somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্তরাল

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক.
অবশেষে পার্কের নির্জন কোণে এসে বসলো সে। একা, সম্পূর্ণ একা। পার্কের ভিতর আলো-আঁধারির খেলা। যে বেঞ্চিটাতে নাইম আধশোয়া হয়ে আছে তার আশে-পাশে কোন লাইটপোস্ট নেই। বেশ খানিকটা দূরে পিঠেপিঠি দুটো লাইটপোস্ট। তার আবছা আলো তাকে একটা জমাট ছায়া করে রেখেছে। পার্কের গা ঘেঁষে যাওয়া রাস্তায় গাড়ীর চলাচল তেমন একটা নেই। কিছুক্ষণ পর পর একটা দুটো গাড়ী তীর বেগে ছুটে যায়, তার হেড-লাইটের তীব্র আলো পার্কের এ পাশটাকে মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল করে তোলে।
নড়ে-চড়ে বসে নাইম। কেমন যেন একটা ত্রস্তভাব তার প্রতিটি অঙ্গসঞ্চালনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। হঠাৎ সে মাথা ঝাড়া দেয়। মনে হয় যেন কোন চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চাচ্ছে। নিজেই অবাক হয় সে। ভাবে আশ্চর্য, এই আমি। আমিই নিজের খেই হারিয়ে ফেলছি! এ্যা, সত্যি। ... হা হা হা। হঠাৎ করে অট্টহাসি দিয়ে ওঠে নাইম। তার হাসির আকস্মিতায় পার্কের গাছগুলো যেন হঠাৎ একটু থমকে দাঁড়ায়। পর মুহূর্তেই আবার বাতাস বইতে শুরু করে। ঝিরঝিরে ভেজা বাতাস। বাতাসে বকুলের গন্ধ। খুব ভালো লাগে তার, উঠতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁৎকে ওঠে, সাড়ে দশটা বাজে! সে ঝট করে উঠে পড়ে সিমেন্টের বেঞ্চ থেকে। পা বাড়াতে যাবে, ঠিক এমনি সময় পেছন থেকে ডেকে ওঠে একটি ভরাট কণ্ঠ - 'দাঁড়ান'।
নাইম চমকে উঠে পেছনে তাকায়। হ্যাংলা-পাতলা এক লোক দাঁড়িয়ে আছে কয়েক গজ দূরে। সে একটু ভয় পাওয়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, 'কে, কে আপনি?'
লোকটা অদ্ভূতভাবে হেসে উঠলো, না তেমন জোরে, না তেমন আস্তে। কিন্তু তার হাসির মধ্যে কেমন একটা যাদুকরী মুগ্ধতা রয়ে গেছে যেন। নাইম অবাক হয়। কে এই লোক? কি চায় সে? ছিনতাইকারী নয় তো? ভাবনাটা মাথায় আসতেই নাইম হাল্কা বোধ করে অনেকটা। তার সাথে দামী হাতঘড়ি আর গোটা তিরিশেক টাকা ছাড়া কিছুই নেই। হাতঘড়িটা নেবে? নিক, কোন ক্ষতি নেই। এ রকম কত ঘড়ি আসবে যাবে। আর টাকা? ওতো হাতের ময়লা। তাছাড়া তিরিশ টাকা দিয়ে ও করবেটাই বা কি? আর নিলেও কোন ক্ষতি নেই। রিক্সা কিংবা স্কুটারে বাসা পর্যন্ত গেলেই ভাড়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু লোকটা যদি এ দু'টোর একটাও না চেয়ে তৃতীয় জিনিস কেড়ে নিতে চায়, তাহলে? ভাবতেই কেঁপে ওঠে নাইম। একটা শির-শিরে অনুভূতি গোটা শরীরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ভয়ে ভয়ে সে তাকায় লোকটার দিকে। লোকটা তখন আরো কাছে চলে এসেছে। একবারে দেড় গজের ভিতর। নাইম ভয় পাওয়া কণ্ঠে বলে, 'কে আপনি, কি চান?'
লোকটি আবারও আগের মতো হেসে ওঠে। থেমে পড়ে ডান পায়ে ভর করে দাঁড়ায়। দু'হাত ঘষতে ঘষতে বলে, 'কিছু মনে করবেন না, আমাকে একটা সিগ্রেট খাওয়াবেন?' একটা কিছু বলতে হয় তাই এ কথা বলছে লোকটা, নাইম তা বোঝে। কিন্তু আসলে কি বলতে চায় ও? জাহান্নামে যাক, না শোনাই ভালো। মানে মানে কেটে পড়ি। সে ভদ্র ছেলের মতো বলে, 'স্যরি, আমার কাছে সিগ্রেট নেই।'
কথাটা বলেই পাশ কাটাতে চায় ও, দু'পা এগোয়। কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা। সে একটু কৌতুক মিশ্রিত কণ্ঠে বলে, 'আরে দাঁড়ান দাঁড়ান, এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একটা সিগ্রেট প্লিজ।'
লোকটার কথা এবং গলার স্বর নাইমের ভয় কাটিয়ে দেয়। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে সে বলে, 'আমার কাছে সিগ্রেট নেই, থাকলেই বা আপনাকে দেব কেন? কে আপনি?'
