মূল : আলামা ড. ইউসূফ আল-কারাযাভী
অনুবাদ : সা'দ উদ্দীন
সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই দেশে দেশে কৌতূহল, বিস্ময় ও ভীতিজনিত নানা কুসংস্কার চালু ছিলো। গ্রহণের দৃশ্য দেখে সেকালে লোকে ভাবতো, কোনো ভয়ঙ্কর রাহু বুঝি সূর্য ও চন্দ্রকে গিলে খেয়ে ফেলছে। তাই জগতকে রক্ষার জন্যে তারা ঈশ্বর বা দেবতার কাছে প্রার্থনা করতো। কিন্তু আজকের দিনে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে গ্রহণের কারণ ও অবস্থা সম্পর্কে আমরা স্পষ্টত জানি যে এটি সূর্য ও চন্দ্রের উদয় ও অস্তের মতোই নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকী আগামী কয়েক শো বছরে ঠিক কোন্ কোন্ মুহূর্তে গ্রহণ হবে এবং কোথায় কতোক্ষণ ধরে তা দৃশ্য হবে, জ্যোতির্বিদরা খুব সহজেই সেসব বলে দিতে পারেন। ইসলামে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সময় ঐচ্ছিক নামাযের ব্যবস্থা আছে, যাকে যথাক্রমে ‘কুসূফ ও খুসূফ’ এর নামায বলা হয়। তাই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে সম্প্রতি ইসলামের বিপক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় যে, ইসলাম সত্যিই ঐশী জীবনব্যবস্থা হলে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের মতো স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনাকে দুর্যোগ ও আল্লাহর গযব মনে করে নামাযের ব্যবস্থা দেয় কীভাবে? উপরন্তু নাস্তিকদের মধ্যে এ নামাযের যৌক্তিকতার প্রশ্ন তুলে গোটা ইসলামকেই কল্পিত প্রমাণ করবার প্রয়াস দেখা যায়। সরল ধার্মিকরা এসব প্রচারণায় বিব্রত হচ্ছেন। কাজেই ইসলামে সূর্য- ও চন্দ্রগ্রহণকে কীভাবে দেখা হয়, এ সংক্রান্ত নামাযেরই বা ভিত্তি কী -- বিষয়টি সম্পর্কে প্রামাণ্য আলোচনা ও নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ উপস্থাপিত হওয়া সময়েরই দাবি।
মহাগ্রন্থ কুরআনে সূর্য-চন্দ্রগ্রহণের নামায সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই। অবশ্য রাসূল সা. এর কথা ও কাজে তার উল্লেখ রয়েছে। আর তা হলো, দশম হিজরী সনে যখন সূর্যগ্রহণ দেখা দেয়, তখন রাসূল সা. তাঁর সাহাবাদের নিয়ে নামাযে দাঁড়ান এবং নামায দীর্ঘ করেন গ্রহণ শেষ হওয়া অবধি। বহু হাদীসে এর উল্লেখ আছে। কিন্তু একটি বিশুদ্ধ হাদীসও এ কথা বলে না যে, গ্রহণ লাগে আল্লাহর ক্রোধ বা অসন্তোষের কারণে। তাছাড়া, হাদীসে উক্ত সূর্যগ্রহণটি ঘটেছে মদীনার বিজয়ী সময়ে, যখন আল্লাহর সাহায্য নেমে এসেছে এবং দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করছে। যদি আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের কারণ হতো, তাহলে তো তা মক্কী জীবনে ঘটাই বেশি যুক্তিযুক্ত ছিলো। কেননা তখন রাসূল সা. ও তাঁর সঙ্গীরা খুব কঠিন সময় পার করছিলেন। মক্কার যালিমরা গুটিকতক সত্যানুগ মানুষের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছিলো। শুধু আল্লাহকে প্রভু বলার ‘অপরাধে’ তাঁদেরকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয়েছিলো।
সেকালে মানুষ সূর্য-চন্দ্রগ্রহণের আরো একটি কারণ বলে ধারণা করতো কোনো মহামানবের মৃত্যুকে। ঘটনাক্রমে হাদীসোক্ত সূর্যগ্রহণের দিনটি ছিলো রাসূলের ছেলে ইবরাহীমের মৃত্যুদিন। তাই লোকজন বলাবলি করতে লাগলো যে, রাসূলের সন্মানে তাঁর পুত্রের মৃত্যুশোকেই সূর্যে গ্রহণ লেগেছে। কিন্তু রাসূল এ কুসংস্কারকে এক মুহূর্ত প্রশ্রয় দিলেন না। তিনি ভুল ভেঙে দিয়ে বললেন, এটি স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার। যদিও তাঁর বহু ঘটিত মুজিযার সঙ্গে আরেকটি যোগ করার সুযোগ ছিলো, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে অসত্য দিয়ে সত্যকে বিজয়ী করা থেকে অমুখাপেক্ষী রেখেছেন।
