somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইলোরা গুহার ১৬ নাম্বার টেম্পল

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমরা আওরঙ্গবাদ থেকে ঘণ্টা দূরে খুলতাতবাদের পাহাড়ের উপর ডাকবাংলোতে উঠেছি । চারিদিকে পাহাড় । বাগানটা বেশ বড় । একটা ঝুল বারান্দা আছে যেখানে বসে দশ কিলোমিটার ফাকা জায়গা দেখতে পাওয়া যায় । খাবার দাবার ডাক বাংলোর দারোয়ানের ঘরেই হয়। চমৎকার ডাল , চাউল , রুটি , সব্জি । চুপচাপ , মনে হয় আশপাশ দিয়ে কোন লোকালয় নেই । রাতে ড্রইং রুমে ঘুমালাম যেহেতু রুমগুলো বাকি সঙ্গীরা দখল করেছে । সকালে সবাই রেডি হয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়েই চিকন কাটা রাস্তা দিয়ে নেমে বাদিকে ঘুরে নামতে গিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম । উন্মুক্ত মন্দির । নিচ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে । ওটার পাশ দিয়ে সমভূমিতে নেমে এলাম । বাদিকের গুহাগুলো দেখতে দেখতে ১ নাম্বার গুহার সামনে । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম উপরে আমাদের কালকের দাড়িয়ে থাকা বারান্দা , রেলিং । চার তালা সমান উচু হবে । কিন্তু ওঠা নামার উপায় নেই কোন । রোমাঞ্চিত আমি , একদম গুহার উপরে বসবাস । বুদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা এই নির্মাণ কাজ শুরু করেছে ৫ম-৭ম শতাব্দীতে । ধারণা করা হয় যে, বৌদ্ধ গুহাসমূহ প্রাথমিক স্থাপনারগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। প্রথম পর্যায়ে ১-৫ নং গুহা (৪০০-৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬-১২ নং গুহা (মধ্য ৭ম-মধ্য ৮ম খ্রিষ্টাব্দ)। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এটা নিশ্চিত যে, হিন্দুগুহা ( ২৭, ২৯, ২১, ২৮, ১৯, ২৬, ২০, ১৭ এবং ১৪ নং. গুহা) এর আগে তৈরী। সর্বপ্রথম স্থাপিত বৌদ্ধগুহা ৬ নং গুহা। ডান পাশের ৫, ২, ৩, ৫ এবং ৪, ৭, ৮, ১০ ও ৯ নং. ব্লক। আর সর্বশেষ স্থাপিত গুহা হল ১১ ও ১২ নং. গুহা। সকল বৌদ্ধগুহা স্থাপিত হয় ৬৩০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।

এই বিশাল স্থাপনাটি বেশিরভাগ বিহার ও মঠের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে বড়ো, পাহাড়ের গায়ে খোদাইকৃত বহুতল ভবন (বাসস্থান, শোবার ঘর, রান্নাঘর এবং অন্যান্য কক্ষ) বিদ্যমান। এই স্থাপনার কিছু গুহাতে পাহাড়ের গায়ে খোদাইকৃত গৌতম বুদ্ধ, বৌদিসত্তব ও পন্ডিতদের প্রতিমাসংবলিত মন্দির বিদ্যমান।

সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধগুহা হল ১০ নং গুহা, এটি চৈত্য হল (চন্দরশালা) অথবা ভিশভাক্রাম গুহা, যা “কারপেন্টার’স কেভ” ('Carpenter's Cave) নামে সর্বাধিক পরিচিত। এই গুহাটিতে অনেকটা গির্জার মত একটি বিশাল হল বিদ্যমান যার নাম চৈত্য, যার ছাদ এমনভাবে খোদাইকৃত যে দেখতে অনেকটা কাঠের বিমের মত। এই গুহার ঠিক মধ্যখানে একটি ১৫ ফুট লম্বা আসনকৃত বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। অন্যান্য বৌদ্ধগুহার মধ্যে ১-৯ নং গুহা হল মঠ এবং দো-তাল (১১ নং গুহা) ও তিন-তাল (১২ নং গুহা) তিনতলা।
কয়েকটি গুহা কুঁদে এত গভীরে গেছে এবং মাথার ওপর বিশাল ছাদ রেখে । দোতালা ,তিনতলা আছে এবং প্রথা অনুযায়ি সিঁড়িও আছে । আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ৩৪ টি গুহা তিন দিনে দেখব । শুধু ১৬ নম্বর গুহা বেশি সময় বা ১ দিন ধরে দেখব । মানুষজন প্রায় নেই , যা আছে ১৬ নাম্বার কৈলাস মন্দিরের ভিতরে । খুব ক্লান্তি শরীরে । ৩ কি ৪ নাম্বার গুহার মেঝে বেশ ঠাণ্ডা তো আমি আর মতি আরামে মেঝের ঠাণ্ডায় ঘুমিয়ে গেলাম । ঘণ্টা খানেক বাদে উঠে বাকিদের খুজতে সামনে গেলাম । প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে । মতি উদ্ভ্রান্তের মত হাজির হয়ে আমায় গালাগাল শুরু করল । সে ঐ নির্জনে ভয় পেয়েছে একা এবং কেন আমি তাকে জাগাইনি । হাসতে শুরু করল সবাই । দুপুরে ঐ পথ ধরে উঠে গেলাম আবার ডাক বাংলোয় খেতে । আসা যাওয়ার পথে উপরে দাড়িয়ে কৈলাস মন্দির দেখি আর ভাবি কারা সেই ভাস্কর আর কুশলী যারা টানা শত বছর ধরে এতোটুকু নষ্ট না করে , জোড়া না দিয়ে এই স্থাপনা বানিয়েছে ।
দুপুরে খেতে যাবার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটাই গুহা থেকে গুহায় । ভেতরের কারুকাজ খুঁটিয়ে দেখি । বিকেল নাগাদ কিছু টুরিস্ট থাকে তারপর তারা টুরিস্ট বাসে করে চলে যায় । পুরো এলাকা ফাকা । সূর্য পাহাড়ের গায়ে হারিয়ে যাবার সাথে সাথে আমরা কৈলাসের পাশের রাস্তা দিয়ে উঠে যাই । দারোয়ানের ছেলেটি বলেছিল পাহাড়ি পথে জানোয়ার আর সাপ থাকে । এমনকি আমাদের বিস্তীর্ণ বাগানেও সাপ আসে । বিনোদনের কিছুই নেই এখানে রাতের শো শো হাওয়া আর রাতজাগা পাখিদের ডাক ছাড়া ।
সকালে যেতে গিয়ে হটাত দাড়িয়ে পড়লাম । আমার সঙ্গী বলল খুব খেয়াল করে দেখুন । আরে হ্যা তাইতো ! এত হনুমান বসে খোলা জায়গার দিকে তাকিয়ে বসে আছে । টেনশন হল যদি কামড় দেয় । একজন বলল কাপড় খুলে মাথায় বেধে হাটতে । দারোয়ানের ছেলেটি হাজির । সে বলল কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা হাটতে । তাই করলাম , কয়েকশ বাচ্চা বুড়া হনুমান নাগালের মধ্যে রেখে ১৬ নাম্বারের সিঁড়িতে পৌঁছে দৌড় দিয়ে নামার প্রতিযোগিতা । কোন হনুমান কিন্তু আমাদের দিকে ফিরেও দেখেনি । অ্যারিষ্টটেল , হোমার সব ফেইল ওদের ভীষণ মনোযোগী হয়ে তাকিয়ে স্ট্যাচুর মত বসে থাকা দেখে। যাক আমাদের বস্ত্র মাথায় বাধা লাগেনি । সন্ধ্যায় আমাদের অনেক পণ্ডিত গজালো নানাবিধ তুকতাক নিয়ে কিভাবে হনুমান থেকে রক্ষা পেতে হয় , এরাই আগে দৌড়ে ডাকবাংলোয় গেসিলো ।
বেশ ঘটা করে কৈলাস দেখা শুরু করলাম । উপর থেকে এর চুড়া , তার নকশা , ক্রমে নিচে ধাবমান চোখ দুটো খুজছে কোথাও কি জোড়া দেওয়া আছে ? ওয়ান কাট রক টেম্পেল , গ্রীসের পারথেনন থেকে অনেক বড় । পাশের দেওয়াল ধরে দাড়িয়ে আমি তাকিয়ে সোজা নিচে । কেমন জানি বড় আঁচড়ে কাটা কালো পাথর । নিচে নেমে মন্দিরে ঢুকলাম , তন্ন তন্ন করে খুজলাম এর অখণ্ডতা । মাথা নুয়ে এল এর ভাস্করদের প্রতি , আর্কিটেক্টদের প্রতি , সাধারন খোদাইকারকদের প্রতি যে এত যত্ন করে কাটতে কাটতে নিচে নেমেছে নির্ভুল নিশানায় এতটুকু বাড়তি না কেটে । মডেল নিশ্চয়ই ছিল এবং সেটা স্টাডি করেছে বছর ধরে । এরপর মাঝের মুল মন্দিরের ভেতরে ঢুকেছে কুঁদে । তারপর ডিজাইন খোদকরা পাতা ,লতা , ফুল আর দেবদেবীর হাই থেকে লো রিলিফ নির্ভুল কুদেছে । শেষ দল পাথর দিয়ে পাথর ঘষেছে স্মুথ করার জন্য । কিছু কর্মী নিশ্চয়ই অন্য কোন দেশ কালে কাজ করেছে বিধায় স্থানীয়দের শেখাতে পেরেছে খোদাই কাকে বলে । এই প্রজন্মের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য কোথাও কাজ করে পুরো ভারতবর্ষকে আলোকিত করেছে । এর আগে আমরা ভুবনেশ্বরে কোনারক সূর্য মন্দির দেখেছি কি প্রজ্ঞায় । হিন্দু সমাজে সন্মানিত সব দেবতার মূর্তি কৈলাস ও পরের গুহায় আছে। শিব সর্বত্র মান্যবর তেমন নন্দী আর পার্বতী । রাষ্ট্রকূটের সময় কৈলাস নির্মিত কিন্তু মনে হয় তিনি দেখে যেতে পারেননি ।
শেষ পাঁচটি গুহা জৈন ধর্মাবলম্বীদের । একটিতে বহু অরনামেনটাল কাজ দেখলাম কিন্তু তা কালচে । জানলাম ওটা সোনালি রঙ্গে আবৃত ছিল । সোনা ভেবে দুর্বৃত্তরা আগুনে জ্বালিয়ে ধোয়া ছাড়া কিছুই পায়নি । একটা মূর্তির শরীর থেকে কালচে রঙের টুকরো ভেঙ্গে হাতে নিলাম । এদিকে সন্ধ্যায় কেউ থাকেনা । ওটা প্লাস্টার জাতীয় কিছু মনে হল । ওর মধ্যে পাট জাতীয় তন্তু পেলাম । পূর্ণ ধারনা এল যে এটা আসলেই আফসান জাতীয় রঙে রাঙ্গানো ছিল । বাইরে সম্ভবত পাহাড় কেটেছে কিছু করবে বলে । সুভেনির হিসাবে কয় টুকরা পাথর নিলাম গাড় সবুজ , ঈষৎ লালচে , মার্বেল সাদা আর ঝকঝকে কালো । আশা করি ওগুলো এখনো আমার শো কেসে বিপুল সংগ্রহের মাঝে লুকিয়ে আছে । প্লাস্টার পাট গুচ্ছ হারিয়ে গেছে । সবাই সবাইকে হাঁকডাক করছে ফেরার জন্য কৈলাসের পাশে দাড়িয়ে । আজ শেষ দিন ইলোরায় । সন্ধ্যার পর ১ নং গুহার উপরে পাথরের ঝুল বারান্দায় বসে ধেয়ে আসা অন্ধকারে বসে রইলাম খোলা জায়গার দিকে তাকিয়ে । দারোয়ানের ছেলে বলে গেল রাত মে মুর্গা আউর রোটি হ্যায় ।

