আমার দেশ, Mon 23 May 2011
পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারছে না। কেউ একাধিকবার পরীক্ষা দিয়েছে, তারপরও পাস করতে পারেনি। আবার যোগ্য প্রার্থীও কম। ফলে বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতীয় কোটা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আগে কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাকোটায় উত্তীর্ণদের দিয়ে এ গ্যাপ পূরণ করা হতো। বর্তমান সরকার নিয়ম করেছে, কোটা পূরণ না হলে সেটি খালি রাখতে হবে। ফলে ২৮ এবং ২৯তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতীয় কোটায় কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২৮তম বিসিএসে ৮১০টি এবং ২৯তম বিসিএসে ৭৯২টি পদ শূন্য রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এ তিন কোটা পূরণের জন্য এবার বিশেষ বিসিএসের আয়োজন করতে যাচ্ছে। আর এ বিশেষ বিসিএস আয়োজনের জন্য ২০০২ ও ২০০৩ সালে জোট সরকারের আমলে জারি করা দুটি সার্কুলার বাতিল করেছে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযোদ্ধা এবং উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পুত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যাদের নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অবশ্য পিএসসির একাধিক সদস্য এ বিশেষ বিসিএসের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন। পিএসসির এ সদস্যদের দাবি, বিশেষ বিসিএসের কারণে মেধাশূন্যরা চাকরি পাবে, এতে ম্যানেজমেন্ট নষ্ট হয়ে যাবে। এর ফলে রাষ্ট্র ঠিকমতো চলবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দলীয় লোকদের নিয়োগ দিতেই সরকার এ বিশেষ বিসিএসের আয়োজন করতে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মহিলা ও উপজাতীয় প্রাধিকার কোটার প্রার্থীদের জন্য বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠান বিষয়ক এক সভা গত ৩ মে অনুষ্ঠিত হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইকবাল মাহমুদের সভাপতিত্বে তার অফিসে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পিএসসির সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (বিধি) মো. ফিরোজ মিয়া, যুগ্ম-সচিব (এপিডি) মো. সোহরাব হোসাইন, যুগ্ম-সচিব (শৃঙ্খলা ও আইন) রইছউল আলম মণ্ডল, উপসচিব মো. মনির হোসেন, আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (মতামত) আবু আহমেদ জমাদার ও পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আ,ই,ম নেছার উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ৫টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমত, ২৮ ও ২৯তম বিসিএস পরীক্ষায় কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে মুক্তিযোদ্ধা এবং উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পূত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যা, মহিলা ও উপজাতীয় কোটায় সংরক্ষিত শূন্য পদে শুধু কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের জন্য বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা ২০১১ অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা ২০১১-এর বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, উক্ত পরীক্ষা শুধুমাত্র কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের জন্য হবে। উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পূত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যা, মহিলা ও উপজাতীয় নাগরিকরা অংশ অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তৃতীয়ত, মুক্তিযোদ্ধা এবং উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পুত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যা, মহিলা ও উপজাতীয়দের সংরক্ষিত কোটায় নিয়োগের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিতব্য বিসিএস পরীক্ষা ২০১১-এর সিলেবাস ও প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত ২৩তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার নম্বরের অনুরূপ হবে। চতুর্থত, মুক্তিযোদ্ধা এবং উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পূত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে পুত্র-কন্যার পুত্র-কন্যা, মহিলা ও উপজাতীয় প্রাধিকার কোটায় বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন প্রচলিত বিসিএস পরীক্ষা সংকান্ত বিধি-বিধান ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় সেই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে এবং বিষয়টি নিশ্চিত করতে পিএসসিকে পরামর্শ দেয়া হয়। পঞ্চমত, পিএসসিকে দ্রুত পরীক্ষা আয়োজনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
সূত্র জানায়, সভার শুরুতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (এপিডি) মো. সোহরাব হোসাইন জানান, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মোট শূন্য পদের শতকরা হিসেবে মেধাভিত্তিক কোটা ৪৫% ও জেলা কোটাসহ প্রাধিকার কোটা ৫৫%। এ বিশেষ বা প্রাধিকার কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ৩০%, মহিলা ১০% উপজাতি (আদিবাসী) ৫% এবং জেলা কোটা ১০%। ২৮ ও ২৯তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও উপজাতীয় কোটায় কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২৮তম বিসিএসে ৮১০টি এবং ২৯তম বিসিএসে ৭৯২টি পদ শূন্য রয়েছে। টেকনিক্যাল ক্যাডারে অপূরণকৃত পদগুলো পূরণের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য ২০০০ সালে ২৩তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি ২৩তম বিসিএসের আদলে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, মহিলা ও উপজাতীয়দের জন্য একটি বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পরামর্শ দেন। সভায় তিনি এও জানান যে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মহিলা ও উপজাতীয় প্রাধিকার কোটার প্রার্থীদের জন্য বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানিয়েছেন।
পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আ,ই,ম নেছার উদ্দিন সভায় জানান, টেকনিক্যাল ক্যাডারে অপূরণকৃত পদ পূরণের লক্ষ্যে ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য ২৩তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছিল। উক্ত পরীক্ষায়ও উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় ৭০৯টি পদের বিপরীতে কমিশন মাত্র ৭৯ জন প্রার্থীকে সুপারিশ করতে পেরেছিল। যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২৩তম বিসিএসে ৬৩০টি পদে কোনো প্রার্থী কমিশন কর্তৃক সুপারিশ করা সম্ভব হয়নি। একই কারণে ভবিষ্যতেও পর্যাপ্তসংখ্যক উত্তীর্ণ মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও উপজাতীয় প্রার্থী পাওয়া যাবে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয সূত্র জানায়, মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতীয় প্রাধিকার কোটার এই পদগুলো জেলা বা বিভাগওয়ারি জনসংখ্যার ভিত্তিতে বণ্টনের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব কোটা শূন্য থাকে। এ অবস্থায় সরকার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য বিশেষ বিসিএস আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত বিসিএস ও সংবিধানের সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখছে সরকার। এ জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও নেয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় ২০০২ ও ২০০৩ সালে জোট সরকারের আমলে জারি করা দুটি সার্কুলার সংশোধন করে বিশেষ বিসিএস আয়োজনের কথা বলেছে। এসব সার্কুলারে প্রাধিকার কোটার পদগুলো পূরণ না হলে সম্মিলিত মেধাতালিকা থেকে পূরণ করার বিধান রাখা হয়েছিল। এরই মধ্যে সরকারি-আধাসরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত, আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনের চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নির্ধারিত কোটা পূরণ করা সম্ভব না হলে তা সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পিএসসি সূত্রে জানা যায়, ২৮তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও উপজাতি কোটায় কারিগরি ক্যাডারের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ৮১০টি এবং ২৯তম বিসিএসে ৭৯২টি পদ পূরণ করা যায়নি। সরকারের নির্দেশে বর্তমানে এসব পদ সংরক্ষিত আছে। কিন্তু সাধারণ ক্যাডারে মুক্তিযোদ্ধা ও মহিলাদের ক্ষেত্রে কোনো অপূরণ থাকা পদ নেই। কারিগরি ক্যাডারে পূরণ না হওয়ায় পদ পূরণে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ২০০০ সালে ২৩তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরীক্ষায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ৭০৯টি পদের বিপরীতে কমিশন মাত্র ৭৯ জন প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২৩তম বিসিএসে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে অবশিষ্ট ৬৩০টি পদে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি পিএসসি। একই কারণে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারগুলোতে ভবিষ্যতেও পর্যাপ্তসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা বা উপজাতীয় প্রার্থী পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে কমিশন সম্প্রতি সরকারের কাছে তাদের সংশয় প্রকাশ করেছে।
বিশেষ বিসিএস সম্পর্কে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের সন্তানদের প্রতি দেশ ও জাতির দায়বদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর বাহিনী অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। তাদের পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, অভিভাবককে হত্যা করেছে। সহায় সম্পদ এবং অভিভাবক হারিয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা পরিবার অভাব-অনটনে দিনাতিপাত করছে। এরূপ বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং তাদের সন্তানদের সমাজের �অনগ্রসর অংশ� হিসেবে বিবেচনা করা সঙ্গত মনে হয়। সরকারি চাকরিতে তাদের আইনানুগ নিয়োগের জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। নানা প্রতিকূল বাস্তবতার কারণে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে নিরুত্সাহ বোধ করেন। একইভাবে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার কারণে মহিলা ও উপজাতি প্রার্থীরা পর্যাপ্ত সংখ্যায় চাকরি পাচ্ছেন না। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মহিলা এবং উপজাতি কোটার কিছুসংখ্যক প্রার্থী চাকরি না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।
পিএসসির সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসান গতকাল আমার দেশকে বলেন, বিশেষ বিসিএস কবে নাগাদ হবে সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে তারপর আমরা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেব।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও কেবিনেট সেক্রেটারি ড. আকবর আলি খান মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মহিলা ও উপজাতীয় প্রাধিকার কোটার প্রার্থীদের জন্য বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হলে এ ধরনের বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় দোষের কিছু নেই। বিশেষ বিসিএসের আগে দেখতে হবে পদ শূন্য আছে কিনা। সচিবালয়সহ অনেক জায়গায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন তখনই সার্থক হবে যে সব পদে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সেসব পদে ভ্যাকেন্সি যদি থেকে থাকে। বিশেষ বিসিএস আসছে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও উপজাতীয়দের জন্য

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


