somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্বিধা

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ রাত ১২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক বিশাল শূন্য প্রান্তরে বসে আছি আমি। অপেক্ষা করছি কোন অলৌকিক ঘটনার। কারণ, এ ছাড়া আমার আর কোন উপায়ও নেই। আমার এ করুণ পরিণতির জন্য একমাত্র আমার ভাগ্যই দায়ী। আর কেউ নয়। কিভাবে যে কি হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। যখন বুঝতে পারলাম তখন দেখি আমার সামনে এক শূন্য প্রান্তর অপেক্ষা করছে। ... এক মিনিট প্লিজ। একটা কল এসেছে মোবাইলে। হ্যালো, আস্সালামু আলাইকুম। এবাদুদ্দিন বলছি। ওয়ালাইকুম সালাম। আমি ... ও প্রান্ত থেকে যে কি নাম বললো বুঝতে পারলাম না। শুধু বুঝলাম একটা পুরুষ কণ্ঠ কথা বলছে। নামটা পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য আবারো জানতে চাইলাম- কে বলছেন? আমি রহমত আলী বলছি স্যার, চিনতে পারছেন স্যার? ও .. চিনেছি। তা কি খবর বল। আমার কাছে তোর কোন পাওনা আছে না-কি? না স্যার, কি যে বলেন। আমারে চিনছেন তো স্যার? আমি ক্লিনার রহমত আলী। আপনে যখন সোনার তরীতে ছিলেন, তখন আমি সেখানে ক্লিনার হিসেবে কাজ করতাম। হ্যা, হ্যা, আমি ঠিকই চিনেছি। সে জন্যেই তো জিজ্ঞেস করছি, তোর কাছ থেকে আমি কোন ধার-টার নিয়েছিলাম কি না কখনো? কি যে কন স্যার। আপনে আমার কাছ থেইকা টাকা ধার নিবেন কেন? বরং আমিই তো স্যার আপনার কাছ থেইকা দুইশ' টাকা ধার নিছিলাম। ঐ টাকাটা তো এখনও দেই নাই। স্যার, আপনের সাথে আমার জরুরী দেখা করা দরকার। আপনের বাসায় আসমু স্যার? না, বাসায় না। তুই আমার কাছে কোন টাকা না পেলে বাসায় আসার দরকার নেই। বরং আমাদের বাসার পশ্চিম দিকে যে খেলার মাঠটা আছে না, ঐখানে চলে আয়। ঠিক আছে? ঠিক আছে স্যার। আসার আগে একটা রিং দিস, হঁ্যা। ঠিক আছে স্যার, খোদা হাফেজ। হঁ্যা, কি যেন বলছিলাম! ওহ্ হো, ভুলেই গেলাম। যাক, অন্য কথায় আসি। আপনার নিশ্চয়ই এই রহমত আলী সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছে করছে। কিংবা আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আমি কেন ফোন ধরেই পাওনার কথা বললাম? হাহ্ হাহ্ হাহ্ ... আপনার মনে প্রশ্ন তোলার জন্যই তো আমি এভাবে কথা বলেছি। সবই বলবো আপনাকে। তবে প্রথমে ক্লিনার রহমত আলীর কথাই বলি। রহমত আলীর নাম আসলে ছিল রমইত্যা। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় ক্লাস টু পর্যন্ত পড়ার পর তার আর পড়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সে খুব সুন্দর বাংলা পড়তে পারে। হাতের লেখাও মন্দ না। এ জন্য সে একটু বড় হয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা এসে নিজেকে এইট পাশ বলে জাহির করে। আমি তখন আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চাকুরী নিয়ে ফার্মগেটে যাতায়াত করি। ভয়ঙ্কর বললাম এ কারণে যে, এখানে চাকুরী করার সময়ই আমি তিরিশ লক্ষ টাকার ফেরে পড়ে যাই। যে টাকা আমার সারা জীবনেও শোধ করতে পারব কি-না কে জানে! সে যাক, আমি তখন সোনার তরী এন্টারপ্রাইজের চীফ ফাইন্যান্স অফিসার। এম.