শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে দু’জন ছিলেন জঙ্গি, একজন খুনি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে যাদের একাধিকবার জঙ্গি হিসাবে চিহ্ণিত করেছেন, যাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) পৃষ্ঠপোষকতা, তালেবান কানেকশনের অভিযোগ রাদ্ব্রীয়ভাবে আনা হয়েছে, এমন অন্তত দু’জনের সঙ্গে শনিবার রাতে তিনি তার বাসভবন যমুনায় বৈঠক করেছেন। এরা দু’জনই আফগান যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ জেলে গেছেন। এ দু’জন হচ্ছেন শেখ হাসিনাকে কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজির বোমা পুঁতে হত্যাচেষ্টাসহ অনেক বোমা হামলা মামলায় কারারুদ্ধ হুজির বাংলাদেশ শাখার প্রধান মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নড়াইলের মুফতি শহীদুল ইসলাম ও বুলবুলি মাওলানা হিসাবে পরিচিত সিলেটের কাজীর বাজার মাদ্রাসার মাওলানা হাবিবুর রহমান। এছাড়া ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে কওমী মাদ্রাসার নেতাদের সঙ্গে আরো যোগ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা যাকে এক সময় খুনি হিসাবে চিহ্ণিত করেছিলেন এবং তার সরকারের আমলে যাকে খুনের মামলা দিয়ে হেনস্থা করা হয়েছিল সেই নেতা শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক। শেখ হাসিনার নেতৃত্ম্বাধীন প্রথম সরকার তাকে খুনের মামলায় গ্রেফতার পর্যন্ত করেছিল।
দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র বলে আইনমন্ত্রী ব্যারিসল্টার শফিক আহমদের মন্তব্য ও কওমী মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের নেতিবাচক অবস্থানের প্রেক্ষিতে দেশের আলেম-ওলামাদের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে, তা প্রশমন করতেই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের অংশ হিসাবেই কওমী মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের মতো প্রধানমন্ত্রী শনিবার বৈঠক করেন। দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের সঙ্গে উল্লেখিত তিনজনের উপস্থিতি সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে মুফতি শহীদকে কয়েক দফায় গ্রেফতার করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতারের পর ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘ইসলামী এনজিও আল মারকাজুল ইসলামীর চেয়ারম্যান মুফতি শহীদুল ইসলামের সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আছে। পাকিস্তানে লেখাপড়া করার সময় তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া আফগান মুজাহিদদের তালিকায়ও তার নাম রয়েছে। ১৯৯৯ সালে দৈনিক জনকণ্ঠ ভবনে ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন পেতে রাখার ঘটনায় মুফতি শহীদুল ইসলামকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, মিরপুরে মসজিদুল ফেরদৌস থেকে বোমা উদ্ধার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। সে সময় তিনি কোনো দল করতেন না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গি তৎপরতায় মুফতি শহীদুলের সংশ্নিদ্বতার বিষয়ে জাতীয় সংসদে একাধিকবার বক্তব্যও দেন।
প্রথম আলো আরো জানায়, ২০০৫ সালের ২২ মে মুফতি শহীদ হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও হুজি ক্যাডারদের নিয়ে খেলাফত মজলিসের ৫৯/৩/৩ পুরানা পল্টনের কার্যালয় দখল করেন। কয়েকশ’ হুজি ক্যাডার নিয়ে মুফতি শহীদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট ও দলের কার্যালয়ের সামনে মহড়া দেন। ২০০৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক লিখে, ‘মুফতি শহীদুলের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, জঙ্গি উত্থান, জঙ্গি গোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।’ একই দিনের যুগান্তর লিখে, ‘মুফতি শহীদুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। একই দিনে জনকণ্ঠের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘দুর্ধর্ষ এই তালেবান নেতা উগ্র মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর প্রধান সংগঠক।’
এদিকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৬ মে সিলেট থেকে যৌথবাহিনী বুলবুলি মাওলানা হিসাবে ব্যাপক পরিচিত সিলেটের কাজীর বাজার কওমী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমানকে গ্রেফতার করেছিল। এরপর দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। মাদ্রাসা ছাত্রদের ব্যবহার করে তিনি ‘ছাহাবা সৈনিক পরিষদ’ গঠন করে সিলেটকে দীর্ঘদিন অশান্ত করে রাখেন। বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মাথার দাম ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করে তখন তিনি দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি ও বিতর্কের জন্ম দেন। প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান ও শহীদ জননী জাহানার ইমামকে তিনি সিলেটে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর তারা আর কখনো সিলেটে যেতে পারেননি। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্ধারিত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের সঙ্গে বিতর্কিত ৫ দফা চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করলে তিনি আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস ভঙ্গকারী বলে অভিহিত করে পত্রিকায় বক্তব্য দেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ‘তিনি এই চুক্তি ভঙ্গকে মক্কার কাফিরদের চুক্তি ভঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেন। মক্কার বনু নজির, বনু কায়নুকাসহ অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের নাম উল্ক্নেখ করে তিনি বলেন, সব চুক্তিতেই কাফিররা আগে চুক্তি ভঙ্গ করেছে। খেলাফত মজলিসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি একতরফা বাতিল করে আওয়ামী লীগ নিজেদের বনু নজির, বনু কায়নুকাদের উত্তরসূরি হিসাবেই প্রমাণিত করেছে।’
সূত্রঃ আমার দেশ, ২০.০৪.০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


