
দুপুরের খাবার বিকেলে খেলাম ট্রলারে বসে । নৌকা , ট্রলার , জাহাজের রান্না একটু আলাদা মজা হয় । সহ বন সংরক্ষকের ট্রলারে আমি অতিথি । দুটি বেড দিয়ে সাজানো ঘর , লাগোয়া টয়লেট । নলিয়ান ফরেস্ট ষ্টেশনে থামলাম । এখানে জেলে আর জঙ্গলে অনুমোদিত কাঠুরেদের ভিড় বেশি । নিরাপত্তার জন্য ধারে কাছের অনেকেই ফরেস্ট ষ্টেশনে নৌকায় রাত কাটায় । রেঞ্জাররা এসে আলাপ সালাপ করে খোজ খবর নিয়ে গেল । আমাদের সাথে আরও দুটি ট্রলার যোগ হয়েছে । সন্ধ্যা নামলো এবং খানিক বাদে আমরা আবারো যাত্রা শুরু করলাম । অন্ধকারে কি অপূর্ব দৃশ্য শিবসা নদীতে । হাজারো হারিকেন জ্বলছে নদীতে ছোট নৌকায় । এরা জোয়ার এবং ভাটা দুই স্রোতে চিংড়ি পোনা ধরবে । শিবসার স্রোত খুব বেশি গতিময় । ট্রলারে দাড়িয়ে অসাধারন দৃশ্য দেখছি আমি একা । বাকিরা প্রতিনিয়ত জংগলে আসে নতুন চারা গাছের গননা করতে ।আমি যা দেখছি তা ওদের কাছে ডাল ভাত । নিরাপত্তার জন্য সাথের দুই ট্রলারে চারটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর অগনিত গুলি । এরা বৃক্ষশুমারি করে কেটে সাফ হওয়া বনে । জি পি এস দিয়ে নিজেদের অবস্থান নির্ণয় এবং সাথে থাকা ম্যাপ দিয়ে ইতিমধ্যে জরিপ করা জায়গায় নতুন গজানো গাছের হিসাব লিখে দাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য । ২০ বছরে এই গাছ বড় হবে । আমি দুইতিন দিন এদের সাথে ঘুরব , দেখব জঙ্গলকে একেবারে ভেতর থেকে । শিবসায় এদিকে আসিনি আগে । জানুয়ারি মাসের শীতকাল কিন্তু সুন্দরবনে চলতি পানিতে বা রানিং ওয়াটারে কিন্তু শীত নেই । ডাঙ্গায় বেদম শীত অনুভুত হয় । আমরা যেখানে পৌছুলাম সেখানে প্রায় আলোহীন একটা পৃথিবী । আমরা পারে না ভিড়িয়ে নোঙ্গর করলাম । তিনটি ট্রলার একসাথে বেধে ফেলল সবাই মিলে। টর্চের আলোয় দেখলাম ফরেস্ট ষ্টেশন আর আশপাশেই অনেক বড় বড় নৌকা । এরা সারা দিন পরিশ্রমী বলে সন্ধ্যায় খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । রাতের রান্না চলছে । পাশের বোটে উঠলাম ওদের থাকার ব্যাবস্থা দেখতে । এক ট্রলারে চারজন করে ঘুমায় । এবার ওরা আমায় সবিনয় অনুরোধ করল আমি যেন মাংস খেতে চাই । হ্যা মুরগী খাব তো ! না ওরা অন্য কিছু বুঝাতে চাইছে । আমি বললেই ওরা জঙ্গলে ঢুকবে এবং তারপর-------- । আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফরেস্ট কনজারভেটরের কেবিনের দিকে তাকালাম । উনি নিশ্চয়ই আমার আনা আজকের পত্রিকা আর ম্যাগাজিন পড়ছেন । ওরা বলল উনি কোন ব্যাপার নয় , আপনি বললেই হবে । ওরা হরিন শিকার করবে আমার নামে এবং রাতে ভোজ হবে। আমার বৃক্ষ এবং বিপদসংকুল প্রাণীদের উপর ন্যাস্ত দায়িত্বের কথা মনে পড়ে গেল । আমি ওদের না উচ্চারন করলাম । ওরা চুপচাপ যারযার বিছানায় শুয়ে পড়ল , মন খারাপ করে। ওরা যদি না জানিয়ে আমাকে না জড়িয়ে শিকার করে নিয়ে আসত সেটা ভিন্ন ব্যাপার ছিল ।
