somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: বিষাদানন্দ

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নিরবিচ্ছিন্ন এই দুঃখের শহরে, আমার বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাধ্যমে, জীবনে আরেকটা দুঃখ এসে যোগ হলো। বিদ্যুৎ নেই মানে বাতি জ্বলে না, রাতের বেলা খেতে বসে বাতি ছাড়া খাওয়া যায় না। আলোর জন্য মোমবাতি লাগবে, মোমবাতি জ্বালাতে দরকার ম্যাচের কাঠি। আমি বিড়ি সিগারেট খাই না, বাসায় তাই ম্যাচ থাকে না। গত এগারো মাস বাসা ভাড়া দিতে পারি না, বাড়িওয়ালাকে বলতেও পারি না, ভাড়া দিয়ে থাকি, বিদ্যুৎ কেন থাকবে না?
একটা দুই টাকা নোট আমার আট বছরের ছেলেকে ধরিয়ে দিয়ে বলি, “যা বাবা, একটা ম্যাচ কিনে নিয়ে আয়।”
আমার ছেলে কফিল দুই টাকার নোট নিয়ে, লাফাতে লাফাতে চলে যায়। সাত তলা হতে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নামার সময়, লাফাতে লাফাতে পা ভেঙে ফেলে। আমাদের আর ভাত খাওয়া হয় না, আলো জ্বালা হয় না, জীবনে দুঃখের আরেকটা অন্ধকার নেমে আসে।

কফিলকে নেয়া হয় হাসপাতালে, ওর মাকে রেখে আমি ফিরে আসি বাসায়। ছয় তলায় থাকা বাড়িওয়ালার ঘরের সামনে বড়সড় জটলা। সব জায়গায় বিদ্যুৎ আছে, আমাদের বাসায় নেই কেনো, এ জবাব বাড়িওয়ালাকে দিতেই হবে। সবাই ভাড়া দিয়ে থাকে, আমার মতন নয়। আমার ছেলে পা ভেঙে হাসপাতালে, এই খবর এরা জানে না; জানে শুধু তাদের ঘরে আলো নেই। কত সহজে আমরা নিজেদের হাজার স্কয়ার ফিটের দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে ফেলছি, জোরে চিৎকার করলেই শোনা যাবে, এমন দূরত্বে থাকা মানুষজনেরও বেদনা, কষ্ট আমাদের ছুঁয়ে যায় না কিংবা হাওয়ায় উড়ে আশেপাশেও আসে না।
পরিচিত মানুষজনের ঝগড়ায় আপনাকে একটি পক্ষ বেছে নিতেই হবে, যে পক্ষ আপনাকে সুবিধা দিবে, সে পক্ষ বেছে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি বাড়িওয়ালার পক্ষ নিয়ে সবাইকে জানান দেই, আমাদের বাসার মেইন মিটারে সমস্যা, কালকে লোক আসবে।
কে কী বুঝল, কে জানে? জটলা ধীরে ধীরে পাতলা হলো, আমার বাড়িওয়ালা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল।

বাড়িওয়ালা জামান সাহেবের ঘরে আমি কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকি। জামান সাহেব জানতে চান, “ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে গেছ?”
আমি আস্তে আস্তে মাথা নাড়ি। আমার ছেলের পা ভাঙাতে যতটুকু কষ্ট হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি বেদনা চোখে মুখে ফুটিয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে মাথা নিচে ঝুঁকিয়ে রাখি। জামান সাহেব কী বলবেন, ভেবে পান না। এই নীরবতা ভাঙার জন্য অথবা আমার বিমূর্ত ভাব কাটাবার জন্য অগত্যা জামান সাহেব বলেন, “কুদ্দুছ মিয়া, টাকা লাগবে?”
আমি ধীরে সুস্থে মাথা তুলে এমনভাবে তার দিকে তাকাই, যেন তিনি এই মুহূর্তে যে কথাটা বলেছেন, তা বলতে আমি সংকোচবোধ করলেও, শুনতে আমি ঠিকই চাচ্ছিলাম।
জামান সাহেব আমার হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন। বলে গেলেন, তিনি নিজেও ভীষণ টানাপোড়নে চলছেন, ছেলে সুস্থ হলে যেন আমি বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে দেই।
এই কথাটা তিনি এই মুহূর্তে না বললেও পারতেন। তার কাছ থেকে অর্থলাভের কারণে আমার মধ্যে যে কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নিয়েছিল, তা নিমিষেই ফিকে হয়ে গেলো কিছুটা, আমি তা চাইনি।

