somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যত্রতত্র এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার এখন জীবনের জন্যই হুমকি!

১৬ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দেশে ২০ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণুনাশক ওষুধ চার শর বেশি নাম দিয়ে বাজারে ছেড়েছে ওষুধ কম্পানিগুলো। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের সব ব্র্যান্ড আইটেম মানুষের হাতের নাগালে। আবার চিকিৎসকরাও ওষুধ কম্পানির প্ররোচনায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই সংরক্ষিত না রেখে সবই ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন সাধারণভাবে। এতে বিপদ আরো বেড়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সাত-আটটি গুরুত্বপূর্ণ জেনেরিকের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে, অর্থাৎ এগুলো জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মানুষের জন্য তৈরি অ্যান্টিবায়োটিকের অতিমাত্রায় যথেচ্ছ ব্যবহার চলছে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলেও। এই অ্যান্টিবায়োটিক মাংসের মাধ্যমে আবার ঢুকছে মানুষের শরীরে। সব মিলিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের ভয়ানক বিপদে আছে দেশের মানুষ।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ-মাংস বা অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করা অ্যান্টিবায়োটিকের বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে কিডনি ও লিভারের ওপর। আবার অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাও আরেক বড় বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এক কথায় মানুষকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প নেই, তেমনি সেই অ্যান্টিবায়োটিকের অসচেতনতামূলক ব্যবহারের ফলে তা এখন ভয়ানক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু দেশে যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ দূরের কথা, তা পর্যবেক্ষণ করারও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

মানুষের জন্য প্রযোজ্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বের কোথাও প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বেচা বা কেনা সম্ভব নয়, শুধু বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হচ্ছে। যে কেউ যখন তখন ওষুধের দোকানে গিয়ে যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। আর এ কারণেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার এ দেশে মানুষের জন্য প্রযোজ্য অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় গবাদি পশুর ক্ষেত্রে। ফলে হিতে বিপরীত ফল দেয়। আর গবাদি পশুতে এমনিতেই যেনতেনভাবে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ তো হচ্ছেই।

ওই ওষুধ বিশেষজ্ঞ জানান, দেশে ২০টি জেনেরিকের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আছে। ওষুধ কম্পানিগুলো এসব অ্যান্টিবায়োটিকের চার শর বেশি ব্র্যান্ড আইটেম ছেড়েছে বাজারে। ফলে এগুলো নিয়ে চলছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সব অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর নয়, তবে অ্যান্টবায়োটিক নিয়মনীতি না মেনে সেবন বা প্রয়োগ করলে কিংবা অপ্রয়োজনে প্রয়োগ ঘটলে ক্ষতি বয়ে আনবে। একইভাবে এমন কিছু ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক আছে, যা মাছ-মাংস বা অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এসব অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবে মানুষের কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। তাই দেশে এসব ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভোক্তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান বলেন, দেশে সাধারণত মাছ-মাংস ও দুধে বেশি মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এগুলো কতটা ক্ষতিকর তা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা নেই। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী এ বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হওয়া দরকার।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের মানুষের পুষ্টির জোগান দিতে মাছ-মুরগি উৎপাদনের কমতি নেই। তবে এসব মাছ-মুরগি রোগমুক্ত রাখতে কিংবা মড়ক ঠেকাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে এসব ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যার বেশির ভাগই রান্নার তাপেও নষ্ট হয় না। ফলে ওই অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে ঢুকে বয়ে আনে মারাত্মক ক্ষতি। বিশেষ করে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করার বড় কারণ হিসেবে মাছ-মাংসের অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিককে দায়ী করা হয়।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার ‘এন্টিবায়োটিকযুক্ত খাদ্যকে না বলুন’ স্লোগান নিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনালের (সিআই) উদ্যোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২০টি দেশে ২৪০টিরও বেশি সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার দিবস পালন করে থাকে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও এর কার্যকারিতা নিয়ে গতকাল একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) উদ্যোগে। ঢাকার ওপর পরিচালিত ওই সমীক্ষার ফলে বলা হয়, ৫৫.৭০ শতাংশ মানুষের দেহে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। এর অর্থ হচ্ছে ঢাকা মহানগরে যেসব রোগজীবাণুর সংক্রমণ ঘটে তার বিরুদ্ধে ৫৫.৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের সুষম খাদ্যের জোগান দিতে উৎপাদন নিশ্চিত করতে হয় হাঁস-মুরগিসহ অন্যান্য গবাদি পশুর। আর এসব গবাদি পশুকে রোগমুক্ত রাখতে প্রয়োগ করা হয় নানা ওষুধ। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ খামারি এসব ওষুধ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় তারা খুব সাধারণ কিছু ধারণা থেকে যখন তখন ইচ্ছামাফিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা এক শ্রেণির অসাধু ওষুধ বিক্রেতা তাদের প্রভাবিত করে থাকে। এর মধ্যে কিছু ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ওই গবাদি পশুরই নয়, মানুষের জন্য মহাবিপদ বয়ে আনে। কিন্তু এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা উপযুক্ত পর্যায়ের মনিটরিংয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। ওই বিশেষজ্ঞ জানান, এখন মানুষের নিরাপদ খাদ্যের স্বার্থেই গবাদি পশু-পাখিকে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে ‘প্রোবায়োটিক’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে খামারের ব্যবস্থাপনাগত কিছু কৌশল অবলম্বনেও জোর দেওয়া হয়, যাতে রোগবালাই কম হয়।

জানতে চাইলে সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির প্রধান অধ্যাপক শাহলীনা ফেরদৌসী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণত আমাদের দেশে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় মুরগি ও গরুতে, যা মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। আমি এ দায়িত্বে আসার আগে এই ল্যাবে একটি মুরগির মাংসের স্যাম্পলে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব মিলেছিল। আমরা এখন আবার পরিকল্পনা নিয়েছি শিগগিরই মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পরীক্ষার জন্য। যদিও সারা দেশ থেকে এ ধরনের স্যাম্পল সংগ্রহ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা কারিগরি সমস্যা রয়েছে। তবু যতটা পারা যায় আমরা তা দিয়েই শুরু করতে চাই।’ ওই বিশেষজ্ঞ অবশ্য মনে করেন, এ ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ বিভাগের বেশি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

গতকাল পবার অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে মৎস্য খামারে ১০ ধরনের ও ৫০ শ্রেণির রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব রাসায়নিকের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও গ্রোথ এজেন্ট। প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের কিডনি, লিভার ও হৃৎপিণ্ডের ক্ষতিসাধন করছে। এ ছাড়া বিশ্বে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৫০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে কৃষি খাতে ৬৩ হাজার ২০০ টন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে। এমন অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের ফলে বিশ্বে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়।

জনস্বার্থে লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে কালেরকণ্ঠ পত্রিকা থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×