somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য লাস্ট সাপার

১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কক্সবাজার ডিবি কার্যালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কক্ষ। টেবিলজুড়ে সাজানো নামী রেস্তোরাঁ থেকে আনা রূপচাঁদা ফ্রাই আর কোরাল মাছের দো পেঁয়াজা। টেবিলের একপাশে বসা এক ব্যবসায়ী, যিনি গত রাতে আড়াই কোটি টাকার হুন্ডি পাচারের অভিযোগে ডিবি হেফাজতে এসেছেন। অন্যপাশে হাসিমুখে বসা ডিবি ইন্সপেক্টর নিয়াজ মোর্শেদ।

নিয়াজ নিজের হাতে মাখানো ভাত ব্যবসায়ীর মুখে তুলে দেওয়ার ভঙ্গি করলেন। পাশ থেকে ডিবির এক কনস্টেবল ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে কয়েকটি ছবি তুলল।

"নিন, মন খুলে খান। নিয়াজ মোর্শেদের হেফাজতে কেউ না খেয়ে থাকে না। মিডিয়া তো এমনি এমনি আমার অফিসকে ‘নিয়াজের ভাতের হোটেল’ বলে না!" নিয়াজ দাঁত বের করে হাসলেন।

ব্যবসায়ী কাঁপতে কাঁপতে ভাত মুখে নিলেন। আগামীকাল সকালে এই ছবি নিয়াজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে যাবে ক্যাপশনসহ—“আসামির সাথে মানবিক আচরণ ও মধ্যাহ্নভোজ”। আর আজ রাতেই ডিবির খাস কামরায় বসে এই ব্যবসায়ীকে গুনতে হবে আড়াই কোটি টাকা মুক্তিপণ।

ডিবি অফিসার নিয়াজ মোর্শেদের উত্থান রূপকথার মতো। চামচামি আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘সাইজ’ করার এক অদ্ভুত প্রতিভা ছিল তার। তার ক্ষমতার আসল উৎস ছিল দুটি—ভিআইপিদের গোপন স্ক্যান্ডালের ফাইল আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার তৈরি ‘মানবিক ও ড্যাশিং অফিসার’ ইমেজ। নিয়াজ নিজেকে অপরাজেয় ভাবতেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের এক তপ্ত দুপুর। হঠাৎ করেই দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হতে শুরু করল। এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের জোয়ারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল নিয়াজের গডফাদারদের ক্ষমতার দেওয়াল।

ঢাকা থেকে ফোন এলো নিয়াজের বিশ্বস্ত এক সুপিরিয়র অফিসারের। ওপাশ থেকে ফিসফিসানি আওয়াজ, "নিয়াজ, বড় সাহেবরা দেশ ছেড়েছেন। হেডকোয়ার্টার থেকে তোমার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু হচ্ছে। জাহিদ শিকদারের মৃত্যুর ফাইল রি-ওপেন হয়েছে। আর্মি যেকোনো মুহূর্তে ডিবি অফিস ঘেরাও করবে। পালানো ছাড়া পথ নেই!"

ফোনটা কেটে গেল। নিয়াজ মোর্শেদের কপালে এবার সত্যি সত্যি ঘাম জমল। তিনি দ্রুত তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে তিনটা পাসপোর্ট এবং একটি এনক্রিপ্টেড হার্ডড্রাইভ পকেটে নিলেন। এই ড্রাইভে আছে দেশের বহু ক্ষমতাধর মানুষের গোপন ভিডিও আর আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রমাণ। এটাই তার শেষ লাইফলাইন—তার ব্ল্যাকমেইল ম্যাটেরিয়াল।

গেট দিয়ে বের হতেই নিয়াজ দেখলেন তার নিজের ফোর্স গা ঢাকা দিয়েছে। বাইরে হাজার হাজার মানুষের স্লোগান। নিয়াজ পেছনের দেয়াল টপকে একটা সাধারণ সিএনজিতে উঠে বসলেন। তার একমাত্র গন্তব্য—কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। সেখান থেকে ট্রলারে করে মিয়ানমার।

টানা তিন দিন ধরে নিয়াজ মোর্শেদ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিন দিন তার চোখে কোনো ঘুম নেই। টেকনাফের এক প্রত্যন্ত শুঁটকি মহালের নোংরা, ভাঙা চৌকিতে যখন তিনি এসে পৌঁছালেন, ততক্ষণে তার শরীর আর মন ভেঙে পড়েছে। পুলিশের তাড়া, চেনা মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, আর ধরা পড়ার তীব্র আতঙ্কে তার রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় উঠে গেছে। তার মাথার ভেতরটা যেন তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছিল।

রাত ১১টা। মোমবাতির টিমটিমে আলোয় বসে নিয়াজ যখন নিজের পিস্তলটা পরীক্ষা করছেন, ঠিক তখনই তার মনে হলো দরজার ওপাশে একটা ছায়া নড়ে উঠল।

অন্ধকারের মধ্য থেকে একটা চেনা অবয়ব হেঁটে ঘরের ভেতর ঢুকল। প্রফেসর রেহান আশরাফ। তার পরনে একটা সাধারণ শার্ট, চোখে চশমা।

নিয়াজ চমকে উঠে পিস্তল তাক করতে চাইলেন, কিন্তু আতঙ্কে আর অতিরিক্ত রক্তচাপে তার হাত কাঁপছিল। "তুমি! তুমি এখানে কীভাবে?" নিয়াজের গলা শুকিয়ে কাঠ।