গত মাসেই আমি কথা দিয়েছি, এগারো মাস কোনোভাবে বারো মাস হবে না। জামান সাহেবের বাড়ি নাম্বার সাতচল্লিশ। সাত আর চার যোগে এগারো। এগারো মাসের বেশি আমি বিনা ভাড়ায় থাকব না। যদিও একই রকম যুক্তি দিয়েছিলাম, চার নাম্বার মাসে ও সাত নাম্বার মাসে। জামান সাহেব তাই আমাকে দেখলে মাঝে মাঝেই বলেন, “কুদ্দুছ মিয়া, বাড়ি নাম্বার যেন যোগ পর্যন্তই যেন থাকে। গুণের দিকে জিনিসটারে নিয়ে যাইও না।”

বাসা ভাড়া আমি কবেই শোধ করে দিতাম। আমি অশিক্ষিত না, মোটামুটি পড়াশুনা করেছি। চাকরি বাকরি না পেলে আমার কী দোষ? চাকরি বাকরি না পেয়ে, যে কাজ গুলো করতে শিক্ষিত হবার প্রয়োজন নেই, তা আমি অনায়াসে করেছি, অকর্মণ্য হয়ে ঘরে বসে থাকিনি।
মানিক মিয়ার চায়ের দোকানে কাজ নিলাম। মানিক মিয়া মাথা গরম মানুষ। কথায় কথায় ঝাড়ি ঝুড়ি দেয়, দোকান থেকে কাজ বাতিল করে দেয়। আমার সিগারেট দিতে দেরী হলে, চা দিতে দেরী হলে ঝাড়ি। ঠান্ডার বোতলের মুখা খুলতে দেরী হলে ঝাড়ি। সবচেয়ে বড় ঝাড়িটা খাই, টাই কোট পরা ভদ্রলোকগুলোর জন্য। এরা দোকানের নিয়মিত কাস্টমার। দোকানে এসে বলে, সিগারেট দেন কিংবা তিন আঙ্গুল বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তিন আঙ্গুল বাড়ানো দেখে না হয় ধরে নিলাম আমি, এরা সিগারেট চাচ্ছে। কিন্তু সিগারেটের নাম তারা ভুলেও মুখে উচ্চারণ করে না। সে এই দোকানে নিয়মিত আসে, মানে সে কোন সিগারেট খায় তা আমার জানা থাকতে হবে। আমার ধারণা এই তিন আঙ্গুল বাড়িয়ে দেয়া কিংবা সিগারেটের নাম উচ্চারণ না করা, তাদের মাঝে নিজেকে দোকানের অন্যদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবার একটা অনুভূতি এনে দেয়। মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালোবাসে।
আমি যাবতীয় সবার সিগারেট ব্রান্ডের নাম কেন মুখস্থ রাখতে পারি না, তা নিয়েও মানিক মিয়ার কাছে ঝাড়ি খাই। যতক্ষণ মানিক মিয়া দোকানে থাকে, আমার বিড়ালের মতন মিউমিউ করতে হয়। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডার বোতল বের করতে আমার যে সময় লাগে, বুড়া মানিক মিয়ার তার চেয়ে বেশি সময় লাগে। তবু আমার মেনে নিতে হয়, মানিক মিয়া ফার্স্ট, কুদ্দুছ মিয়া লাস্ট।