ইমাম আহমদ ও তাবরানী সামুরা বিন জুনদুব সূত্রে বর্ণনা করেন যে, নবী সা. সূর্যগ্রহণের সময় তাঁদের সম্মুখে ভাষণ দেন। ভাষণে বলেন : “...... কিছু লোক ধারণা করে, সূর্য- ও চন্দ্রগ্রহণ এবং তারকারাজির কপথ থেকে বিচ্যূতি পৃথিবীর কোনো মহামানবের মৃত্যুর কারণে হয়, এটা ঠিক নয়। বরং এসব আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে তাঁর বান্দারা উপদেশ গ্রহণ করে ...।” (মাজমাউয যাওয়াইদ: ২/২১০)
ইমাম হাকিমও একে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী তাঁর মুসতাদরাক ও তালখীসে হাদীসটির উদ্ধৃতি দিয়ে এর সত্যতা প্রতিপাদন করেছেন। (১/২৩১, ৩২৯)
ইমাম বুখারী মুগীরা বিন শু’বা হতে বর্ণনা করেন, শু’বা বলেন : ইবরাহীমের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ হলে লোকেরা বলতে লাগলো : “ইব্রাহীমের মৃত্যুর কারণে গ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূল সা. বললেন : “নিশ্চয় সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর কুদরতের অন্যতম দুই নিদর্শন। কারো জন্মমৃত্যুর কারণে এগুলির ‘গ্রহণ’ হয় না। তাই যখন তোমরা এর কোনো একটিকে গ্রহণগ্রস্ত হতে দেখবে, তখন আল্লাহর কাছে দু’আ করবে এবং স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত নামায পড়বে।” লক্ষণীয় বিষয়, চন্দ্র-সূর্যগ্রহণ নিয়ে এ প্রশ্ন এবং ইসলামে একে দুর্যোগ বা ভয়ঙ্কর হিসেবে দেখা হয়েছে বলে জটিলতা সৃষ্টির মূল কারণ যেটি, তা হলো, আবূ বুকরা হতে মারফূ’ সূত্রে বুখারীর কিছু বর্ণনায় “ لا ينكسفان لموت أحد ” -- ‘গ্রহণ হয় না কারো মৃত্যুর কারণে’ এরপরই “ ولكن الله يخوف بهما عباده”, অর্থাৎ ‘কিন্তু আল্লাহ এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করেন’, -- এ বর্ধিত অংশটি। ইমাম বুখারীসহ হাদীসতত্ত্বের অভিজ্ঞ ইমামগণ বর্ণনাপরম্পরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এই শেষোক্ত জুড়ে দেয়া অংশটি প্রামাণ্য নয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ বর্ধিত অংশটি হাম্মাদ বিন যিয়াদ ইউনুস থেকে, তিনি হাসান থেকে, তিনি আবূ বুকরা থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকরীগণ হাদীসটি ইউনুস থেকে বর্ণনা করেছেন, অথচ তাঁরা এ অংশটি উল্লেখ করেন নি। যেমন আবদুল ওয়ারিস, শু’বা, খালেদ বিন আবদুল্লাহ, হাম্মাদ বিন সালামা প্রমুখ। ইমাম বুখারীর ন্যায় অধিকাংশ হাদীসের ইমামগণের নীতি অনুযায়ী যে বর্ণনা তারচে’ অধিকতর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী বা সংখ্যায় বেশি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিরোধী হয়, সেটি 'শায' এবং প্রত্যাখ্যানযোগ্য। এ ধরণের সূত্রহীন বা অগ্রাহ্য হাদীস অথবা হাদীসে এমন পরিবর্ধন সহীহ হাদীসের সংজ্ঞা থেকে বের হয়ে যায়।
