somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সমকামী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার প্রতিকার কি?

১০ ই মে, ২০১৮ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির (সমকামী-যৌনপ্রবৃত্তিগত সংখ্যালঘু) প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে আজ নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে, ২০১২ ইং সালে সারা বিশ্বে ২৬৫ জন সমকামী ব্যক্তি শুধুমাত্র তাদের যৌন প্রবৃত্তির কারণে হত্যার শিকার হয়েছে। যা তার আগের বছরের চেয়ে ২০ ভাগ বেশী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলাম ধর্মাম্বলী জনসংখ্যা বিশিষ্ট রাষ্ট্রে সমকামি ব্যক্তির প্রতি নির্যাতন, বৈষম্য এবং হত্যার ঘটনা বেশী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজও সমকামী ব্যক্তির প্রতি সংঘটিত বৈষম্য ও সহিংসতার ঘটনা উপেক্ষার চোখে দেখা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব ঘটনাগুলো অপরাধ হিসেবে গন্য করা হয় না। ফলে দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তির হাত থেকে রেহাই পায় এবং ঘটনাগুলো পর্দার আড়ালে থেকে যায়। যা সমকামী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার ঘটনাকে উস্কে দেয়।

সমকামী ব্যক্তি সর্বসময় সকল স্থানে অরক্ষিত এবং তারা সর্বদা নিপীড়ন, বৈষম্য, দুর্ব্যবহারের এমনকি প্রায়শ নির্যাতন ও হত্যার মত চরম সহিংসতার শিকার হন। অধিকাংশ রাষ্ট্র সমকামী ব্যক্তির সমাবেশ, সংগঠন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা চরম্ভাবে খর্ব করে। তাদের প্রতি বৈষম্য সমাজের প্রচলিত চিরাচরিত নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান এবং সেগুলোর মাধ্যমে লৈঙ্গিক অসমতাকে চিরস্থায়ী করার প্রয়াশ পায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কিছু কিছু দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক সমলিংগীয় দুজন ব্যক্তির যৌন সম্পর্ক শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গন্য করে আজও শাস্তি হিসেবে সশ্রম কারাবাস অথবা মৃর্ত্যুদণ্ড নির্ধারিত করা হয়েছে।

শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারনে সমকামী ব্যক্তির মারাত্বকভাবে সহিংসতার শিকার হওয়াকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রতিপাদন করার ধারা বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বেই বিদ্যমান। যদিও শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক, প্রথাগত ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে সমকামী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য প্রদর্শণ ন্যায্য বলে প্রতিপাদন করার চেষ্টা কোনভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সমকামী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন ও তাদের ঘৃনার চোখে বা হীন দৃষ্টিতে দেখার হাত থেকে সুরক্ষা প্রদানের সুনির্দিষ্ট আইনী কাঠামো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে অনুপস্থিত। ফলে সারা বিশ্বেই সমকামী ব্যক্তি যখন চাকরি, স্বাস্থ্য সেবা বা শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করে তখন তারা শুধু মাত্র তাদের যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হন। চাকরি, স্বাস্থ্য সেবা বা শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারনে সমকামী ব্যক্তি বেশি পরিমানে দারিদ্রতার শিকার হন।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন দ্বারা যদিও সমকামী ব্যক্তির অধিকার সংরক্ষন করা হয়েছে, তথাপি তাদের সকল মানবাধিকার পূর্ণভাবে উপভোগের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রায়শ নির্দিষ্ট কিছু আইন প্রণয়ন ও নীতিমালা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যদিও সমকামী ব্যক্তির জন্য নতুন কোন অধিকার সৃষ্টির প্রয়োজন নেই, বরং তাদের প্রতি যেন কোন প্রকার বৈষম্য করা বা তাদের কোন অধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয়, তারা যেন অন্যান্য সাধারণ মানুষের মত একই ধরনের অধিকার উপভোগ করতে পারে সে ব্যপারে রাষ্ট্রকে সচেষ্ট হতে হবে।