কাওরান বাজারের সে দোকান চব্বিশ ঘন্টা খোলা। একদিন মানিক মিয়া আমাকে বলে, রাতে কাজ করতে রাজি আছি কি-না? এক পুরাতন কর্মচারি টাকা চুরি করে পালিয়েছে। সব চ্যাংড়া, চোংড়া ছেলে রাতে, ওদের দেখে শুনে কাজ করাতে হবে। বেতন মাসে তিনশ টাকা বেশি।
আমি নিবিড়ভাবে চিন্তা করে দেখলাম, এই প্রস্তাব আমার রাতের ঘুম আর স্ত্রীসঙ্গ ব্যতীত, যাবতীয় সব বিষয়ে লাভবান করবে। ঐ দুটি বিষয় দিনেও সম্ভব। আমি রাজি হয়ে যাই। রাজি হয়ে, বিড়াল থেকে বাঘ বনে যাই। রাতের শিফটের কর্মচারীদের উপর খবরদারি করি। মুখে সবসময় একটা ভারিক্কি ভাব ফুটিয়ে রাখি। নিজেকে দোকানের মহাজন “মানিক মিয়া” বলে মনে হয়। এক দুইবার চ্যাংড়া চোংড়াকে এক আধটা চড় থাপ্পড় মারি। ওরা অবশ্য আমাকে মান্য করে। এসবে রাগ করে না।
মানিক মিয়ার দোকানে, কুদ্দুছ মিয়ার নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, ‘রাতের বেলা কেউ সিগারেট খাইতে চাইলে সিগারেটের নাম বলতে হবে। আঙ্গুল দেখানো চলবে না, হু হা চলবে না, ইশারা চোখা টিপাটিপি চলবে না।’

আমার সুখের দিন বেশি স্থায়ী হয় না। কোনো এক শুক্রবার রাতে, হ্যাংলা পাতলা, সদা নেশা করে রকম এক ছেলে এসে আমার কাছে ইশারায় সিগারেট চায়। আমি জোর গলায় বলি, “কী চাই?”
“সিগারেট দে।”
আমাকে তুই তুকারি করাতে মাথা গরম হয়ে যায়। আমার চেয়ে বয়সে ছোটো নেশাখোর না-কি আমাকে তুই তুকারি করে! আমি বলি, “তোর কাছে সিগারেট বিক্রি করুম না।”
নেশাখোর লাফ দিয়ে দোকানে ঢুকে যায়, আমাকে দুই চার ঘা লাগিয়ে দেয়। আমিও ছেড়ে দেবার মানুষ না। সুযোগ বুঝে দুই উরুর মাঝে চাপ দিয়ে দেই। আশেপাশের সবাই এসে আমাদের ঝগড়া থামায়।
আমাদের ঝগড়ার সাথে সাথে, আমার মানিক মিয়ার দোকানে কাজ করাও থেমে যায়। আমাকে মানিক মিয়া দোকান থেকে বের করে দেয়। দোকান ভাঙচুরে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি ও বিল্লাল বকশির সাথে ঝামেলা করার অপরাধে আমি বিতাড়িত হই।

আমার বাড়িওয়ালা জামান সাহেব অতি সজ্জন ব্যক্তি হলেও, তাকে ঠিক কেতাদুরস্ত বলা যায় না। বিয়ে সাদি করেননি, তাই চির কুমার বলা চলে। নিজের জীবনের উপার্জন দিয়ে এই বাড়ি তৈরি করেছেন। যা ভাড়া আসে তাতে দিব্যি চলে যাবার কথা। কিন্তু তিনি ঠিক কী কারণে সাত তলা বাড়ির বারোটা ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল দিতে পারেননি, তা হয়ত বাড়ির বাকিদের কাছে অজানা। আমি এগারো মাস ধরে ভাড়া না দিলেও, জামান সাহেব আমাকে স্নেহ করেন। আমার সাথে মোটামুটি সকল বিষয়ে তিনি আলাপ আলোচনা করেন। আমার সাথে তার সদ্ব্যবহার মাঝে মাঝে আমার মাঝে এই ভাবনাও এনে দেয় যে, স্ত্রী সন্তান কিংবা কোনো কূলে কোনো আত্মীয় না থাকা জামান সাহেব, কোনোদিন তার জীবন সায়াহ্নে গিয়ে, এই বাড়িখানা আমার নামেই লিখে দিবেন।

