somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"জ্ঞানী" [mini story]

২৩ শে এপ্রিল, ২০১২ রাত ২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বাবা ছিলেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি।
বলা যেতে পারে একেবারে জ্ঞানগর্ভ, জ্ঞানরত্ন, জ্ঞানতীর্থ, জ্ঞানান্বিত।

অন্যদের জ্ঞানি করার লক্ষে জ্ঞান সম্প্রসারণই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তাঁর সবচেয়ে বড় ও নিকটতম লক্ষ ছিলাম আমি। তাঁর জ্ঞানের আলোকে আমাকে গড়েপিটে মানুষ করার সাধনায় জীবনের একটা বড় সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন।

সাহিত্য বাবা ছিলেন আমার প্রথম এবং অপরিহার্য ভাবেই একমাত্র গুরু। তাঁর প্রাণান্তকর অনুপ্রেরণায় আমি তাঁর প্রিয় বই “তিনশত কবিতায় বঙ্গীয় বিবর্তন” এতবার পড়েছিলাম যে এখনও আমি প্রায় পুরটা বই’ই উল্টো দিক দিয়েও মুখস্ত বলতে পারি। এই বইটা ছাড়া আমার হাতে অন্য কোন বই দেখলেই তিনি ভ্রু কুঁচকে দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর চোখের ভাষার বিভিন্ন রকম মানে হতে পারে। আমার কাছে কেবল একটা মানেই প্রকট হয়ে ধরা পড়ত, “বঙ্গীয় বিবর্তনের তিনশ কবিতা বগলের তলায় পুরে রাখার জিনিস না। বার বার পড়ে অনুধাবন করার জিনিস।“

এরপর যা হওয়ার কথা তাই হল। প্রস্তরবৎ কঠিনং এই সকল কবিতার অর্থ, গূঢ়ার্থ, ভাবার্থ, বিষয়-পদবিন্নাস ও কালানুসারে ধারাবাহিক উপস্থাপনা ইত্যাদি আমার ভিতর জলবৎ তরলং হয়ে প্রবেশ করল।

বাবা আমাকে গান’ও শেখাতেন। তাঁর অতি প্রিয় গান ছিল “বৈশাখে বলেছি তারে পৌষের কথা।” স্বাভাবিক ভাবেই আমার কর্ণকুহরে এই গান ব্যতিত অন্য কোন গানের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। এল.পি.তে অন্য কোন গান ভুলক্রমেও যদি বাজিয়ে ফেলতাম বাবার অবিস্মরণীয় বানি চিরন্তনী আমার শ্রবনিন্দ্রিয়ে যার পর নাই আঘাত হানতো।
তিনি বলতেন “এই সব ছাইপাঁশ শুনে কান ভারি করার মানে... ... ... ইত্যাদি, ইত্যাদি... এখনও তো ওই গানটার অন্তরাটাও ঠিক মতো ধরতে পারোনা।”

অনুরূপ দৃশ্য এর অবতারনা হলে তাৎক্ষনিক ভাবেই তিনি আমার সঙ্গিত গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। ডেকে বলতেন “এসো, আমি তবলায় বসলাম। একবার গেয়ে শোনাও দেখি কতটা হল।”

সেই সময় এখনকার মতো ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। FM তো কল্পনাতীত। সেকালে আমাদের আকাশ প্রচারিত বিনোদন বলতে ছিল বেতার। নিয়ম করেই শোনা হতো।

মনে পড়ে তখন প্রত্যেক ভোরে বেতারে ব্যায়ামের অনুষ্ঠান হতো। একদিন বাবা আমাকে সকাল সকাল তুলে দিয়ে উহা সুন্তে বসলেন। এবং আমার জন্য সর্বাঙ্গীণ হিতকর হিসেবে ওইদিনে প্রচারিত চার নম্বর ব্যায়ামটা তাঁর মনে ধরল।

বাবা আমাকে কষে সেই ব্যায়াম শেখালেন। সেটা মন্দ ছিলনা বটে কিন্তু অতি আগ্রহ বশত আমি অন্য কোন ব্যায়ামে মন দিতে চাইলেও বাবার কারনে কখনও শরীর দিতে পারিনি।

বাবা ধৈর্য ধরে আমাকে বোঝাতেন যে আমার ক্ষীণকায় শরীরটাকে যদি দৈর্ঘে-প্রস্থে বাড়ানোর ইচ্ছা থাকে তাহলে ওই চার নম্বর ব্যায়ামটাই হতে পারে আমার একমাত্র সাহায্যকারী। অতঃপর আমার উচিৎ বার বার চর্চার মাধ্যমে ব্যায়ামটা পুরোপুরি আয়ত্ত করা। মাঝে মাঝে বাবা বিরক্ত হয়ে এ’ও বলতেন “যদি তোমার মামাদের মতো বেঁটে-বাঁটকুল হয়ে থাকতে না চাও তাহলে আর ওই চার নম্বরকে অবহেলা করনা বাবা।”

একটা জিনিস বাবা নিজে রোজ খেতেন, আমাকেও খাওয়াতেন। সেটা হল সিদ্ধ ডিম। হাস-মুরগি ভেদ নেই। একটা হলেই চলতো। আমি কখনো-সখনো ডিমের অমলেট বা টুপা খেতে চাইলেই বাবা সিদ্ধ ডিমের যাবতীয় উপকারিতার লম্বা ফিরিস্তি শুনাতেন।

সেই সাথে সিদ্ধ ডিম এতদিন আমাকে কত কত ক্যালরি, কত ক্যালসিয়াম, কত আয়রন, ভিটামিন A B C D ইত্যাদি দিয়েছে সেগুলো স্মরণ করিয়ে দিতেন। তখন তাঁর মুখ দেখে বুঝা যেতো যে ডিম সিদ্ধর উপর আমার এই অকৃতজ্ঞতায় তিনি যারপরনাই ব্যথিত।

বাবা আর আমাদের মাঝে নেই। তবে তাঁর জ্ঞানের প্রভাব চিরন্তন ভাবে রয়ে গেছে আমার মাঝে।

আজ যখন আপনাদের আমার বাবার গল্প শোনাচ্ছি তখন পর্যন্ত আমি একমাত্র যে বইটি পড়েছি তা হল “তিনশত কবিতায় বঙ্গীয় বিবর্তন”, একমাত্র যে গানটা আমি গাইতে শিখেছি তা হল “বৈশাখে বলেছি তারে পৌষের কথা”, শরীর রক্ষার জন্য আজও আমি সেই একটা ব্যায়ামই করতে পারি- বেতারের চার নম্বর। আর বহুরূপী স্বাদ উৎপাদী ডিমের একটি মাত্র স্বাদের সাথেই আমার জিভ পরিচিত; সিদ্ধ ডিমের স্বাদ!


[রুশ গল্পের ছায়া অবলম্বনে]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০১২ রাত ২:২৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×