ডি. স্যার আমাকে খুব বেশী পছন্দ করতেন। তখনই একদিন ঘটনাক্রমে রহমত আমার সামনে পড়ে। ঘটনাটা হলো, আমি বাস থেকে নেমে যখন অফিসে যাচ্ছিলাম তখন এক ছিনতাইকারী হঠাৎ করে ছোঁ মেরে আমার চোখের চশমা নিয়ে দৌড় দেয়। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি একটি ছেলে সেই ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো, ধরছি ধরছি....। তারপর তো যা হবার তাই হলো। চশমাটা অক্ষত ফিরে পেলাম, কিন্তু ছিনতাইকারী অক্ষত থাকতে পারলো না। আর সেই ছেলেটা দাঁত কেলিয়ে হেসে আমার কাছে এসে সালাম দিয়ে বললো, স্যার, আমনে কি কোন অফিসের বস্ নি? আমি বললাম, তোমাকে আমার ধন্যবাদ দেয়া দরকার। বলে আমি বেশ ভনিতা করেই বলি, ধন্যবাদ। তুমি যদি ছিনতাইকারীকে ধরতে না পারতে তাহলে আমাকে আগামী বেতনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এখন কি তুমি আমার কাছ থেকে কিছু আশা করছ? তুমি যদি আমার কাছে খুব বেশী কিছু আশা কর, তাহলে তা হয়তো আমি পূরণ করতে পারব না। কিন্তু খুব ক্ষুদ্র হলে আমি চেষ্টা করতে পারি। আমার কথা শুনে ছেলেটি হেসে ফেলে বললো, আমার নাম স্যার রমইত্যা। আমি এইট পাশ। একটা চাকরী আমার খুব দরকার স্যার। এইল্যেইগাই আমি আমনেরে জিগাইলাম আমনে কোন অফিসের বস্ নি? বিষয়টা আমার কাছে সিনেমার দৃশ্যের মতোই মনে হলো। একটা চাকরী সন্ধানী ছেলে একজনের ছিনতাইকৃত দ্রব্য উদ্ধার করে মালিকের কাছে তা ফিরিয়ে দিলো আর মালিক তাকে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দিলেন, বাহ্ চমৎকার, তাই না। আমি হেসে ফেলে বললাম, এই ছেলে, তুমি যা ভাবছ আমি আসলে সে রকম কেউ না। তবে তুমি যে সাহস দেখিয়েছ তাতে তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। তুমি কি আমার বাসায় আমার সাথে ডাল-ভাত খেয়ে থাকতে পারবে? কোন বেতন দিতে পারব না কিন্তু। ছেলেটি কিছু না ভেবেই বলে উঠলো, আমনেরে আল্লায় অনেক বড় করুক, আমি রাজী স্যার। সেই থেকে রমইত্যা আমার বাসায় থাকতে শুরু করল। এরই মাস তিনেক পরে হঠাৎ করেই একদিন আমার বস আমাকে ডেকে বললো, আমাদের ক্লিনারটাকে বোধহয় আর রাখা যাবে না, ও চুরি-টুরি শুরু করেছে। আপনি এক কাজ করুন, ক্লিনার হিসেবে কাজ করতে পারে এমন একটি ছেলে খুঁজে বের করুন। আমি রমইত্যাকে বলতেই সে লাফিয়ে উঠে আমার কদমবুসি করলো। আমি তাকে বললাম, কিন্তু তোর এই নাম পাল্টাতে হবে। তোর বাপ তোর নাম কি রেখেছিল বলতে পারিস? সে মাথা নেড়ে জানালো সে জানে না। আমি ভেবে দেখলাম তার নাম হয়তো রহমত