somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের স্কুল গুলো কেন কারাগারের মত ভয়ের......?

১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি বরাবরের মত ইংরেজি ভাষায় অদক্ষ। কিন্তু আমি নাকি বাংলায় বেশ কথা বলতে পারি অনেকেই বলে থাকে। তাহলে ইংরেজিতে কেন কথা বলতে পারিনা আমি? অনেক খুঁজে বের করেছি এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভুল প্রয়োগের ফল। আমাদের দেশে ভাষাকে ভাষার মত না শিখিয়ে আগেই এর ব্যাকরণ ধরিয়ে দেওয়া হয়। কই আমরা তো বাংলা ভাষা সেখার জন্য ছোট বেলাতেই বাংলা ব্যাকরণ শিখি নাই। আমার সারে তিন বছরের মেয়ে তুবা তো ভাষাকে ভাষা হিসেবে শিখেছে বলে এখনই অনর্গল বাংলায় কথা বলে চলে। তুবাকে যদি ভাষা না শিখিয়ে ব্যাকরণ ধরিয়ে দিতাম তাহলে হয়তো নিজের ভাষাটাই ও আর শিখতে পারত না। ঠিক এভাবেই আমরা যখন স্কুলে ইংরেজি শিখতে যাই আমাদের কাছে ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে তুলেই ধরা হয়না। এটাও যে বাংলার মত একটা ভাষা এবং কথা বলার ভাষা তা আমরা ভুলে তো যাই বরং ব্যাকরণের পাল্লায় পরে আমাদের মনের মধ্যেই না পারার সেই লজ্জা ভয় ঢুকে যায়। ফলাফল আমাদের আর ইংরেজি শেখা হয়ে ওঠে না।

একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে এর সাথে জড়িত নানান বিষয় সামনে চলে আসে। আমার ধারনা সারা পৃথিবীর মধ্যে খুব সম্ভবত আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সব থেকে খারাপ। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ভুল গুলোকে শুধরে দেবার বদলে ভুল গুলো নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে থাকে। চাপ দেয় শিক্ষার্থীর উপর, চাপ দেয় অবিভাবকের উপর। ফলে এখন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অবিভাবক সবাই স্কুলের সময়টা হালকা থাকার বদলে মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এখানে স্কুলের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের কতটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে সেটাই মুখ্য বিষয়। যেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকেনা সেখানে ভাল কিছু আশা করা বোকামি নয়কি?

আমার কথাই যদি বলি। যখন ক্লাস সিক্সে নতুন স্কুলে ভর্তি হই তখন স্কুল আমার কাছে একটা ভয়ের জায়গায় রূপ নেয়। ইংরেজি না পারলে বেতের মার, কান ধরে বারান্দায় সবার সামনে দাড়িয়ে থাকা, ডিটেনশন ক্লাস থেকে শুরু করে অনবরত কান ধরে ওঠবস করার মত শাস্তি গুলো এক সময় আমার স্কুলের সকল আনন্দই কেড়ে নিয়েছিল। একটা সময় এমন হয়েছিল যে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে কান পেতে শোনার চেষ্টা করতাম রাস্তায় গাড়ির শব্দ শোনা যায় কিনা। কোন কারনে গাড়ি বন্ধ মানে স্কুল বন্ধ হবার সুযোগ।

পরিস্থিতি বদলে যায় ঠিক ক্লাস এইটে ওঠার পর। কিভাবে যেন স্কুলের শারীরিক শিক্ষা স্যার সহ আরও দুইজন স্যারের সাথে একটা প্রাণের সম্পর্ক হয়ে যায় আমার। স্কুলের প্রতি একটা টান অনুভব করা শুরু হয় আমার। ধিরে ধিরে আমি হয়ে উঠি স্কুলের ভলান্টিয়ার টীমের লিডার। দাপট বেড়ে যায় অনেক। মনের থেকে ভয় সরে গিয়ে আমি হয়ে উঠি স্কুলের অনেকের স্নেহের ছাত্র। তাই বলে যে আমি ইংরেজিতে ভাল হয়ে গিয়েছিলা তা কিন্তু নয়। কিন্তু আমি যে বিষয় গুলোতে ভাল পারতাম তাতে দক্ষতা অন্য সকলের থেকে অনেক বেড়ে যায়। আমার মনে আছে আমি দশম শ্রেণীতে থাকতেই ক্লাসের অন্যদের হিসাব বিজ্ঞানের ক্লাস নিতাম আমি।

স্কুল জীবনের ঠিক দুটি বিপরীত চিত্র আমার জীবনের অংশ। প্রথম দিকে যখন স্কুল আমার কাছে শুধু শাস্তির জায়গা হিসেবে ছিল তখন স্কুল বন্ধ থাকা মানে আমার কাছে ঈদের আনন্দ। এর সাথে পরিক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়া তো চলছিলো। পরে সেই স্কুলেই যখন কয়েকজন বন্ধুসম প্রাণের স্যারদের কাছে চলে গেলাম তখন স্কুল ঈদের সময় বন্ধ দিলেও মন খারাপ লাগতো।