'রাগ করছেন কেন? কেবল তো একটা সিগ্রেট চেয়েছি, তাই না। আর পকেটে সিগ্রেট রেখেও আপনি এভাবে অস্বীকার করছেন কেন? সাথে সিগ্রেট থাকা তো অন্যায় কিছু নয়। তাছাড়া আপনার সাথে আমার একটা জরুরী আলাপ আছে। আলাপটা সারার জন্য একটা সিগ্রেট প্রয়োজন, দিন্ না প্লিজ।'
লোকটার কথা বলার ঢঙ দেখে নাইম অবাক হয়। কিন্তু লোকটা কে? কি আলাপ করতে চায় তার সাথে? যেভাবে কথা বলছে তাতে মনে হয় লোকটা তাকে ভালো করেই চেনে। কিন্তু নাইম কি তাকে চেনে? সে ভালো করে তাকায় লোকটার দিকে। না, এ লোককে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ে না তার। কিন্তু লোকটা তাকে কিভাবে চেনে? সে যে ধূমপায়ী তা-ই বা কি করে জানে? সে খেয়াল করে দেখে সন্ধ্যার পর থেকে একটা সিগ্রেটও ধরায়নি। পার্কে ঢুকে ধরাবে ধরাবে করেও আর ধরানো হয়ে ওঠেনি। লোকটা নিঃসন্দেহে পার্কে ঢোকার পর থেকেই তাকে ফলো করেছে। কারণ, পার্কে ঢোকার আগে সে সামনে-পেছনে ভালো করে লক্ষ্য করেছিলো, কেউ তাকে ফলো করছে এমন মনে হয়নি তার। তার খুঁতখুঁতে মন কেবলই পেছনে তাকায়। না, এ লোককে সে চেনে না। একবার অন্ততঃ ওর সাথে পরিচয় হলে তার মনে থাকতোই। যাকে চেনে না তার সাথে সে কথা বলতে যাবে কেন! নাইম বলে ওঠে, 'আপনাকে আমি চিনি না এবং বাস্তবেই আপনার সাথে আমার পরিচয় নেই। সুতরাং কোন কথাও নেই আপনার সাথে। চলি, খোদা হাফেজ।'
কথা কয়টি বলেই নাইম চলে যেতে উদ্যত হয়। লোকটা এবার আর তাকে থামতে বলে না। ভরাট গম্ভীর কণ্ঠে বলে, 'আমার সাথে আলাপ হলে আপনি ভীষণ উপকৃত হবেন। আপনার মাথার উপর বিপদের যে কালো মেঘ জমা হয়ে আছে তা-ও কেটে যাবে আশা করি। অতএব যাবার আগে একটু ভাবুন।'
ভীষণভাবে চমকে ওঠে নাইম। কি বলছে লোকটা! বিপদ! কিসের বিপদ! না, তার সাথে তো এমন কারো সম্পর্ক নেই যে তার কোন ক্ষতি করতে পারে! তাহলে কি লোকটা ভুল করে অন্য লোক ভেবে তার সাথে আলাপ করতে চাইছে? তাই হবে হয়তো। এ রকম ভুল তো অনেক সময় তারও হয়েছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার হাসি পায়। সে একটু কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বলে, 'স্যরি, আপনি সম্ভবতঃ ভুল করছেন, আপনি যার সাথে কথা বলতে চান আমি সে নই। আপনি আমাকে চেনেন না, আমিও আপনাকে চিনি না। সুতরাং ...'
'না, আমি ভুল করছি না।' নাইমের কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠে লোকটা, 'আমি আপনাকে চিনি'। প্রচ আত্মবিশ্বাস তার কণ্ঠস্বরে। সে বলতে থাকে, 'আপনার নাম চৌধুরী নাইম আহমেদ। আপনার পিতার নাম চৌধুরী শাবি্বর আহমেদ। আপনার জন্মস্থান নরসিংদী, আপনার পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, এবং ...'
এ পর্যন্ত বলেই থেমে যায় লোকটা। যেন একটু দম নেয়।
নাইম একেবারে অফ হয়ে যায়, কোন কথা বলতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু।
লোকটা গলার স্বর একটু খাদে নামিয়ে আনে, 'আপনাকে আমি কতটুকু চিনি তা বোঝাতে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?'
নাইম সরাসরি এর কোন উত্তর দিতে পারেনা। মনে মনে বলে ওঠে, 'না নেই'। এ মুহূর্তে লোকটাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করেনা। কেন যেন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় তার। ভেতরে ভেতরে সে কেবল ঘামছে। লোকটা গলার স্বর কোমল করে বলে, 'আপনি কি আমার সাথে আলাপ করবেন?'