আমি আমার কিশোর পেরোনোর বয়সে, দুলাল বিশ্বাস নামে এক জোত্যিষীর কাছে তিনশত টাকা খরচ করে হাত দেখিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমার জীবনে প্রবল উন্নতি আছে, ধন সম্পদ প্রাপ্তিযোগ আছে। সে উন্নতি কিংবা ধন সম্পদের দেখা আমি না পেলেও, চেষ্টায় কমতি রাখিনি। দুলাল বিশ্বাস আমাকে এ বিষয়েও বলেছিলেন যে, আমার জীবনের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলা এবং ভাগ্যবান সংখ্যা হচ্ছে চার ও সাত। আমার ইন্টার পরীক্ষার রোলের শেষে দুই সংখ্যা মিলে সাতচল্লিশ থাকাতেই বোধহয় আমি ইন্টারে পাঁচ বিষয়ের আশির উপরে মার্কস পেয়ে পাশ করেছিলাম। ওর থেকে ভালো ফলাফল আমি আর কখনও করতে পারিনি জীবনে। আমি আমার বিয়ের চার বছরের মাথায় বাচ্চা নিয়েছি, বাচ্চার বয়স যখন সাত তখন সুন্নতে খতনা দিয়েছি। সর্বোপরি জামান সাহেবের এই সাতচল্লিশ নাম্বার বাড়িটার সাত তলায় ভাড়া নিয়েছি। এবার উন্নতির আশা করাই যায়।
কিন্তু জামান সাহেব নিজেও যেখানে বিচ্ছিরি রকম ঝামেলায় ফেঁসে আছেন, সেখানে আমার উন্নতি কোথা থেকে হবে তা আমার মাথায় আসে না।

জামান সাহেব তার অবশিষ্ট সঞ্চয় ও একটা ব্যাংক হতে স্বল্প মেয়াদে কোটি খানেক টাকা লোন নিয়ে একটা জমি ক্রয় করেন। জামান সাহেব তার বাসা ভাড়া থেকে যে টাকা পান তাতেই অনায়াসে ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে পারবেন। তার উপর তার চিন্তা ভাবনা, জমি প্লট করে তিনগুণ দামে বিক্রি করলেও লোকে কিনবে। জমির কাগজ পত্র সবই ঠিক। এত বিশাল জমি, এত কমে পাওয়াতে জামান সাহেব দ্বিতীয় বার না ভেবেই নিয়ে নেন। জমি লাভের এক মাসের মাথায় জামান সাহেবের সাইনবোর্ড ভেঙে, নতুন সাইনবোর্ড টানানো হয়, যাতে স্পষ্ট লেখা, ক্রয়সূত্রে জমির মালিক বদরুল বকশি।
বদরুল বকশি, এলাকার অনেক বড় একজন নেতা। সামনে এমপি নির্বাচনে দাঁড়াবে। বিশাল সন্ত্রাস বাহিনী নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। তার ভাই বিল্লাল বকশি তার ডান হাত। যে ডান হাতের দুই উরুর মাঝে আমি চাপ দিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখিয়েছিলাম।

কোটি টাকার ঝামেলায় আমার বাড়িওয়ালা জামান সাহেব পড়ে আছেন। প্রতি মাসে ব্যাংক লোন শোধ করতে হয়, বাড়ি ভাড়া তুলে। অবশিষ্ট টাকায় কোনোমতে খাওয়া দাওয়া চলে, বারো ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাসের বিল তার দেয়া হয় না। টাকা থাকে না। সবেমাত্র বিদ্যুৎ সংযোগ গিয়েছে বদরুল বকশির প্রভাবে, এরপর পানি, গ্যাসও উধাও হবে।