অন্য সব নাগরিকের মত সমকামী ব্যক্তিরও যে সকল ক্ষেত্রে সকল সময় বৈষম্যহীন ব্যবহার লাভের অধিকার রয়েছে তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন ও চুক্তি দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২ ও ২৬ নং অনুচ্ছেদ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে তা স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়। তাছাড়া, জাতিসংঘের বিভিন্ন ট্রিটি বডি এবং স্পেশাল র্যাুপর্টিয়ারগণও সমকামী ব্যক্তির বৈষম্যহীন ব্যবহার লাভের অধিকারকে জোড়ালো সমর্থন প্রদান করেছে।

২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের পাঁচটি প্রধান অঞ্চলের ৬৮ টি রাষ্ট্রের সমর্থনে মানবাধিকার, যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের উপর একটি বিবৃতি প্রদান করা হয়, যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সমর্থন করে। বিবৃতিটি শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারনে বিচারিক হত্যাকাণ্ড, সেচ্ছাচারী আটক ও অন্যান্য মানবাধিকার লংঘনকে তীব্রভাবে তিরস্কার করা হয়। একইসাথে বিবৃতিটির মাধ্যমে বৈষম্যহীনতার মূলনীতি প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

সমগ্র বিশ্বের ৫৪ টি রাষ্ট্রের পক্ষে ২০০৬ সালে এবং ৮৫ টি রাষ্ট্রের পক্ষে ২০১১ সালে সমকামী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত যৌথ বিবৃতিদুটোতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সমর্থন প্রদান করে। ২০১১ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল মানবাধিকার, যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের ওপর একটি সিদ্ধান্ত গ্রহন করে, ইরোপিয়ান ইউনিয়ন যাতে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন প্রদান করে। উক্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনারের কার্যালয় বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক আইন ও অনুশীলন এবং শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারনে বৈষম্য ও সহিংসতার ওপর গভীরভাবে অধ্যায়নের মাধ্যমে ডকুমেন্টেশন তৈরির জন্য একটি কমিশন গঠন করে।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০ টি রাষ্ট্রে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গন্য করা হয়, যার মধ্যে বেশ কিছু রাষ্ট্রে সমকামিতার অপরাধে মৃর্ত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এভাবে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গন্য করা আইন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী এবং তা সমকামী ব্যক্তির বেঁচে থাকা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের অধিকারসহ সমিতি গঠন, সমাবেশ করা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার লংঘনসহ তার সার্বিক মানবাধিকারের লংঘন। সমকামীতাকে আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে গন্য করার মাধ্যমে সমকামিতা বিষয়ক আলোচনাসহ ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়।

সমকামীতাকে অপরাধ হিসেবে গন্য করায় বিদ্যমান প্রিজুডিস ও সামাজিক স্টিগমা বৃদ্ধি পায় এবং তাদের প্রতি বৈষম্য আইনী রূপ লাভ করে। এতে করে সমকামী ব্যক্তি আরো বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং তারা সাধারণ জঙ্গন সহ পুলিশের নৃশংসতা, নির্যাতন এবং অন্যান্য প্রকারের নিষ্ঠুর অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের মত সহিংসতার বেশী শিকার হন।

ব্যবসায়ীক যৌনকর্ম নিরোধ আইন, উৎপাত বিরোধী আইন, তথাকথিত ক্রস ড্রেসিং নিরোধ আইনের মত আইনী ব্যবস্থায় অনেক সময় সমকামী ব্যক্তিরা লক্ষবস্তুতে পরিনত হয় এবং পুলিশ সদস্য সেসব আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে সমকামী ব্যক্তিদের শুধুমাত্র তাদের যৌন প্রবৃত্তি, লৈঙ্গিক পরিচয় ও লৈঙ্গিক অভিব্যক্তির কারনে অভিযুক্ত করে বিচারে সোপর্দ করে তাদের শাস্তি প্রদান করে। তছাড়া, সমকামী ব্যক্তির পরিচয়পত্রে তাদের সঠিক লৈঙ্গিক পরিচয়ের প্রতিফলন না থাকায় তারা সহিংসতার শিকার হলেও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়।

শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তি ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যে বা সহিংসতার শিকার হয়নি এমন সমকামী ব্যক্তির দেখা পাওয়া খুবই কঠিন। স্বাস্থ্য সেবা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, কর্ম প্রাপ্তি থেকে বিচার প্রাপ্তি, বিনোদন থেকে বিশ্রাম, এমনকি কারাগারেও তারা বৈষম্য ও অসম আচরণের শিকার হন। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে কর্মক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্র এমন কোন স্থান নেই যেখানে বৈষম্যমূলক আইন, নীতিমালা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সমকামী ব্যক্তিরা সহিংসতার শিকার হন না। কিন্তু পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের চিরাচরিত বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, আইন ও নীতিমালার কারনে সমকামী ব্যক্তি শত-সহশ্রবার সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হলেও তা বিনা প্রতিকারে ও বিনা বিচারে থেকে যায় পর্দার অন্তরালে। তবে কি সমকামী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার কোন প্রতিকার নেই?
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০১৮ দুপুর ১২:৩৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শ্রদ্ধেয়া প্রধানমন্ত্রী, রাজাকারের সব নাতী রাজাকার হতে পারে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৪ রাত ৮:২৪

আমার নানা'র বাবা সিলেটে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার নানা'র বড় ভাই পাকিস্তানের শাসনামলে পুলিশের সুপার ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছিলেন। কিন্তু, আমার মায়ের বাবা অর্থাৎ আমার নানা আওয়ামী লিগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াত শিবির আবারও একটি সুন্দর আন্দোলনকে মাটি করে দিল।

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৪ রাত ৯:৩৪


নোট: এটি একটি সেনসেটিভ পোস্ট, পোস্ট না পড়ে, কিংবা পোস্টের মর্মার্থ না বুঝে, কিংবা পোস্ট এর অংশ বিশেষ পড়ে, কিংবা পোস্টে কি বুঝাতে চেয়েছি সেটা না... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত-শিবির-বিএনপি চাচ্ছে, দেশ মিলিটারীর হাতে যাক।

লিখেছেন সোনাগাজী, ১৫ ই জুলাই, ২০২৪ রাত ১০:৩৫



বিএনপি ছিলো মিলিটারীর সাইনবোর্ড, আর জামাত-শিবির ছিলো মিলিটারীর সিভিল জল্লাদ; এখন মিলিটারী তাদের পক্ষে নেই। এরপরও, তারা চায় যে, দেশ কমপক্ষে মিলিটারীর হাতে যাক, কমপক্ষে আওয়ামী লীগ থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এবং নিরবতা প্রশ্ন করে, আপনি কী উত্তর দিবেন?

লিখেছেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, ১৬ ই জুলাই, ২০২৪ রাত ৩:৪১



জী, হ্যা। আপনের বিশ্বাস না হলে গতকালের ঘটনাগুলো দেখতে পারেন। দয়া করে, কেউ এটাকে ছবি ব্লগ বা জামাইত্তা ব্লগ মারাইতে আইসেন না। আমি আওয়ামীলীগের কুকুরদের জামাতি কুকুর বলা লোক না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোটা সিষ্টেম থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ আছে?

লিখেছেন সোনাগাজী, ১৬ ই জুলাই, ২০২৪ ভোর ৫:৪১



কোটা সিষ্টেম থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ আছে? অবশ্যই আছে, এবং সব সময় ছিলো; দরকার সদিচ্ছা, কিছু অর্থনৈতিক ও ফাইন্যান্সিয়াল জ্ঞান।

চাকুরী সৃষ্টি করতে হবে; জিয়া, এরশাদ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×