নাইম পরাজিত নিস্তেজ গলায় বলে, 'হ্যা, আপনাকে আমি সময় দেব।'
লোকটা বাচ্চা ছেলের মতো 'হুররে' বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ডান হাতের আঙ্গুল মুখে পুরে শিষ দেয়। নেচে ওঠে এক পাক।
প্রচ মানসিক চাপের মুখেও ভীষণ হাসি আসে নাইমের। আচ্ছা পাগল তো লোকটা! কিন্তু সে তার হাসিকে উন্মুক্ত করে না। মুচকি হেসে আবার গম্ভীর হয়ে যায়। লোকটা অনুনয় করে, 'একট সিগ্রেট প্লিজ'।
নাইম সুবোধ বালকের ন্যায় প্যান্টের পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে আনে। লোকটার দিকে একটা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও অগি্নসংযোগ করে একটায়। একটা কাজ পেয়ে ভালোই লাগে তার। সিগ্রেটও টানা হয়, প্রস্তুতিও নেয়া হয় মনে মনে।
'আসুন, বসা যাক।'
লোকটার আহ্বানে আগের বেঞ্চিতে ফিরে যায় নাইম। অর্ধচন্দ্রাকৃতির বেঞ্চিতে প্রায় মুখোমুখি বসে ওরা। লোকটা আলাপের সূত্রপাত করে, 'ঘন্টা তিনেক ধরে এখানে বসে বসে কি ভাবছিলেন বলুত তো!'
লোকটার ভনিতা দেখে নাইমের হাসি পায়। বলে, 'আপনিই বলুন না কি ভাবছিলাম। আপনি তো আবার সবজান্তা।'
'না সবজান্তা নই, তবে কোন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা আমার প্রবল। আর সংঘটিত অতীত জানায় কি কারো আপত্তি থাকতে পারে?'
'না তা পারে না, তবে প্রেরক-মাধ্যম এবং গ্রাহকের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক থাকা চাই। আমার সাথে আপনার তেমন কি সম্পর্ক বলুন।'
'ধীরে বন্ধু ধীরে। অত উতলা হবেন না, সব বলবো আপনাকে। তবে প্রথমে আমার সমস্ত প্রশ্নের জবাব চাই।'
'কিন্তু আমার সম্পর্কে আপনার এত কৌতুহল কেন?' একটু রূঢ় অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে ওঠে নাইম। লোকটা বেশ চমৎকার করে হাসে, সামান্য শব্দ হয়। বলে, 'তা তো বললামই, আপনার উপকার করতে চাই।'
'কিন্তু কেন, কে আপনি?'
প্রচন্ড কৌতুহল ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে। তার চাহনিতে ফুটে ওঠে সীমাহীন ব্যগ্রতা। লোকটা নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন। মৃদু হাসে সে, নাইমের কৌতুহল নিছক ছেলেমী ভেবে মাথা নাড়ে। বলে, 'আমি আপনার শুভাকাংখী। আপাততঃ এটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকুন। এখন বলুন, এতক্ষণ কি ভাবছিলেন?'
নাইম বিরক্ত হয়, অবাকও হয় খানিকটা। বলে, 'ভাবছিলাম তো অনেক কিছুই, কোনটা বলব?'
সুস্পষ্ট বিরক্তি ফুটে ওঠে তার কণ্ঠে। লোকটা হাসে। একেবারে সরল আমুদে হাসি- বাচ্চাদের অহেতুক রাগ দেখে যে ধরনের হাসি আসে তেমন। বলে, 'যে ভাবনাটা প্রবল ছিল সেটাই বলুন।'
নাইমের মেজাজ একেবারে তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। আরে বাবা কি বলতে চাও বলে ফেলো। এতো ন্যাকামি কিসের! সে চড়া গলায় বলে ওঠে, 'আপনি কি আমাকে কচি খোকা পেয়েছেন, এ্যা? কি চান আপনি, আমার কাছে কি চান? বলুন, কি চান?'
উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ে নাইম। তার চোখ জ্বলে ওঠে অকস্মাৎ, এই অন্ধকারেও তার চাহনি যে কারো মনে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু লোকটা নির্বিকার। নাইমের উত্তেজনাকে সে কোন আমলই দিচ্ছে না। যেন আমল দেয়ার মতো কিচ্ছু নেই। কিংবা সে আগে থেকেই জানতো নাইম এ ধরনের ব্যবহারই করবে। লোকটা ধীর শান্ত কণ্ঠে বলে, 'আপনি অহেতুক উত্তেজিত হচ্ছেন। দয়া করে বসুন, কথা শুনুন।'
'না, আমি আপনার কোন কথাই শুনব না। আপনি কি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চান? তাতে কোন ফায়দা হবে না আপনার। আমার পিতার কিংবা আমার এমন কোন অর্থ-সম্পদ নেই যা দিয়ে আপনার মুখ বন্ধ করা যাবে। অতএব আপনার যা খুশি করতে পারেন।'
প্রচন্ড জেদের সাথে কথাগুলো বলে নাইম। লোকটা ঝট করে উঠে দাঁড়ায় বেঞ্চ থেকে। প্রায় ধমকের সুরে বলে ওঠে, 'থামুন। কি যা তা বলছেন আপনি? আপনার পিতা আমার শিক্ষক। আমি তাঁকে ভালো করেই চিনি। তাঁর মতো সৎ লোক কমই আছে। আর আমি কি-না তারই মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি করব! ছি! ভাবতেও লজ্জা করছে।'
বলেই থামে লোকটা। কি যেন ভাবে মুহূর্তকাল। বলে, 'ঠিক আছে, যেতে পারেন আপনি। আপনার সাথে আজ আর কোন কথা বলবো না। যদি প্রয়োজন মনে করেন কাল ঠিক সন্ধ্যায় এখানটায়ই আসবেন।' বলেই হন হন করে পার্কের গভীরে যেতে থাকে লোকটা। নাইম তাকে ডাকবে ডাকবে করেও আর ডাকতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে। দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে যায় লোকটা। নাইম ভাবে, কে এই লোক? কি অদ্ভূত, ঠালো! আচ্ছা, লোকটা কি বলতে চেয়েছিল? বিপদ! কিসের বিপদ? ভাবতে গিয়ে সবকিছু এলোমেলো মনে হয় তার।
দুই.