আমি বহুবার বলেছি, জামান সাহেবকে, “আপনি বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগান, তা না হলে অন্ততপক্ষে একজন দারোয়ান। মানিক মিয়া তার চায়ের দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে বসে আছে। আপনার এত বড় বিল্ডিং। তার উপর আবার বদরুল বকশির হুমকি ধামকি। সিসিটিভি ক্যামেরা দরকার, নিচে একজন দারোয়ান দরকার।”
আমার বাড়িওয়ালা রাজি হন না। তার এই সাত তলা বাড়ির কোনো সিকিউরিটি দরকার নাই। তিনি নিরাপত্তা হিসাবে থানায় জিডি করেন, বদরুল বকশি ও বিল্লাল বকশির নামে। তাকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। এছাড়া জমি নিয়ে মামলা তো চলছেই।

আমি মানিক মিয়ার দোকান হতে বিতাড়িত হয়ে, একটা ভ্যানে সবজি নিয়ে বসি আমার বাসার সামনে। আমার বাড়িওয়ালা জামান সাহেব তাতে পূর্ণ সমর্থন দেন। কিছু টাকা উপার্জন হলে, বাসা ভাড়া অন্তত শোধ হবে। প্রতিদিন সকালে কাওরান বাজার হতে কম দামে সবজি কিনে এলাকায় বেশি দামে বিক্রি করি। ভালোই চলে। তবে সে ভালোও আমার ভালো থাকে না। এলাকায় বিল্লাল বকশির প্রভাব। যাবতীয় চাঁদা সে তুলে। আমার কাছে যে টাকা চাঁদা দাবি করে, তা দিলে আমার লাভের টাকা কিছুই থাকে না। তাছাড়া বিল্লাল বকশি আমার শত্রুপক্ষ, তার ভাই বদরুল বকশি আমার বাড়িওয়ালার শত্রু। আমি চাঁদা দেই না এবং তার ফলস্বরূপ আমার ব্যবসাও করা হয় না। টাকা খেয়ে পুলিশ এসে আমাকে লাঠিপেটা করে, সবজির ভ্যান নিয়ে বসা উচ্ছেদ করে। আমি সম্পূর্ণ কাজহীন হয়ে যাই। জীবনে একের পর এক দুঃখের মাঝে, আমার ছেলে কফিলের পা ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আরেকটা দুঃখ হয়ে জীবনে যোগ হয়। এ দুঃখের জীবনে সুখ কবে আসবে, আমি তা ভেবে কূল কিনারা পাই না।

এর মাঝে অবাক করা এক ঘটনা ঘটে। আমার স্ত্রী ও সন্তান হাসপাতালে, আমি ঠিক কোথায় তা বলতে পারি না। আমার বাড়িওয়ালা জামান সাহেব তার বাসায় খুন হন। মুখ বেধে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে ভর দুপুরে খুন করা হয়েছে। পুলিশ আসে, লাশ নিয়ে যায়। বদরুল বকশি ও বিল্লাল বকশি পলাতক। তাদের পুলিশ খুঁজছে। ধরে ফেলবে অবশ্যই। যতই সহযোগিতা পূর্বে পুলিশ তাদের করে থাকুক, এখন মনে হয় না, সে সহযোগিতায় কাজ হবে। নিশ্চিত ধরা পড়বে।

আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ভ্যান গাড়িটার দিকে তাকাই। আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। আবার ভ্যানে করে সবজি বিক্রি না-কি মানিক মিয়ার চায়ের দোকান কিংবা দুটোই, কোনটা আমার করা উচিত তাই ভেবে যাই। আমার মনের আনন্দ আমি কাউকে বোঝাতে পারি না, একা একা অনুভব করি শুধু। জামান সাহেব মারা গেলেন মানে, এই সাতচল্লিশ নাম্বার বাড়িতে আমার বিনা ভাড়ায় থাকার এগারো মাস আর পার হবে না। এখানেই থেমে থাকবে। আমার ভাড়া দিতে হবে না। ব্যাংক এ বাড়ি নিয়ে যাবে না-কি জামান সাহেবের জমি, আমি তা জানি না। তবু নিশ্চিত আমার কাছে কেউ ভাড়া চাইবে না।

