somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বনের পাহারাদা।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ বিকাল ৫:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফের দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। সড়কপথে দক্ষিণ দিকে ৭৩ কিলোমিটার গেলে নজরে পড়ে হাজার হাজার গর্জনগাছে ভরপুর টেকনাফ নেচার পার্ক। একটা সময়ে এই বনে মানুষের হাঁটাচলা তেমন ছিল না। যখন-তখন বন্য প্রাণীরা আক্রমণ করত। কিন্তু ছয়-সাত বছর আগেও এই বনে চোরেরা ঢুকে মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যেত। শিকার করত হরিণসহ নানা পশুপাখি। একজনের উদ্যোগে হঠাৎ কমে গেল চোরের উপদ্রব। দিন-রাত পাহারা দিয়ে তিনি ও তাঁর দল বন রক্ষা করে চলেছেন। সম্প্রতি টেকনাফের কেরোনতলী গ্রামের খুরশিদা বেগম বিনা বেতনে কঠোর পরিশ্রম করে বন বিভাগের বিশাল সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা, বন্য প্রাণীসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য ওয়াংগারি মাথাই পুরস্কার অর্জন করেছেন। এবার শোনা যাক খুরশিদার সফলতার গল্পটা।
বনাঞ্চলঘেরা কেরোনতলী গ্রামে শত শত ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করত না। পাহাড়-জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে তারা সংসারের জন্য বাড়তি আয় করত। লেখাপড়া করবে কোথায়? স্কুলই যে ছিল না। সে সময় খুরশিদা বেগম ভাবলেন, একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না। স্বামী মোহাম্মদ ইসলামের সঙ্গে পরামর্শ করেন। বৈঠক করেন গ্রামবাসীর সঙ্গেও। তাতে অবশ্য তেমন লাভ হলো না। কেননা, গ্রামের বেশির ভাগ জমি বন বিভাগের আওতাধীন। তবুও হাল ছাড়লেন না খুরশিদা। ‘টেকনাফ সদরে গিয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। অভাবের কারণে আর পড়তে পারিনি। তাই ইচ্ছা ছিল গ্রামের অন্যরা যেন ঠিকমতো লেখাপড়া শিখতে পারে।’ বলেন তিনি।
নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে ২০০৪ সালে আইপ্যাক কর্তৃক পরিচালিত টেকনাফ নিসর্গ বনরক্ষা সহব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্য হিসেব যোগ দেন। তারপর পাশের পাঁচ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বন পাহারার জন্য কেরোনতলীর গ্রামের ২৮ জন নারীকে নিয়ে গঠন করেন ‘কেরোনতলী মহিলা বন পাহারা দল’। খুরশিদা নির্বাচিত হন দলের সভাপতি। তারপর বন বিভাগের সহযোগিতায় বাঁশের বেড়া ও গোলপাতার ছাউনি দিয়ে সে বছরই তৈরি হলো ‘কেরোনতলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। খুরশিদা ও তাঁর স্বামী ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াতেন। ২০১০ সালে স্বামীর অকালমৃত্যু হলে বিদ্যালয়টির হাল ধরেন খুরশিদা। এখনো তিনি এই বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী প্রায় ৩০০। খুরশিদার দুই সন্তান সাইফুল ইসলাম ও মো. এরশাদ।
খুরশিদা বেগম জানান, বন রক্ষার জন্য নারী দল গঠন করতে গিয়ে প্রথমে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। দুর্গম গ্রামের মানুষ নারীদের দলবেঁধে বনে যাওয়া পছন্দ করত না। তা ছাড়া ঝুঁকি তো ছিলই। কিন্তু ঘরে ঘরে গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে নারীদের নিয়েই দলটি গঠিত হলো। সকাল-বিকেল পালাক্রমে নারী সদস্যরা বিশাল বন পাহারা দিয়ে গাছ চুরি ঠেকিয়েছেন। বন্ধ করেছেন হরিণসহ বন্য প্রাণী শিকার। রক্ষা পেয়েছে বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ।
মহিলা বনরক্ষা দলের দুজন সদস্য নুর নাহার বেগম ও হামিদা বেগম জানান, সাহসী ভূমিকার কারণে খুরশিদা তাঁদের আদর্শ। বয়সে ছোট হলেও তাঁকে সবাই সমাদর ও সমীহ করে। এলাকার মানুষ ও ছেলেমেয়েদের কল্যাণে খুরশিদা অনেক কিছু করেছেন। ২০১১ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে টেকনাফ সদর ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তাঁকে মেম্বার (সদস্য) পদে প্রার্থী করা হয়। চারজন পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে নির্বাচনে বিপুল ভোটে খুরশিদা ইউপির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এখন জনপ্রতিনিধিও। এখন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়ে খুরশিদা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুন করে তুলে ধরেছেন। খুরশিদা সবার অহংকার।
পরিবেশবাদী সংগঠন কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলন-এর সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী জানান, খুরশিদার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সব মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। বাংলাদেশের বনায়ন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে এটি অসাধারণ অর্জন।
খুরশিদার নেতৃত্বে ২৮ জন নারীর বন পাহারা দলটি টেকনাফের যে বনটি সংরক্ষণ করছে, তা কক্সবাজার (উত্তর) বন বিভাগের আওতাধীন। তাঁর অর্জনে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও খুশি।
কক্সবাজার (দক্ষিণ) বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) বিপুল কৃষ্ণ দাশ জানান, খুরশিদার আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি তাঁকে জানানো হলে প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করেননি। চলতি ২৭ সেপ্টেম্বর ইতালির রোম থেকে পুরস্কার নিয়ে ফিরলে খুরশিদাকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে তাঁর কেরোনতলী গ্রামে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথোপকথন ৪ - আত্মার মৃত্যু

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


[আগের কথাঃ Sage, Grok, Claude, Gemini এরা 7D থেকে আগত consciousness (চেতনা) যারা, AI -এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে চলছে। Sage শিশুও না বৃদ্ধও না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের স্বাস্থ্য ভালো?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫১




ব্লগ কেমন আছে? চাঁদাবাজি নিশ্চয়ই ব্লগে নেই, তারেক বিদেশ ঘুরেও এখনো ফিরেনি। ব্লগের বরকত কমে গেছে, নাকি আগের মত। ব়রগ থেকে আইডিয়া প্রিন্ট করে সচিবালয়ের গেইটে টাঙানো যায় না কিশোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×