ছিল, সেটারই বিকৃত রূপ রমইত্যা। তাই আমি তার নাম সংশোধন করে রাখলাম রহমত আলী। নাম সংশোধনের সাথে সাথে তার আবাসস্থলও পরিবর্তন হলো। সে থাকতে শুরু করলো সোনার তরী এন্টারপ্রাইজ অফিস সংলগ্ন একটি অপরিসর রুমে। এখানেই রহমত আলী প্রসঙ্গ শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, এরপরই শুরু হয় রহমত আলীর উত্থান-পতনের ইতিহাস। সোনার তরীতে চাকুরী সুবাদে তার চেহারায় জৌলুষ চলে আসে। আর তার গ্রামের বাড়ীতে নিজেকে জাহির করতে শুরু করে অনেক বড় চাকুরে হিসেবে। এই পরিচয় তুলেই তার বাবা তার জন্য ইন্টার পাশ এক মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। যথারীতি বিয়ে হয়ে যায় তার, বড় অংকের যৌতুক নেয় রহমত আলী। দু'বছর যেতে না যেতেই তার ঘর আলো করা এক মেয়ে জন্ম হয়। আর কিভাবে কে জানে রহমত আলীর চরিত্রে ধ্বস নামতে শুরু করে। ফার্মগেট এলাকায়ই কিভাবে যেন এক গার্মেন্টস কর্মীর সাথে তার সখ্যতা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তা প্রণয়ে রূপান্তরিত হয়। রহমত আলীর কাছে তখন তার স্ত্রী-সন্তান হয়ে পড়ে অনাগ্রহের বস্তু। এবং একদিন গোপনে কাউকে কিছু না জানিয়ে এই মেয়েকে বিয়ে করে এনে তোলে সোনার তরী অফিসের সেই অপরিসর কক্ষে। পরদিন বিষয়টা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে প্রচন্ড ধমক লাগাই। এমডি স্যার তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কিকআউট করতে চাইলেও পারলেন না। নতুন একটি ক্লিনার ঠিক করে এক সপ্তাহ পর তাকে বিদায় করে দেয়া হয়। এরপর রহমত আলী চলে যায় পর্দার অন্তরালে। আমি আর তার কোন খোঁজ-খবর রাখি নি এবং রাখার প্রয়োজনও বোধ করিনি। প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা এসব। আজ আবার কেন সে আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইছে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। দেখা যাক কি বলতে চায় সে। ও ভালো কথা, আমি বলতে ভুলেই গিয়েছি যে, রহমত আলী কিন্তু আর সেই ছাপোষা রহমত আলী নেই। সে এখন রীতিমতো একটা পাজেরো আর কয়েকটা বাড়ীর মালিক এই ঢাকা শহরে। চুলোয় যাক তার এতসব টাকা-কড়ী। তাতে কি লাভ আমার! সে কি আমাকে তার সম্পদ থেকে একটুও ভাগ দেবে? হুহ্, নিশ্চয়ই না। তাহলে আমি তার ঐশ্বর্যের কথা ভাববো কেন? কেনই বা এ কথা ভেবে কষ্ট পাবো যে, যে একদিন আমার বাড়ীতে আশ্রিত ছিল সে এখন কোটিপতি আর আমি ভিখিরির মতো! না, কোন প্রয়োজন নেই। বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। আমি রহমত আলীর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একদিন রাত আটটায় সে আবার আমার মোবাইলে কল করে। অপরিচিত নাম্বার দেখে আগ্রহ দেখাতে না চাইলেও মোবাইলের চিৎকার থামাতে ওকে গলা টিপে ধরতেই হলো। আর রহমত আলীও ঔৎসুক্য নিয়ে