নাইমের ভাল্লাগে না কিছুই। দুপুর গড়িয়ে গড়িয়ে বিকেলের দিকে যেতে থাকে। নাইম বিছানায় গড়াগড়ি যায়। মাথার পাশে খোলা ডায়েরীটা মেলে ধরে হাতে। সেই সকাল থেকে এ পর্যন্ত অনেক লিখেছে সে। ভালো না লাগার একমাত্র প্রতিষেধক এটা। এখন তার মানসিক অবস্থা যেমন, তা খুলে বলার মতো তেমন কেউ নেই। কাউকে হয়তো বলা যায়! কিন্তু না- সে বলবে না। সযত্নে ডায়েরীর মাঝের পৃষ্ঠাটা ওল্টায় নাইম। ছবিটা টুপ করে তার বুকের উপরেই এসে পড়ে। নাইম পুলকিত হয়। ডায়েরীটা বুকের উপর রেখে তুলে ধরে ছবিটা।
'অপূর্ব মীরা, অপূর্ব!' নাইম মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে ছবিটার দিকে। একটা পাথরের উপর বসে আছে মীরা। পেছনে বিভিন্ন রঙে মিশেল দেয়া পাথরের দেয়াল। হাল্কা সবুজ রঙের কাপড়ের উপর সুন্দর সুতোর কাজ করা জামার সাথে লাল ওড়না। চুলগুলো বাম কাঁধে এলানো। মুখে মৃদু হাসি, চোখও যেন হাসছে সেই সাথে। হাতের ভেতরে হাত, পায়ের অবস্থান সামান্য উঁচু-নীচুতে, পাথরে আর সমতলে। তেমন আহামরি কিছু নয়, কিন্তু সব মিলিয়ে অদ্ভূত এক সৌন্দর্য যেন খুব ধীরে পাখা মেলে উড়তে শুরু করে।
নাইম আলতো করে ছবিটা রাখে বুকের উপর। বাইরে তাকায়। মেঘমুক্ত আকাশ। রাস্তার ওপারের নারকেল গাছগুলো বাতাসে মৃদু দুলছে। একটা কাক মুখে করে একটা সুদৃশ্য ছোট্ট টিনের কৌটা এনে তার বাসার উপর বসে। চারদিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখে দেয় বাসায়। আবার উড়ে যায় সাথে সাথে।
কাকের চোখ বন্ধ করা নাইম দেখেনি, অনুমান করেছে। কথাটা ভাবতেই তার খুব হাসি পায়। কোন শব্দ না করে হেসে ওঠে সে। ব্যপারটা নিজের সাথে মেলাতে চেষ্টা করে। সেওতো মীরার ছবিটা চুরি করে এনেছে। অবশ্য চোখ-কান খোলা ছিলো তার। কেউ টের পায়নি। অনুমান করতে পারে নি মীরাও। বরং মীরা নাইমের কাছেই অভিযোগ করে, 'আচ্ছা নাইম ভাই বলেন তো কেমনটা লাগে, আমার একটা ছবি কে যে চুরি করলো তা বুঝতেই পারতাছি না।'
নাইম অবাক হওয়ার ভান করে, 'তোমার ছবি চুরি গেছে? কোনটা?'
'আপনি দেখছেন। ঐ যে পিকনিকে গিয়ে তুললাম না পাথরের উপর বসে, ঐটা।'
'হ্যা দেখেছি। ছবিটা তো খুব ভালো ছিল। মনে হয় কারো পছন্দ হয়েছে, তাই নিয়ে গেছে।' এটা কোন ব্যাপারই না ধরনের সুর তার কণ্ঠে।
'তাই বলে আমাকে না বলেই নেবে? চাইতে পারতো না?'