মাঝে লন্ডন প্রবাসী এক আইনজ্ঞ বন্ধুর সাথে সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম সেখানে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মারা নাকি স্বপ্নের বাইরের বিষয়। শুধু তাই নয়, বাবা মায়েরাও নাকি শাসন করতে গিয়ে সন্তানের গায়ে হাত তুলতে পারেনা। এমন কোন ঘটনা ঘটলে স্কুল থেকে অবিভাবকদের যেমন ডেকে নেওয়া হয় তেমনি একই ঘটনা বারবার ঘটলে একসময় সেই সন্তান বাবা মায়ের কাছে অনিরাপদ ধরে নিয়ে সন্তানকে সরকারি হেফাজতে নিয়ে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে সেদিন কিন্ডারগার্ডেনে চাকুরীরত এক বোনের কাছ থেকে শুনতে পেলাম একটি শিশু শিক্ষার্থী ক্লাসের মধ্যে মল ত্যাগ করে কাওকে কিছু না বলার কারনে ঐ শিশুর মাকে খুব অপমানিত করেছে স্কুলের অন্য শিক্ষিকারা।

ছোট বেলায় শুনতাম, শিক্ষক যেখানে বেতের বারি দেয় সে জায়গা নাকি বেহেস্তে যায়। সত্য মিথ্যা জানিনা। কিন্তু বাবা মায়ের পরে স্কুল, স্কুলের পরিবেশ এবং স্কুলের শিক্ষকেরা যে একটি শিশুকে সুস্থ ভাবে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার কারিগর সেটা থেকে যেন আমরা বহু দূরে সরে এসেছি।

মোবাইল সাথে নিয়ে পরিক্ষার দেওয়া অথবা মোবাইল ফোন থেকে নকল করে পরিক্ষা দেওয়া খারাপ। কিন্তু সেই খারাপকে কেন্দ্রে করে বাবা মায়ের সামনে, স্কুলের শিক্ষকদের সামনে, সম্পূর্ণ ক্লাসের সামনে অপমানিত করে তার থেকে কি ভাল ফল আমরা আশা করতে পারি? যখন আমি স্কুলে গিয়ে ভয়ে থাকতাম, তখন আমি পরিক্ষায় অনবরত ফেল করতাম। কিন্তু যখন ভয় কেটে যায় কয়েক জন প্রাণের শিক্ষকের কারনে তখন ক্লাসের সেরা ছাত্র হতে কেও আটকাতে পারেনি আমাকে।

তবে গত বেশ কিছু বছর ধরে অসুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাথে অবিভাবকদেরও আমি অসুস্থ হয়ে যেতে দেখেছি। যেখান ইংরেজির শিক্ষক হিসাব বিজ্ঞান পারেন না, অথবা হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক বীজ গণিত পারেন না সেখানে আমাদের সন্তানদের সকল বিষয়ে গোল্ডেন জিপিএ পেতে হবে এ কেমন শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি আমরা? এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাও কি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে না?

হয়তো কিছু দিনের মধ্যে আমার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। এখন স্কুলে ভর্তি হবার পরে কোন ভুলের কারনে অথবা পড়া না পারার কারনে আমাকে বা তুবার মাকে স্কুলের শিক্ষিকারা ডেকে অপমান করবে, অথবা নোংরা প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে ফেলে তুবার মান যাচাই করা হবে তা নিয়ে আমি সত্যি খুব শঙ্কিত। আমি জানিনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কবে আনন্দের হবে, কবে আমাদের সন্তানেরা ভুলের কারনে অপমানিত না হয়ে আদরে মায়ায় সেই ভুলটুকু বুঝতে শিখবে, আপনি জানেন কি?
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ১০:৪৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভয়ংকর সেই খবরের পর… সন্তানের হাতটা শক্ত করে ধরুন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫

আজ সকালে খবরটি পড়ে আমার মনটা একদম ভেঙে গেল। ভাবতেই ভয় লাগছে—আমাদের সন্তানদের আমরা আসলে কতটা অরক্ষিত পরিবেশে বড় করছি! ছোট্ট একটি নিষ্পাপ শিশু, যে পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনতেই শেখেনি, তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু খতরে মেঁ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


শুধুমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু। তার বক্তব্যের মূলপ্রতিপাদ্য হলো হিন্দু খতরে মেঁ! আশ্চর্যের বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা নাকি মুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, কিছুদিন পরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

দিনগুলো কেমন যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে!
দেখতে দেখতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে,
এইতো সেদিন থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করলাম,
আর এদিকে দেখি চার মাস শেষ হয়ে পাঁচ মাস চলছে। অথচ আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে:)

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৩ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:২০


আমাদের দেশে রাজনীতিতে নেতা যাই বলে তার কর্মীরা সেটাকে সঠিক মনে করে। সেটা নিয়ে দ্বিমত করে না। এখন ধরুন নেতা মুখ ফসকে বলে ফেলেছে “সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠে।” তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডেঙ্গু আবার ধেয়ে আসছে তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কার্যক্রম রূপকল্প

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪১


লেখাটির উপক্রমনিকা
মাস কয়েক আগে সামুর পাতায় ব্লগার কলা বাগান ১ এর একটি গুরুত্বপুর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে । লেখাটিতে থাকা মুল কথাগুলি ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×