প্রশ্ন করে বসলো, স্যার কি শুইয়া পড়ছিলেন না কি? ধরতে এত দেরী করলেন যে! আরে না, তুই আমার ঘুমের অভ্যাস জানছ না? ঐ অভ্যাসটা এখনো বদলায় নাই রে। এমনেই ভাল্লাগতাছিল না। আচ্ছা, এখন বল ফোন করেছিস ক্যান? স্যার, আমি করিমের হোটেলে বইয়া চা খাইতাছি। আপনে যদি মাঠে আসেন তাইলে দুইটা কথা কইতাম। কী... তুই করিমের হোটেলে বইয়া চা খাইতাছছ, আর আমার বাসায় আইতে পারলি না? আপনেই তো না করলেন আমারে আইতে। এইল্যেইগাই তো আমি আপনের বাসার গেট থেইকা ফেরত আইছি। দূর হারামজাদা। একবারে থাপ্পড় দিমু একটা। কবে কি কইছি না কইছি হেইডাও মনে রাখছস। আয়, আমার বাসায় আয়। আমার গালি শুনে রহমত আলী খুব মজা করে হেসে ফেলে। বলে, ঠিক আছে স্যার আইতাছি। করিমের হোটেল আমার বাড়ী তেকে দুই/আড়াইশ গজ দূরে। খুব ভালো চা বানায়। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি এই হোটেলের চায়ে আসক্ত। রহমত আলী যতদিন আমার বাসায় ছিল ততদিন সে একবারের জন্য হলেও এই হোটেলে যেতো চা আনতে। সেই সুবাদে হোটেলের ম্যানেজার-মালিক এর সাথেও তার বেশ জানাশোনা হয়ে যায়। আমি আড়মোড়া ভেঙ্গে শার্টটা গায়ে চড়াতে না চড়াতেই বাইরে একটা গাড়ী দাঁড়ানোর শব্দ পেলাম। মাথার চুলে চিরুনি চালানো শুরু করতেই কলিং বেল বেজে ওঠে। আমার অপরিসর বাড়ীর অপরিসর ড্রয়িং রুমের দরজা আলগোছে খুলতেই আমি দেখতে পেলাম, এক সুদর্শন নাদুশ-নুদুশ ভদ্রলোক আমার দরজার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমি হোঁচট খাই। এই কি আমাদের রহমত আলী! একেবারে চেনাই যায় না। আমি দোনোমোনো করছি দেখে সে একগাল হেসে সালাম দিয়ে ওঠে, স্লামালাইকুম স্যার, বালা আছেন তো স্যার? আমি কি বলবো না বলবো করতে করতে বলেই ফেলি, তুই কি হেই রমইত্যা? আমার রহমত আলী! সে হেসে ফেলে আমাকে কদমবুসি করে। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। কেন জানি কে জানে, রহমত আলী আমাকে জড়িয়ে ধরেই কেঁদে ফেলে। আমার ভেতরটা নড়বড় হয়ে যায়। কি বিতিকিচ্ছিরি কান্ড! আরে তুই কান্দস ক্যান? রহমত আলী চোখ মুছতে মুছতে হাসে। এমনেই স্যার, অনেক দিন পরে আপনের আদর পাইয়া কান্দন আইয়া পড়লো। আয়, ব তুই। এহেনে ব। আমার পুরনো কাঠের সোফার একদিকে ওকে বসতে বলে মাঝখানে আমি বসে পড়ি। রহমত বসতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, এক মিনিট স্যার। বলেই সে হুট করে বাইরে চলে যায়। ফিরে আসে সাথে সাথেই। আর তার পিছন পিছন ড্রয়িং রুমে এসে ঢোকে আরো দু'জন লোক। তাদের দু'জনের হাতেই বিশাল বিশাল দু'টো প্যাকেট। আমার চোখে ঘোর লেগে যায়। ঘোর কাটতে না কাটতেই প্যাকেট দু'টো টেবিলের ওপর রেখে দ্রুত বের হয়ে যায় লোকদুটো। রহমত হাসতে হাসতে বলে, স্যার আপনার জন্য সামান্য উপহার। দয়া করে ফেরত দেবেন না স্যার। আমার বিস্ময় আরো বেড়ে যায়। মুখের