পয়লা বৈশাখের দিন বিকেল পাঁচটার পর থেকে উন্মুক্ত স্থানে কোনো প্রকার কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান করা যাবে না। ১৩ এপ্রিল সকাল ছয়টা থেকে ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। আর রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল সাড়ে চারটার পর প্রবেশ করা যাবে না।
সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্তারা এ আদেশ জারি করেছেন। তাদের ভাষায় বিগত দিনগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে এবারের আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি সাজানো হয়েছে। নববর্ষ উদ্যাপনের লক্ষ্যে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রসরোবর, হাতিরঝিলসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন।
পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালীর ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো এবং সার্বজনীন একটি উৎসব। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য এ দিনে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে যোগ দেন। এ দিনে মানেনা বয়সের ব্যবধান। ছেলে-বুড়ো, কন্যা, বৃদ্ধা সকলেই কমবেশী এ দিনটিতে আনন্দ করার চেষ্টা করে। একবারে দরিদ্রতম লোকটির বাগিতেও এ দিনে বিশেষ কিছু রান্নার আয়োজন করা হয়। ভোর থাকতেই সবাই ঘুম থেকে উঠে বারনী বা মেলায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করে। আলতা, চুরি কেনার পাশাপাশি গিন্নীর জন্য পিঠা বানানোর নেহাৎ একটি কড়াই হলেও কেনা হয় এ দিনে। শিশু কিশোররা এ দিনে নানা আনন্দ আয়োজনে মেতে থাকে। নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাড়ার ছেলেরা চাদা তুলে মাইক ভাড়া করে বাড়ীর মেয়েদের শাড়ী জোড়া দিয়ে চাদোয়া বানিয়ে নিজেদের মতো করে নাটক, যাত্রা পালা বা সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ উৎসব।
বাঙ্গালীর এ প্রাণের উৎসবে আজ ধর্মের লেবাস পড়া এক ভয়ানক দৈত্য বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। তাদের ভাষায় এসব উৎসব আয়োজন করা যাবে না। মধ্যযুগ থেকে চলে আসা এ উৎসবে হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা আসাটা খুব একটা আনন্দদায়ক সংবাদ হতে পারে না।
জানা যায় সাংগঠনিক কোন ভিত্তি না থাকা পরও আওয়ামী ওলামা লীগ নামক এক ভুইফোড় সংগঠন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পালনে নিজেদের ফতোয়া জারি করেছে। সে ফতোয়ায় সরকার বাহাদুর শংকিত হয়ে বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসবে নানা বিধি নিষেধ দিয়েছে। প্রানের উৎসব যদি নিশ্চিন্ত মনে, প্রান খোলে না করা যায় – তাহলে কি উৎসবের মজা পাওয়া যায়? যারা নিরাপত্তার জন্য হুমকি তাঁদের কিছুই করতে পারছে না – সাধারন আমজনতার উৎসব পালনে বিধি নিষেধ আসতেছে – এই বিধিনিষেধগুলি প্রকারন্তে যারা বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে না তাঁদের প্রাথমিক জয় বলেই ধারণা করা হয়।
এদের বিষয়ে পুলিশ কর্তা বলেছেন, ‘এ উৎসবটা জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে একটা উৎসব। নির্ভয়ে মানুষ যেন আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা শুধু বাইরে অনুষ্ঠান করা নিষেধ করেছি।’ আবার ওলামা লীগের পয়লা বৈশাখ নিষিদ্ধের দাবি প্রসঙ্গে কমিশনার বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ অনেকে অনেক কথাই বলবে। সব কথায় কান দেওয়া যাবে না।
এখানেই কবি নীরব। গণতান্ত্রিক দেশে অনেকেই অনেক কথা বলবে। আবার তাদের কথায় কান দেয়া যাবে না। এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি তাদের ভয়ে ভীত হয়ে নন্দলালের মতো ঘরে বসে থাকলেও হবে না।
পুলিশ কর্তার মুখে এ বানী বা নিষেধাজ্ঞা শুনে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় বাংলাদেশ ক্রমে পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। দেশে জঙ্গী নেই বলে প্রচার করে ওলামা লীগের জঙ্গীদের ভয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের সময় বেধে দেয়ার মাধ্যমে সরকার কি প্রমান করতে চাইছে?
নিরাপত্তা দিতে না পারলে দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করুন। স্বার্বজনীন একটি উৎসবকে বাঁধাধরা নিয়ম করে কখনো আটকানো যাবে না। এটি তারূন্যের উৎসব। তারূন্যকে কোন অজুহাতে বেঁধে রাখা উচিত নয়। বরং যুক্তি ও সুন্দর আচরন দিয়েই তাদের বুঝাতে হবে। বাঙ্গালীর স্বার্বজনীন এই বর্ষবরণ উৎসব বাঁধাহীন চলতে দেয়া উচিত। যারা ধর্ম পালন করবে তারা অবশ্যই তাদের ধমীয় বিধি নিষেধ মেনেই উৎসব করে। আর যারা ধর্ম মানে না তাদেরকেও জোর করে ধর্মে র পথে আনা যাবে না। বখাটে ও সন্ত্রাসীদের দমন করতে না পারলে সেটি সরকার ও সরকারী বাহিনীর ব্যর্থতা। এ জন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রন করা উচিত নয়।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


