মেয়েবেলা! হুমম, একটা সময় পর্যন্ত আনন্দ হৈ হুল্লোড়ে কেটে যায়। তবে শিশুবেলাটি মেয়েবেলায় পরিণত হতে হতে অনেককিছু পরিবর্তিত হয়ে যায়, তখন মনে হয়, ছেলেদের যেমন ছেলেবেলা থাকে, আমাদের মেয়েবেলাও যদি তেমনই হতো! তেমনই কিছু মুহূর্ত নিয়ে পোস্ট!

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
১) মাঠে খেলা!
তখনো মনে মনে বাচ্চাই আছি। কিশোরি ব্যাপারটা মনে তেমন একটা পরিবর্তন আনেনি। বুঝিইনা সেসব কি! দিব্বি হেসে খেলে দৌড়ে বেড়াচ্ছি।
বড় ছুটিগুলো খুব মজায় কাটত। সকালে কয়েক ঘন্টা হাতের লেখা প্র্যাকটিস, গ্রামার প্র্যাকটিস, ঘড়িতে ১০ টা বাজা মাত্র মায়ের দিকে অনুনয়ের চোখে তাকিয়ে পারমিশন নিয়ে ছুটে যাওয়া কাজিনদের কাছে। দুপুর পর্যন্ত নানা দুষ্টুমি, ছাদের গাছ পালা দিয়ে রান্না রান্না খেলা, কম্পিউটার গেমস খেলা, আর বিকেলে মাঠে যেয়ে ক্রিকেট ফুটবল খেলা। সেসময়ে পাড়ার ছেলেরাও যুক্ত হতো।
কাজিনদের সাথে ডিল থাকত। এক বেলা ওরা আমার সাথে মেয়েদের খেলা খেলবে, আরেক বেলা আমি ওদের সাথে ছেলেদের খেলা খেলব। এই ডিল করে বাইরে বাইরে এমন দেখানো হতো যে আমরা তো পছন্দই করিনা ওপোসিট জেন্ডারের খেলাগুলো খেলতে। বাধ্য হয়ে খেলছি। কিন্তু আসলে আমরা সব রকমের খেলাই মজা করে খেলতাম, শুধু খেলা কেন খুব মজা করে গল্পও করতাম সবাই।
যাই হোক, এই রুটিনে অভ্যস্ত আমি সদ্য কিশোরিবেলার ছুটিতেও বেড়িয়ে গিয়েছি খেলতে। হুট করে জানালা দিয়ে মাকে দেখি ইশারা করে আমাকে ডাকছে। আমি বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে ইশারা করলাম পরে আসছি, মা তারপরে কাজের লোককে দিয়ে ডেকে পাঠাল।
আমি গেলাম ঘরে, ব্যাস সেই শেষ, আর মাঠে যাওয়া হয়নি।
এই ধাড়ী বয়সে আমি কোন সাহস ও বুদ্ধিতে ছেলেদের সাথে খেলতে গেলাম সেটা নিয়ে অনেক বকাঝকা হলো। মা বলল, পাড়ার অন্যকোন মেয়েকে তোর মতো বেড়িয়ে যেতে দেখেছিস? আমি খেয়াল করে দেখলাম, আসলেই তো লাস্ট কয়েকবছর ধরে তো যে দুএকটা মেয়ে মাঠে আসত তারাও আর আসেনা, আমিই একটি মেয়ে ছিলাম পুরো গ্রুপে! লজ্জায় পড়ে গেলাম!
সেদিন রাতে মায়ের বকা ও কথায় লজ্জায় এবং আবারো মাঠে যেতে না পারার দুঃখে খুব খুব কেঁদেছিলাম। আচ্ছা কষ্ট কিসের বেশি ছিল? আমি খেলতে যেতে পারছিনা সেটার? নাকি আমার ছেলে কাজিন, সাথীরা পারছে সেটার?
পরের বিকেলবেলা সবচেয়ে ক্লোজ কাজিনটা ডাকতে এলো, আমি জানালাম যেতে পারবনা।
ও বলল, "হে হে হারার ভয়ে আসেনা।" ও ভেবেছিল ক্ষেপালেই আমি টুপিটা পড়ে চলে আসব।
কিন্তু তেমন কিছুই হলো না দেখে ও খেলতে চলে গেল। জানালা দিয়ে আমি ওদের খেলা দেখতে লাগলাম, আর ওরা বারবার আমাকে ইশারায় যেতে বলল।
কয়েকদিন আমি আসলেই যাচ্ছিনা দেখে ও এক বিকেলে পাশে বসে গলা খাদে নামিয়ে বলল, "কি হয়েছে?"
ওর ছয়ের উচ্চারণটা খুব লাউড হতো, শুদ্ধ ছিলনা উচ্চারণটা। আমার এখনো ওর "কি হয়েছে?" বলাটা স্পষ্ট মনে আছে। কি চিন্তা, দরদ ছিল ওর কন্ঠে! সারাক্ষন আমাকে ক্ষেপিয়ে, জ্বালিয়ে মারা মানুষটা আমার এত কেয়ার করত সেটা সেদিন বুঝলাম!
