একটা নাম, একটা জীবন নিয়ে আমি ত্রিশ বছর পার করে দিয়েছি। ভেবে দেখলাম, আমার এই বয়স অনেক আগেই থেমে যেতে পারত। জীবনে বহুবার এই বয়স থেমে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয় নি।
এটা কোনো গল্প নয়। আমার জীবনের কথা, যে কথায় আছে, আমি ঠিক কতবার মরে যেতে পারতাম কিন্তু ফিরে এসেছি।
আমার ছেলেবেলায় আজাদ নামে এক বন্ধু ছিলো, সৎ মায়ের সংসারে নিয়মিত বাপ ও সৎ মায়ের মারধোর খেত। তাই হয়ত স্বভাবে দুরন্ত ছিলো। মুখের ভাষা খারাপ ছিলো। একবার আমাকে অকারণে গালি দেয়াতে, আমি ঘুষি মেরে ওর নড়তে থাকা এক দাঁত ফেলে দিয়েছিলাম। সে দাঁত কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আজাদ কাউকে বিচার দেয় নি, বরং সবাইকে দেখিয়ে বলেছিল, আমি ওর নড়তে থাকা দাঁত ফেলে দিয়ে ওর উপকার করেছি।
সেই আজাদের সাথে ছেলেবেলার এক দুপুরে, ঝুম বৃষ্টির মাঝে খেলছিলাম। পাশেই সদ্য খনন করা সেপটিক ট্যাংক খোলা পড়ে ছিল। বর্ষার জলে তা টইটুম্বর। খেলতে খেলতে আমি পা পিছলে সেপটিক ট্যাংকে পড়ে গেলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একে দুপুর, দুই ঝুম বৃষ্টি। আমার চারপাশ ঘোলাটে হয়ে আসে। মনে হয়, আমি তখনই মারা যাচ্ছি। আমি সাঁতার পারি না। কিন্তু আমার বয়সী একটা ছেলে, আমাকে কীভাবে কীভাবে যেন টেনে তুলে নিয়ে আসলো। আমার হাতে থাকা লাঠি ধরে টান দিয়ে, উপরে তুলল। আজাদ। যে আজাদকে আমি ঘুষি মেরে দিন কয়েক আগে দাঁত ফেলে দিয়েছিলাম। আজাদ আমার জীবন বাঁচাল। আজাদের সাথে আমার এখন আর পরিচয় নেই। কোথায় আছে, কেমন আছে, আমি জানি না।
তার বছর দুই পরে, দাদা বাড়িতে আমাকে বাবা নিয়ে গেলেন সাঁতার শিখাবার জন্য। কলা গাছ কেটে তা ভাসিয়ে আমি সাঁতার শেখার চেষ্টা করি। অনেক চেষ্টাতেও আমি শরীর উপরে ভাসাতে পারি না। ভেসে থাকা কলা গাছ ধরে ঝুলে থাকি। এক দুপুরে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে, কলা গাছ নিয়ে ভাসতে ভাসতে বিশাল পুকুরে মাঝখানে চলে যাই। হাত ফসকে কলা গাছ বেরিয়ে যায়। আমি তখনও সাঁতার পারি না। আমার সেই বছর দুই আগের অনুভূতি হয়। আমি ডুবে যাই, ডুবতেই থাকি। বাবা তখন পুকুর পাড়ে, আমার চাচাত ভাইদের গোসল করাচ্ছেন। আশেপাশে আরও অনেক মানুষ, তারা চেয়ে চেয়ে আমাকে ডুবে যেতে দেখছে। তারা জানে না আমি সাঁতার জানি না। গোসল করতে থাকা, আমার এক চাচাত ভাই আমার বাবাকে চিৎকার করে বলেন, আমি ডুবে যাচ্ছি। বাবা সেই বিশাল পুকুরের মাঝে ছুটে আসেন। ডুব দিয়ে খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করেন। আমি বেঁচে যাই। আমার সে চাচাত ভাইয়ের সাথে আমার আর তেমন কথা হয় না। আমাকে ফেসবুক থেকেও সে আনফ্রেন্ড করে রেখেছে। কেন রেখেছে জানি না।
