
বাচ্চাদের আন্দোলন কি থেমেছে ? সব কি শান্ত হয়ে গেছে ? না হলেও, দ্রুতই হবে। বাচ্চা বলছি কেন, ওরা তো বড়দের চেয়েও অনেক বড়। পুলিশের লাইসেন্স চেক করে, মন্ত্রীর গাড়ি ফিরিয়ে দেয়, চোখ উঁচিয়ে দৃঢ় চিত্তে বলতে পারে, ‘আপনি ভুল পথে এসেছেন’- তাঁদের মত ক্ষমতাবান আর কে হতে পেরেছে এই দেশে ! আমার দৃঢ় বিশ্বাস; তোফায়েল আহমেদ না হয়ে যদি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওই পথ দিয়ে যেতো তাহলেও এই টগবগে নব সূর্যরা তাঁর গাড়ি আটকে দিতো। বলতো, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে কিছুতেই আইন ভাঙতে পারেন না, আইন সবার জন্য সমান’। আজ পর্যন্ত আর কোন ঘটনায় কি মনে হয়েছে এতটা দুঃসাহস দেখাতে পারবে কেউ ! ওরা পেরেছে, কারণ, এই বয়সটাই এমন যেখানে কোন পিছুটান নেই, ভীরুতার স্থান নেই, নোংরা রাজনীতি নেই। অন্যায়ে তুখোড় প্রতিবাদী সাহসে ভরপুর সব প্রাণ। আবেগী এই বয়সটার সবচেয়ে বড় শক্তি হল জীবন উদ্দীপনা। এই উদ্দীপনায় পৃথিবীর সব কিছুকেই ওরা খুব সিরিয়াস ভাবে নেয় এবং হতাশার সামান্যতম চিহ্ন এই বয়সে থাকে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের এই বয়সী সৈনিক বেছে নেয়ার কারণও ছিল এই যে, হিটলার খুব ভালোভাবেই জানতো এই বয়সটাই হচ্ছে মানুষের উদ্দীপনার সর্বোত্তম বয়স এবং সেই বয়স যখন তাদেরকে দিয়ে যে কোন কিছুই করানো সম্ভব একেবারে নির্ভয়ে, নির্ভারে।
যাইহোক, এখানে কোন হিটলার বা অন্য কেউ নেই। কিশোর ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করেছে। তাদের সহপাঠীদের মৃত্যু তাদের সাহস জলে ঢেউ তুলেছে এবং সমস্ত জল ও ঢেউ মিলে সাগরের মত ফুঁসে উঠেছে। আমি গত দুদিন ধরে শুধু পড়েই যাচ্ছি পড়েই যাচ্ছি আর ছবি দেখে যাচ্ছি এই সোনার টুকরো ছেলেদের। কিন্তু টের পাচ্ছি এই সোনাকে এখন তামা, পিতল হয়ে একেবারে কাঁদামাটি বানানোর পাঁয়তারা চলছে। সব দাবী মেনে নেয়ার আশ্বাস শুধুই কথার কথা, একটা কিছুই হবে না প্রকৃতপক্ষে। কারণ, যেই দাবী সেগুলোর একটাও নতুন নয়, সবই আইনে আগে থেকেই আছে এবং প্রয়োগ নেই একটারও। একটা দাবী নিয়ে ছাত্ররা আন্দোলন করে আদায় করলে সেটাই খুব কাজের হত এবং ইতিহাস সৃষ্টি করতো। তা হল, মন্ত্রী শাহজাহান খানের পদত্যাগ। যা এর আগে কেউ এদেশে করতে পারে নি। এটা ঘটলে সবাই বুঝতো ছাত্র আন্দোলনের শক্তিটা কি এবং কি তার দূর্বার গতি। একটা উদাহরণে বাকি সব মন্ত্রীরা সতর্ক হয়ে যেতো। গদি থেকে পড়ে যাবার ভয়ে বাকি সবাই একটু হলেও তাদের দায়িত্বে সচেতনতা বাড়াতো।
নিহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়া হচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার। বাস মালিকের ও চালকের শাস্তি হচ্ছে তাদের নিশ্চিত প্রাপ্য বিচার। আন্দোলনের সম্পূরক ফল হিসেবে এসব এমনিতেই ঘটতো। কিন্তু দাবী আদায় হওয়া উচিত ছিল একমাত্র সেটা, তাহলেই এই আন্দোলনকে সফল বলা যেত। এই যে মৃত্যুর পরেও রক্ত ঝরলো, আন্দোলনে আহত হল বাচ্চারা তারা শুধু কিছু মুখের বুলি নিয়েই ফিরে যাবে, এটা কি প্রহসন নয় ? কোমলমতি কিশোরদের সাহসশক্তি দূর্বার কিন্তু তাদের বোধ তো তাদের বয়সোপযোগী, তাই এই ঠুলী পড়ানোটা তারা বুঝতে পারছে না। পুলিশকে ফুল দিয়ে প্রতিবাদ অথবা গালিগালাজের স্লোগান তুলে প্রতিবাদ যেটাই হোক, এই বুদ্ধিগুলো নিশ্চিতভাবেই পুরোপুরি ছাত্রদের মাথা থেকে আসেনি। তাদের পেছনে বড়রা আছেন। স্থানভেদে হয় কোন শিক্ষক বা অন্য কেউ। সবাই তাদেরকে সাপোর্ট এবং বাহবা দিচ্ছে। সকল মাধ্যমে প্রায় সবাই কথা বলছেন। এই বড়রা তো পারতেন, ছাত্রদের দিয়ে প্রহসনের দাবী না তুলে সত্যিকারের একটা দাবী আদায় করে আন্দোলনটা সফল করতে। এই একটা বিরাট আন্দোলনে ঠিক একই সময়ে ঘটা আরও কিছু ভীষণ স্পর্শকাতর ইস্যু আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। যেমন, মধুপুরে এক আদিবাসী শিশুর উপর পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা। তাহলে ওই সকল বিচারের দাবীও তো এই আন্দোলনের সাথে মিশে গেছে। এই আন্দোলনের দাবী হওয়া উচিত ছিল আরও বহুগুণ শক্তিশালী এবং ফলাফল হওয়া উচিত পদত্যাগের মত নিশ্চিত, স্পষ্ট দৃশ্যমান।
যেকোন দেশেই ছাত্রশক্তি হল একাডেমিকভাবে অটোম্যাটিক তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় মানব শক্তি। পেশী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় অর্গানাইজড শক্তি। আমাদের দেশে রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই শক্তি প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত কিন্তু স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অবস্থায় মোটেই তা নয়। এটি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ছাত্রদের প্রাণের আন্দোলন। এই আন্দোলনকে কলঙ্কিত এবং ব্যর্থ হতে দেখা বড়দের জন্য তীব্র লজ্জা ও ব্যর্থতা বই কিছু নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০১৮ রাত ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


