

দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানকে বলা হয় Four Asian Tigers. এই দেশগুলি ক্রমাগত উন্নয়নের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে দরিদ্র অবস্থা থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে। একটি দেশ যে প্রাথমিক পর্যায়ের স্বৈরশাসনের মধ্যেও অর্থনৈতিক উন্নতিতে বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে দক্ষিন কোরিয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই পোস্টে আমি দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন থেকে বাংলাদেশ কি শিখতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করছি।
দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৪৫ সালে জাপানের উপনিবেশিক শাসন থেকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়। ১৯৬০ সালেও এটি একটি গরীব দেশ ছিল এবং তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায় নাই। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সিংমান রি ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসন করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য নয়। তিনি তার প্রতিপক্ষকে (বিশেষত কমিউনিস্টদের) কঠোর হস্তে ও নির্মমভাবে দমন করেন। তার সময়ে দেশে সীমাহীন দুর্নীতি বিরাজমান ছিল।
প্রথম ১২/১৩ বছর উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার পরও ১৯৬০ থেকে দেশটি দ্রুত গতিতে উন্নয়ন যাত্রা শুরু করে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্থর ছিল। মূলত ১৯৮০ সালের পর থেকে কিছু উন্নয়ন দৃশ্যমান হতে থাকে। তবে আমরা যদি কোরিয়ার মত গতি অর্জন করতে পারতাম তাহলে ২০০০ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাতে পারতাম।
দক্ষিন কোরিয়া ১৯৬০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সামরিক একনায়কদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। অথচ এই সময়কালেই দেশটি দরিদ্র দেশ থেকে একটি শিল্পোন্নত দেশে পরিনত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রও যে সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে তা দক্ষিন কোরিয়ার সরকার ও জনগন তা প্রমাণ করেছে।
সময়ের ভিন্নতা থাকলেও দক্ষিন কোরিয়ার উন্নয়নে কিছু বিষয় আছে যা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। বাংলাদেশের মত দক্ষিণ কোরিয়ারও শুরুতে নিম্নোলিখিত সীমাবদ্ধতা ছিল;
১। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা।
২। দেশের সামান্য কিছু লোক ছাড়া বাকিরা দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত। ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে উঠে নাই।
৩। যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ( ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ)
৪। ব্যাপক দুর্নীতি
৫। গণতন্ত্রহীনতা (বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রকৃত পক্ষে কতটুকু কার্যকর ছিল তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে) ও পরবর্তীতে
সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত সরকার।
৬। অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। কলকারখানা তেমন ছিল না।
৭। পুজির সীমাবদ্ধতা।
৮। বিদেশীদের দানের উপর নির্ভরশীলতা।
৯। সাক্ষরতার হার কম ছিল।
১০। বহু যুগ পর্যন্ত উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল।
এত সীমাবদ্ধতা সত্যেও দক্ষিন কোরিয়া স্বৈরশাসকদের দ্বারা দুই দশকের মধ্যে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই সীমাবদ্ধতা সমূহকে দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে মোকাবেলা করলঃ
১। একাধিক উন্নত রাষ্ট্রের সহযোগিতাঃ
দক্ষিণ কোরিয়া বহু বছর পর্যন্ত আমেরিকার কাছ থেকে আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা পেয়েছে। ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়াতে আমেরিকার সৈন্য আছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া সৈন্য দিয়ে আমেরিকাকে সাহায্য করেছে। এর বিনিময়ে তারা প্রচুর অর্থ সহায়তা, ভিয়েতনামে ঠিকাদারি কাজ, আন্তর্জাতিক বাজারে ঢোকার সুযোগ ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। আমেরিকা রাশিয়াকে চাপে রাখতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক ও ভুগলিক কারণে দক্ষিন কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়া জাপান তাদের ব্যবসায়ীক কৌশল হিসাবে তাদের অনেক ব্যবসাতে কোরিয়াকে যুক্ত করেছে। কোরিয়া যেহেতু জাপানের উপনিবেশ ছিল তাই জাপানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কোরিয়ার সমস্যা হয় নাই। জাপানের সাথে কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ীক সম্পর্ক উন্নয়ন ও জাপানের শিল্পায়ন পদ্ধতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও অনুসরণ করে দক্ষিণ কোরিয়া লাভবান হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উদ্যোক্তা ও প্রকৌশলী জাপানের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা এবং তারা জাপানী ভাষায় কথা বলতে পারত। ফলশ্রুতিতে দক্ষিন কোরিয়া অর্থ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ক্ষেত্রে লাভবান হয়েছে। জাপানের সাথে ব্যবসায়ীক প্রতিযোগিতার মনোভাব তাদের উন্নতিকে আরও তরান্বিত করেছে। দুঃখজনক ব্যাপার হোল বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকে কোনও ধনী রাষ্ট্রের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা পায় নাই। এরকম সুযোগ পেলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও তরান্বিত হত। ধনী দেশগুলো কিছু দান খয়রাত, অনুদান, ঋণ ইত্যাদি দিলেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারি নাই নিজেদের পরিকল্পনাহীনতা ও দুর্নীতির কারনে। আরব দেশগুলি বাংলাদেশকে অনেক পরে স্বীকৃতি দেয়। চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন খুব বেশী জড়িত হতে চায়নি।
২। স্বৈরাচার ও একনায়কদের উন্নয়ন দক্ষতা ও দূরদর্শিতাঃ
দক্ষিন কোরিয়ার প্রথম দিকের স্বৈরশাসক ও একনায়করা গায়ের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখলেও দেশের উন্নয়নে তারা অনেক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজনীতির কারণে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত হতে দেন নি। বাংলাদেশ উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে একই সাথে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক এই উভয় গুন সম্পন্ন কোনও রাষ্ট্রনায়ক পায় নাই। কেউ দেশপ্রেমিক ছিলেন কিন্তু দক্ষ ছিলেন না। আবার কেউ স্রেফ এক নায়ক ছিলেন ক্ষমতা ধরে রাখাটাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। রাজনৈতিক অনাচারের কারণে উন্নয়ন নিয়ে নেতারা বেশী আন্তরিক ছিলেন না।
৩। নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলাঃ
দক্ষিণ কোরিয়া নিরক্ষরতা দূরীকরণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়ে ১৯৭০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৭% নিয়ে আসে। ১৯৫০ সালে এটা ছিল ২৫% এর মত। অথচ বাংলাদেশে ৪৯ বছর পরেও সাক্ষরতার হার ৭৪% বলা হচ্ছে। ১৯৯০ সালের মধ্যেই আমাদের সাক্ষরতার হার অন্তত ৮০% করা উচিত ছিল। দক্ষিন কোরিয়ার জনগন উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে অনেক অগ্রসর। ৬০ এর দশক থেকেই বহু কোরিয়ান নাগরিক জাপান যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরে। সরকার এদেরকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে মাঝারি শিল্প ও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভারী ও প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প গড়ে তোলে। আমাদের দেশে এখনও শিক্ষার মান অনেক নিম্ন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের খুব ক্ষুদ্র অংশ আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারছে। ফলে উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে এই দেশের ১ কোটিরও বেশী লোক বিদেশে চাকরী করলেও সামান্য কিছু দক্ষ লোক ছাড়া বাকিরা বিভিন্ন দেশে অপেক্ষাকৃত কম বেতনে নিম্নমানের কাজ করছে। আন্তরজাতিক শ্রম বাজারে এরা প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে পড়ছে। দেশের ভিতরেও দুর্নীতি ও অসুস্থ ব্যবসায়ীক পরিবেশের কারণে মেধাবিরা নিম্নমানের মেধার দাপটে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছে না। প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকলেও যে একটি জাতি উন্নত হতে পারে তা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রমান করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটানোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়া একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ অত্যধিক পরিশ্রমী একটি জাতি। তারা আমদানি নির্ভরতা কমানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করে। শ্রমঘন হালকা শিল্পে মনোযোগ দেয়। প্রথম পর্যায়ে কিছু অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ব্যতীত আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে। পরবর্তী পর্যায়ে কিছু সম্ভাবনাময় সেক্টর বেছে নেয় রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য। এর ফলে দেশটির নিজস্ব শিল্প ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং অনেক কর্ম সংস্থান হয়। বাংলাদেশে আমরা এখনও পর্যন্ত দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের লেখাপড়ার মান দিন দিন নিম্নমুখি হচ্ছে। হাতে গোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া ভালো মানের শিক্ষিত ছেলেমেয়ে পাওয়া দুষ্কর। শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। আমরা গত ৪৯ বছর ধরেই আমদানি নির্ভর একটা জাতি। হালকা ও মাঝারি ধরনের শিল্প গড়ে আমদানি নির্ভরতা কমান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াসের ক্ষেত্রে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশে ৪৯% মানুষ এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রতি বছর কমছে। ফলে কৃষিতে কর্ম সংস্থান আর বাড়বে না ( মৎস্য ও গবাদি পশুপাখির খামার ছাড়া)। ফলে আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে শিল্প ও সেবা খাতে। দক্ষিণ কোরিয়াতে ১৯৬০ সালে জিডিপির ৫০% আসত কৃষি থেকে এখন তা মাত্র ২.৩০%। এর বিপরীতে তারা রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলেছে এবং আমদানি কমানোর জন্য নিজস্ব শিল্পকে কিছু সময়ের জন্য সুরক্ষা দিয়েছে। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। এক তৈরি পোশাক ছাড়া আমাদের বড় কোনও রপ্তানি খাত নেই। এই খাতটাও অন্তর্নিহিত কিছু সমস্যার কারণে দুর্বল অবস্থায় আছে । তবে কিছু সেক্টর যেমন টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং নির্ভর ক্ষুদ্র শিল্প, ফারমাসিউটিকাল, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ, ইলেক্ট্রনিক্স, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করন, সিরামিকস, স্টিল রি রোলিং মিল, চামড়া ও পাদুকা শিল্প, পারফিউম, কসমেটিকস, পেইন্ট, ব্যাটারি, কাচের সামগ্রী, বৈদ্যুতিক তার, কাঠের ফার্নিচার, মোটর সাইকেল ইত্যাদি সেক্টরে আমাদের আরও ভালো করার সুযোগ আছে। এই খাত গুলিতে উন্নতি করতে পারলে অনেক কর্ম সংস্থান হবে এবং বিদেশের বাজার ধরারও সুযোগ আছে। এছাড়া বিভিন্ন সেবা খাত যেমন তথ্য প্রযুক্তি, আউট সোরসিং, পর্যটন, নির্মাণ শিল্প, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতেও আমাদের যথেষ্ট শম্ভবনা রয়েছে।
৪। পরিবার নিয়ন্ত্রিত বৃহৎ শিল্প গ্রুপকে রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও সহযোগিতাঃ
দক্ষিন কোরিয়ার স্বৈরশাসকরা কিছু পরিবার নিয়ন্ত্রিত শিল্প গ্রুপকে ( যেমন Samsung, Hyundai, LG, Kia, Daewoo, Kepco, Posco) একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ীক সাহায্য ও সুবিধা দিয়ে গেছে বছরের পর বছর। কোরিয়ান ভাষায় এটাকে Chaebol (পারিবারিক ব্যবসা ) বলে। অনেক নৈতিক এবং অনৈতিক সাহায্য ও সহযোগিতা এরা সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে। এর উদ্দেশ্য যেমন ছিল দুর্নীতি তেমনি ছিল উত্তর কোরিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা, দেশের শিল্পোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজার ধরা। সরকারের এই নীতিটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। তবে এই নীতির কারণে দ্রুত অনেক গুলি গ্রুপ অব কম্পানিজ গড়ে ওঠে যারা আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজার ধরতে সমর্থ হয়। দক্ষিন কোরিয়ার উন্নয়নে এদের ভুমিকা অনস্বীকার্য। ৭০ এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে তেমন কোনও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ছিল না। ৮০ দশকের শুরু পর্যন্ত সরকার শিল্পায়নের তেমন কোনও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই নি। নৈতিকতার মধ্যে থেকে সরকারের উচিত ছিল একটি ব্যবসায়ী শ্রেনি তৈরি করা। কারণ আমাদের দেশে কোনও ব্যবসায়ী শ্রেনি ৮০ র দশকের আগে ছিল না। পরবর্তীতে আমাদের সরকারগুলি কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপকে সাহায্য অবশ্য করেছে কিন্তু এতে দেশের অর্থনীতি লাভবান হইনি বরং ব্যবসার মালিক ও সরকারের কিছু দুর্নীতিবাজ লোক এতে লাভবান হয়েছে। এখন আমাদেরকে গার্মেন্টস ছাড়া অন্যান্য সেক্টরে সামর্থ্য বৃদ্ধি করে শিল্পায়নের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে হবে। কারণ কৃষি আমাদের দেশে অপরিহার্য হলেও এত অধিক জন সংখ্যার দেশকে শুধু কৃষি নির্ভর রেখে দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না। তবে খাদ্যে স্বনির্ভর হওয়া জরুরী।