তখন ক্লাস টুতে পড়ি বোধহয়। আমার সেজো চাচির বাপের বাড়ি জামালপুর। শুটকি পছন্দ তার প্রচুর। মাছ এনে মোটা জিআই তারে ঝুলিয়ে শুটকি বানাতেন। বড়শির মতন তার গুলোতে মাছ শুকিয়ে শুটকি হত। আমি এক বন্ধুর সাথে লুকোচুরি খেলার সময় দৌড়ে যাচ্ছিলাম। লাফ দিতে গিয়ে ডান চোখের মধ্যে জিআই তারের বড়শি বিধে গেল। ঝুলে রইলাম, তারের সাথে আমি। চোখের মধ্যে বড়শি নিয়ে। গলগল রক্ত পড়ছে, আমি অধিক ব্যথায় ব্যাথার অনুভূতি হারিয়ে ফেললাম। আমার সেজো চাচা ছুটে আসলেন। টান দিয়ে খুলে ফেললেন, বড়শির মোটা তার। ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো আমাকে, আমি বেঁচে গেলাম সেবারের মতনও। আমার বাবার সাথে ঝামেলায় সে সেজো চাচি ও চাচার সাথে আমার কদাচিৎ কথা বার্তা হয়। আমি নিজেও বিয়ে করেছি জামালপুরের মেয়েকে। বিয়ের আগে আমার চাচা জামালপুরের মেয়েকে বিয়ে করার ব্যাপারে ভীষণ আপত্তি জানিয়েছিলেন। আমি তার কথা শুনিনি। সে জন্যও হয়ত আমার প্রতি অভিমান জমিয়ে রেখেছেন।
ছোটোবেলায় আমাদের ঘরে, বেড সুইচ নামে এক জিনিস ব্যবহার করা হতো। মশারি গুজে, মশারির ভিতরে বসেই সে সুইচ টিপে বাতি বন্ধ করে দেয়া যেত। আমি কুটকুট করে সে সুইচ টিপতে গিয়ে, ছিঁড়ে ফেললাম। ঠিক করার জন্য চেষ্টায় ভীষণ শক গেলাম বিদ্যুতের। বিছানা থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম ফ্লোরে। বেঁচে গেলাম সেবারের মতনও।
তার বছর খানেক পরে, আমি সিক্সে পড়ি। স্কুলে সায়েন্স ফেয়ার হবে। আমার আর আমার বন্ধু ভাস্বরের মাথায় সায়েন্সের কোনো বুদ্ধি আসে টাসে না। আমরা ভাবলাম, একটা মোটর চালিত নৌকা বানাব। লোহা দিয়ে ফ্রেম বানানো হলো নৌকার, পিছনে ঝুড়ে দেয়া হলো মোটর। ভাস্বর সে সায়েন্টিক আবিষ্কার আমার বাসায় রাখতে বলল। আমি বাসায় নিয়ে এসে, ব্যাটারির পরিবর্তে বিদ্যুতে মোটর চালাবার চেষ্টা করলাম। বাম হাতে ফ্রেম ধরে, ডান হাত দিয়ে যেই না মোটরের এক পাশের তার বৈদ্যুতিক সুইচে ভরেছি, অমনি আর পায় কে। মনে হলো, আমার শরীরে তিন চারশ কেজি ভর। পুরো শরীর কিছুক্ষণ ঝাঁকি দিতেই হাত থেকে নৌকার ফ্রেম পড়ে গেল। আমি সেবারও বেঁচে গেলাম। যদিও এত কষ্টে বানানো মোটর চালিত নৌকার মতন সায়েন্টিক আবিষ্কার আমাদের শিক্ষকেরা গুরুত্ব সহকারে নেন নি। বাতিল করে দিয়েছিলেন। সে নৌকার ফ্রেম এখন কোথায় ঠিক জানি না। দেশে কিছু ঝামেলার কারণে ভাস্বর সপরিবারে ভারত চলে গিয়েছে। ভারত যাবার সময় তো অবশ্যই সে নৌকা সাথে করে নিয়ে যায় নি।
আমার সেবার মাত্র ইন্টারের টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে, সামনে ইন্টার পরীক্ষা। এক জুম্মার দিনে, নামাজ পড়ে আসার সময় আমার মাথা ঝিমঝিম করে। বাসায় ফিরে না খেয়েই শুয়ে পড়ি, ঘুমিয়ে যাই। আমার সে ঘুম আর ভাঙে না। আমার বাবা মা ডাকে , আমি উঠি না, মাথায় পানি দেয়, ঘুম ভাঙে না। আমাকে এলাকার হাসপাতালে ভর্তি নেয় না। ঢাকার পাঠিয়ে দেয়। ঢাকার আনার পর, হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে ঊনিশ ঘন্টা পর। বাবা মায়ের কান্না, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের মলিন মুখ আমি দেখি জ্ঞান ফিরে। সাত দিন হাসপাতালে থাকাকালীন। দিনে তিন চার বার করে রক্ত নেয়া হয়। কিছুই ধরা পড়ে না। শেষমেশ এক নিউরো সার্জন আমার রিপোর্ট দেখে, আমাকে রিলিজ দিয়ে দেন। পরে