এখান দিয়েই প্রতিদিন ওঠা নামা করতাম আর তাকিয়ে দেখতাম।











সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩০
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন ডোডো পাখি

লিখেছেন জাহিদ হাসান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:৩৮


পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া পাখির একটি প্রজাতি হচ্ছে ডোডো । এটি ওশেনিয়া বা অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের অধিবাসী ছিলো। বর্তমানে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আজকে আমি সেই ডোডো পাখি নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাখো তৌহিদী জনতার কান্না আহাজারিতে চির বিদায় আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:০৬

হাটহাজারি মাদরাসা প্রাঙ্গন। ছবিঃ অন্তর্জাল।

লাখো তৌহিদী জনতার কান্না আহাজারিতে চির বিদায় আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.

লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্মরণকালের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ নামাজে জানাজা শেষে হেফাজতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকাইয়া কুট্টিঃ 'চান্নিপশর রাইতের লৌড়' ও কবি জুয়েল মাজহার

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:৩৫


ঢাকার নামকরন নিয়ে দ্বীতিয় কিংবদন্তীঃ
৭৫০ সাল থেকে ১১৬০ সাল পর্যন্ত ‘ঢাবাকা’ নামের ৪১০ বছরের সমৃদ্ধশালী বৌদ্ধ জনপদই আজকের ঢাকা মহানগরী। ১১৬০ থেকে ১২২৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ৬৯ বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে এই শাহ আহমদ শফী?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৩২



শাহ আহমদ শফী ১৯২০ কারও মতে ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়াটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। কারও মতে ১০৩ বছর বয়সী এই আহমদ শফী ১০ বছর বয়সে হাটহাজারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

শতাব্দীকালব্যাপী বর্ণাঢ্য জীবনের সফল মহানায়কের মহাপ্রয়াণঃ

লিখেছেন কসমিক রোহান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৩৭



জীবদ্দশায় যেখানেই তিনি গিয়েছেন মুহুর্তেই জনসমূদ্র হয়ে গেছে, ইন্তিকালের পরেও ঘটেছে একই ঘটনা।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগে স্বাক্ষি হওয়া হাসপাতাল জুড়ে ছিলো বাঁধভাঙা জনস্রোত, লাশ মুবারাক ফরিদাবাদ আনা হলে বিশাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×