশের ভিসা আছে কি না। যুক্তরাজ্যের মাল্টিপল ভিসা আমার পাসপোর্টে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি টিকিট করার জন্য পত্রিকার জিএম জিল্লুর ভাইকে নির্দেশ দিলেন। বাসা থেকে পাসপোর্ট আনানোর জন্য বললেন আমাকে। বিকাল ৩টায় একথা বলার পর সন্ধ্যার ফ্লাইটে রওনা। তার সামনে আমি চোখের পানি ফেলে কাঁদলাম। তাকে ছেড়ে আসতে আমার ইচ্ছা ছিল না।’
‘তিনি আমার কোনো কথাই শুনতে রাজি হলেন না। শুধু বললেন- তোমার জীবন রক্ষা হোক সেটা আমি চাই। আগে তোমার জীবন রক্ষা কর, তারপর যা হবে হোক। তার এ কথার উপর আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না।’
বুধবার তিনি জানান দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার কী অনুভূতি হয়েছিল। তিনি লেখেন, ‘গত ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ দীর্ঘ ৪৫ মিনিট বসিয়ে রাখার পর আমাকে যখন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়, তখন রাত প্রায় সাড়ে ৮টা।’
‘চেক ইনে প্রবেশের পর আমার বোবা কান্না ধরে রাখতে পারছিলাম না। ফুঁপিয়ে কান্না আসছিল। প্রিয় মাতৃভূমি, অফিসের সহকর্মী, পরিবার-পরিজন সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
‘বিশেষ করে আমার ছোট তিনটি সন্তানের চেহারা শুধু চোখের সামনে ভাসছিল। আড়াই বছর বয়সের ফুটফুটে ফুলের মতো সুন্দর কন্যাসন্তানটি আমি বাসায় ঢুকলেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত। সেই সন্তানের চেহারা তখন শুধু আমার চোখের সামনে ভাসছে। চোখের পানি ফেলছি আর শুধু সেই সন্তানের কথা ভাবছি। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে যখন দেশ ছেড়ে চলে আসছিলাম তখন তাদের সঙ্গে একটু সময় কাটানোর সুযোগও ছিল না আমার।’
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে উচ্চ আদালত নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার জের ধরে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অলিউল্লাহ নোমান এক মাস এক সপ্তাহ কারাদণ্ড ভোগ করেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।