'হয়তো বেচারা সাহস পায়নি। কিংবা ভেবেছে তুমি দেবে না।'
মীরা নাইমের কাছে ব্যাপারটার গুরুত্ব তুলে ধরতে না পেরে রাগ করে চলে যায়।
নাইম ভাবে, আচ্ছা, ছবিটা চুরি না করে চেয়ে আনলে পারতাম না! চাইলে কি ও দিত? এর উত্তর হঁ্যা হওয়ার পেছনে কোন যুক্তি দেখে না নাইম। ওর বন্ধুর বোন ছাড়া তো আর কিছু নয় মীরা। সে ওকে বোনের মতই দেখত, এখনো দেখার চেষ্টা করছে; কিন্তু পারছে না। মীরাকে ওর ভালো লেগে গেছে। এর পেছনে কারো হাত নেই। মীরা কখনো তাকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেনি। সে নিজেও চায়নি এ রকম করে ভাবতে। কিন্তু কী-ই বা করার আছে তার।
'প্রেম তো নিঃসঙ্গ বাতাসের মতো।
সে যখন বয়ে যায়,
তখনই কেবল অনুভব করা যায় তাকে।'
সে তো এখন তা অনুভব করতে পারছে। কিন্তু এ ব্যাপারে তার আর কিছু করার নেই। সে ইচ্ছা করলে মীরাকে সব কিছু খুলে বলতে পারে। কিন্তু না, সে তা করবে না। মীরা যদি নিজ থেকে তাকে কিছু না বলে তাহলে সে নিঃশেষ হয়ে গেলেও কিছু বলবে না। তা ছাড়া এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গেলে যদি মীরার ভাইয়ের সাথে ওর বন্ধুত্ব নষ্ট হয়! না না, এ অসম্ভব। ওর মতো বন্ধু হারানোর বেদনা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। থাক মীরা ওর মতো।
প্রলাপের মতো কথা কয়টি আউড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে নাইম। টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে সে। ছবিটার দিকে তাকায় আবার। এক চিলতে বিষাদময় হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে। বুকের গহীন থেকে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় নাইম। ছবিটা যত্ন করে লুকিয়ে রাখে বইয়ের আলমিরায়।
কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসা প্রয়োজন। সারা দিনের এই শুয়ে-বসে থাকা এক ধরনের জড়তা এনে দিয়েছে তার মধ্যে। বিকেলের হাওয়া গায়ে লাগালে হয়তো ভালো লাগবে। সে কাপড় পাল্টাতে থাকে। তার হঠাৎ মনে হয়- কোথায় যেন যাওয়ার কথা ছিল, কার সাথে যেন আলাপ ছিল তার। সে ভালো করে মনে করতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। এরই মধ্যে ভুলে গেছে সে। নিজের উপর খুব রাগ হয় তার। মাথার চুল টেনে ধরে দু'হাতে। 'শালার মাথা, তুই এত খারাপ হলি কবে থেকে?' খুব জেদের সাথে শূন্যে ঝাড়া দেয় প্যান্ট। একই মুড নিয়ে প্যান্টের ভিতর পা ঢোকায় সে। বিড়বিড় করে বলে ওঠে, 'জাহান্নামে যাক দেখা করা, আমি পার্কেই যাব।'
রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে পার্কে ঢোকে নাইম। গায়ে হাফ শার্ট। বেশ ফুরফুরে লাগে তার। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে তার প্রিয় বেঞ্চির কাছে চলে আসে। আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে অনেকেই। সবুজ ঘাসের উপর বসে বাদামী-আড্ডা জমিয়েছে কেউ কেউ। কিন্তু ওর প্রিয় বেঞ্চিটা একদম খালি। যেন ওর অপেক্ষাতেই আছে বেঞ্চিটা। নাইম বেশ আরাম করে বসে পড়ে বেঞ্চটায়। শার্টের বোতাম খুলে উদাম করে দেয় বুকটা। চোখ বুঁজে কি যেন ভাবতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার ভাবনা নির্দিষ্ট কোন পথ ধরে চলতে শুরু করার আগেই পেছন থেকে বলে ওঠে একটি কণ্ঠ, 'সময় মতই এসেছ তাহলে?'
পরিচিত কণ্ঠ শুনে হাসিমুখে ঘাড় ফেরায় নাইম, 'আরে ফাতু যে। এই বিকেলে পার্কে কেন, বাসায় যাওনি?'
'তোমার সাথে দেখা করব বলে গেলাম না।'
নাইমের পাশে বসতে বসতে বলে ফাতু। নাইম কিছুটা অবাক হয় ওর কথা শুনে। বলে, 'আমি এখানেই থাকব এ কথা তোমাকে কে বলল?'
'কেউ বলেনি। তবে আমি জানতাম তুমি এখানেই থাকবে। আজকে ক্লাস করনি কেন?'
'এমনি। ঘুম ভাঙ্গলো দেরীতে, যেতে ইচ্ছে করলো না। অতএব...' বলে ঘাড় সামান্য ঘুরিয়ে চোখ-মুখ এবং হাতের ভঙ্গিমায় মুহূর্তের জন্য টানটান-সতেজভাব ফুটিয়ে তোলে নাইম। যার অর্থ 'এটা কোন ব্যাপার হলো'।
ফাতু ঠোঁট টিপে হাসে। নাইমের এই ভঙ্গিটা তার দারুণ ভালো লাগে। কেমন এক ধরনের ছেলেমানুষী যেন লুকিয়ে আছে ওর মধ্যে। ফাতু বলে, 'তোমার সমস্যাটা কি নাইম?'
'কেন, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?'
ঘাড় কাত করে কপাল কুঞ্চিত করে বলে নাইম।
'বুঝি নাইম, আমি বুঝি সবকিছু।'
ঘাড় সামান্য দুলিয়ে দুষ্টুমি ভরা হাসি ঠোঁটে এনে বলে ফাতু। নীচের ঠোঁট উপরের দাঁতের হাল্কা কামড়ে ধরে মজা করে হাসে সে। বলে, 'কিন্তু মেয়েটা কে?'