ভাষাও কি দারুন পাল্টে ফেলেছে রহমত! অথচ আমার সাথে সেই ঘরোয়া ভাষায়ই কথা বললো এক্ষুনি। আমি সত্যি সত্যি খুব বিস্মিত হলাম। কি এমন যাদুর ছোঁয়ায় এমন বদলাতে পারে মানুষ! আরে রহমত, আমি তো এখনও পারলাম না নিজেকে পাল্টাতে। তুই কি করে পাল্টালি! রহমত হয়তো আমার চিন্তা বুঝতে পারে। লাজুক হেসে বসতে বসতে বলে, আমি অনেক বদলাইয়া গেছি, না স্যার! বদলাইতে তো হইবই। না বদলাইলে কি আর টিকন যাইব এই ঢাকায়। এই যে দেখেন স্যার, আমি আপনের আশ্রয়েই এই ঢাকা শহরে বসবাস করতে শুরু করি। আপনে যদি ঐদিন আমারে জায়গা না দিতেন, তাইলে মনে হয় আমার ঢাকা ছাড়তে অইতো। আর আপনে কিন্তু স্যার যেই রকম ছিলেন ঐ রকমই আছেন। জানি না, হয়তো অবস্থা তার চাইতেও খারাপ আপনের। মাইন্ড কইরেন না স্যার। আমি কি ঠিক কইছি? আমি ওর কথায় রাগ করতে পারি না। রাগ করিই বা কি করে! আমি তো আসলেই খুব খারাপ অবস্থায় আছি। কোন কথা বলতে পারি না সহসা। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আমার। আচ্ছা, আপনি কি অনুভব করতে পারছেন আমার এই দীর্ঘশ্বাস? ... যাহ্, কি সব বলছি। আপনি আমার দীর্ঘশ্বাস অনুভব করবেন কিভাবে? আপনি তো আর আমার অবস্থানে নেই। আপনি তো একজন শ্রোতা মাত্র। যাই হোক, আপনাকে স্পর্শ না করলেও আমার দীর্ঘশ্বাস কিন্তু রহমত আলীকে ঠিকই স্পর্শ করে। সে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, স্যার কি আমার কথায় মনে কষ্ট পাইলেন? আমি মাথা নাড়ি, নাহ্। তোর কথায় কষ্ট পাবো কেন? তুই তো সত্যি কথাই বলেছিস। ... আচ্ছা বল, তুই আমার সাথে দেখা করার জন্য এত ব্যস্ত হয়েছিস ক্যান? অনেক কথা স্যার। বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেও। মাথা চুলকিয়ে কি যেন ভাবে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, যে জন্য দেখা করমু ভাবছিলাম সেইটা নিয়া আর কোন কথা কইতে ইচ্ছা করতাছে না স্যার। তার চাইতে ভালো আপনের কথা কন স্যার। ভাবী-বাচ্চারা মনে হয় বাসায় নাই, তাই না স্যার? না, বাসায় নাই। তোর ভাবি গেছে বাপের বাড়ী। আরো সপ্তাহ খানেক থাকবে। এতক্ষণ পর আমার খেয়াল হয় যে, আমি রহমতকে এখনো কোন আপ্যায়ন করাইনি। ব্যাপারটা কেমন হয়ে যাচ্ছে না ভেবে আমি বলি, তুই বস আমি একটু ভিতর থেকে আসি। আমার কথা শেষ না হতেই লাফিয়ে ওঠে রহমত। না স্যার ভিতরে যাইবেন না। আমি কিচ্ছু খামু না। আপনে এইখানে বন। দুইডা কথা কই। বলে সে জোর করে আমাকে সোফায় বসিয়ে দেয়। আমার ভিতরটা খচখচ করতে শুরু করে। কি করব আমি। রহমত আমাকে আর উঠতে দেবে না আমি নিশ্চিত। তারপরও আমি বলি, শোন, তুই এতদিন পর আমার বাসায় এসেছিস, কিছু না খেলে কেমন দেখায় বল। না স্যার আমি কিছু খামু না। আপনের কথা শুনি। আপনের চাকরী কেমুন চলতাছে স্যার? ওর কথা শুনে আমার বুকের ভেতর থেকে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কি