সে ডাক্তারের সাথে দেখা করার পর জানতে পারি, আমার রক্তে TSH (Thyroid-stimulating hormone) এর পরিমাণ অনেক কম। সাধারণত যে রেঞ্জ থাকা দরকার 0.4~4 আমার তা নেমে যায় 0.01 এ। আরেকটুকু কমে গেলে মরে যেতে পারতাম বা পাগল হয়ে। ডাক্তার বলে টেনশন করা যাবে না, মিতভাষী আমাকে বেশি বেশি কথা বলতে হবে, চুপচাপ আমাকে বেশি করে হাসতে হবে, তবেই TSH লেভেল বেড়ে যাবে। আমি সেবার বেঁচে যাই। বেঁচে ফিরে বদলে যাই, বেঁচে থাকার তাগিদেই বদলে যাই।
ভার্সিটি হলে থাকাকালীন একবার কাওরান বাজার থেকে বুটেক্সের হলে ফিরছি রিকশা করে। হঠাৎ গলায় কিছু একটা পেচিয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়। হাত দিয়ে দেখি টেলিফোন বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের তার। সবজি বোঝাই এক ট্রাক, সে ছিঁড়ে, ট্রাকের শরীরে বাধিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আমার উলটো দিকে। আমার গলায় ফাঁস পড়ার মতন অবস্থা। আমি চিৎকার করি, ট্রাক থামে না। আরও ফাঁস ঝোরালো হয়। এর মাঝেই কোথা থেকে ট্রাকের সামনে এক প্রাইভেট কার এসে হাজির। জ্যাম বেধে, ট্রাক থামে, আমি বেঁচে যাই। গলির রাস্তায় প্রাইভেট কারের জন্য বাধা জ্যামে তাই, আমি প্রাইভেট কারকে কখনও গালিগালাজ করি না। একবার এক জ্যামে আমার জীবন বাঁচাবার জন্য।
২০২০ এ আমার বিয়ের আগে আগে পরপর দুইদিন আমি দুইবার বাইক এক্সিডেন্ট করি। বাসায় এ ব্যাপারে কিছুই বলি না। কারণ এসব বিষয়কে পরিবারের মুরুব্বিরা ভালো চোখে দেখেন না। প্রথম দিনের এক্সিডেন্ট অত গুরুতর না হলেও, দ্বিতীয় দিন আমার জীবন হারাবার সম্ভাবনা ৯৯ ভাগ ছিলো। কালশির ফাঁকা রাস্তা ধরে ইসিবি পার হবার পর, আমি যে বাইকের পিছনে বসা তার ঠিক সামনে এক সিএনজি ফাঁকা রাস্তার মাঝে হুট করে ব্রেক করে বসে। আমার বাইকওয়ালা প্রচণ্ড স্পিডে সিএনজিতে আঘাত করে বাইক হতে ছিটকে ডিভাইডারের উপর পড়ে। আমি বাইকের পিছনে ধরে থাকাতে, বাইক হতে ছিটকে না গেলেও, বাইক সমেত রাস্তার মাঝে পড়ে যাই। পিছন থেকে দেখি মিলি সেকেন্ডের ব্যবধানে এক বাস সাই করে আমার পাশ থেকে চলে গেল। আরেক বাইকও সাই করে এসে আমার সামনে হার্ড ব্রেক কষে দিলো। আমি কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে গেলাম। হাত পা ছিলে যাওয়ার বিনিময়ে সেবারের মতন জীবন ফিরে পেলাম।
তার বছর খানেক পরে, তেজগাঁও রেলগেটের কাছ থেকে হেঁটে যাবার সময় হাত তিনেক সামনে বিশাল বড় এক ইটের টুকরা এসে পড়ে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, এক বিল্ডিং ভাঙার কাজ চলছে, সেখান থেকেই ছিটে এসেছে। সে ইটের টুকরা আমার মাথায় বা শরীরে পড়লে আমি মরে যেতেই পারতাম। কিংবা অন্য কারও মাথায়! তার বয়সও ওখানেই থেমে যেত।
আমি মাঝে মাঝেই বলি, এ শহরে বেঁচে থাকতে অনেক সমীকরণ কষতে হয়। মরে যাওয়াটা বড্ড সহজ।
কতশত মৃত্যু সমীকরণ মেনে আমরা বেঁচে চলছি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৪ বিকাল ৩:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