নাইম যেন হাল্কা ফাঁপড়ে পড়ে যায়। কাটিয়ে ওঠে তৎক্ষণাৎ। ফাতুর কথাকে কোন আমল না দেয়ার ঢঙ্গে বলে, 'মাঝে মাঝে যে কি সব বলো না তুমি!'
কথাটা বলে নাইম অন্যদিকে তাকায়। মনোযোগ ফেরাতে চেষ্টা করে অন্য দিকে।
'তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ নাইম।' ফাতু বলে, 'ও কিছু না, ক'দিনেই সেরে যাবে। তবে ফটক উন্মোচনের দায়িত্ব কিন্তু তোমারই।'
নাইম যেন কথাটা শোনেনি এমন ভাব করে হঠাৎ তাকায় ফাতুর দিকে। হেসে দিয়ে বলে, 'আচ্ছা, তোমার এই অদ্ভূত নামটা কে রেখেছে? ফাতু, আরে ফাতু কি কারো নাম হতে পারে?'
নির্ভেজাল কৌতুকপ্রবণতা নাইমের কণ্ঠে। ফাতু বোঝে কথা কাটাচ্ছে নাইম। তবু কৌতুকের জবাব না দিয়ে পারে না সে, 'জি্ব না স্যার, আমার নাম ফাতু না ফাতেহা। ফাতু বানিয়েছেন আপনারা। আপনাদের কারণেই আমার হাজব্যান্ডও আমাকে ফাতু বলে ডাকে। মাঝে মাঝে ফালতু বলতেও দ্বিধা করে না।'
হা হা হা হা... উচ্চ শব্দে হেসে ওঠে নাইম। বলে, 'এমন স্বার্থক নামটা কে রেখেছে ম্যাডাম?'
'বাবা রেখেছেন। ফাতেহা অর্থ শুরু। আমাকে দিয়েই ওনাদের শুভ উদ্বোধন কি-না..।'
ফাতুর কথায় নাইম শব্দ করে হেসে ফেলে। ফাতু খুব মজা করে ঠোঁট টিপে হাসে। ফাতু বলে, 'আসল কথায় আস নাইম। সেই ভাগ্যবতীটা কে? নিশ্চয়ই কোন বিবাহিত বান্ধবী নয়?'
নাইম বুঝতে পারে- ফাতু বুঝে ফেলেছে। আর 'বিবাহিত বান্ধবী' বলে সে নিজেকে নিয়ে মজা করছে। ওকে কাটিয়ে যাওয়া খুব কষ্টকর। তবুও চেপে যাওয়া যায় কি-না তা পরীক্ষা করার জন্য সে কপট ধমক দেয়, 'ফাতু'।
নাইম নিজেই অবাক হয় তার কণ্ঠে। ধমকের বদলে অনুনয়ের সুর বেরুলো তার কণ্ঠ থেকে। যার অর্থ 'শুধু শুধু বিরক্ত করছ কেন?'
ফাতু হেসে ফেলে নিজের সাফল্যে। কাব্যি করে ওঠে,
'মনের ভেতরে লুকানো যে কথা
বন্ধু গো তা বলা না যায়,
জবান সহে তো পরাণ সহে না
এ কেমন সখা বলো না হায়।'
ফাতুর কাব্যিক রহস্যে একেবারে অবাক হওয়ার ভান করে নাইম। বড় বড় চোখে, হাসি হাসি হা-করা মুখে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উল্লসিত কণ্ঠে বলে, 'এত চমৎকার চরণ তুমি বলতে পার! আরে, তুমি তো কবি হয়ে গেছো। এই অঘটন কবে ঘটালে?'
নাইমের সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গাত্মক উচ্ছ্বাসকে কোন গুরুত্ব দেয় না ফাতু। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, 'বাসর রাতে, যেদিন ও আমার হাতে হাত, আর ...'
'চোখে চোখ রাখল, সেদিনই কবিত্ব উথলে উঠলো শিরায় শিরায়। তাই না!'
ফাতুর কথা কেড়ে নিয়ে বক্রোক্তি করে নাইম। ফাতু বোঝে। কিছু মনে করে না তার কথায়। এই ছেলেটাকে তার ভীষণ পছন্দ। ওকে একটা দিন ক্যাম্পাসে না দেখলে তার দিনটাই মাটি হয়ে যায়। কিন্তু সে বিবাহিত বলে নিজেকে আড়াল করেছে সেই প্রথম থেকেই। যে কারণে সেখান থেকে সরেও যেতে পারে না সে। আর এখন তার মনে হচ্ছে বিবাহিত হিসেবে জানানোটাই ভালো হয়েছে। না হলে ছেলেটা অন্য কোন মেয়েকে ভালোবাসতে পারতো না। যেমনটা সে পারেনি। সে যাক। আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসতে চায় সে। বলে, 'নাইম বাদ দাও ওসব। বলো না মেয়েটা কে?'