সন্দেহ সৃষ্টিকারীরা “ يخوف الله بهما عباده” অথবা “ ادعوا الله وصلوا حتى ينجلي ” এর মতো দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত বাক্যগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বলতে থাকেন : কীসের ভয়? কী জন্যে দু’আ আর কী জন্যে সালাত? গ্রহণ একটি প্রাকৃতিক বিষয়। হ্যাঁ, আমরাও বলি অবশ্যই এটি একটি প্রাকৃতিক বিষয়। আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি অনুসারেই গ্রহ-নক্ষত্র চালিত হয়, আবর্তনের নির্দিষ্ট নিয়ম ও স্থান-কালে ব্যত্যয় হয় না। সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়মই আল্লাহর ইচ্ছা এবং কুদরতেরই প্রকাশ। কাজেই জগতে যা কিছু সঙ্ঘটিত হয়, তাঁর ইচ্ছা ও কুদরতেই হয়। একইভাবে যখন সূর্য- ও চন্দ্রগ্রহণের মতো আল্লাহর কোনো নিদর্শন প্রকাশিত হয়, তখন তো এটাই স্বাভাবিক যে তা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর অপার মতা, ইচ্ছা, শক্তি, প্রজ্ঞা ও পরিচালনার মাহাত্ম্যবোধ জাগিয়ে তুলবে। মানুষের মন নিবেদনের নিষ্ঠায়, জিহ্বা প্রশংসার উচ্চারণে, হাত প্রার্থনার অনুনয়ে এবং তার কপাল ভক্তির সিজদায় তাঁর প্রতি অভিনিবিষ্ট হবে।
নানা নৈমিত্তিক ও বিচিত্র প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ আপনাকে অভিব্যক্ত করেন। রাসূল সা. তখন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও প্রার্থনায় মগ্ন হতে উৎসাহ দিতেন। এ বিষয়ক বহু যিকর ও দু’আর কথা রাসূলের পুণ্যাত্মা সহচরগণ বর্ণনা করে গিয়েছেন। এসব আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয়। এমন কয়েকটি দু’আ :
ক. সকাল বিকালে
ইমাম তিরমিযী আবূ হুরায়রা সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূল সা. তাঁর সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিতে বলতেন : যখন তোমরা সকালে ঘুম থেকে ওঠো, পাঠ কোরো -- اللهم بك أصبحنا، وبك أمسينا، وبك نحيا، وبك نموت، وإليك النشور
আর বিকেলে পড়ো, اللهم بك أمسينا وبك أصبحنا.... الحديث
ইমাম তিরমিযী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন ইবনে মাসঊদ থেকে। তিনি বলেন : সকালবেলা রাসূল সা. বলতেন : أمسينا وأمسى الملك لله والحمد لله، لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد، وهو على كل شيء قدير، رب أسألك خير ما في هذه الليلة، وخير ما بعدها، وأعوذ بك من شر هذه الليلة، وشر ما بعدها، رب أعوذ بك من الكسل وسوء الكبر، رب أعوذ بك من عذاب في النار، وعذاب في القبر
তেমনি বিকালবেলাও বলতেন : أصبحنا وأصبح الملك لله
খ. ঝড়ো হাওয়া প্রবাহ ও মেঘের ঘনঘটার সময়
ইমাম মুসলিম আয়শা থেকে বর্ণনা করেন, প্রবল বায়ূ প্রবাহকালে রাসূল সা. বলতেন: اللهم أسألك خيرها وخير ما فيها، وخير ما أرسلت به، وأعوذ بك من شرها، وشر ما فيها وشر ما أرسلت به
তাঁর থেকে আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূল সা. যখন দিগন্তে মেঘমালা দেখতেন, তখন কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে প্রার্থনায় নিবিষ্ট হয়ে বলতেন : اللهم إني أعوذ بك من شرها যদি বৃষ্টি হতো, তাহলে বলতেন : اللهم صيبا هنيئا
ইমাম আবূ দাঊদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ও আবূ আওয়ানাও ইমাম মুসলিমের শর্তের ওপর বিশুদ্ধ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, যেমনটি আলবানী তাঁর ‘আল-কালিমুত তায়্যিব ’ কিতাবে বর্ণনা করেছেন।
গ. নতুন চাঁদ দেখার সময়
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল যখন নতুন চাঁদ দেখতেন, বলতেন: الله أكبر، اللهم أهله علينا بالأمن والإيمان، والسلامة والإسلام والتوفيق لما تحب وترضى، ربنا وربك الله