আমি "কিছু হয়নি" বললাম, ও ভাবল কোনকিছু নিয়ে রাগ করেছি। বেশ অনেকদিন রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে করে বুঝে গেল একসময়ে, আমার না বলা উত্তরটি, "আমার মেয়েবেলা হয়েছে!"
২) চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া!
এটা খুব মজার একটা ইচ্ছে। আমি ছোট থেকেই ক্রিকেট ভক্ত। কোন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে যখন দেখতাম চায়ের দোকানে মানুষজন মজা করে ক্রিকেট দেখতে দেখতে চা খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, আমারো খুব ইচ্ছে করত! কিন্তু চায়ের দোকানে শুধু নানা বয়সের ছেলেদেরই দেখতাম, কিছু কিছু মেয়ে ফ্লাস্ক নিয়ে আসত চা নিয়ে যেতে। কিন্তু ওখানে বসে ওপেনলি আড্ডা দিতে দেখতাম না।
সমরেশের সাতকাহনে দীপাবলির চায়ের দোকানে চা খাওয়া নিয়ে রীতিমত ঝড় উঠেছিল, প্রতিবাদী মেয়েটি যা পেরেছিল আমি তা কোনভাবেই পারতাম না। মায়ের অন্যসব বকা গায়ে না লাগলেও, মা যখন নিচু স্বরে চোখ বড় বড় করে "ভালো দেখায় না, মেয়েদের সবকিছু মানায় না" ইত্যাদি বলত ভীষন একটা লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম। মায়ের সেই একেকটি বাক্য কত হাজার বাক্য যে লুকিয়ে থাকত! সেকারণে আমার জন্যে যে দেওয়াল পরিবার, সমাজ তুলেছিল, আমি নিজেকে তারচেয়েও ছোট চার দেওয়ালে বন্দি করতে শুরু করে দেই, যেন লজ্জায় পড়ার কোন আশংকাই না থাকে!
আমি চারিপাশ খেয়াল করে বোঝার চেষ্টা করতাম কোন কোন কাজগুলো অন্য মেয়েরা করছেনা, সেগুলো নিজেও করতাম না, কিন্তু কোনকিছুতে বাঁধা থাকলে সেসব কাজ করার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়। লাভের লাভ কিছুই হতো না, "ছেলে হলে কত ভালো হত" টাইপ ভাবনা আসত মাথায়!
৩) বৃষ্টিতে ভেজা - মুক্তি!
হুমায়ুন স্যারের একটি কথা পড়েছিলাম বহু আগে। সেটি ছিল, "মেয়েদের মেয়েবেলা থাকেনা। দশ বছর বয়স থেকেই তাদের নিজেকে রক্ষা করে চলতে হয়।"
একবার কাজিনরা সবাই মিলে বৃষ্টিতে ভিজছি ছাদে। মা খালা একটু পরে নিতে এলো, পরীক্ষা পরীক্ষা, জ্বর চলে আসবে ইত্যাদি বলে। আমরা তাদের কথা তো শুনলাম ই না, উল্টো তাদেরকেও টেনে নিলাম! তারা একটু রাগ দেখালেও বৃষ্টির স্পর্শে সব ভুলে গেল মনে হয়! আমাদেরকে ঘরে ফিরতে বললেও, তাদেরই পা যেন নড়ছিল না কোমল, শীতল জলের স্পর্শ পেয়ে! প্রশয়সূচক বকা দিচ্ছিলেন আমাদের, এবং হয়ত নিজেদের ছোটবেলা মনে করছিলেন আমাদেরকে দেখে! আমরাও মহা আনন্দে ভিজে যাচ্ছিলাম। লাফালাফি, নাচানাচি, বৃষ্টির ছড়া সবই চলছিল।
আমার জীবনের খুব সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটা ছিল সেটা নি:সন্দেহে। নানা কারণে আপনজনদের সাথে বেশি সময় আমি পাইনি জীবনে, যেটুকু পেয়েছি সেটুকু চোখে বসিয়ে নিয়েছি, মাঝেমাঝে মনে করে আবারো আনন্দের বৃষ্টিতে ভিজে যাই!
যাই হোক, এভাবে কিছুক্ষন চলার পরে হুট করে খালা অন্যরকম গলায় চিল্লিয়ে উঠল, "চল সবাই, এতক্ষন ধরে বলছি কারো কানে যাচ্ছেনা? বেয়াদব হয়ে গেছে সব।" এভাবে খালা কখনো বকত না, বকলেও আল্লাদ করে বকত। সেই তিনি আমার দুজন কাজিনকে তো একেবারে টেনে হাত ধরে নিয়ে গেল, আমাদেরকেও গরম চোখ দিয়ে ইশারা করল নিচে যাবার। আমার মাও তাই করল। আমি পুরো হতবাক হয়ে গেলাম, একটু আগেই তো এই দুজন সিনেমার হিরোইনদের মতো মিষ্টি হাসিতে বৃষ্টিতে দাড়িয়ে ছিল। হুট করে কি হলো?