নাইম এবার একটু গম্ভীর হয়ে যায়। সরাসরি তাকায় ফাতুর চোখের দিকে। ফাতু চোখ স্থির রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তবে নির্দিষ্ট একটা ছন্দে বার বার সরল রেখায় এসে দাঁড়ায় তার চোখ এবং দেখে নাইমের চোখ স্থির, শান্ত এবং গভীর। ফাতু বোঝে এ চাহনির অর্থ। নাইম ওকে নার্ভাস করতে চাচ্ছে। এ যে দৃষ্টি নয় সাইকোটিক রে বা মনস্তাত্তি্বক রশ্মি- যেন মহূর্তের মধ্যে তার মনের খবর সব বলে দেবে। ফাতু হেসে ফেলে নাভর্াসনেস কাটায়। বলে, 'উঁহু, কাজ হবে না। আমি নার্ভাস হই নি। বলো কে সে?'
নাইম তার চোখ সরিয়ে নেয় অন্যদিকে। একটু হাসে। বলে, 'তুমি নাছোড়বান্দা।' যেন স্বগতোক্তি করলো সে। 'তুমি অবশ্য তাকে চেনো। চেহারায় না হোক, নামে।'
ফাতু একটু ভাবনায় পড়ে যেন। ভাবতে ভাবতেই বলে, 'আমার ধারণা যদি মিথ্যে না হয়, তবে সে মীরা।'
নাইম একটু লজ্জা পাওয়া সপ্রসংশ দৃষ্টিতে তাকায়। বলে, 'তোমার আইকিউ খুব ভালো ফাতু।'
ফাতু যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। তার হৃদয়টা টলমল করে ওঠে কিসের জন্য যেন। যেন বা টুপ করে ঢিল ছুঁড়লো কেউ পদ্ম-পুকুরে। কিন্তু ওসব মুহূর্তকালের জন্য। আপন মনেই মাথা ঝাড়া দেয় সে। বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে, 'মীরার সাথে কোন আলাপ হয়েছে তোমার?'
'না।'
'ও কি জানে তোমার কষ্টের কথা?'
'সম্ভবতঃ না।'
'তোমার সম্বন্ধে কতটুকু জানে ও?'
'অনেক কিছুই জানে। রাবেয়াকে যে আমি খুব পছন্দ করতাম এবং ওর সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ইত্যাদি তো জানেই। তোমার সাথে আমার কি ধরণের সম্পর্ক তা-ও জানে। তা ছাড়া প্রায়ই জিজ্ঞেস করে কার সাথে প্রেম করছি বা করবো ইত্যাদি।'
'এতো আলাপ হয়, অথচ আসল কথাটাই কখনো বলতে পারনি?'
অপারগতার হাসি হাসে নাইম। মাথা নেড়ে বলে, 'তা সম্ভব না ফাতু, সম্ভব না।'
'কেন সম্ভব নয়, অবশ্যই সম্ভব। কখনো চেষ্টা করেছো?'
'তা কি করে করবো বলো। ওদের বাড়িতে আমি এতটা ফ্রি যে, অনেকে ভাবে আমি ও বাড়ীর ছেলে। এ অবস্থায় যদি ওর সাথে আমার তেমন কোন সম্পর্ক হয় তাহলে কি সেটা ওর আব্বা-আম্মা কিংবা ভাই মেনে নেবে? যদি মেনে না নেয় তবে শুধু শুধু কষ্ট পাবে মেয়েটা। ওর ভাইয়ের সাথে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। না ফাতু না, এ অসম্ভব।'
বলে মাথা নীচু করে ফেলে নাইম। ফাতু গর্জে ওঠে, 'কাপুরুষ'।
নাইমের কিছুই বলার নেই। মাথা নীচু করে গালিটা হজম করার চেষ্টা করে। একটু পরে চেহারায় জোর করে হাসি ফুটিয়ে তুলে তাকায় নাইম। দেখে ফাতু তাকিয়ে আছে তার পেছনের দিকে। চোখের ইশারায় কাকে যেন কি বোঝাতে চেষ্টা করছে। নাইম ফাতুর দৃষ্টিকে অনুসরণ করে।
একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে দশ-পনেরো গজ দূরে। তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই। লোকটাকে দেখে নাইমের মাথায় একটা কিছু ভাবনা আসে। সজীব হয়ে ওঠে তার মেমোরি সেলগুলো। হঠাৎ একটা বিদু্যচ্চমক খেলে যায় মাথায়। ঝট করে উঠে দাঁড়ায় নাইম। 'কাল রাতে তো এর সাথেই কথা হয়েছিল! এর সাথে দেখা করার কথা ছিল আজ। কি যেন বলতে চেয়েছিল লোকটা।' নাইম ফাতুর কথা ভুলে যায় হঠাৎ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতে শুরু করে লোকটার দিকে। ফাতু ডাকে, 'নাইম'।
নাইমের যেন হঠাৎ খেয়াল হয় ফাতুর কথা। চমকে উঠে বলে, 'ও.. ফাতু, তুমি একটু বসো। আমি ঐ লোকটার সাথে একটু কথা বলে আসি।'
'কার সাথে কথা বলবে তুমি?'
