... বইয়ের একনিষ্ঠ কর্মী, বইয়ের পোকা... কথাগুলো কেমন শোনা গেলেও এতে যে গর্ব করার একটা বিষয় আছে তা টের পেয়েছি অনেক পরে। অনেক ছোটবেলার কমিক্স পড়ার অভ্যাস টা কলেজ পর্যন্ত টিকে ছিল। কলেজ পেড়িয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোড়গোড়ায় তখনো আমার হাতে শোভা পেতো ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা রুশ লেখক পাভেল বাঝোভ-এর মালাকাইটের ঝাঁপি ছাড়াও অন্যান্য রুপকথার বই।
হাতের কাছে যা পেতাম তা পড়ে ফেলাই ছিল তখনকার একমাত্র তপস্যা। আমার মাত্রাতিরিক্ত বই প্রীতি দেখে মা যেন প্রমাদ গুনলেন। পাঠ্য বইয়ের স্থান বদল হয়না সপ্তাহের পর সপ্তাহ্, কিন্ত ঘরে সংরক্ষিত ডেল-কার্ণেগীর একঘেয়ে বই ও আমার হাতে পড়ে প্রাত্যহিক জায়গা বদল করে। আমাকে সু-পথে নেয়ার জন্য তেড়ে এলেন তার অতি পরিচিত (অবশ্যই আমার কাছে এবং কেবল আমারই জন্য রক্ষিত) অগি্ন-মূর্তি ধারণ করে। সেদিন বাবা আমাকে বাঁচিয়ে ছিলেন এই বলে যে বই কখনো কাউকে ভুল পথে চালিত করেনা, ও তো খারাপ কিছু করছেনা, তবে কেন এই শাস্তি তার। আর আমাকে বুঝিয়ে ছিলেন অন্য বইয়ের পাশে যেন, পাঠ্যবই গুলো ও খানিক ঘেঁটে দেখি। মায়ের সেই সেদিনের 'রুদ্্র মূর্তি' , বাবার উপদেশ.... মায়ের সাথে এখনো হাসা-হাসি করি যখনই কথা হয়।
মুজতবা আলী-র বইকেনা গল্পের কথা মনে পড়ে। প্রিয়ার দিঘীর মতো কালো চোখ একসময় ঘোলা হয়ে আসবে, সুরার স্বাদ একসময় কেটে যাবে কিন্তু একখানা ভালো বইয়ের আবেদন কখনোই শেষ হয়ে যাবে না। কেউ হয়তো গলায় তলোয়ার ধরলেও অপরের জিনিষ ছুঁবে না কিন্তু বইয়ের বেলাতে সে ই গব্বর সিং এর ভূমিকা নিতে পারে।
অনেক গুলো বইয়ের মাঝে ঠিক এই মুহুর্তে কয়েকটা বইয়ের কথা খুব মনে পড়ছে যা কিনা এক নি:শ্বাষে পড়ে ফেলেছিলাম সব ভুলে গিয়ে। এর মাঝে 'বারমুডা ট্রায়াংগেল' পড়ার কথা মনে হলে নিজেকে খুঁজে পাই সোফার উপর শোয়া এক ঠ্যাং সোফার রেলিং-এ তোলা অবস্থায়, 'ণ-হন্যতে' পড়েছি বাথরুমের কমোডের উপর বসে, 'কোরাল আইল্যান্ড' পড়েছি স্কুলের পিছনের বেঞ্চিতে বসে। বুদ্ধদেব এর 'পুরানা পলটন' (বা আমরা তিনজন)পড়ে নিজেকে 'সেই ঊনিশো সাতাশ সনে' টেনে নিয়ে গিয়েছি, শুনতে পেয়েছি ছাদ পেটানোর শব্দ। আবার সেই তিন বন্ধুর একজন নিজেকে কল্পনা করে কোন এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি ভেজা ঘাশের উপর শুয়ে পড়ার মুহুর্তেতার স্যাৎসেতে গন্ধ সমস্ত অস্তিত্ত দিয়ে উপলব্ধি করেছি। 'আদম, ইভ ও অন্ধকার' পড়ে মনে হয়েছে আমিও তো এসব সামাজিক অনিয়ম গুলোর সাক্ষী। আমারো ইচ্ছে করে ঘৃণা গুলোকে প্রবল বেগে বের করে দিই শরীর থেকে যার স্রোতে ভেসে যাক সব অনিয়মের উপমা। রমাপদ চৌধুরী-র 'শেষের সীমানা' -র শেষ দিকে মনে হয়েছে আমি ও ঠুংরী বাবার একজন সাক্ষাৎ প্রার্থী, সবার সাথে আমিও পাহাড়ের ঢালু রাস্তা বেয়ে এগিয়ে চলেছি আর মনে মনে বলছি, ঠুংরী বাবা, একবার... অন্তত একবারের জন্য হলেও সত্যি হয়ে উঠো তুমি, তোমার মির্যাকল দিয়ে ভালো করে দাও আমার সুধন্যাকে.....
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



