
শেষ বার্তা
বড় ব্যাথার এক দিনে তোমার জন্ম হয়েছিলো।
নগরীর দ্বারপ্রান্তে ছিলোনা কোন মশাল।
অন্ধকারাচ্ছন্ন কোষ্ঠে শুধু ভয়ের আনাগোনা।
নিভৃতে একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন তোমার দাদীমা।
সময়ের ফেরে যাকে একদিন ঈর্ষা করেছিলো গ্রাস।
সেই প্রভাতে তোমার জন্মের পরে শহরে ঢাক পড়লো।
কত গুণীজন এলো অবেলার ফুল হাতে !
প্রত্যাশা তুমি যেন আকাশ হও।
দীর্ঘ বসন্তের শেষে, শতাব্দী কাল অপেক্ষার পরে
এ শহরে কোন নতুন শিশু জন্ম নিয়েছিলো।
প্রবীণেরা হর্ষধ্বনি দিয়ে শাঁখ বাজিয়েছিলো।
সুদূর পশ্চিম থেকে এনেছিলো আইভি লতা।
প্রাণ নাশের হুমকি যে তখনো বর্তমান
তা যেন সবাই ভুলে গিয়েছিলো।
শুধু একা আমি-ই খুশি হতে পারিনি।
সন্তানহীন থাকা এক বেদনা, আর সন্তান পেয়ে হারানো;
তার চেয়ে কঠিন ব্যাথা যে মহাবিশ্বে আর নেই।
আমার আপ্লুত নয়ন বারবার আমার দেবদূতকে দেখছিলো।
তোমার কোমল চোখও বুঝি সেদিন আমাকে বুঝেছিলো!
তাই তো তুমি কাঁদোনি, দীর্ঘ আরও এক শতাব্দী।
শত্রুরা যখন বুঝে গেলো,
এ পৃথিবীতে নেই, আর কোন নতুন প্রাণ নেই,
বিনাশকারীরা যখন ভ্রমে তাদের আখের গোছালো,
ঠিক তখন আমার প্রসূন প্রস্ফুটিত হোল।
আমি তোমায় লুকিয়ে রেখেছিলাম কৃষ্ণ গহ্বরে।
এ পৃথিবীতে সাতশো কোটি কৃষ্ণবিবর আছে।
সবাই সবকিছু সেখানে লুকাতে পারে, তুমিও পারবে।
আমি লুকিয়েছিলাম তোমাকে,আড়ালে নতুন প্রাণকে।
ঝঞ্ঝা বিক্ষোভ মাথায় নিয়ে তোমাকে দিতে চেয়েছি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী।
আমি জানতাম সুদিন আসবে, কালো মেঘ কেটে যাবে।
তুমি হবে সেই সকালের রোদ্রোজ্জ্বল আকাশ।
তাই প্রবীণদের আশাহত করতে আমি সেদিন কাঁপিনি।
তোমার দাদীমাকেও ভয় পাইনি।
আমার ঘুমন্ত সন্তান, তুমি আমার কৃষ্ণ বিবরে ছিলে।
বেড়ে উঠেছো সেখানে নিভৃতে, কিন্তু অন্ধকারে।
তোমার ছটফটানি, তোমার একাকীত্ব আমাকে অসম্ভব বেদনা দিয়েছে।
বিক্ষোভে তুমি অসংখ্যবার ফুলে উঠেছো, কিন্তু আমি স্বেচ্ছা নিরুপায়।
মায়ের যে তার সন্তানকে বাঁচাতেই হয়।
অধিককাল পরে তোমার জন্মের এক শতাব্দী পরে;
আজ তুমি জানতে চাইছো নির্বাসনের কথা,
প্রশ্ন করছো এতটা নিষ্ঠুর আমি হলাম কিভাবে ?!
যে শিশু জন্ম থেকেই রক্তের মাঝে বড় হয়,
সে জানে নিষ্ঠুর হওয়া কাকে বলে !
ভুল সময়ে জন্ম নিলে তুমিও জানতে।
তুমি ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছো ঠিক, কিন্তু বাঁচোনি।
যাপন না করলে তাকে জন্ম বলে না।
আজ এক অমানিশার ভোরের পর আমি লিখতে বসেছি।
তোমাকে আমার সব জানিয়ে যেতে হবে।
জানিয়ে যেতে হবে কিভাবে ঘর ভাঙ্গে ঘর, মানুষ ভাঙ্গে মানুষ।
জানিয়ে যেতে হবে কিভাবে মেঘ ফাঁকি দিয়ে চাঁদ ছোঁয়া যায়।
কিভাবে প্রেমের সঙ্গীতে সুখের সন্তরণ হয়।
তোমাকে জানিয়ে যেতে হবে ভালোবাসার সমস্ত পদাবলী।
তোমার নির্মল নিঃশ্বাসের চারা আমি বুনেছি,
তুমি সেথা বনায়ন করবে স্বমহিমায়, সবুজ খেয়ালে।
আমি তোমাকে জানিয়ে গেলাম এই পৃথিবীর সবার কৃষ্ণবিবর আছে, তোমারও আছে,
সবাই সেটা জানে না, কিন্তু তুমি জানবে।
তুমি জানবে কিভাবে দুনিয়ার সবকিছু সেখানে লুকানো যায়।
নিজের সন্তানকে বাঁচাতে হলে সেটা তোমাকে জানতেই হবে।
নয়তো নতুন প্রাণের অপেক্ষায় আবারও অসীমে পরে যাবে পৃথিবী।
বিনাশকারীরা চিরকালই ঘুরে ফিরে এসেছে, আসবে।
এটাই তোমাকে আমার শেষ বার্তা, ভালো থেকো আমার চোখের মণি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