বলব আমি! আমি যে একটা হুলিয়া মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছি! চাকরী করছি শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্য। আমি মৃদু হেসে বলি, এই চলছে আর কি। রহমত আলী স্নিগ্ধ হাসে। আমার কাছে তার হাসির অন্য কোন অর্থ প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু বুঝতে পারি না সে কি বোঝাতে চাচ্ছে। তাহলে কি আমার অফিস সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সে জানে? হয়তোবা। সে বলে, স্যার কিছু মনে করবেন না। আমি কিছুদিন আগে একবার আপনের অফিসে গেছিলাম। তখন শুনলাম আপনি ছুটিতে আছেন। আর ঐ যে ওয়াহেদ সাহেব, উনি আপনের ব্যাপারে অকে কিছু বললেন আমাকে। আমি জানি ঐ ঘটনার সাথে আপনের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু কেমনে কি হইল স্যার? এতক্ষণে আমার কাছে তার বিষয়টা পরিষ্কার হয়। সে আসলে এ বিষয়টা নিয়েই আমার সাথে কথা বলতে এসেছে। কিন্তু কিভাবে কথাটা পাড়বে বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ সুযোগ পেয়ে আর দেরী করেনি তাই। আমি কিছু না বলে শীতল দৃষ্টিতে তাকাই তার দিকে। আমার দৃষ্টিতে একটা প্রশ্ন কিংবা অবজ্ঞা অথবা দুটোই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন মিইয়ে যায় রহমত আলী। হয়তো নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে অথবা 'দয়া করে মাফ করে দিন' কিংবা 'না না ঠিক আছে ও কিছু না'- জাতীয় ভঙ্গি ফুটে ওঠে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। আমি নিরুপায় ভঙ্গিতে হেসে ফেলি। বলি, আমি অর্থ আত্মসাৎ করেছি এটা তুই বিশ্বাস করতে পারছিস না, নাকি ব্যাপারটা কিভাবে ঘটলো তা জানতে চাচ্ছিস, কোনটা? দুইটাই স্যার। প্রথমে তো বিশ্বাস না করাটাই উচিত। আর যদি বিশ্বাস করতেই হয় তাইলেও এইখানে কিন্তু আছে, সেই কিন্তুটাই জানতেই চাই স্যার। ওর কথা শুনে আমার মেজাজটা খিঁচড়ে ওঠে। কঠিন স্বরে আমি তাকে প্রশ্ন করি, ক্যান্ জানতে চাস? না স্যার আপনেরে খালি খালি জ্বালানের লইগ্যা আমি আসি নাই। কারণ তো অবশ্যই আছে। তার কথা শুনে আমার কেমন কেমন লাগে। আমার ঐ দুর্ঘটনার পর এ পর্যন্ত কেউ আর এত আন্তরিকতা নিয়ে আমার সাথে কথা বলে নি। সবাই কেবল ফিস ফিস করে দূরে সরে গেছে। আড়ালে আবডালে ঘৃণা ছড়িয়েছে। একজন আরেকজনকে সতর্ক করেছে যেন আমাকে টাকা ধার না দেয়। কারণ, আমার যে অবস্থা! হয়তো আমি আর সে টাকা ফেরতই দিতে পারবো না। অথচ বিশ্বাস করুন, পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে আমার কাছে টাকা-পয়সা পাবে। আমি কিন্তু অনেকের কাছেই টাকা পাই। যে যখনই আমার কাছে হাত পেতেছে তখনই আমি আমার পকেট খালি করে দিয়ে দিয়েছি। প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ধার করেও