হাদীসটি ইমাম দারিমী বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী ত্বালহা থেকে সংক্ষেপ করে বর্ণনা করেছেন এবং 'হাসান' বলে অভিহিত করেছেন। ইবনে হিব্বানও আলবানীর ন্যায় হাদীসটি তার শাওয়াহিদসহ সহীহ বলেছেন।
বিভিন্ন সময় ও অবস্থার জন্যে ভিন্ন ভিন্ন এমন অনেক দু’আই বর্ণিত রয়েছে। যেমন ঘুমানো, ঘুম থেকে জাগা, পানাহার, কাপড় পরা, বাহনে আরোহন, ভ্রমণ ও ভ্রমণ থেকে ফেরার সময় ইত্যাদি। এ ব্যাপারে আলাদা অনেক কিতাবও রচিত হয়েছে। যেমন ইমাম নাসাঈ ও ইবনে সিন্নির ‘আমলুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ’, নববীর ‘আল-আযকার’, ইবনে তাইমিয়ার ‘আল-কালিমুত তায়্যিব ’, ইবনুল কাইয়্যিমের ‘আল-ওয়াবিলুস সায়্যিব’, ও শাওকানীর ‘তুহফাতুয যাকিরীন’ ইত্যাদি।
এসব যিক্র ও দু’আ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তর যেনো সর্বদা আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। নিত্যকার ও কদাচিৎ, সকল ঘটনা ও বিষয়কে মুমিন সাধারণ মানুষের চে’ ভিন্ন চোখে দেখে। সে চোখ অন্তরের চোখ। তাই সে এগুলোর পেছনে দেখে আল্লাহর সে হাত, যা সৃষ্টির উৎস; সে চোখ, যা রক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে নিরত। তাই সে তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল এবং তাকবীর বলতে থাকে। দু’আ এবং বিনয় প্রকাশ করতে থাকে।
ইমাম বুখারী ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’-এ আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন মেঘের গর্জন শুনতেন, আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট হয়ে বলতেন : سبحان الذي يسبح الرعد بحمده، والملائكة من خيفته
নিত্যকার অভ্যস্ত স্বাভাবিক বিষায়াবলিতে যখন মুমিনের এ অবস্থা, তখন সূর্য-চন্দ্রগ্রহণের ন্যায় ব্যতিক্রমী বিষয়ের ক্ষেত্রে, যা দীর্ঘ সময় পরে পরে এক-দু’ বার ঘটে, তাতে তার কী অবস্থা হওয়ার কথা? আল্লাহর বিরাট নিদর্শন প্রকাশিত হবে, আর অন্যান্য মানুষের ন্যায় সে উদাসীন ও আনমনা থাকবে, তা তো হতে পারে না। নিত্যঘটিত প্রাকৃতিক ও অভ্যাসগত বিষয়ের জন্যে যিকর ও দু’আর ব্যবস্থা থাকলে এরূপ বিরাট নিদর্শনের জন্যে এরচে’ বেশি কিছু প্রয়োজন। আর তা হলো নামায। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয়ের প্রাধান্য থাকে, তাঁরা যখনই জগতে আল্লাহর কোনো স্বাভাবিক কুদরতেরও প্রকাশ দেখেন, ধরে নেন তার পেছনে এমন কিছু রয়েছে, যা তাঁরা না-জানলেও আল্লাহ জানেন, তাই তাঁরা তা থেকে গাফিল থাকেন না।
ইমাম ইবনে দাক্বীকুল ঈদ বলেন : কখনো কেউ বিশ্বাস করতে পারে যে, জ্যোতির্বিদরা যা বলেন, তা يخوف الله بهما عباده
পরিপন্থী। এ বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। কারণ আল্লাহর কাজসমূহের কিছু স্বাভাবিক, আর কিছু অস্বাভাবিক। সকল কার্যকারণের ওপর রয়েছে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কুদরত। তিনি কারণ ব্যতিরেকেও যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক সকল কিছুর তিনিই নিয়ন্তা। আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দাদের বিশ্বাস দৃঢ় বলে যখনই তাঁরা বিস্ময়কর কিছু ঘটতে দেখেন, তাঁদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হতে পারে।