জামান সাহেব আমার কাছের মানুষ ছিলেন, তার মৃত্যুর বিষাদ তবু আমার আনন্দ হচ্ছে। কিছু বিষাদ এভাবেই আনন্দ হয়। আমি দুলাল বিশ্বাসের কথা ভাবি আর বাড়ির গায়ে লেখা সাতচল্লিশ নাম্বারের দিকে তাকিয়ে থাকি। দুলাল বিশ্বাস আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন হয়ত।

এ জীবনে কত শত বেদনা, দুঃখ, বিষাদ। যখন হাতড়ে কোনো আলোর দিশা, সুখের ছোঁয়া পাওয়া সম্ভব হয় না, তখন বোধহয় মানুষ এভাবেই অন্যের বিষাদকে নিজের সুখ ভেবে আনন্দ পায়। যে সমীকরণের কোনো সমাধান খুঁজে পায় না, তা অসমাপ্ত রেখে; একদম শেষে জানা উত্তর লিখে সান্ত্বনা পায়।

আচ্ছা জামান সাহেবকে খুন করল কে?

রিয়াদুল রিয়াদ
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ১২:৫০
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শোকের উচ্চারণ।

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৪ সকাল ১০:১৬

নিত্যদিনের জেগে উঠা ঢাকা - সমস্তরাত ভারী যানবাহন টানা কিছুটা ক্লান্ত রাজপথ, ফজরের আজান, বসবাস অযোগ্য শহরের তকমা পাওয়া প্রতিদিনের ভোর। এই শ্রাবণেও ময়লা ভেপে উঠা দুর্গন্ধ নিয়ে জেগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যা হচ্ছে বা হলো তা কি উপকারে লাগলো?

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৬ শে জুলাই, ২০২৪ দুপুর ১:২৮

৫ হাজার মৃত্যু গুজব ছড়াচ্ছে কারা?

মানুষ মারা গিয়েছে বলা ভুল হবে হত্যা করা হয়েছে। করলো কারা? দেশে এখন দুই পক্ষ! একে অপর কে দোষ দিচ্ছে! কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের নামে উগ্রতা কাম্য নয় | সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যবাদকে না বলুন

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২৬ শে জুলাই, ২০২৪ বিকাল ৫:২৭



প্রথমেই বলে নেয়া প্রয়োজন "বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সমস্ত অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে" ধীরে ধীরে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের উপর ভর করে বা ছাত্রদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন প্রশ্নের কি উত্তর? আপনাদের মতামত।

লিখেছেন নয়া পাঠক, ২৬ শে জুলাই, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:১৬

এখানে মাত্র ৫টি প্রশ্ন রয়েছে আপনাদের নিকট। আপনারা মানে যত মুক্তিযোদ্ধা বা অতিজ্ঞানী, অতিবুদ্ধিমান ব্লগার রয়েছেন এই ব্লগে প্রশ্নটা তাদের নিকট-ই, যদি তারা এর উত্তর না দিতে পারেন, তবে সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকুরী সৃষ্টির ব্যাপারে আমাদের সরকার-প্রধানরা শুরু থেকেই অজ্ঞ ছিলেন

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৬ শে জুলাই, ২০২৪ রাত ৯:০৭



আমার বাবা চাষী ছিলেন; তখন(১৯৫৭-১৯৬৪ সাল ) চাষ করা খুবই কষ্টকর পেশা ছিলো; আমাদের এলাকাটি চট্টগ্রাম অন্চলের মাঝে মোটামুটি একটু নীচু এলাকা, বর্ষায় পানি জমে থাকতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×