খাবার সারভ হল । খেয়ে দেয়ে বাইরে গিয়ে একটা বিড়ি ধরালাম । এত ঘুটঘুটে অন্ধকার যে চারিপাশের কোথায় কি আছে একদম বোঝা যায় না । ট্রলার ম্যানকে জিজ্ঞাসা করলাম আজকের তিথি কি । ও বলল আজ অমাবশ্যা । আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত আমি । আশপাশে কোন বিদ্যুৎ না থাকায় বা নগরের অবস্থান নেই বলে আকাশ পুরো ধরা দিয়েছে আমার সামনে । এত তারা, রজতশুভ্র ! না গুনেও শেষ হবেনা । ছোট বড় মাঝারি সব তারাই আছে । শীতের এইসময়ে ধরিত্রী একটু উত্তরমুখী থাকে , আমি কি সৌভাগ্যবান আজ । মিল্কিওয়ে ভাবটা একদম পরিস্কার । মহাজগতের শেষ প্রান্ত অশেষ যেন । কত তারা এখানে ? কে দেবে আমার প্রশ্নের উত্তর । শাহিন সাহেব কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে আমার মত আকাশে তাকালেন । আমি শিশিরে ভিজে যাওয়া মুখ মুছলাম কেবিন থেকে তোয়ালে এনে । শাহিন সাহেব কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে বললেন এই শিশিরপাত চোখে দেখা যায়না । বিপদ হচ্ছে এটা মাথায় বসে ঠাণ্ডা লেগে গেলে জ্বর মাস্ট । আসলেও তাই , প্রতি তিন চার মিনিটে আমার মুখ চোখ ভিজে যাচ্ছে শিশিরপাতে , অদৃশ্য অথচ আকাশ কি পরিস্কার । ভ্যানগগ চলে এলো দৃশ্যপটে । তিনি উত্তর গোলার্ধে আরও ভাল বিশাল আকাশ দেখেছিলেন বলেই বিখ্যাত ছবি একেছিলেন । এই দেখার একটা কৌশল আছে । ভ্যানগগ তার ভেতরে বিশাল এক জনপদকে সেঁধিয়ে নিয়ে দেখেছিলেন বলেই তার স্টারি নাইট সকলকে আকর্ষণ করেছিল । তিনি অডিয়েন্স বুঝতেন , তাদের মেজাজ বুঝতেন । এই বুঝতে পারাটা একজন শিল্পীর সার্থকতা । সুন্দরবন থেকে আকাশে জানুয়ারি মাসে মিল্কিওয়ের প্যাচ ভীষণ আলাদা রকম । ওটা একসময় আঁধারে হারিয়ে গেছে । কয়েক কোটি তারা দৃশ্যমান । এদের কোথাও কি জীবন নেই । মুখ মুছছি আর ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছি । ঘাড় ব্যাথা শুরু হল । ভাবলাম বালিশ এনে শুয়ে দেখি । ট্রলারম্যান পাশেই দাড়িয়ে । সে বুঝে ফেলল আমার মতিগতি । বলল স্যার আপনি অভ্যস্ত না , জ্বর হয়ে যাবে । শেষ দেখা দেখে কেবিনে ঢুকে শুয়ে পড়লাম । ঘুম আসার আগ পর্যন্ত মন জুড়ে আকাশের মিল্কিওয়ের শেষ প্রান্ত জেগে রইল ।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ৯:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