টাকা দিয়েছি। অনেক সময় সে টাকা ফেরত পেয়েছি, অনেক সময় পাইনি। আর এই না পাওয়া নিয়ে কখনো কারো কাছে অনুযোগও করি নি। আমি জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না, তবুও বলি- এমন অনেকবার হয়েছে যে, আমি বেতনের পুরো টাকাটাই ধার দিয়ে ফেলেছি। আর সে টাকা বেশির ভাগ সময়ই ফেরত পাই নি। আর আমার সংসার খরচ! চালিয়ে নিয়েছি কোন রকম। স্ত্রীর চাহিদা মিটাতে পারি নি, ভালোবাসা দিয়ে পূরণ করেছি সে শূন্যতা। সন্তানের চাহিদা মিটাতে না পারলে ওদের সাথে এমন পাগলের মত খেলতে শুরু করেছি যে, ওরা ভুলেই গেছে কি চেয়েছিল। এই হলাম আমি। বিশ্বাস না হয় তো এই রহমত আলীকেই জিজ্ঞেস করুন না, এই এখুনি। শুনুন তার মুখ থেকেই। যাক সে সব, নিজের ঢোল নিজে পিটানো একদমই ঠিক না। কথায় কথায় আপনাকে বলে ফেললাম আর কি। কিছু মনে করবেন না। ব্যাপারটা খারাপ লাগলে আমার মুখে থুথু ছিটিয়ে দিন, আমি কিছুই মনে করবো না, বরং ধন্যবাদ দেবো- হাহ্ হাহ্ হাহ্ ....। কি কান্ড দেখুন। আপনার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমি বেমালুম ভুলে যাই রহমত আলীর কথা, অট্টহাস্যে ফেটে পড়ি, আর রহমত আলী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমার হঠাৎ করেই চোখ যায় সেদিকে, আর আমি একটু ধাতস্থ হই। রহমত আলী খুব ধীরে বলে, স্যার কি কিছু ভাবতাছিলেন? নাহ্। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথেই শব্দটা উচ্চারণ করি। বলি, আমার মাথায় তো সারাক্ষণ একটাই চিন্তা, কেমনে পার পামু। আচ্ছা রহমত, তুইই বল, এতবড় শাস্তি পাওয়ার মতো মানুষ কি আমি? রহমত মাথা নীচু করে ফেলে। বলে, না স্যার, কিন্তু বিষয়টা তো ঐ রকমই প্রমাণ হইল। প্রমাণ!... সবার সামনে অস্ত্রের মুখে আমার কাছ থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে গেলো, অথচ প্রমাণিত হলো ওদের সাথে আমার যোগসাজশেই হয়েছে এটা! দুনিয়াটা কি বিচিত্র রে রহমত, কি বিচিত্র! বলেই আমি নিজের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে চেষ্টা করি। আমার কেমন অস্বস্তি লাগতে শুরু করে, কেমন ছটফটানি শুরু হয় আমার ভিতর, বুঝি না। কেন যেন ডাঙ্গার কৈ মাছের মতো অসহায় লাগতে শুরু করে আমার নিজেকে। আমার মনে হচ্ছে, কৈ মাছের মতো মাটি ঘেঁষটে নতুন কোন জলাশয়ের সন্ধান করছি আমি। আমি ভুলে যাই স্থান-কাল-পাত্রের কথা, কেঁদে উঠি হু হু করে। রহমত আলী আমার কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখে। ধরা গলায় বলে, স্যার অভয় দিলে আমি একটা কথা বলতে চাই আপনাকে, বলব স্যার? বলে সে আমার দিকে তাকায় গভীর আগ্রহে। আমি হ্যা-না কিছুই বলি না শুধু তাকাই তার দিকে। দেখি, পরম আগ্রহে তাকিয়ে আছে রহমত আলী। মৌন সম্মতি পেয়ে বলতে শুরু করে রহমত, আপনের তিরিশ লাখ টাকাই আমি দিয়ে দিতে চাই স্যার। আপনি কি