আমরা কয়েকজন কাজিন মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। সবাই গোসল করে ভেজা জামা পাল্টে গোল টেবিল থুক্কু গোল কার্পেট বৈঠকে বসলাম। ড্রয়িং রুমের কার্পেটের ওপরে গোল হয়ে বসে ফিসফিসানি শুরু হলো। আমাদের কাজের আপুটা (সেও ভিজতে গিয়েছিল আমাদের সাথে) বলল, "আমি কিন্তু বুঝছি আফা, তয় কইতে পারুম না!" তাকে অনেক জোড়াজুড়ি করার পরে যেটা বের হলো সেটা হলো, পাশের বাড়ির জানালায় দাড়িয়ে থাকা এক লোক নাকি আমাদের দিকে "কিরাম নজরে" তাকিয়ে ছিল।
আমি তখন "কিরাম নজর" বিষয়টি বুঝতাম না, তবে এটুকু বুঝতাম যে বাবা, টিচার, ডাক্তার, আত্মীয় ছাড়া অন্যকোন পুরুষ খারাপ কারণেই তাকায়। এটা একটা নোংরা ব্যাপার। খালার বকার ঢংয়েও বুঝতে পারছি, সেই "কিরামটা" ভীষন খারাপ কিছুই ছিল। সেই লোকের রাগটাই আমাদের ওপরে ঝেড়েছিলেন তিনি। বিষয়টি বুঝতে পেরে শরীরে কেমন যেন ঘেন্না ঘেন্না লাগল। মনে হলো একটা পাপ হয়েছে, কিছু না জেনে বুঝেও সেই পাপের অংশ হয়ে গিয়েছি আমি, আমরা!
এরপর থেকে বৃষ্টিতে ভেজা সহ যেকোন প্রকার আনন্দের ব্যাপারে "রয়ে সয়ে" চলতে হবে, বেশি উচ্ছলতা দেখানো যাবেনা সেটা সবাই বুঝে গিয়েছিলাম। কেননা আপেলকে চাকুর ওপরে রাখা হোক অথবা চাকুকে আপেলের ওপরে, কাটতে তো আপেলকেই হয়!
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
হুমম, আমি জানি যে পুরুষেরও নিজস্ব সংঘাত আছে। তাদের জীবনটাও বেড অফ রোজেস না। আর সবকিছুতে নারী পুরুষ একেবারে সমান সমান হতে পারেনা। কিন্তু অনেক বৈষম্য আমরা এবসুলেটলি ফর নাথিং তৈরি করেছি। সেসব বৈষম্য একজন মেয়ের আত্মসম্মানবোধকে ছোট থেকেই মেরে ফেলে। আর ছেলেদের মনেও একধরণের হাইয়ার অথোরিটি টাইপ ভাব গেঁথে দেয় ছোট থেকেই। মেয়েদের অনেক আগেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তুমি মেয়ে, এই অপরাধে তোমাকেই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে, কেউ যদি তোমার দিকে খারাপ চোখে তাকায় তোমার দোষ, কেউ তোমাকে নিয়ে বাজে কথা বললে তোমার দোষ। সবকিছুতেই তোমার দোষ। ভুল তোমার তরফ থেকে হলে তোমার দোষ, ভুল সামনের তরফ থেকে না হলেও তোমার দোষ কেননা তুমি ঠিক থাকলে তো ছেলেটি ভুল করত না!! তোমার ভুলগুলো পাপ, আর পুরুষের পাপগুলো ভুল! হাহা।
যদিও দেশীয় সমাজ অনেক পাল্টেছে, লিস্টে যা লিখেছি তার মধ্য দিয়ে হয়ত আজকালকার নব্য কিশোরিরা যাচ্ছেনা, অথবা যাচ্ছে অনেকক্ষেত্রেই!
তাই আমি এই পোস্টে পুরুষ ব্লগারদের পাশাপাশি নারী ব্লগারদের মূল্যবান মন্তব্য চাই। একেক পরিবারের নিয়মনীতি একেকরকম। কেমন ছিল আপনাদের মেয়েবেলা? কোন বৈষম্য কি ফেস করেছেন? নাকি করেননি? সেসব কি আপনার বড়বেলার ওপরে ছোট বড়, ভালো মন্দ কোন প্রভাব ফেলেছে?
লেটস গেট ইনটু এন ওপেন, হনেস্ট ডিসকাশন। তাহলে আমাদের সামনের জেনারেশনটা অন্তত ছেলেবেলার মতোই একটা মেয়েবেলা পাবে!
ছবিসূত্র: অন্তর্জাল!
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৮:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