রেহান কোনো জিপিএস ট্র্যাকার বা সোর্স নিয়ে আসেননি। তিনি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে খবরের কাগজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্র ধরে এই বর্ডার এরিয়ার সম্ভাব্য রুটগুলো অনুমান করে গত দুদিন ধরে এখানে অপেক্ষা করছিলেন। জুয়াড়ির মতো এই একটা চালে রেহান নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন।

রেহান শান্ত গলায় বললেন, "নিয়াজ সাহেব, জাহিদ শিকদারের ফাইল আটকে আপনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন, ক্ষমতার জোয়ার সবসময় এক দিকে থাকে না।"

নিয়াজ কাঁপতে কাঁপতে তার পকেট থেকে হার্ডড্রাইভটি বের করলেন। "রেহান, শোনো! আমার কাছে এই হার্ডড্রাইভ আছে। এতে শত শত কোটি টাকার হিসাব আর ভিআইপিদের ফাইল আছে। এটা দিয়ে আমরা থাইল্যান্ডে রাজকীয় জীবন কাটাতে পারব। আমাকে শুধু বর্ডারটা পার হতে সাহায্য করো!"

রেহান এক পা এগিয়ে এসে নিয়াজের হাত থেকে হার্ডড্রাইভটি টেনে নিলেন। নিয়াজের তখন বাধা দেওয়ার মতো শারীরিক বা মানসিক শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই।

রেহান ড্রাইভটি নিজের পকেটে পুরলেন। নিয়াজ ভাবলেন রেহান হয়তো এটা ধ্বংস করবেন, কিন্তু রেহান তা করলেন না। এই অমূল্য ব্ল্যাকমেইল ফাইলটি নিজের কাছে রেখে তিনি ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখলেন।

রেহান দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তিনি পেছনে একবারও তাকালেন না। শুধু যাওয়ার আগে নিয়াজকে দেখে মৃদু স্বরে বললেন—

"ক্ষমতা মানুষকে ধ্বংস করে না। মানুষ নিজেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।"

তারপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

ঠিক তার পর মুহূর্তেই নিয়াজের মাথার ভেতর একটা তীব্র শব্দ হলো। ডান হাতটা অবশ হয়ে পিস্তলটা মেঝেতে পড়ে গেল। বুক ফেটে যাওয়া এক যন্ত্রণায় তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমহীনতা আর উচ্চ রক্তচাপের কারণে গ্রেপ্তারের ঠিক আগ মুহূর্তে তার মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ বা ম্যাসিভ স্ট্রোক হলো। তিনি কথা বলার বা নড়ার শক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললেন।

পরদিন সকালে দেশের সবকটি টেলিভিশন স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ উঠল:

"টেকনাফ সীমান্ত থেকে সাবেক ডিবিকর্তা নিয়াজ মোর্শেদ গ্রেপ্তার। গ্রেপ্তারের সময় তিনি প্যারালাইজড ও অচৈতন্য অবস্থায় মেঝেতে পড়েছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের পলাতক জীবন এবং তীব্র মানসিক আতঙ্কের কারণে তিনি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।"

সংবাদপত্রে বা পুলিশের রিপোর্টে কোথাও প্রফেসর রেহান আশরাফের নামের দূরতম কোনো উল্লেখও থাকল না।

ঢাকার একটি নির্জন লাইব্রেরিতে বসে খবরের কাগজটি পড়লেন রেহান আশরাফ। তার পকেটে তখনো রয়ে গেছে সেই এনক্রিপ্টেড হার্ডড্রাইভটি।

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৩
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে তে কি দেখতে চাই না

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



ওপার বাংলা আর এপার বাংলা মানে কোন দেশের কোন অঞ্চল বোঝায়, সেটা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু দু'বাংলার সংস্কৃতি বেশির ভাগটাই আলাদা। শব্দ উচ্চারন থেকে শুরু করে মন মানসিকতা, পোশাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩

ফিরে এসো অনুরাধা, ভেঙে দিয়ে সব বাঁধা....

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন- ফিরতেই পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে?

বাংলাদেশে ফিরে আসা তাঁর জন্য অসম্ভব নয়। চাইলে তিনি দেশে ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুপান্তর

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭


কাজী সালাউদ্দিন সাহেবের আসলেই রাজকপাল , এই কথা বললে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হয় না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের মসনদে টানা ষোলো বছর বসে থাকার এক বিরল কীর্তি তিনি গড়েছেন, যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা বাস করছি প্রচণ্ড রাজনৈতিক ভণ্ডামোর মধ্যে – হুমায়ুন আজাদ। কিছু কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৮



ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে সেটা হল plausible. যার একটা অর্থ হল “আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত”। হুমায়ুন আজাদের অনেক লেখার মধ্যে এ জিনিসটা পাওয়া যায়। এমনিতে হুমায়ুন আজাদ খুবই ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ১৭ই মার্চ ১৯২০

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪১




একটা সোনার ছোট্ট ছেলে জন্ম নিলো এই  দিনে,
স্বভাবগুনে স্থান পায় সে কোটি জনতার মনে।

সেই ছেলেটি জন্মেছিল টুঙ্গিপাড়া গ্রামে।
মুক্তিরই এক বার্তা নিয়ে এলো ধরাধামে।

অন্তরটি তাঁর বিশাল বড়ো,বুক ভর্তি  মায়া,
সব মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×