'ঐ যে ঐ লোকটার সাথে।'
বলে হাত বাড়িয়ে লোকটার দিকে ইশারা করতে পিছন ফিরে তাকায়। সাথে সাথে হোঁচট খায় সে। কই, লোকটা গেল কোথায়? এইমাত্র না ওখানে ছিল। ভালো করে তাকায় চারপাশে। না, কোথাও নেই। তাহলে কি সে ভুল দেখেছে? সে উদভ্রান্তের মতো চারপাশে তাকায় আবারও। না, কোথাও নেই লোকটা। সে হতাশ হয়ে বসে পড়ে বেঞ্চে। ফাতুর খুব মায়া হয় ওর প্রতি। ও রহস্যময় হাসি হাসে। বলে, 'তুমি যাকে খুঁজছো তাকে আমি চিনি নাইম।'
'তুমি চেনো? চেনো ঐ লোকটাকে?'
নাইমের অবাক হবার পালা। ফাতুর সাথে লোকটার সম্পর্ক কি? ফাতু ঠোঁট টিপে মৃদু মাথা ঝাঁকায়, 'হ্যাঁ আমি চিনি। আমিই পাঠিয়েছিলাম ওকে। ও-ই বলেছে আজ সন্ধ্যায় এখানে থাকবে তুমি।'
নাইম সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে যায় তার কথা শুনে। সত্যিই কি ফাতু পাঠিয়েছিল লোকটাকে? কিন্তু কেন? সেটা এমন কি কথা যা সে নিজে বলতে পারতো না? ভাবে আর আশ্চর্য হয় নাইম। বলে, 'তুমি পাঠিয়েছিলে ওকে? কিন্তু কেন?'
প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠে নাইম। অপরিসীম কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে ফাতুর দিকে। ফাতু চোখ নামিয়ে নেয়। বলে, 'আমি আসলে তোমাকে বুঝতে পারিনি নাইম। ভেবেছিলাম তুমি আমার প্রতি খুব দুর্বল। সত্যিই যদি তা হতো, তাহলে আমার জন্য খুব খারাপ হতো সেটা। আমি চেয়েছিলাম ওর মাধ্যমে তোমাকে সাবধান করে দিতে।'
'ওহ্ ফাতু, তুমি ...'
বলে চুলের ভিতর দু'হাত ঢুকিয়ে মাথা নীচু করে বসে থাকে নাইম। আপনাতেই তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। সে ফাতুর কাছ থেকে এ ধরনের কথা আশা করেনি কখনো। কিছু ভাবতে পারে না সে। ফাতু বলে, 'তুমি খুব ভালো ছেলে নাইম। মীরাকে তোমার সাথে চমৎকার মানাবে। আর আমি আশা করবো, আমাদের বন্ধুত্ব কখনো নষ্ট হবে না।'
কথাগুলো বলে থামে ফাতু।
নাইম চোখ বন্ধ করেই ভাবতে থাকে অনেক কিছু। ফাতুকে সে কখনো মেয়ে ভাবতেও চেষ্টা করেনি। সে তার বন্ধু, কেবল বন্ধু। অথচ ফাতুই কি-না তাকে ভুল বুঝতে যাচ্ছিল। যাক, তবুও ভালো বলে ফেলেছে সে। 'ধন্যবাদ ফাতু, অসংখ্য ধন্যবাদ।'
মুখ তুলে তাকায় নাইম। কিন্তু চমকে ওঠে তৎক্ষণাৎ। কোথায় গেলো ফাতু? এও কি সম্ভব? এইমাত্র কথা বললো জলজ্যান্ত মানুষটা, আর এইমাত্র নেই? না, এ অসম্ভব।
সে উদভ্রান্তের মতো তাকায় চারপাশে। নিজেকে একটা উন্মাদ মনে হয় তার। যেন ঘোরে পেয়েছে তাকে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না ফাতু নেই এখানে। তাহলে কি সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো? না না, একটা রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ কখনো হাওয়ায় মিলাতে পারে না। তবে সে যাবে কোথায়?
আবার ভাবে নাইম, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো! সে তাকায় পশ্চিমাকাশে। সূর্য ডোবার আর অল্প বাকি। অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে পার্ক। জ্বলে উঠছে সোডিয়াম বাতিগুলো। সে হিসাব করে সময়। 'হ্যা, সন্ধ্যা তো হওয়ারই কথা।' না এ স্বপ্ন নয়, এ সত্যি, এ বাস্তব। আমি বাসা থেকে পার্কেই এসেছিলাম, পার্কেই আছি। আরো অনেকেই আছে। ফাতুও এসেছিলো। কিন্তু ও গেলো কোথায়? ও তো স্পষ্ট কথা বললো আমার সাথে।
তাহলে কি সে আসেনি? এ সব কিছুই কি আমার কল্পনা? লোকটাও কি আমার কল্পনার ফসল? না না না ...।
নাইম বিস্মিত, শঙ্কিত, উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে ঘাসের উপর। সব কিছু ভুলে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু না, আবার ঘুরে ফিরে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় মীরা, ফাতু, লোকটা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের শিক্ষা - ১

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ৯:২৬



সমাজ আমাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে। কখনো ধন-সম্পদ দিয়ে, আবার কখনোবা কপর্দকশূন্যতা দিয়েও! সমাজের এই পরীক্ষায় কেউ জিতেন, আবার কেউবা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়ে বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×