৫। উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ করে শিল্পায়নঃ
কোরিয়ায় প্রথম কয়েক দশকে শ্রম সস্তা ছিল। সরকার তার দক্ষ জনশক্তির উদ্ভাবনী শক্তি ব্যবহার করে প্রযুক্তি নির্ভর হাইটেক শিল্পে নতুন নতুন পণ্য/ সেবা বাজারজাত করতে থাকে। অন্য দেশের টেকনোলজিকে তারা আরও উন্নত করে সহজেই নতুন পণ্য তৈরি করতে সক্ষম হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার তারা ধরতে পারে। ফলে ইলেক্ট্রনিকস, তথ্য প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, ইস্পাত, রাসায়নিক দ্রব্য, গাড়ি, তেল পরিশোধন, টেলিকমিওনিকেশন ইত্যাদি সেক্টরে দক্ষিন কোরিয়া আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। কোরিয়া গবেষণা খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। কোরিয়ার বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানের নামে অনেক আন্তর্জাতিক পেটেন্ট করা আছে এবং এটি বেড়েই চলেছে।
৬। প্রথম পর্যায়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষাঃ
রপ্তানিমুখী শিল্পে যাওয়ার আগে নিজেদের শিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হয়। স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যে আমাদের শিল্প কারখানার প্রবৃদ্ধি ছিল না বললেই চলে। স্বাধীনতার আগে যাওবা ছিল তা আমরা পরবর্তীতে একে একে ধ্বংস করেছি। ৮০ র দশক থেকে তৈরি পোশাক শিল্পে আমরা মনোনিবেশ করি। ১৯৯০ এর আগে এর সুফল আমরা পাইনি। ফলে প্রথম ২০ বছর এটা ছাড়া আমাদের আর কোনও উল্লেখ করার মত শিল্প কারখানা ছিল না। এখনও শিল্পায়নের গতি জনসংখ্যার তুলনায় অনেক শ্লথ। ভারতও কয়েক দশক পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় আমদানিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। যার সুফল তারা পাচ্ছে।
৭। জনসংখ্যাতাত্তিক লভ্যাংশঃ
প্রতিটি উন্নয়নশীল জাতি এরকম সুযোগ একবারই পায়। কোরিয়া এটা পেয়েছিল। এটা এমন একটা মেয়াদকে বুঝায় যখন দেশের কর্মক্ষম মানুষের শতকরা হার সব চেয়ে বেশী থাকে। এটা অনেক বছর পর্যন্ত চলে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা ১৯৮০ তে শুরু হয়েছে এবং ২০৪০ পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ এই সময়ে দেশে কর্মক্ষম মানুষের হার বেশী থাকবে। ফলে সঠিকভাবে এদের কাজে লাগাতে পারলে দেশ দ্রুত সামনে আগাতে পারে। তবে শর্ত হোল জনশক্তি হতে হবে দক্ষ এবং এদের কাজ দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের ইতিমধ্যে ৪০ বছর চলে গেছে কিন্তু এই সময়ে আমরা এদের দক্ষভাবে গড়ে তুলেতে পারিনি এবং একটা বিরাট অংশকে কাজ দিতে পারিনি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া এটাকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
৮। অন্তর্কলহ মুক্ত দেশঃ
উত্তর কোরিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতিগত অভ্যন্তরীণ তেমন কোন বিভক্তি কখনও ছিল না। আমেরিকান বেইস থাকার কারণে যুদ্ধের পরে উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে তারা কোনও বড় চাপ অনুভব করেনি। এ ব্যাপারে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ মুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পক্ষের এবং বিপক্ষের মধ্যের দ্বন্দ্বের জন্য বহু মূল্য দিতে হয়েছে। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী বছর গুলিতে একটা স্থিতিশীল সরকার আমরা পাই নাই।
৯। নিখাদ দেশপ্রেমঃ
দেশের চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে দেশের জনগন তাদের পরিবারের মহিলাদের স্বর্ণালঙ্কার সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বিদেশী সংস্থার দেনা শোধের জন্য, এমন ঘটনা কল্পনা করা যায়? সত্যিই এরকম ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়াতে ঘটেছিল ১৯৯৮ সালে। এ থেকে তাদের দেশপ্রেমের মাত্রা বোঝা যায়।
এই ধরণের চেতনা ১৯৭১ সালের ৯ মাসে আমাদের দেশে ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এটা উবে যেতে খুব কম সময় লেগেছিল। পরিবর্তন অলৌকিকভাবে ঘটে না। মানুষই পরিবর্তন ঘটায়। আমাদেরকে আসলে সত্যিকারের কার্যকরী ও দৃশ্যমান দেশপ্রেম দেখাতে হবে তবেই পরিবর্তন সম্ভব।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০২১ রাত ১২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