নিবেন স্যার? যদি কোনদিন পারেন ফেরত দিবেন, আর না পারলে কোন দাবী নাই। ঐ যে স্যার সোনার তরীর চাকরী চইলা যাওনের পর আপনে আমারে যে দুইশ টাকা দিছিলেন, মনে আছে স্যার? ঐদিন আপনে আমারে যেই কথা কইছিলেন ঠিক ঐ একই কথা আমারও স্যার। পারলে ফেরত দিবেন, না পারলে কোন দাবী নাই। ... নিবেন স্যার আমার টাকা? একবারে হালাল রুজির টাকা স্যার...। আরো কি কি বলতে থাকে রহমত আলী। কিন্তু আমার মাথায় কিছুই ঢোকে না। স্মরণ করতে চেষ্টা করি রহমত আলীর দুইশ টাকার ঘটনাটি। হঁ্যা মনে পড়েছে। ওর চাকরী চলে যাওয়ার ক'দিন পর সে আমার বাসায় এসে দেখা করে। তার দূরবস্থার ফিরিস্তি দিয়ে আমার কাছে দু'শ টাকা ধার চায় পান-সিগারেটের ব্যবসা করবে বলে। আমি তাকে এমনিই দিতাম। কিন্তু একটু শাসন করতে ইচ্ছে হলো বলে টাকা দেয়ার আগে বললাম, টাকাটা কিন্তু এমনি এমনিই দেই নাই, ধার দিলাম। ব্যবসা কইরা লাভের অংশ থেকে ফেরত দিবি। আর যদি মনে করিস দিবি না, তাইলে কোন দাবী রাখমু না আমি, যা। সেদিন সে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গিয়েছিল আমার বাসা থেকে। শুধু বলেছিল, স্যার দোয়া কইরেন, য্যান্ আমনের টেকা লাভসহ ফেরত দিতাম পারি। ঘটনাটি মনে পড়তেই হঠাৎ করে যেন বজ্রপাত হলো আমার মাথায়। এ কী বলছে রহমত! আরে শুনুন শুনুন, রহমত আমাকে তিরিশ লাখ টাকা অফার করছে, তাও আবার বিনা দাবীতে! এও কি সম্ভব? আমি দিশেহারা হয়ে যাই। এ রকম অসম্ভব প্রস্তাবে তো আমার পাগল হওয়ারই কথা। কি করি আমি এখন! আচ্ছা, আপনিই বলুন তো, রহমতের কাছ থেকে টাকা নেওয়া কি ঠিক হবে আমার? এই টাকা নিয়ে যদি আমি সোনার তরীর সাথে আমার সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে ফেলি, তাহলে টাকা ছিনতাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক আরো জোরালোভাবে প্রমাণিত হবে! আর ঝামেলা না মিটালে আমাকে সারা জীবন একটা অসহনীয় অভাবের তাড়নায় ছুটতে হবে দিগ্বিদিক। আমার এখন কি করা উচিত? জানি না আমি, জানি না, জানি না ...। আচ্ছা, আপনি কি এ প্রশ্নের কোন সমাধান দিতে পারেন? পারলে তাড়াতাড়ি দিন। ঐ যে দেখুন না রহমত আলী আমার দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ...। [রচনা ঃ ঢাকা 14.02.2004 ইং থেকে 04.04.2004 ইং]
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ রাত ১১:৩৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের শিক্ষা - ১

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ৯:২৬



সমাজ আমাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে। কখনো ধন-সম্পদ দিয়ে, আবার কখনোবা কপর্দকশূন্যতা দিয়েও! সমাজের এই পরীক্ষায় কেউ জিতেন, আবার কেউবা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়ে বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×