মহাবিশ্বের কিছুই চিরন্তন নয়, সূর্য-চন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই কথা। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেমতো এরা নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট গতিতে নিরন্তর পরিভ্রমণ করে চলেছে। সেইসব রহস্যের কিছুটা মানুষ জানে, কিছু জানে না। কিন্তু আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। মুমিন এমনই বিশ্বাস করে, তাই সে কখনো উদাসীন থাকে না। সূর্য- ও চন্দ্রগ্রহণের আপাত ভীতিকর দৃশ্য তাকে মনে করিয়ে দেয় ভয়ঙ্কর মহাপ্রলয়ের কথা। তাঁর অন্তর আজ থেকে কাল, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে চলে যায়। বিশেষত যখন স্মরণ হয় আল্লাহর বাণী (وما أمر الساعة إلا كلمح البصر أو هو أقرب) (কিয়ামতের ব্যাপারটি তো এমন, একটি চোখের পলক অথবা তারচেয়েও নিকটবর্তী। সূরা নাহল: ৭৭)
কিছু বর্ণনায় এসেছে, মহানবী সা. গ্রহণকালে কিয়ামত সঙ্ঘটিত হয়ে যাবার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন। এতে প্রশ্ন জাগে, কিয়ামতের অনেক আভাস ও নিদর্শন রয়েছে, যা রাসূল নিজেই বলেছেন এবং এগুলো এখনো প্রকাশিত হয় নি। তাই কেউ কেউ এ বর্ণনায় অভিযোগও করেছেন। তবে এ বর্ণনা এ অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে যে, রাসূল সা. এমন করেছেন উম্মতকে শিক্ষা দেয়া ও সতর্ক করার জন্যে। যাতে করে কিয়ামতের বিষয়টি সর্বাবস্থায় স্মরণ থাকে। বিশেষত যখন শেষ যামানা আসবে এবং বড় বড় চিহ্ন ও নিদর্শনগুলো প্রকাশিত হতে থাকবে।
হযরত উসমানের শাসনামলে সূর্যগ্রহণ দেখা দিলে তিনি লোকদেরকে নিয়ে নামায পড়েন। অতঃপর ফিরে এসে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। আর আবদুল্লাহ বিন মাসঊদ আয়েশার কে বসলে কতক সাহাবীও তাঁর কাছে বসেন। তখন তিনি বলেন, রাসূল সা. সূর্য- ও চন্দ্রগ্রহণকালে নামায পড়ার নির্দেশ দিতেন। তাই তোমরা যখন এ দু’টি দেখবে, তখন নামাযের আশ্রয় নেবে। কেননা যদি কিয়ামত সঙ্ঘটিত হয় যায়, তাহলে তোমরা তখন উদাসীন অবস্থায় থাকলে না। আর যদি তা না হয়, তাহলে অনেক পুণ্য তোমরা অর্জন করলে। (ইমাম আহমদ, আবূ ইয়ালা ও তাবরানী বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। মাজমাউয যাওয়াইদ: ২/২০৬-২০৭)। ইমাম আহমদ শাকির তাঁর মুসনাদে বর্ণনার সনদ বিশুদ্ধ বলেছেন। (৬/৪৩৮৭)
এ সকল উপাত্ত দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সূর্য-চন্দ্রগ্রহণকালে ইসলাম যে সালাত, দু’আ ও যিকরের প্রবর্তন করেছে, তা এজন্যে নয় যে, গ্রহণ আল্লাহর গযবের কারণ আর সে গযব দূর করার জন্যেই নামায। অতীতকালের কিছু ব্যক্তিবিশেষের অভিমত ছাড়া এরূপ ধারণার পেছনে গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই মতামতগুলি শুদ্ধ না ভুল, তার দায়দায়িত্বও ইসলামের ওপর বর্তায় না। ইসলামের বিশ্বাস ও আচরণগত শরীয়ার ক্ষেত্রে এসবের কোনো মূল্য নেই। ইসলামী জীবনাদর্শের মৌল ভিত্তি আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।
সৃষ্টিতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের বিখ্যাত পণ্ডিত হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালী এসব কল্পজাত বিভ্রান্তির (দুর্বল হাদীসের পাশাপাশি) দ্বিতীয় আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘المنقذ من الضلال ’ কিতাবে। তিনি লিখেছেন : ইসলামের নামে এ ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ ইসলামের জনৈক মূর্খ হিতাকাঙ্ক্ষী, যার ধারণা হলো দর্শন-বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট সব চিন্তাকে ধর্মের আওতা থেকে বের করে দিয়ে ইসলামকে সাহায্য করা উচিত। সে বিজ্ঞানী-দার্শনিকদেরকে মূর্খ আখ্যায়িত করে তাদের সমূহ জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে বসে। এমনকি সূর্য-চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কীয় তাঁদের উক্তিগুলোকেও। তার ধারণা, তাঁরা যা বলেছেন তা শরীয়া বিরোধী। এসব স্থূল প্রচারণা পণ্ডিতদেরকে ইসলাম থেকে বিমুখ করার পেছনে কাজ করেছে। সাধারণ মানুষও প্রভাবিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। অথচ সত্য হলো, ইসলাম সর্বদাই সকল জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে এসেছে এবং শুদ্ধ বিজ্ঞান-দর্শনের সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই।
মহানবীর বাণী -- إن الشمس والقمر آيتان من آيات الله تعالى لا ينخسفان لموت أحد ولا لحياته، فإذا رأيتم ذلك فافزعوا إلى ذكر الله تعالى وإلى الصلاة -তে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নির্দেশিত চন্দ্র-সূর্যের গতি ও বিশেষ সময়ে এগুলির নিজ নিজ কপথে একই সরলরেখায় অবস্থানের কোনো অস্বীকৃতি নেই। আর হাদীসের আলোচিত -- لكن الله إذا تجلى لشيء خضع له এ বর্ধিত এ অংশটি সহীহ হাদীসগ্রন্থগুলোতে নেই। (المنقذ من الضلال للغزالي পৃষ্ঠা ১৪০-১৪১)
দুর্বল হাদীস দ্বারা প্রমাণ দেয়া বৈধ হলে আমরা তাবরানী তাঁর আল-কাবীরে সামুরা থেকে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা উল্লেখ করতাম। তাতে রয়েছে যে, রাসূল সা. বলতেন : (إن الشمس والقمر لا يخسفان لموت أحد، ولا لشيء تحدثونه، ولكن ذلكم من آيات الله) হাদীসটিতে একজন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন। যেমন বায়হাক্বী বলেছেন। এজন্যে তা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবু সে যুগে তা বিষয়ের গুরুত্বে মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছিলো। তাই তারা এগুলি বর্ণনা এবং লিপিবদ্ধ করেছেন। সারকথা হলো, কুরআন বা রাসূল সা. থেকে এমন কোনো প্রমাণ উদ্ধার করা যায় না, যাতে সূর্য- বা চন্দ্রগ্রহণ সঙ্ঘটিত হওয়ার জন্যে প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহ যে রীতি ঠিক করে রেখেছেন, তা ছাড়া ভিন্ন কোনো কারণে তা সঙ্ঘটিত হয়।
* আল্লামা ড. ইউসুফ আল-কারাযাভী -- বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলিমে দ্বীন, গবেষক ও শতাধিক গ্রন্থপ্রণেতা। জন্ম : ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, মিশর। আল-আযহার থেকে ১৯৫৩-এ ইসলামী ধর্মতত্ত্বে স্নাতক, ১৯৫৮-এ আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা, ১৯৬০-এ উসূল আদ্-দ্বীন বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং ‘সামাজিক সঙ্কট নিরসনে যাকাতের ভূমিকা’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্যে ১৯৭৩-৭৭ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। আল-জাজিরার বিশ্বখ্যাত ‘ইসলাম ও শরীয়া’ বক্তৃতা সিরিজের জন্যে বিখ্যাত। বর্তমানে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন।
সা’দ উদ্দীন : শিক্ষক, শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া ক্বাসিমুল উলূম, জকিগঞ্জ, সিলেট। ই-মেইল : [email protected]
সূর্য-চন্দ্রগ্রহণের সালাত বিষয়ে আপত্তির জবাব
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।